গ্রামবাংলার মুচি সম্প্রদায় ও হাতে তৈরি জুতোর ঐতিহ্য: আধুনিকতার চাপে কি হারিয়ে যাচ্ছে এক প্রাচীন পেশা? এক বিশেষ সাক্ষাৎকার।

চামড়ার কাজ, হস্তদক্ষতা, জীবিকার সংকট এবং নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বিশেষ সাক্ষাৎকার

বিশেষ সাক্ষাৎকার | সব খবর

সাক্ষাৎকারদাতা: নিত্যানন্দ দাস, কাল্পনিক চর্মশিল্প গবেষক ও গ্রামীণ হস্তশিল্পের ইতিহাস অনুসন্ধানকারী

প্রতিবেদক: গ্রামবাংলার পুরোনো হাটে, রাস্তার মোড়ে কিংবা বাজারের এক কোণে ছোট্ট দোকানে বসে জুতো সেলাই করতে দেখা যেত মুচিদের। কারও ছেঁড়া চটি মেরামত করা, কারও জুতোর তলা বদলে দেওয়া, আবার কারও পুরোনো চামড়ার জুতোকে নতুনের মতো করে তোলাই ছিল তাঁদের প্রতিদিনের কাজ। আজ সেই দৃশ্য অনেক জায়গায় কমে এসেছে। এই পরিবর্তনকে আপনি কীভাবে দেখেন?

নিত্যানন্দ দাস: এই পরিবর্তনকে বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের গ্রামীণ জীবনের পুরোনো অর্থনীতির দিকে তাকাতে হবে। একসময় মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের বহু জিনিস দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা হতো। জুতো বা চটি নষ্ট হয়ে গেলেই নতুন জিনিস কেনার সুযোগ সবার ছিল না। অনেক পরিবারের কাছে একটি ভালো জুতো ছিল গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই জুতো ছিঁড়ে গেলে, তলা খুলে গেলে কিংবা ফিতে নষ্ট হলে সেটি মেরামত করিয়ে আবার ব্যবহার করা হতো।

এই প্রয়োজন থেকেই গ্রামীণ বাজারে জুতো মেরামতের পেশা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। মুচিরা শুধু জুতো সেলাই করতেন না; তাঁরা উপকরণ চিনতেন, চামড়ার অবস্থা বুঝতেন, কোথায় নতুন তলা লাগাতে হবে, কোথায় সেলাই শক্ত করতে হবে এবং কোন জুতো আর মেরামত করা সম্ভব নয়—এসব বিষয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখেছিলেন।

বর্তমানে সস্তা জুতো, সিন্থেটিক উপকরণ, বড় দোকান এবং অনলাইন বিপণনের প্রসার ঘটেছে। অনেক জুতো এমনভাবে তৈরি হচ্ছে, যেগুলি মেরামত করা কঠিন বা মেরামতের খরচ নতুন জুতো কেনার খরচের কাছাকাছি। ফলে পুরোনো পেশার চাহিদা কিছু ক্ষেত্রে কমেছে।

তবে এই পেশা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, এমন বলা ঠিক হবে না। এখনও বহু মানুষ জুতো মেরামতের পরিষেবা নেন। প্রশ্ন হলো, এই কাজকে কীভাবে সম্মানজনক, লাভজনক ও আধুনিক সময়ের উপযোগী করে তোলা যায়।

প্রতিবেদক: হাতে তৈরি চামড়ার জুতো নির্মাণের ঐতিহ্য সম্পর্কে একটু বলুন।

নিত্যানন্দ দাস: হাতে তৈরি জুতো নির্মাণ একটি দক্ষতানির্ভর কাজ। জুতোর নকশা, পায়ের মাপ, ব্যবহারের ধরন এবং উপকরণের গুণমান—সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় রাখতে হয়। কোনও জুতো শুধু দেখতে সুন্দর হলেই যথেষ্ট নয়; সেটি পরতে আরামদায়ক হতে হবে, পায়ের সঙ্গে মানানসই হতে হবে এবং যথেষ্ট মজবুত হতে হবে।

প্রথাগতভাবে জুতো তৈরির কাজে চামড়া কাটা, নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী অংশ তৈরি, উপরের অংশের সঙ্গে তলা যুক্ত করা, সেলাই করা এবং প্রান্ত মসৃণ করার মতো বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। প্রতিটি ধাপে নির্ভুলতা দরকার। সামান্য ভুল মাপের কারণে জুতো পায়ে চাপ দিতে পারে কিংবা দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

