আমকে বলা হয় ফলের রাজা। গ্রীষ্মকাল এলেই বাজারে আমের চাহিদা বেড়ে যায়। কাঁচা আম দিয়ে আচার, চাটনি ও বিভিন্ন খাবার তৈরি হয়, আর পাকা আম খাওয়া হয় সরাসরি, শরবত, জুস, আমসত্ত্ব ও নানা মিষ্টান্ন তৈরিতে। এই বহুমুখী ব্যবহারের কারণে আম চাষ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলচাষের ক্ষেত্র।
পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আম চাষের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তবে উপযুক্ত জাত নির্বাচন, সঠিক সময়ে ছাঁটাই, ফুলের পরিচর্যা, রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত বাজারজাতকরণ করলে অন্যান্য অঞ্চলেও আম চাষের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে আম উৎপাদন নয়, উন্নত চারা, বাগানের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, ড্রিপ সেচ এবং ফলের গুণমান বাড়ানোর কৌশল ব্যবহার করেও চাষিরা উৎপাদন ও আয় উন্নত করার চেষ্টা করছেন।
১. আমের পরিচয় ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
আমের বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica। এটি অ্যানাকার্ডিয়েসি পরিবারের একটি চিরসবুজ ফলগাছ। উপযুক্ত পরিবেশে আমগাছ বহু বছর বেঁচে থাকতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ফল দিতে পারে।
আমের অর্থনৈতিক গুরুত্বের প্রধান কারণগুলি হল—
- পাকা ও কাঁচা আমের ব্যাপক চাহিদা।
- আমের আচার, চাটনি, আমসত্ত্ব, পাল্প ও জুস তৈরির সুযোগ।
- স্থানীয় বাজার থেকে বড় পাইকারি বাজারে বিক্রির সম্ভাবনা।
- নার্সারিতে উন্নত আমের চারা উৎপাদনের সুযোগ।
- ফল সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকিং ও পরিবহণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
তবে আমের ফলন প্রতিবছর সমান হয় না। আবহাওয়া, ফুল আসার সময় বৃষ্টি, রোগ-পোকা, গাছের বয়স এবং পরিচর্যার পার্থক্যের কারণে উৎপাদন কমবেশি হতে পারে।
২. আম চাষের জন্য উপযুক্ত জলবায়ু
উষ্ণ ও উপ-উষ্ণ জলবায়ু আম চাষের জন্য উপযোগী। পর্যাপ্ত সূর্যালোক গাছের বৃদ্ধি, ফুল আসা এবং ফলের বিকাশে সহায়তা করে।
শুষ্ক আবহাওয়া অনেক সময় আমের ফুল আসার জন্য অনুকূল হতে পারে। কিন্তু ফুল ফোটার সময় অতিরিক্ত বৃষ্টি, কুয়াশা বা দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্রতা থাকলে পরাগায়ন ব্যাহত হতে পারে এবং ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, ফলের বৃদ্ধি ও বিকাশের সময় পর্যাপ্ত মাটির আর্দ্রতা দরকার। তীব্র ঝড়, শিলাবৃষ্টি এবং প্রবল বাতাসে ফুল ও ছোট আম ঝরে পড়তে পারে। তাই বাগান নির্বাচনের সময় জমির অবস্থান, জলনিকাশ এবং স্থানীয় আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা জরুরি।
৩. আম চাষের জন্য উপযুক্ত মাটি
আম বিভিন্ন ধরনের মাটিতে জন্মাতে পারে। তবে গভীর, উর্বর, ঝুরঝুরে এবং ভালো জলনিকাশযুক্ত দোআঁশ মাটি সাধারণত উপযোগী।
যে জমিতে বৃষ্টির জল দীর্ঘ সময় জমে থাকে, সেখানে আমগাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে নতুন চারা লাগানোর ক্ষেত্রে জলাবদ্ধতা এড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জমি তৈরির আগে মাটির পরীক্ষা করালে অম্লতা, ক্ষারত্ব এবং পুষ্টি উপাদানের অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। সেই অনুযায়ী মাটির উন্নয়ন ও সার ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করা উচিত।
৪. কোন জাতের আম চাষ করবেন?
