
শহরের এক পুরোনো আবাসনে থাকত অনিরুদ্ধ। ছোটবেলা থেকেই সে গান ভালোবাসত। কিন্তু তার কাছে গান মানে ছিল কেবল সুর, তাল আর মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাততালি পাওয়া। মানুষের মনের কথা যে কখনও কখনও সুরের বাইরেও প্রকাশ পায়, তা সে বুঝতে পারেনি।
একদিন আবাসনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য গান বাছাই করতে গিয়ে তার পরিচয় হলো পাশের ফ্ল্যাটে থাকা বৃদ্ধা মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে। তিনি একসময় বিখ্যাত বেহালাবাদক ছিলেন। এখন বয়সের ভারে বাইরে বেরোনো কমিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ঘরের দেওয়ালে সারি সারি পুরস্কার, আর আলমারিতে যত্ন করে রাখা একটি পুরোনো বেহালা।
অনিরুদ্ধ একদিন সাহস করে তাঁর কাছে গিয়ে বলল, “মাসিমা, আমাদের অনুষ্ঠানে আপনি যদি একটু বেহালা বাজাতেন, খুব ভালো হতো।”
মৃণালিনী দেবী মৃদু হেসে বললেন, “বেহালা তো বাজাতে পারি, কিন্তু এখন আর আগের মতো আঙুল চলে না।”
অনিরুদ্ধ কথাটা শুনে একটু হতাশ হলো। সে ভেবেছিল, বৃদ্ধা হয়তো অনুশীলন করলে আবার মঞ্চে ফিরতে পারবেন। তাই বলল, “আপনি চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই পারবেন।”
বৃদ্ধা উত্তর দিলেন না। শুধু জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।
কয়েক দিন পরে অনিরুদ্ধ জানতে পারল, মৃণালিনী দেবীর একমাত্র ছেলে বিদেশে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ খুব কম। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি একাই থাকেন। একসময় যাঁর বেহালার সুরে হলঘর ভরে উঠত, আজ তাঁর ঘরে দিনের পর দিন নেমে আসে নিঃশব্দ একাকিত্ব।
অনিরুদ্ধের মনে হলো, সে এত দিন ভুল প্রশ্নই করে এসেছে। সে শুধু জানতে চেয়েছে, বৃদ্ধা আবার বাজাতে পারবেন কি না। একবারও জানতে চায়নি, তাঁর মনের মধ্যে কী জমে আছে।
সেদিন থেকে অনিরুদ্ধ প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাঁর ঘরে যেতে শুরু করল। কখনও চা খেতে খেতে গল্প করত, কখনও পুরোনো অনুষ্ঠানের ছবি দেখত। মৃণালিনী দেবীও ধীরে ধীরে খুলে বলতে লাগলেন তাঁর জীবনের নানা কথা—প্রথম মঞ্চে ওঠার ভয়, গুরুজির কঠোর শিক্ষা, স্বামীর সঙ্গে প্রথম কনসার্ট দেখতে যাওয়া, আর ছেলের ছোটবেলায় বেহালার সুর শুনে ঘুমিয়ে পড়া।
একদিন অনিরুদ্ধ বলল, “আপনার বাজানো যদি আর আগের মতো না-ও হয়, তবু আপনার সুর শোনার ইচ্ছেটা তো আমাদের আছে।”
মৃণালিনী দেবী দীর্ঘক্ষণ বেহালাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “তাহলে একদিন তোমাদের জন্য বাজাব। তবে একটা শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
“আমার বাজনা শেষ হলে কেউ হাততালি দেবে না। সবাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকবে।”
অনিরুদ্ধ অবাক হলেও রাজি হয়ে গেল।
অনুষ্ঠানের দিন আবাসনের ছোট হলঘরে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছিল। মৃণালিনী দেবী ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠলেন। তাঁর আঙুল কাঁপছিল, চোখে ছিল অজানা আশঙ্কা। তিনি বেহালা কাঁধে তুলে প্রথম সুরটি তুললেন।
সুর নিখুঁত ছিল না। কোথাও কোথাও তাল কেঁপে যাচ্ছিল, কোথাও দীর্ঘ বিরতি পড়ছিল। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণ সুরের মধ্যে ছিল এক জীবনের স্মৃতি, হারানোর ব্যথা আর আবার ফিরে পাওয়ার আনন্দ।
গান শেষ হওয়ার পর কেউ হাততালি দিল না। হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে রইল। কয়েকজনের চোখে জল চিকচিক করছিল। মৃণালিনী দেবী মাথা নিচু করে বসেছিলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি মুখ তুলে দেখলেন, সামনের সারিতে বসে থাকা একটি ছোট মেয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।
মেয়েটি আস্তে করে বলল, “দিদা, তোমার গান শুনে মনে হলো তুমি অনেক কথা বলছ।”
সেই একটি বাক্যে মৃণালিনী দেবীর চোখ ভিজে উঠল। তিনি মেয়েটির মাথায় হাত রেখে বললেন, “হ্যাঁ রে, আজ অনেক দিনের জমে থাকা কথাগুলো বলতে পারলাম।”
অনুষ্ঠানের পর থেকে আবাসনের মানুষজন তাঁর সঙ্গে নিয়মিত সময় কাটাতে শুরু করল। কেউ গল্প করতে আসত, কেউ পুরোনো গান শুনতে চাইত। অনিরুদ্ধও বুঝতে শিখল, কাউকে সাহায্য করার অর্থ সব সময় তার সমস্যার সমাধান করে দেওয়া নয়। কখনও কখনও পাশে বসে তার না-বলা কথাগুলো শোনাই সবচেয়ে বড় সাহায্য।
এরপর থেকে অনিরুদ্ধ যখনই কাউকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখত, তাড়াহুড়ো করে উপদেশ দিত না। সে আগে জিজ্ঞেস করত, “তুমি কি কিছু বলতে চাও? আমি শুনছি।”
কারণ সে বুঝেছিল, পৃথিবীর সব অনুভূতির ভাষা শব্দ নয়। কিছু কথা চোখে লেখা থাকে, কিছু কথা নীরবতায় বাজে, আর কিছু কথা শোনার জন্য দরকার শুধু একটি সহৃদয় মন।
শিক্ষা: মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু তার সমস্যার সমাধান করা নয়; কখনও মন দিয়ে তার কথা শোনাই ভালোবাসা ও সহমর্মিতার সবচেয়ে বড় প্রকাশ।












Leave a Reply