অঞ্চলভেদে নকশা ও নির্মাণপদ্ধতির পার্থক্যও দেখা যায়। কোথাও সাধারণ দৈনন্দিন ব্যবহারের জুতো তৈরি হতো, কোথাও বিশেষ ধরনের চটি বা ঐতিহ্যবাহী পাদুকা ব্যবহৃত হতো। সব অঞ্চলের জুতো একই রকম ছিল না; স্থানীয় জলবায়ু, মানুষের পেশা, আর্থিক সামর্থ্য এবং সামাজিক রীতির প্রভাব পড়ত।

হাতে তৈরি জুতোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, নির্দিষ্ট ব্যক্তির পায়ের মাপ অনুযায়ী তা তৈরি করা সম্ভব। যদিও এই কাজের জন্য সময়, দক্ষতা ও যথাযথ উপকরণ প্রয়োজন।

প্রতিবেদক: জুতো মেরামতের কাজের মধ্যে এমন কী বিশেষ দক্ষতা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝতে পারেন না?

নিত্যানন্দ দাস: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যাটি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। জুতো ছিঁড়েছে বলেই যে সব ক্ষেত্রে শুধু সেলাই করলেই চলবে, তা নয়। কখনও সেলাইয়ের সুতো নষ্ট হয়, কখনও তলা খুলে যায়, আবার কখনও জুতোর উপরের অংশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

একজন অভিজ্ঞ কারিগর প্রথমে জুতোর সামগ্রিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। তলার ক্ষয় কতটা, সেলাই কোথায় খুলেছে, চামড়া শক্ত হয়ে গিয়েছে কি না এবং জুতোর কাঠামো এখনও ব্যবহারযোগ্য কি না—এসব বিচার করে তিনি কাজ শুরু করেন।

কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো তলা খুলে নতুন তলা লাগাতে হয়। কোথাও ছেঁড়া অংশে উপযুক্ত উপকরণ বসিয়ে সেলাই করতে হয়। আবার কোনও জুতোর কাঠামো এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে যে সেটি মেরামত করা নিরাপদ বা অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়।

এখানে অভিজ্ঞতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের জুতো নিয়ে বহু বছর কাজ করলে কারিগর বুঝতে পারেন কোন উপকরণে কীভাবে সেলাই করলে দীর্ঘস্থায়ী হবে। কোন জায়গায় বেশি চাপ পড়ে এবং কোন অংশ আগে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেটিও তাঁর জানা থাকে।

এই জ্ঞানকে ছোট করে দেখলে ভুল হবে। মেরামত করা মানে শুধু ভাঙা জিনিস জোড়া লাগানো নয়; বরং সমস্যার কারণ বুঝে উপযুক্ত সমাধান বেছে নেওয়া।

প্রতিবেদক: আধুনিক জুতোর বাজার কি এই পেশার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ?

নিত্যানন্দ দাস: এটি বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি, তবে একমাত্র কারণ নয়। বাজারে সস্তা জুতো সহজে পাওয়া গেলে অনেক ক্রেতা মেরামতের পরিবর্তে নতুন জুতো কিনতে চান। আবার কিছু আধুনিক জুতো এমন উপকরণ দিয়ে তৈরি হয়, যা সাধারণ সেলাই বা প্রচলিত পদ্ধতিতে মেরামত করা যায় না।

আরেকটি বিষয় হলো মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন। আগে একটি জুতো দীর্ঘদিন ব্যবহার করার প্রবণতা বেশি ছিল। বর্তমানে ফ্যাশন, নকশা এবং নতুন ধরনের পণ্য কেনার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে জুতো ব্যবহারের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে।

তবে অন্যদিকে পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেরামত ও পুনর্ব্যবহারের গুরুত্বও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেক মানুষ এখন অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য কমাতে চান। এই প্রবণতা জুতো মেরামতের পেশার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কারিগরদের যদি উন্নত মানের উপকরণ, আধুনিক সরঞ্জাম এবং ভালো পরিষেবা দেওয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তাঁরা নতুন বাজারেও কাজ করতে পারবেন। শুধু পুরোনো পদ্ধতিতে আটকে থাকলে চলবে না; আবার অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করলেও চলবে না।

প্রতিবেদক: এই পেশার সঙ্গে সামাজিক বৈষম্যের ইতিহাসও জড়িয়ে রয়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখা উচিত?