আমের জাত নির্বাচন নির্ভর করে এলাকার আবহাওয়া, বাজারের চাহিদা, ফলের স্বাদ, আঁশের পরিমাণ, সংরক্ষণক্ষমতা এবং বিক্রির উদ্দেশ্যের ওপর।
ভারতে পরিচিত কয়েকটি আমের জাত হল—
হিমসাগর: পশ্চিমবঙ্গের একটি জনপ্রিয় আম। এর মিষ্টি স্বাদ ও সুগন্ধের জন্য ক্রেতাদের কাছে বিশেষ পরিচিত।
ল্যাংড়া: সুগন্ধি ও স্বাদযুক্ত আম হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন অঞ্চলে এই জাতের চাহিদা রয়েছে।
ফজলি: বড় আকারের ফলের জন্য পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও আশপাশের অঞ্চলে ফজলি আমের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
লক্ষ্মণভোগ: পশ্চিমবঙ্গের পরিচিত আমের জাতগুলির মধ্যে অন্যতম। বাণিজ্যিক বাজারে এর চাহিদা রয়েছে।
আম্রপালি: তুলনামূলকভাবে ছোট আকারের গাছ এবং আকর্ষণীয় ফলের বৈশিষ্ট্যের কারণে পরিকল্পিত বাগানের জন্য বিবেচিত হয়। তবে গাছের ঘনত্ব ও পরিচর্যা জাতের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ঠিক করতে হবে।
দশেরি: উত্তর ভারতের পরিচিত জাত। নির্দিষ্ট অঞ্চলের জলবায়ু ও বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকলে চাষের জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাণিজ্যিক বাগান তৈরির আগে স্থানীয় উদ্যানপালন দপ্তর বা কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের পরামর্শ নিয়ে জাত নির্বাচন করা ভালো। দূরবর্তী অঞ্চলের জনপ্রিয় জাত সব জায়গায় একই রকম ফলন দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
৫. উন্নত চারা নির্বাচন
আমের বাগান তৈরির ক্ষেত্রে চারার গুণমান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বীজ থেকে জন্মানো গাছে ফল ধরতে অনেক সময় লাগে এবং ফলের গুণমান মাতৃগাছের মতো নাও হতে পারে। তাই বাণিজ্যিক বাগানের জন্য সাধারণত নির্ভরযোগ্য নার্সারি থেকে কলমের চারা সংগ্রহ করা হয়।
চারা কেনার সময় খেয়াল রাখতে হবে—
- জাতের নাম ও পরিচয় স্পষ্ট কি না।
- গাছের পাতা সতেজ এবং ডালপালা সুস্থ কি না।
- কলমের জোড় ভালোভাবে লেগেছে কি না।
- শিকড় পচা বা অন্য রোগের লক্ষণ আছে কি না।
- নার্সারি নির্ভরযোগ্য কি না।
একই বাগানে একাধিক জাত লাগালে ফল সংগ্রহের সময়ে বৈচিত্র্য তৈরি হতে পারে। তবে জাতের নির্বাচন এমনভাবে করা উচিত, যাতে পরাগায়ন ও স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে।
৬. জমি তৈরি ও চারা রোপণ
আমের চারা লাগানোর আগে জমি পরিষ্কার করে জলনিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। গাছের পূর্ণবয়স্ক আকার, জাত এবং বাগানের পরিকল্পনা অনুযায়ী দূরত্ব নির্ধারণ করতে হয়।
প্রচলিত বাগানে অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৮–১০ মিটার বা তারও বেশি ব্যবধান রাখা হয়। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট জাত ও ছাঁটাই ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে উচ্চঘনত্বের বাগানে তুলনামূলক কম দূরত্ব ব্যবহার করা হয়। উচ্চঘনত্বের বাগানে নিয়মিত ছাঁটাই ও গাছের আকার নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।
রোপণের সাধারণ পদ্ধতি—
১. নির্ধারিত দূরত্বে গর্ত তৈরি করতে হবে। ২. গর্তের মাটি ঝুরঝুরে করে ভালোভাবে পচানো জৈব সার মেশাতে হবে। ৩. চারার শিকড়ের বল অক্ষত রেখে গর্তে বসাতে হবে। ৪. কলমের জোড় মাটির ওপরে রাখতে হবে। ৫. চারার চারপাশের মাটি আলতো করে চেপে দিতে হবে। ৬. রোপণের পর প্রয়োজনমতো জল দিতে হবে।
