ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিশুদের খেলাগুলির মধ্যে এমন কিছু খেলা রয়েছে, যেগুলিতে দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না; দরকার হয় শুধু কয়েকজন বন্ধু, একটু খোলা জায়গা আর আনন্দ করে সময় কাটানোর ইচ্ছা। পাঞ্জাবের কোকলা ছপাকি (Kokla Chhapaki) এমনই একটি পরিচিত দলগত খেলা। এতে একটি কাপড় বা রুমাল ব্যবহার করা হয়। খেলোয়াড়েরা গোল হয়ে বসে থাকেন, আর একজন খেলোয়াড় তাঁদের পিছন দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে গোপনে কাপড়টি কারও পিছনে রেখে দেন।
খেলাটির আনন্দ তৈরি হয় মনোযোগ, অনুমান, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টার মধ্য দিয়ে। পাঞ্জাবের পাশাপাশি উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কাছাকাছি নিয়মের খেলাও দেখা যায়। তবে স্থানীয় নাম, ছড়া এবং খেলার পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকতে পারে।
কোকলা ছপাকি কী?
কোকলা ছপাকি একটি ঐতিহ্যবাহী দলগত শিশুদের খেলা। পাঞ্জাবি লোকসংস্কৃতিতে এই খেলার পরিচিতি রয়েছে। খেলাটিতে একটি ছোট কাপড় বা রুমাল ব্যবহার করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত মাটিতে গোল হয়ে বসেন। তাঁদের মধ্যে একজন হাতে কাপড় নিয়ে গোলের বাইরে বা পিছন দিয়ে ঘুরতে থাকেন।
ঘুরতে থাকা খেলোয়াড়টি সুযোগ বুঝে অন্য কারও পিছনে কাপড় রেখে দেন। যার পিছনে কাপড়টি রাখা হয়েছে, তাঁকে তা বুঝে দ্রুত উঠে কাপড় হাতে নেওয়ার চেষ্টা করতে হয়। অনেক প্রচলিত রূপে কাপড় রাখা খেলোয়াড়টি গোল ঘুরে নিজের জায়গায় পৌঁছনোর চেষ্টা করেন, আর অন্য খেলোয়াড় তাঁকে ধরার চেষ্টা করেন।
এই খেলার নিয়ম পরিবার, স্কুল বা এলাকার প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বদলাতে পারে। কোথাও খেলাটি ছড়া গেয়ে খেলা হয়, আবার কোথাও ছড়ার বদলে শুধু ঘুরে কাপড় রাখার নিয়ম অনুসরণ করা হয়।
খেলার প্রস্তুতি
কোকলা ছপাকি খেলতে বেশি উপকরণের প্রয়োজন হয় না। একটি পরিষ্কার কাপড় বা রুমাল এবং কয়েকজন খেলোয়াড় থাকলেই শুরু করা যায়।
খেলার জায়গা: সমতল ও নিরাপদ উঠোন, ঘাসের মাঠ বা স্কুলের খোলা জায়গা বেছে নেওয়া ভালো।
খেলোয়াড়ের সংখ্যা: কয়েকজন নিয়ে খেলা সম্ভব। অংশগ্রহণকারী বেশি হলে গোলটি বড় করে নেওয়া যায়, যাতে সবাই স্বচ্ছন্দে বসতে পারেন।
প্রধান উপকরণ: একটি ছোট কাপড় বা রুমাল।
বসার ব্যবস্থা: সবাই গোল হয়ে বসবেন এবং মাঝখানে যথেষ্ট ফাঁকা জায়গা রাখবেন। গোলের বাইরের দিকে ঘুরে যাওয়ার জন্যও জায়গা থাকা দরকার।
খেলা শুরুর আগে সবাইকে নিয়ম বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। বিশেষ করে অন্য খেলোয়াড়ের পিছনে কাপড় রাখার পদ্ধতি এবং কখন উঠে দৌড়তে হবে, তা পরিষ্কার থাকা দরকার।
কীভাবে খেলা হয়?
