
বাঙালি রান্নায় চিংড়ি মাছের কদর বরাবরই বেশি। লাউ, পটল, কুমড়ো কিংবা নারকেলের সঙ্গে চিংড়ির নানা পদ পরিচিত হলেও কচুর মুখী দিয়ে চিংড়ির ঝোল তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত একটি সুস্বাদু পদ। কচুর মুখীর মোলায়েম গঠন, চিংড়ির স্বাভাবিক মিষ্টি স্বাদ এবং আদা-জিরের মশলা মিলে এই রান্নায় তৈরি হয় চমৎকার স্বাদ।
বর্ষা ও শীতের মরসুমে অনেক বাড়িতে কচুর মুখী পাওয়া যায়। অল্প কয়েকটি উপকরণ দিয়েই এই পদটি তৈরি করা সম্ভব। তবে কচু ভালোভাবে সিদ্ধ করা জরুরি, কারণ অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা কচুতে গলা বা মুখ চুলকানোর অনুভূতি হতে পারে।
উপকরণ
- মাঝারি আকারের চিংড়ি — ২৫০ গ্রাম
- কচুর মুখী — ৫০০ গ্রাম
- আলু — ১টি, ঐচ্ছিক
- পেঁয়াজ — ১টি মাঝারি
- আদা বাটা — ১ চা চামচ
- রসুন বাটা — আধা চা চামচ, ঐচ্ছিক
- জিরে গুঁড়ো — ১ চা চামচ
- ধনে গুঁড়ো — ১ চা চামচ
- হলুদ গুঁড়ো — ১ চা চামচ
- লঙ্কার গুঁড়ো — আধা চা চামচ
- কাঁচালঙ্কা — ২টি
- তেজপাতা — ১টি
- গোটা জিরে — আধা চা চামচ
- সর্ষের তেল — ৩ টেবিল চামচ
- নুন — স্বাদমতো
- চিনি — সামান্য, ঐচ্ছিক
- গরম মশলা গুঁড়ো — এক চিমটি
- জল — প্রয়োজনমতো
- ধনেপাতা — সামান্য, ঐচ্ছিক
রান্নার প্রণালী
১. কচুর মুখী পরিষ্কার ও সিদ্ধ করা
প্রথমে কচুর মুখী ভালোভাবে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে নিন। কচু কাটার সময় কারও কারও হাতে চুলকানি হতে পারে, তাই প্রয়োজনে গ্লাভস ব্যবহার করুন।
কচুর মুখী বড় হলে দুই টুকরো করে নিন। জল ও সামান্য নুন দিয়ে সেদ্ধ করুন। কচু নরম হলে জল ঝরিয়ে রাখুন। কচু যেন সম্পূর্ণ সিদ্ধ হয়, তা নিশ্চিত করুন। অতিরিক্ত গলে যাওয়ার আগেই নামিয়ে নিন।
২. চিংড়ি মাছ প্রস্তুত করা
চিংড়ির খোসা ছাড়িয়ে মাথা রাখতে বা বাদ দিতে পারেন। পিঠের কালো শিরা পরিষ্কার করে মাছ ধুয়ে নিন। সামান্য হলুদ ও নুন মাখিয়ে ১০ মিনিট রাখুন।
কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে চিংড়ি হালকা ভেজে তুলে রাখুন। বেশি সময় ভাজবেন না, কারণ তাতে চিংড়ি শক্ত হয়ে যেতে পারে।
৩. মশলা কষানো
একই কড়াইয়ে প্রয়োজন হলে সামান্য তেল দিন। তেল গরম হলে তেজপাতা ও গোটা জিরে ফোড়ন দিন।
কুচোনো পেঁয়াজ দিয়ে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। এবার আদা বাটা ও রসুন বাটা দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়ুন। হলুদ, জিরে গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো এবং লঙ্কার গুঁড়ো অল্প জলে গুলে কড়াইয়ে দিন।
মাঝারি আঁচে মশলা ভালোভাবে কষান। মশলা কড়াইয়ের গা ছেড়ে এলে বুঝবেন কষানো অনেকটা সম্পূর্ণ হয়েছে।
৪. কচুর মুখী দিয়ে রান্না
এবার সিদ্ধ কচুর মুখী ও আলু ব্যবহার করলে তার টুকরো কড়াইয়ে দিয়ে মশলার সঙ্গে আলতো করে মিশিয়ে নিন। ৩–৪ মিনিট কষিয়ে নিন, যাতে মশলার স্বাদ কচুর মধ্যে ঢুকে যায়।
এরপর পরিমাণমতো গরম জল দিন। ঝোল কতটা পাতলা হবে, তা নিজের পছন্দ অনুযায়ী ঠিক করুন। ঢাকনা দিয়ে কম-মাঝারি আঁচে ৮–১০ মিনিট রান্না করুন।
৫. চিংড়ি যোগ করা
কচুর মুখী ও আলু ভালোভাবে সিদ্ধ হলে ভাজা চিংড়ি এবং চেরা কাঁচালঙ্কা দিন। আরও ৪–৫ মিনিট অল্প আঁচে রান্না করুন, যাতে চিংড়ির স্বাদ ঝোলে মিশে যায়।
নুন পরীক্ষা করে প্রয়োজনে ঠিক করুন। চাইলে সামান্য চিনি দিতে পারেন। শেষে এক চিমটি গরম মশলা ছড়িয়ে চুলা বন্ধ করুন।
৬. পরিবেশন
ঢাকনা দিয়ে ৫ মিনিট রেখে দিন। তারপর গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন। ঝোলের মশলা, কচুর মুখীর মোলায়েম ভাব এবং চিংড়ির স্বাদ একসঙ্গে এই পদটিকে বিশেষ করে তোলে।
রান্নার সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
১. কচুর মুখী সম্পূর্ণ সিদ্ধ করতে হবে। আধসিদ্ধ কচু পরিবেশন করবেন না।
২. চিংড়ি অতিরিক্ত ভাজবেন না; এতে মাছ শক্ত হয়ে যেতে পারে।
৩. কচুর মুখী সিদ্ধ করার পরেই মশলায় দিলে রান্নার সময় নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
৪. ঝোল বেশি ঘন হয়ে গেলে অল্প গরম জল যোগ করুন।
৫. যাঁদের কচু খেলে অ্যালার্জি বা অস্বস্তি হয়, তাঁদের এই পদ এড়িয়ে চলা উচিত।
উপসংহার
কচুর মুখী দিয়ে চিংড়ির ঝোল বাঙালির পরিচিত উপকরণে তৈরি একটি সুস্বাদু ও বৈচিত্র্যময় পদ। প্রতিদিনের ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা যায়, আবার বাড়িতে অতিথি এলেও এই রান্না মেনুতে রাখা যেতে পারে। কচু ভালোভাবে সিদ্ধ করা এবং চিংড়ি অল্প সময় রান্না করাই এই পদের স্বাদ ও গঠন ঠিক রাখার মূল কৌশল।












Leave a Reply