বর্ষার শুরুতে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে চারা লাগানো সুবিধাজনক হতে পারে। তবে জলাবদ্ধ জমিতে রোপণ করা উচিত নয়।
৭. জলসেচের সঠিক পদ্ধতি
আমগাছের জলসেচের চাহিদা তার বয়স, মাটির ধরন, আবহাওয়া এবং ফলের বিকাশের পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে।
নতুন চারার শিকড় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় নিয়মিত আর্দ্রতা বজায় রাখা দরকার। গাছ বড় হলে শিকড়ের বিস্তার বাড়ে, ফলে সেচের ব্যবধান ও পরিমাণও বদলে যায়।
ড্রিপ সেচ ব্যবহারের মাধ্যমে গাছের শিকড়ের অঞ্চলে নিয়ন্ত্রিতভাবে জল দেওয়া যায়। এতে জল অপচয় কমানো এবং সারের ব্যবহার আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।
তবে ফুল আসার সময় অতিরিক্ত জল দেওয়া বা বাগানে জল জমতে দেওয়া উচিত নয়। আবার ফলের বিকাশের সময় দীর্ঘস্থায়ী জলাভাব দেখা দিলে ফলের আকার ও গুণমান প্রভাবিত হতে পারে।
৮. সার ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা
আমগাছের ভালো বৃদ্ধি ও ফলনের জন্য সুষম পুষ্টি প্রয়োজন। নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন অণুপুষ্টি উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ।
সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে—
জৈব সার: ভালোভাবে পচানো গোবর বা কম্পোস্ট মাটির গঠন উন্নত করে এবং জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ায়।
রাসায়নিক সার: গাছের বয়স, মাটির পরীক্ষার ফল এবং প্রত্যাশিত উৎপাদন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করতে হবে।
অণুপুষ্টি: পাতায় হলদে ভাব বা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দেখা দিলে নিজে থেকে একাধিক উপাদান প্রয়োগ না করে কারণ নির্ণয় করা উচিত।
মালচিং: গাছের গোড়ার আশপাশে উপযুক্ত জৈব মালচ ব্যবহার করলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হয়।
গাছের গোড়ায় সার জমিয়ে রাখা বা অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করলে শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট মাত্রা ও সময় মেনে সার দেওয়া উচিত।
৯. ফুল আসা ও ফল ঝরা নিয়ন্ত্রণ
আম চাষের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হল ফুল আসা এবং ফল ধরে রাখা। অনেক সময় গাছে প্রচুর ফুল এলেও শেষ পর্যন্ত অল্প সংখ্যক ফল পরিণত হয়। এর কিছু অংশ স্বাভাবিকভাবেই ঘটে।
ফল ঝরার সম্ভাব্য কারণগুলি হল—
- অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা অনিয়মিত আবহাওয়া।
- ফুলের সময় বৃষ্টি ও আর্দ্রতার প্রভাব।
- অপর্যাপ্ত পরাগায়ন।
- রোগ-পোকার আক্রমণ।
- গাছের পুষ্টির ঘাটতি।
- অনিয়মিত জলসেচ।
ফুল আসার সময় গাছের ওপর অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক প্রয়োগ এড়ানো উচিত। পরাগবাহক পোকামাকড়ের ক্ষতি করে এমন ব্যবস্থাপনা পরাগায়নে বাধা দিতে পারে।
ফল ঝরলেই বেশি সার বা কীটনাশক দেওয়া সমাধান নয়। আগে কারণ চিহ্নিত করে স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
১০. আমের প্রধান রোগ ও পোকামাকড়
আমের উৎপাদনে রোগ ও পোকামাকড় বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। তাই ফুল আসার আগে থেকে ফল সংগ্রহ পর্যন্ত নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