নিত্যানন্দ দাস: এই বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে চর্মশিল্প ও জুতো মেরামতের কাজ ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে পেশার ভিত্তিতে মানুষের সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করা হতো। এর ফলে কিছু সম্প্রদায় দীর্ঘদিন বৈষম্য ও অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনও পেশার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকলেই সেই পেশায় যুক্ত মানুষদের নির্দিষ্ট কাজ করতে হবে—এমন নয়। প্রত্যেক মানুষের নিজের পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা, শিক্ষা গ্রহণের অধিকার এবং মর্যাদার সঙ্গে কাজ করার অধিকার রয়েছে।

চর্মশিল্পের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলে শুধু কারিগরি দক্ষতার কথা বললেই হবে না। এর সঙ্গে জড়িত মানুষের অভিজ্ঞতা, সামাজিক অবস্থান, সুযোগের অসমতা এবং পরিবর্তনের সংগ্রামও তুলে ধরতে হবে।

আজকের দিনে পেশাগত দক্ষতাকে সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়। একজন দক্ষ কারিগরের কাজের মূল্য তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং পরিষেবার মান দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত।

প্রতিবেদক: তরুণ প্রজন্ম কেন এই পেশায় আসতে চাইছে না বলে মনে হয়?

নিত্যানন্দ দাস: এর পিছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আয়ের অনিশ্চয়তা। বাজারের কোনও নির্দিষ্ট স্থানে বসে কাজ করলে প্রতিদিন সমান সংখ্যক ক্রেতা আসবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। দ্বিতীয়ত, সামাজিক মর্যাদার প্রশ্ন। কিছু তরুণ মনে করেন, এই পেশায় যুক্ত হলে তাঁরা সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়বেন। তৃতীয়ত, উন্নত প্রশিক্ষণ ও ব্যবসা বাড়ানোর সুযোগের অভাব।

যদি একজন তরুণ দেখেন যে দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেও তাঁর আয় বাড়ছে না, কাজের পরিবেশ উন্নত হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ নেই, তবে তাঁর অন্য পেশায় যাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

তাই তরুণদের শুধু ঐতিহ্য রক্ষার কথা বলে এই কাজে ধরে রাখা যাবে না। তাঁদের দেখাতে হবে, এই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কীভাবে নিজের ব্যবসা গড়ে তোলা যায়, কীভাবে নতুন ধরনের পণ্য তৈরি করা যায় এবং কীভাবে ক্রেতার কাছে পৌঁছনো যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ যদি হাতে তৈরি পাদুকা নির্মাণে দক্ষ হন, তবে তিনি নিজের নকশার পণ্য তৈরি করতে পারেন। আবার জুতো মেরামতের পাশাপাশি ব্যাগ, বেল্ট বা অন্য উপযুক্ত চর্মজাত সামগ্রীর কাজ শিখতে পারেন। অবশ্য এর জন্য প্রশিক্ষণ, মূলধন এবং বাজারের চাহিদা বোঝা দরকার।

প্রতিবেদক: গ্রামীণ মুচিদের ব্যবসা বাড়ানোর জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

নিত্যানন্দ দাস: প্রথমত, তাঁদের কাজের মান উন্নত করার জন্য প্রশিক্ষণ দরকার। নতুন ধরনের উপকরণ, সেলাইয়ের সরঞ্জাম, তলা লাগানোর পদ্ধতি এবং গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগের কৌশল শেখানো যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ কর্মস্থল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক কারিগর রাস্তার ধারে অল্প জায়গায় কাজ করেন। সেখানে বৃষ্টি, রোদ, ধুলো এবং যানবাহনের ঝুঁকি থাকে। স্থানীয় প্রশাসন উপযুক্ত স্থানে ছোট কর্মক্ষেত্র বা বাজারে নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করতে পারলে তাঁদের কাজের পরিবেশ উন্নত হতে পারে।

তৃতীয়ত, উপকরণ কেনার ক্ষেত্রে সমবায় বা গোষ্ঠীভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একসঙ্গে উপকরণ কিনলে কিছু ক্ষেত্রে খরচ কমতে পারে। তবে এই ধরনের উদ্যোগ সফল করতে স্বচ্ছ হিসাব, নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দরকার।