প্রথম ধাপ: গোল হয়ে বসা
সব খেলোয়াড় মাটিতে গোল হয়ে বসেন। তাঁদের মুখ সাধারণত গোলের কেন্দ্রের দিকে থাকে, ফলে পিছনের দিকটি সব সময় দেখা সম্ভব হয় না।
দ্বিতীয় ধাপ: একজনের হাতে রুমাল
একজন খেলোয়াড় রুমাল হাতে নিয়ে গোলের বাইরে হাঁটতে বা দৌড়াতে থাকেন। অন্যরা চেষ্টা করেন তাঁর গতিবিধি লক্ষ রাখতে, যাতে তিনি তাঁদের পিছনে রুমাল রেখে দিলে তা বুঝতে পারেন।
তৃতীয় ধাপ: গোপনে কাপড় রাখা
ঘুরতে থাকা খেলোয়াড়টি সুযোগ বুঝে একজনের পিছনে রুমাল রেখে দেন। এই সময় বসে থাকা খেলোয়াড়টি যদি তা খেয়াল না করেন, তাহলে রুমালটি তাঁর পিছনে পড়ে থাকতে পারে।
চতুর্থ ধাপ: দ্রুত প্রতিক্রিয়া
যার পিছনে রুমাল রাখা হয়েছে, তিনি বুঝতে পারলে দ্রুত উঠে রুমালটি তুলে নেন। এরপর প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রুমাল রাখা খেলোয়াড়কে ধরার জন্য তাঁর পিছনে দৌড়তে পারেন।
পঞ্চম ধাপ: পরের পালা
খেলার প্রচলিত ধরন অনুযায়ী, রুমাল রাখা খেলোয়াড় নিজের জায়গায় পৌঁছে গেলে অথবা ধরা পড়লে পরবর্তী পালা নির্ধারণ করা হয়। কিছু অঞ্চলে যে খেলোয়াড় সময়মতো রুমাল খেয়াল করতে পারেন না, তাঁর জন্য আলাদা নিয়ম থাকে। তাই খেলা শুরুর আগে কোন নিয়ম অনুসরণ করা হবে, তা ঠিক করে নেওয়া ভালো।
ছড়া ও লোকসংস্কৃতি
কোকলা ছপাকি নামটির সঙ্গে পাঞ্জাবি শিশুদের একটি পরিচিত ছড়ার সম্পর্ক রয়েছে। খেলার সময় ছড়া গাওয়া বা ছন্দে কথা বলার রীতি অনেক লোকজ খেলায় দেখা যায়। ছড়ার তালে খেললে অংশগ্রহণকারীদের মনোযোগ ধরে রাখা এবং খেলার পরিবেশ প্রাণবন্ত করা সহজ হয়।
তবে ছড়ার শব্দ ও উচ্চারণ অঞ্চলভেদে আলাদা হতে পারে। লোকমুখে প্রচলিত ছড়ার একাধিক রূপ থাকতে পারে বলেই কোনও একটি সংস্করণকে সর্বত্র প্রচলিত একমাত্র রূপ বলা ঠিক নয়।
লোকছড়া শিশুদের ভাষা শেখা, ছন্দ বোঝা এবং নিজেদের এলাকার সাংস্কৃতিক পরিচয় জানার একটি মাধ্যম। তাই কোকলা ছপাকির মতো খেলায় ব্যবহৃত ছড়া সংগ্রহ করাও লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
খেলাটির আকর্ষণ কোথায়?