পাউডারি মিলডিউ: ফুল ও কচি অংশে সাদা গুঁড়োর মতো আবরণ দেখা যেতে পারে। রোগের কারণে ফুল ও ছোট ফল ঝরে যেতে পারে।
অ্যানথ্রাকনোজ: পাতায়, ফুলে ও ফলে কালচে দাগ তৈরি হতে পারে। আর্দ্র আবহাওয়ায় রোগের বিস্তার বাড়তে পারে।
আমের হপার: ফুলের মঞ্জরি ও কচি অংশ থেকে রস শোষণ করে। আক্রমণ বেশি হলে ফুল ও ফলের ক্ষতি হয়।
ফলমাছি: ফলের ভেতরে লার্ভা তৈরি করে ফল নষ্ট করতে পারে। আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে নিরাপদে নষ্ট করা এবং উপযুক্ত ফাঁদ ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
মিলিবাগ: গাছের বিভিন্ন অংশে অবস্থান করে রস শোষণ করতে পারে। বাগান পরিষ্কার রাখা এবং গাছের গোড়ার পরিচর্যা এদের নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আক্রান্ত অংশ অপসারণ, উপযুক্ত ফাঁদ এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা উচিত। প্রয়োজনে স্থানীয় কৃষি দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে। ফুলের সময় পরাগবাহক পোকামাকড়ের সুরক্ষা এবং ফল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত অপেক্ষার সময় মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
১১. ফল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ
আমের ফল সংগ্রহের সঠিক সময় নির্ধারণে জাত, ফলের পরিপক্বতা, বাজারের দূরত্ব এবং বিক্রির ধরন বিবেচনা করতে হয়। দূরের বাজারে পাঠানোর জন্য অনেক সময় সম্পূর্ণ পাকার আগে পরিপক্ব ফল সংগ্রহ করা হয়।
ফল সংগ্রহের সময়—
- গাছের ডাল ভেঙে ফল নামানো এড়াতে হবে।
- পরিষ্কার ফল সংগ্রহের সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে।
- ফলের গায়ে আঘাত বা ক্ষত লাগতে দেওয়া যাবে না।
- রোগাক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত ফল আলাদা করতে হবে।
- আকার ও গুণমান অনুযায়ী বাছাই করতে হবে।
আম সংগ্রহের পর পরিষ্কার, বাছাই, প্যাকিং এবং উপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করলে বাজারজাতকরণের সুবিধা হয়। তবে আমের জাতভেদে সংরক্ষণক্ষমতা আলাদা। তাই বাণিজ্যিক সংরক্ষণে উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করা দরকার।
১২. আম থেকে মূল্য সংযোজন
কাঁচা ও পাকা আম দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরি করা যায়। এর ফলে মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদন হলে বিকল্প বাজার তৈরির সুযোগ পাওয়া যায়।
আম থেকে তৈরি করা যায়—
- আমের আচার।
- আমসত্ত্ব।
- আমের চাটনি।
- আমের পাল্প ও জুস।
- শুকনো আমের টুকরো।
- বিভিন্ন মিষ্টান্ন ও খাদ্য উপকরণ।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী এসব পণ্য উৎপাদনের কথা ভাবতে পারেন। তবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বিক্রির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি, সঠিক প্যাকেজিং, সংরক্ষণ এবং প্রযোজ্য খাদ্য-নিরাপত্তা বিধি মেনে চলতে হবে।
১৩. আম চাষে খরচ ও লাভের হিসাব
আমের বাগান একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। বাগান তৈরি, চারা কেনা, সার, সেচ, শ্রম, ছাঁটাই, রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ, ফল সংগ্রহ ও পরিবহণে খরচ হয়।
কলমের গাছও প্রথম বছর থেকেই পূর্ণ উৎপাদন দেয় না। গাছের বয়স ও জাত অনুযায়ী ফলন ধীরে ধীরে বাড়ে। তাই বাগান তৈরির সময় প্রথম কয়েক বছরের পরিচর্যার খরচের হিসাব রাখা জরুরি।
লাভ নির্ভর করে—