চতুর্থত, ডিজিটাল মাধ্যমে পরিষেবার প্রচার করা যেতে পারে। কোনও কারিগর নিজের কাজের ছবি, দোকানের অবস্থান এবং যোগাযোগের তথ্য অনলাইনে তুলে ধরতে পারেন। স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে পরিচিতি বাড়লে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পঞ্চমত, সরকারি দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তার সুযোগ সম্পর্কে কারিগরদের তথ্য দেওয়া প্রয়োজন। কোন প্রকল্পে কী শর্ত রয়েছে, কী নথি লাগে এবং কীভাবে আবেদন করতে হয়, তা বুঝিয়ে দেওয়া হলে তাঁরা উপকৃত হতে পারেন।

প্রতিবেদক: পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে জুতো মেরামতের সম্পর্ক কী?

নিত্যানন্দ দাস: জুতো মেরামত করলে ব্যবহারযোগ্য কোনও জিনিসকে অকালেই ফেলে দিতে হয় না। এর ফলে নতুন জুতো কেনার প্রয়োজন কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে যায় এবং বর্জ্য তৈরিও কমতে পারে।

জুতোর উপরের অংশ ভালো থাকলেও তলা ক্ষয় হয়ে যেতে পারে। যদি উপযুক্তভাবে তলা বদলে দেওয়া যায়, তবে পুরো জুতো ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। একইভাবে সেলাই খুলে গেলে বা ছোট কোনও অংশ নষ্ট হলে মেরামতের মাধ্যমে জুতোটিকে আবার ব্যবহারযোগ্য করা সম্ভব।

তবে পরিবেশগত লাভ নির্ভর করে মেরামতের পদ্ধতি, ব্যবহৃত আঠা ও উপকরণ, জুতোর অবস্থা এবং মেরামতের পর সেটি কত দিন ব্যবহার করা যাচ্ছে তার উপর। সব জুতো মেরামত করা সম্ভব নয়, আর গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জুতো জোর করে ব্যবহার করাও উচিত নয়।

এখানে মূল ধারণাটি হলো—যে জিনিস নিরাপদে ও যুক্তিসংগত খরচে মেরামত করা যায়, সেটিকে অকারণে ফেলে না দেওয়া। এই অভ্যাস শুধু জুতোর ক্ষেত্রেই নয়, বহু দৈনন্দিন পণ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

প্রতিবেদক: হাতে তৈরি চামড়ার জুতোর ক্ষেত্রে প্রাণীকল্যাণ ও পরিবেশের প্রশ্নও রয়েছে। কারিগরদের এই বিষয়ে কীভাবে সচেতন করা যায়?

নিত্যানন্দ দাস: আধুনিক চর্মশিল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রাণীকল্যাণ, কাঁচামালের উৎস এবং চামড়া প্রক্রিয়াকরণের পরিবেশগত প্রভাবের কথা অবশ্যই বলতে হবে। চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কিছু পদ্ধতিতে রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়। সেগুলি অনিয়ন্ত্রিতভাবে নিকাশি বা জলাশয়ে ফেলা হলে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে।

তাই কাঁচামাল সংগ্রহের উৎস সম্পর্কে সচেতনতা, উপযুক্ত প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব রয়েছে। ছোট কারিগরদের পক্ষে সবকিছু একা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাঁদের নিরাপদ উপকরণ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর সুযোগ দিতে হবে।

এ ছাড়া যাঁরা প্রাণীজ উপকরণ ব্যবহার করতে চান না, তাঁদের জন্য উপযুক্ত বিকল্প উপকরণ নিয়ে কাজের সুযোগও রয়েছে। তবে বিকল্প উপকরণ মানেই সব ক্ষেত্রে পরিবেশের উপর কম প্রভাব—এমন দাবি করা যায় না। তার স্থায়িত্ব, উৎপাদনপদ্ধতি এবং ব্যবহারের আয়ু বিবেচনা করতে হবে।

কারিগরদের উচিত ক্রেতাকে পণ্যের উপকরণ সম্পর্কে যথাসম্ভব পরিষ্কার তথ্য দেওয়া। আর ক্রেতাদেরও পণ্যের উৎস ও স্থায়িত্ব নিয়ে সচেতন হওয়া দরকার।

প্রতিবেদক: এই পেশায় মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব কি?

