
এক সময় শিশুদের খেলাধুলার জন্য দামি খেলনা কিংবা আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজন হতো না। বাড়ির উঠোন, বারান্দা কিংবা স্কুলের বিরতিতে কয়েকটি ছোট পাথর দিয়েই জমে উঠত খেলা। হাতের তালুতে পাথর ছুড়ে আবার ধরে ফেলা, মাটিতে পড়ে থাকা পাথর দ্রুত তুলে নেওয়া এবং প্রতিটি ধাপে দক্ষতা দেখানো—এই ছিল খেলার মূল আকর্ষণ।
পাঁচ পাথর বা পাঁচগুটি এমনই একটি ঐতিহ্যবাহী দক্ষতাভিত্তিক খেলা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর নানা রূপ দেখা যায়। কোথাও ছোট পাথর, কোথাও বীজ কিংবা বিশেষ গুটি ব্যবহার করা হয়। খেলাটির নিয়ম অঞ্চলভেদে বদলালেও হাত-চোখের সমন্বয়, মনোযোগ ও ক্ষিপ্রতা এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
আমাদের ধারাবাহিকের আগের একটি পর্বে পাঁচগুটি খেলা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাই একই খেলা আবার বিস্তারিত না লিখে, এবারের লেখায় তুলে ধরা হল আরেকটি ঐতিহ্যবাহী খেলা—পাল্লাঙ্কুঝি।
পাল্লাঙ্কুঝি কী?
পাল্লাঙ্কুঝি দক্ষিণ ভারতের একটি ঐতিহ্যবাহী বোর্ড গেম। বিশেষত তামিলনাড়ু অঞ্চলে এই খেলার পরিচিতি রয়েছে। কাঠের তৈরি একটি বোর্ডে সারিবদ্ধ ছোট ছোট গর্ত থাকে। সেই গর্তগুলিতে বীজ, কড়ি বা ছোট গুটি রেখে দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে খেলা হয়।
এই খেলায় দৌড়ঝাঁপের বদলে গুরুত্ব পায় গণনা, পরিকল্পনা এবং সঠিক সময়ে সঠিক চাল দেওয়ার ক্ষমতা। প্রতিটি গর্তে কতগুলি গুটি রয়েছে, কোন গর্ত থেকে গুটি তোলা উচিত এবং গুটি বণ্টনের পর কী পরিস্থিতি তৈরি হবে—এসব বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
পাল্লাঙ্কুঝি দক্ষিণ ভারতের লোকজ সংস্কৃতি ও পারিবারিক বিনোদনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিবরণে এই খেলার প্রচলন এবং কাঠের বোর্ডে বীজ বা কড়ি ব্যবহার করে খেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আগেকার দিনে বাড়ির সদস্যরা অবসর সময়ে একসঙ্গে বসে এই ধরনের বোর্ড গেম খেলতেন। বিশেষত গ্রামীণ সমাজে সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি খেলার গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট। কাঠের বোর্ড না থাকলে স্থানীয়ভাবে মাটিতে গর্ত করেও কিছু অনুরূপ খেলা খেলা সম্ভব হতো।
তবে পাল্লাঙ্কুঝির সব আঞ্চলিক সংস্করণের নিয়ম এক নয়। বোর্ডের গর্তের সংখ্যা, গুটি বণ্টন এবং গুটি সংগ্রহের পদ্ধতিতে পার্থক্য দেখা যায়।
খেলার উপকরণ
পাল্লাঙ্কুঝির প্রচলিত একটি সংস্করণে দুই সারিতে সাতটি করে গর্ত থাকে। প্রতিটি গর্তে সমান সংখ্যক বীজ বা গুটি রাখা হয়। সাধারণত দুই খেলোয়াড় বোর্ডের বিপরীত দিকে বসেন।
খেলার জন্য প্রয়োজন হতে পারে:
- পাল্লাঙ্কুঝির বোর্ড অথবা গর্ত আঁকা সমতল পাটাতন।
- বীজ, কড়ি বা ছোট গুটি।
- গুটি গণনার জন্য মনোযোগ ও ধৈর্য।
ছোট শিশুদের সঙ্গে খেললে এমন উপকরণ ব্যবহার করা উচিত, যা সহজে মুখে ঢুকে যাওয়ার মতো ছোট নয়। শিশুদের বয়স অনুযায়ী বড় ও নিরাপদ গুটি বেছে নেওয়া ভালো।
কীভাবে খেলা হয়?