কোকলা ছপাকির আকর্ষণ এর সরলতার মধ্যে। খেলোয়াড়দের শুধু বসে থাকা নয়, চারপাশে কী ঘটছে তা লক্ষ করতে হয়। অন্যদিকে রুমাল নিয়ে ঘুরতে থাকা খেলোয়াড়কে বুদ্ধি করে কাপড় রাখার সুযোগ খুঁজতে হয়।
খেলাটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো:
- মনোযোগ: নিজের পিছনে রুমাল রাখা হয়েছে কি না, তা বোঝার জন্য সতর্ক থাকতে হয়।
- দ্রুত প্রতিক্রিয়া: রুমাল দেখতে পেলে দ্রুত উঠে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়।
- অনুমান করার ক্ষমতা: অন্য খেলোয়াড় কোথায় রুমাল রাখতে পারেন, তা আন্দাজ করার চেষ্টা চলে।
- দলগত আনন্দ: সবাই একসঙ্গে অংশ নেওয়ায় হাসি-ঠাট্টা ও বন্ধুত্বের পরিবেশ তৈরি হয়।
- সহজ আয়োজন: একটি কাপড় দিয়েই খেলা সম্ভব, ফলে বাড়ি বা স্কুলে সহজে আয়োজন করা যায়।
এসব বৈশিষ্ট্যের জন্য কোকলা ছপাকি শিশুদের অবসর বিনোদনের পাশাপাশি দলগত অংশগ্রহণেরও একটি সুযোগ তৈরি করে।
আধুনিক সময়ে কোকলা ছপাকি
বর্তমানে শিশুদের অবসর কাটানোর ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম এবং ঘরের ভিতরে বসে বিনোদনের সুযোগ বেড়েছে। ফলে কিছু এলাকায় ঐতিহ্যবাহী দলগত খেলার চর্চা কমে যেতে পারে।
তবু স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া দিবস, গ্রীষ্মকালীন শিবির এবং পারিবারিক মিলনমেলায় কোকলা ছপাকির মতো খেলা সহজেই ফিরিয়ে আনা যায়। এতে বেশি খরচ হয় না এবং সব খেলোয়াড়ের জন্য দামি সরঞ্জাম কেনার প্রয়োজনও পড়ে না।
খেলাটিকে সংরক্ষণের জন্য শিশুদের শুধু নিয়ম শেখালেই হবে না; এর সঙ্গে যুক্ত ছড়া, স্থানীয় নাম এবং পারিবারিক স্মৃতিও সংগ্রহ করা উচিত। বিভিন্ন অঞ্চলে কীভাবে একই ধরনের খেলা ভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে, তা নথিবদ্ধ করলে ভারতের লোকক্রীড়ার বৈচিত্র্য আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে।
শিশুদের নিরাপত্তা
কোকলা ছপাকি সাধারণত সহজ খেলা হলেও দৌড়ানোর সময় ধাক্কা লাগা বা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই খেলার জায়গা পরিষ্কার ও সমতল হওয়া উচিত। আশপাশে ধারালো বস্তু, কাচ, গর্ত বা যানবাহনের চলাচল থাকা উচিত নয়।
ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে দৌড়ানোর দূরত্ব কম রাখা এবং একজন বড় মানুষের নজরদারি থাকা ভালো। খেলোয়াড়দের কাউকে ধাক্কা দেওয়া, জামাকাপড় ধরে টানা বা ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলে দেওয়া উচিত নয়। প্রতিযোগিতার চেয়ে আনন্দ ও নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
উপসংহার
কোকলা ছপাকি পাঞ্জাবের পরিচিত ঐতিহ্যবাহী শিশুদের খেলাগুলির মধ্যে একটি। একটি ছোট কাপড়, কয়েকজন বন্ধু এবং মনোযোগী চোখ—এই সামান্য উপকরণ দিয়েই খেলাটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এতে দৌড়, অনুমান, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং দলগত আনন্দ একসঙ্গে মিশে থাকে।
লোকজ খেলা সংরক্ষণ মানে শুধু অতীতের স্মৃতি ধরে রাখা নয়; শিশুদের পারস্পরিক যোগাযোগ, সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সুযোগও তৈরি করা। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোকলা ছপাকির মতো সহজ খেলাগুলির চর্চা বজায় থাকলে নতুন প্রজন্মও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আনন্দের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।













Leave a Reply