নিত্যানন্দ দাস: অবশ্যই সম্ভব, যদি প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ তৈরি করা যায়। ঐতিহাসিকভাবে কিছু অঞ্চলে চর্মশিল্পের বিভিন্ন কাজে নারীরা যুক্ত ছিলেন, আবার কোথাও কাজের বিভাজন ছিল আলাদা। তাই সব অঞ্চলের ইতিহাস এক রকম বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

বর্তমানে নারীরা পাদুকার নকশা, সেলাই, উপকরণ প্রস্তুতি, মান যাচাই, বিপণন এবং ছোট ব্যবসা পরিচালনার মতো কাজে যুক্ত হতে পারেন। তাঁদের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আর্থিক সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা দরকার।

স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কয়েকজন প্রশিক্ষিত কারিগর মিলে ছোট উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তুলতে পারেন। তবে উদ্যোগ শুরুর আগে স্থানীয় চাহিদা, উৎপাদন খরচ, বিক্রির সম্ভাবনা এবং লাভের হিসাব যাচাই করা উচিত।

নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্দেশ্য শুধু ঐতিহ্য সংরক্ষণ নয়; বরং তাঁদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও পেশাগত বিকাশের সুযোগ বাড়ানো।

প্রতিবেদক: হাতে তৈরি জুতো কি আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে?

নিত্যানন্দ দাস: পারে, তবে তার জন্য নকশা ও বাজার সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে হবে। হাতে তৈরি জুতোর একটি সুবিধা হলো, সীমিত সংখ্যায় বিশেষ নকশা তৈরি করা সম্ভব। ক্রেতার পায়ের মাপ ও ব্যবহারের প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য তৈরি করা যায়।

কেউ দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য মজবুত পাদুকা চাইতে পারেন, কেউ চান ঐতিহ্যবাহী নকশা, আবার কেউ চান নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের উপযোগী পণ্য। বাজারের এই ভিন্ন চাহিদা বোঝা গেলে কারিগররা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন।

তবে নতুন নকশা তৈরি করলেই ব্যবসা সফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পণ্যের মান, আরাম, স্থায়িত্ব, দাম এবং সময়মতো সরবরাহ—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় কারিগরদের নকশা শেখানোর কর্মশালা, পণ্যের প্রদর্শনী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা যেতে পারে। অনলাইন বিক্রির সুযোগও রয়েছে, তবে তার জন্য পণ্যের ভালো ছবি, সঠিক মাপের তথ্য, প্যাকেজিং এবং ক্রেতার সঙ্গে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ দরকার।

ঐতিহ্যবাহী দক্ষতা ও আধুনিক নকশার সমন্বয় ঘটলে এই পেশার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদক: জুতো মেরামতের পেশাকে ঘিরে একটি নথিভুক্ত ইতিহাস তৈরি করা কতটা জরুরি?

নিত্যানন্দ দাস: খুবই জরুরি। আমরা সাধারণত বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিখ্যাত ডিজাইনার কিংবা জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ইতিহাস বেশি শুনি। কিন্তু গ্রামের ছোট কারিগরদের কাজের ইতিহাস অনেক সময় কোথাও লেখা থাকে না।

কোনও কারিগর চল্লিশ বছর ধরে একই বাজারে কাজ করছেন—এটি শুধু ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়। তাঁর অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, বাজারের পরিবর্তন, পণ্যের দাম, পরিবহণব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন অর্থনীতির ইতিহাস।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, বিদ্যালয়, কলেজ এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন উদ্যোগ নিয়ে প্রবীণ কারিগরদের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করতে পারে। তাঁদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম, পুরোনো নকশা এবং কাজের পদ্ধতির ছবি সংগ্রহ করা যেতে পারে।

এই কাজ করতে গিয়ে ব্যক্তির সম্মতি নেওয়া, তাঁর বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা এবং তাঁর পরিচয় ও অবদানকে সম্মান করা জরুরি। কোনও সম্প্রদায় সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে যাচাই না করে ইতিহাস হিসেবে তুলে ধরা উচিত নয়।

নথিভুক্ত ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বুঝতে সাহায্য করবে যে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত শুধু বড় ব্যবসার উপর দাঁড়িয়ে ছিল না; অসংখ্য ক্ষুদ্র কারিগরও মানুষের দৈনন্দিন জীবন সচল রেখেছেন।

প্রতিবেদক: গ্রামীণ বাজারে এই পেশার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?