প্রথম ধাপ: বোর্ড সাজানো
বোর্ডের প্রতিটি গর্তে নির্দিষ্ট সংখ্যক গুটি রাখা হয়। দুই খেলোয়াড় নিজেদের দিকের গর্তগুলির ওপর নজর রেখে খেলা শুরু করেন।
দ্বিতীয় ধাপ: গুটি তোলা
নিজের পালায় একজন খেলোয়াড় একটি গর্ত থেকে সব গুটি তুলে নেন। এরপর নির্ধারিত দিক অনুসারে পরবর্তী গর্তগুলিতে একটি করে গুটি রাখতে থাকেন।
তৃতীয় ধাপ: হিসাব রাখা
গুটি বণ্টনের সময় শেষ গুটিটি কোথায় পড়ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট সংস্করণের নিয়ম অনুসারে সেই অবস্থান থেকে পরবর্তী চাল বা গুটি সংগ্রহের সুযোগ নির্ধারিত হতে পারে।
চতুর্থ ধাপ: প্রতিপক্ষের চাল বোঝা
নিজের গুটি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের গুটির অবস্থানও খেয়াল রাখতে হয়। একটি চালের ফলে প্রতিপক্ষ বেশি গুটি সংগ্রহ করার সুযোগ পাবে কি না, তা ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
পঞ্চম ধাপ: খেলার ফলাফল
খেলা শেষ হলে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে দুই খেলোয়াড়ের সংগৃহীত গুটি গণনা করা হয়। প্রচলিত অনেক সংস্করণে বেশি গুটি সংগ্রহকারী খেলোয়াড় বিজয়ী হন। তবে স্থানীয় নিয়ম অনুসারে ফলাফল নির্ধারণের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
শিশুদের জন্য কী উপকার হতে পারে?
পাল্লাঙ্কুঝির মতো কৌশলভিত্তিক বোর্ড গেম শিশুদের বিভিন্ন দক্ষতা অনুশীলনের সুযোগ দেয়।
গণনার অভ্যাস: গুটি তোলা, বণ্টন করা এবং সংখ্যা হিসাব রাখার মাধ্যমে গণনার অনুশীলন হয়।
মনোযোগ: প্রতিটি গর্তে কত গুটি রয়েছে, তা লক্ষ্য রাখতে হয়।
পরিকল্পনা: একটি চালের সম্ভাব্য ফল ভেবে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে হয়।
ধৈর্য: নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করা এবং প্রতিপক্ষের চাল পর্যবেক্ষণ করা শেখা যায়।
সামাজিক দক্ষতা: মুখোমুখি বসে খেলার ফলে নিয়ম মানা, সৌজন্য বজায় রাখা এবং জয়-পরাজয় মেনে নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
এসব সম্ভাব্য উপকারিতা থাকলেও কোনও একটি খেলা খেললেই শিশুর বুদ্ধিমত্তা নিশ্চিতভাবে বেড়ে যাবে—এমন দাবি করা যায় না।
আধুনিক সময়ে এই খেলার প্রাসঙ্গিকতা
আজকের দিনে মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল গেম শিশুদের বিনোদনের বড় অংশ হয়ে উঠেছে। তবু পাল্লাঙ্কুঝির মতো বোর্ড গেম পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দিতে পারে।
বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গ্রন্থাগার কিংবা পাড়ার ক্লাবে ঐতিহ্যবাহী বোর্ড গেমের আয়োজন করা যেতে পারে। এতে শিশুরা বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি ও খেলার সঙ্গে পরিচিত হবে।
স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে পাল্লাঙ্কুঝির আঞ্চলিক নিয়ম সংগ্রহ করে লিখে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মৌখিকভাবে শেখানো অনেক খেলার নিয়ম সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে।
উপসংহার
পাল্লাঙ্কুঝি এমন একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা, যেখানে অল্প কয়েকটি গুটি দিয়ে তৈরি হয় গণনা, পরিকল্পনা ও কৌশলের আকর্ষণীয় লড়াই। দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত এই খেলা নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলা সম্ভব।
ঐতিহ্যবাহী খেলাকে সংরক্ষণ করতে হলে শুধু তার নাম জানাই যথেষ্ট নয়। খেলার নিয়ম, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসও সংরক্ষণ করতে হবে। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে এমন খেলাগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও পৌঁছতে পারে।
তথ্যসূত্র: দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী বোর্ড গেম পাল্লাঙ্কুঝি সম্পর্কিত প্রকাশিত সাংস্কৃতিক বিবরণ ও প্রচলিত নিয়মাবলি।












Leave a Reply