১. ফলন ও ফলের গুণমান। ২. স্থানীয় ও পাইকারি বাজারদর। ৩. রোগ-পোকা এবং আবহাওয়াজনিত ক্ষতি। ৪. ফল সংগ্রহ ও পরিবহণের খরচ। ৫. বিক্রির সময় ও বাজারের চাহিদা। ৬. প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ।
নির্দিষ্ট লাভের অঙ্ক অনুমান করে বিনিয়োগ না করে স্থানীয় কৃষি দপ্তর, নার্সারি, পাইকার এবং অভিজ্ঞ চাষিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা উচিত।
১৪. আম চাষে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার
বর্তমানে আমের বাগানে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে এগুলি উৎপাদন ও সম্পদের দক্ষ ব্যবহার বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
ড্রিপ সেচ: গাছের শিকড়ের অঞ্চলে জল সরবরাহ করে।
মাটির আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ: কখন জলসেচ প্রয়োজন তা নির্ধারণে সাহায্য করে।
উচ্চঘনত্বের বাগান: নির্দিষ্ট জাত ও নিয়ন্ত্রিত ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে তুলনামূলক কম জমিতে বেশি গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করা যায়।
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা: নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ফাঁদ, বাগানের পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনভিত্তিক অনুমোদিত বালাইনাশকের ব্যবহারের সমন্বয় ঘটায়।
উন্নত প্যাকিং ও পরিবহণ: ফলের ক্ষতি কমিয়ে বাজারে ভালো মানের আম পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে বিনিয়োগ, শ্রমের প্রয়োজন এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে তার উপযোগিতা যাচাই করা উচিত।
১৫. নতুন চাষিদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
যাঁরা প্রথমবার আমের বাগান করতে চান, তাঁদের অল্প জমি দিয়ে শুরু করা এবং স্থানীয়ভাবে সফল জাত সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করা ভালো।
বাগান তৈরির আগে মাটির পরীক্ষা করাতে হবে। নির্ভরযোগ্য নার্সারি থেকে চারা কিনতে হবে। জমিতে জলনিকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে। গাছের বয়স অনুযায়ী সার ও জলসেচের পরিকল্পনা করতে হবে। ফুল ও ফলের সময় নিয়মিত বাগান পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
একই সঙ্গে বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা জরুরি। শুধু বেশি ফলন হলেই লাভ বেশি হবে, এমন নয়; ফলের গুণমান, সঠিক সময়ে সংগ্রহ এবং ভালো বাজার পাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
আম চাষ ভারতের ফলচাষের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এবং পশ্চিমবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিতেও এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। উপযুক্ত জাত নির্বাচন, উন্নত চারা, বৈজ্ঞানিক সার ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রিত জলসেচ, রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত বাজারজাতকরণের মাধ্যমে আম চাষকে আরও লাভজনক করে তোলা সম্ভব।
তবে আমের বাগান দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। তাই চাষ শুরু করার আগে জমি, জলবায়ু, বাজার এবং বিনিয়োগের সামর্থ্য বিচার করে পরিকল্পনা করতে হবে। সঠিক পরিচর্যা ও ধৈর্যের সঙ্গে এগোলে আম চাষ কৃষকের আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।













Leave a Reply