নিত্যানন্দ দাস: আমি মনে করি, এই পেশার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার উপর। সব কারিগরকে একই ধরনের কাজ করতে হবে, এমন নয়। কেউ মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, কেউ হাতে তৈরি পাদুকা নির্মাণে বিশেষজ্ঞ হতে পারেন, আবার কেউ ব্যাগ, বেল্ট বা অন্য চর্মজাত সামগ্রী তৈরির প্রশিক্ষণ নিতে পারেন।

স্থানীয় বাজারে ক্রেতার চাহিদা বুঝতে হবে। কোন ধরনের জুতো বেশি ব্যবহৃত হয়, কোন মেরামতের কাজের চাহিদা রয়েছে এবং ক্রেতারা কত খরচ করতে রাজি—এসব তথ্য ব্যবসার পরিকল্পনায় কাজে লাগতে পারে।

একই সঙ্গে কারিগরদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো জরুরি। তাঁদের কাজকে অবহেলার চোখে না দেখে দক্ষ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। স্কুলের শিক্ষার্থীদের কাছে বিভিন্ন পেশার গুরুত্ব তুলে ধরা যেতে পারে, যাতে কোনও কাজকে সামাজিক পরিচয়ের কারণে ছোট করে দেখার প্রবণতা কমে।

সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সহায়তা, প্রশিক্ষণ, বাজারের সঙ্গে সংযোগ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এই পেশার অনেক অংশ নতুনভাবে বিকশিত হতে পারে।

প্রতিবেদক: শেষ প্রশ্ন—যাঁরা জুতো মেরামতের কাজ করেন, তাঁদের প্রতি সমাজের কী দায়িত্ব রয়েছে?

নিত্যানন্দ দাস: প্রথম দায়িত্ব হলো তাঁদের মানুষ হিসেবে সম্মান করা। পেশার ভিত্তিতে কাউকে ছোট করা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত, তাঁদের কাজের ন্যায্য মূল্য দেওয়া উচিত। একটি জুতো মেরামত করতে কতটা সময়, শ্রম ও উপকরণ লাগছে, তা বুঝে পারিশ্রমিক দেওয়া দরকার।

তৃতীয়ত, তাঁদের নিরাপদ কর্মপরিবেশের কথা ভাবতে হবে। রাস্তার ধারে কাজ করা কারিগরদের জন্য উপযুক্ত স্থান, বৃষ্টি ও রোদ থেকে সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় আলোর ব্যবস্থা থাকলে কাজ করা সহজ হয়।

চতুর্থত, তাঁদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দিতে হবে। নতুন সরঞ্জাম ও উপকরণ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ পেলে তাঁরা আরও ভালো পরিষেবা দিতে পারবেন।

সবশেষে বলতে চাই, কোনও পেশা ছোট নয়। আমরা প্রতিদিন যে জুতো পরে হাঁটি, সেটি তৈরি ও মেরামতের পিছনে কারও দক্ষতা, শ্রম এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই শ্রমকে সম্মান করতে শেখাই একটি মানবিক সমাজের পরিচয়।

প্রতিবেদকের উপসংহার

গ্রামবাংলার মুচি ও জুতো মেরামতের কারিগরদের জীবন আমাদের সামনে শ্রম, দক্ষতা এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি তুলে ধরে। একসময় যে পেশা দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ ছিল, আজ তার সামনে নতুন বাজারব্যবস্থা, সস্তা পণ্যের প্রতিযোগিতা এবং বদলে যাওয়া ক্রেতা-অভ্যাসের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

তবু এই পেশার ভবিষ্যৎ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। মেরামত ও পুনর্ব্যবহারের প্রতি আগ্রহ, হাতে তৈরি পণ্যের সম্ভাবনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ডিজিটাল বিপণনের সুযোগ কাজে লাগানো গেলে নতুন দিগন্ত তৈরি হতে পারে।

এর জন্য প্রয়োজন বাস্তব পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং সামাজিক সম্মান। ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ কেবল অতীতের কথা বলা নয়; সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নেওয়াও।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই সাক্ষাৎকারটি কাল্পনিক। সাক্ষাৎকারদাতা নিত্যানন্দ দাস এবং তাঁর বক্তব্য কোনও বাস্তব ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নয়। প্রকাশের সময় এটিকে কাল্পনিক সাক্ষাৎকার হিসেবে উল্লেখ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *