
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা প্রচলিত ছিল, যেগুলি ঘরে বসে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে খেলা যেত। এই খেলাগুলির কিছুতে শারীরিক দক্ষতা প্রয়োজন, আবার কিছু খেলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে স্মৃতিশক্তি, হিসাব করার ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের চাল বোঝার কৌশল। দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী বোর্ড খেলা অষ্ট চম্মা বা Ashta Chamma এই দ্বিতীয় ধরনের খেলার একটি পরিচিত উদাহরণ।
অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার সঙ্গে এই খেলার বিশেষ সাংস্কৃতিক যোগ রয়েছে। এটি সাধারণত বোর্ড, গুটি এবং পাশা বা পাশার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী উপকরণ দিয়ে খেলা হয়। পরিবারে অবসর কাটানো থেকে শুরু করে বন্ধুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা—বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে এমন খেলা বিনোদনের পাশাপাশি পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করত।
অষ্ট চম্মার নাম ও পরিচয়
অষ্ট চম্মা দক্ষিণ ভারতের একটি ঐতিহ্যবাহী গুটি চালানোর খেলা। এর নামের সঙ্গে তেলুগু ভাষা ও স্থানীয় খেলাধুলার ঐতিহ্যের সম্পর্ক রয়েছে। অঞ্চলভেদে খেলার নামের উচ্চারণ, বোর্ডের নকশা এবং নিয়মে কিছু পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
এই খেলায় খেলোয়াড়েরা নিজেদের গুটিকে বোর্ডের নির্দিষ্ট পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে শুধু গুটি এগিয়ে নিলেই জয় নিশ্চিত হয় না। কখন গুটি বের করতে হবে, কোন পথে এগোলে সুবিধা হবে, প্রতিপক্ষের গুটিকে কীভাবে বাধা দেওয়া যায় এবং নিজের গুটিকে কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়—এসব বিষয়েও পরিকল্পনা করতে হয়।
অষ্ট চম্মাকে আধুনিক লুডোর সঙ্গে তুলনা করা হয়। তবে দুটি খেলাকে একেবারে একই বলা ঠিক নয়। অষ্ট চম্মার নিজস্ব স্থানীয় রীতি ও ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে। লুডোকে কেন্দ্র করে পরিচিত নিয়মের সঙ্গে মিল থাকলেও অষ্ট চম্মার আঞ্চলিক সংস্করণে গুটি চালানো, নিরাপদ ঘর এবং জয়ের শর্তে পার্থক্য থাকতে পারে।
বোর্ড ও খেলার উপকরণ
ঐতিহ্যগতভাবে বোর্ডটি মাটিতে আঁকা হতে পারত। বাড়ির মেঝে, উঠোন বা সমতল জায়গায় রেখা টেনে খেলার পথ তৈরি করা যেত। বর্তমানে কাপড়, কাঠ, কাগজ কিংবা ছাপানো বোর্ডেও এই ধরনের খেলা খেলা হয়।
সাধারণত খেলার জন্য প্রয়োজন হয়—
১. খেলার বোর্ড: নির্দিষ্ট ঘর ও পথ চিহ্নিত একটি নকশা। ২. গুটি: প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য আলাদা রঙ বা চিহ্নের গুটি। ৩. চাল নির্ধারণের উপকরণ: পাশা অথবা স্থানীয় নিয়মে ব্যবহৃত অন্য কোনো উপকরণ। ৪. খেলার জায়গা: বোর্ড রেখে স্বচ্ছন্দে বসার মতো সমতল স্থান।
ঐতিহ্যবাহী খেলায় উপকরণ সবসময় বাজার থেকে কিনতে হত না। অনেক পরিবার নিজেরাই গুটি তৈরি করত এবং মাটিতে বোর্ড এঁকে খেলত। এই সহজলভ্যতা গ্রামীণ ও পারিবারিক জীবনে এমন খেলার প্রসারে সাহায্য করেছিল।
কীভাবে খেলা হয়?
অষ্ট চম্মার বিভিন্ন স্থানীয় সংস্করণে নিয়মের পার্থক্য থাকায় এখানে একটি সাধারণ ধারণা দেওয়া হল। নির্দিষ্ট অঞ্চলের খেলা শেখার সময় সেই অঞ্চলে প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা উচিত।
প্রথম ধাপ: খেলোয়াড় নির্বাচন ও গুটি সাজানো
খেলোয়াড়েরা নিজেদের গুটি এবং বোর্ডের নির্ধারিত ঘর ঠিক করে নেন। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের গুটি আলাদা করে চেনার মতো হওয়া দরকার। খেলা শুরু করার আগে চাল নির্ধারণের নিয়মও ঠিক করে নেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ধাপ: গুটি খেলার পথে আনা
প্রচলিত গুটি চালানোর খেলাগুলির মতো অষ্ট চম্মাতেও নির্দিষ্ট ফল বা শর্ত পূরণ হলে গুটি খেলার পথে আনা যায়। কোন ফল হলে গুটি বের করা যাবে, তা স্থানীয় নিয়মের ওপর নির্ভর করে।
তৃতীয় ধাপ: গুটি এগিয়ে নেওয়া
খেলোয়াড়েরা পালা করে চাল দেন। প্রাপ্ত ফল অনুযায়ী গুটি বোর্ডের নির্দিষ্ট পথ ধরে এগিয়ে যায়। একাধিক গুটি থাকলে কোন গুটিকে এগিয়ে নেওয়া বেশি সুবিধাজনক হবে, তা খেলোয়াড়কে বিচার করতে হয়।
চতুর্থ ধাপ: প্রতিপক্ষের চাল বিবেচনা করা
কিছু সংস্করণে নির্দিষ্ট ঘরে প্রতিপক্ষের গুটি থাকলে সেটিকে আবার শুরুর অবস্থায় পাঠানো যায়। আবার কিছু ঘর নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কোন ঘরে কী নিয়ম প্রযোজ্য, তা খেলার সংস্করণ অনুযায়ী আলাদা হতে পারে।
পঞ্চম ধাপ: গুটিকে শেষ ঘরে পৌঁছনো
খেলোয়াড়ের লক্ষ্য থাকে নিজের নির্ধারিত গুটিগুলিকে বোর্ডের পথ অনুসরণ করে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া। যে খেলোয়াড় প্রথমে নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় গুটিগুলি গন্তব্যে পৌঁছে দেন, তিনি বিজয়ী হন। তবে নির্দিষ্ট জয়ের শর্ত খেলা শুরুর আগে পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।
অষ্ট চম্মা খেলায় কৌশলের গুরুত্ব
প্রথম দেখায় অষ্ট চম্মাকে পাশা বা চালের ওপর নির্ভরশীল খেলা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু খেলোয়াড়ের সিদ্ধান্তও ফলাফলে প্রভাব ফেলে। ভালো খেলতে হলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হয়।
গুটি বের করার সময়: নতুন গুটি খেলার পথে আনলে ভবিষ্যতে বেশি বিকল্প তৈরি হতে পারে। তবে সব সময় নতুন গুটি বের করাই সেরা সিদ্ধান্ত নয়।
নিরাপদ অবস্থান: নিজের গুটি এমন ঘরে রাখার চেষ্টা করতে হয়, যেখানে প্রতিপক্ষের আক্রমণের ঝুঁকি কম।
প্রতিপক্ষের অবস্থান বোঝা: প্রতিপক্ষ কোন গুটি নিয়ে এগোতে পারে, তার সম্ভাবনা বিচার করে নিজের চাল নির্ধারণ করা দরকার।
ঝুঁকি ও লাভের হিসাব: দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে কোনো গুটি বিপদে পড়তে পারে। আবার অতিরিক্ত সতর্ক থাকলে প্রতিপক্ষ এগিয়ে যেতে পারে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই কৌশলের অংশ।
এই কারণে খেলাটি শিশুদের জন্য যেমন আকর্ষণীয় হতে পারে, তেমনই বড়দের কাছেও বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
শিশুদের মানসিক বিকাশে সম্ভাব্য ভূমিকা
অষ্ট চম্মার মতো বোর্ড খেলা শিশুদের নিয়ম মেনে চলা, পালা দেওয়া এবং ফলাফল মেনে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। গুটি কোথায় রয়েছে এবং পরবর্তী চাল কী হতে পারে, তা মনে রাখার মাধ্যমে মনোযোগ ও পরিকল্পনা করার অনুশীলন হয়।
খেলার সময় শিশুরা জয়-পরাজয়ের অভিজ্ঞতাও অর্জন করে। হেরে গেলে হতাশ না হয়ে আবার চেষ্টা করা, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখা এবং নিজের ভুল থেকে শেখা—এসব সামাজিক দক্ষতা অনুশীলনের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে কোনও খেলা খেললেই বুদ্ধিমত্তা বা শিক্ষাগত ফল নিশ্চিতভাবে বাড়বে, এমন দাবি করা ঠিক নয়। বরং পরিবারের সঙ্গে আনন্দের সময় কাটানো এবং নিয়মিত ইতিবাচক মেলামেশার একটি উপায় হিসেবে এই খেলাকে দেখা যেতে পারে।
পারিবারিক জীবনে ঐতিহ্যবাহী খেলার গুরুত্ব
একসময় অনেক পরিবারে সন্ধ্যায় বা অবসর সময়ে ঘরের সদস্যরা একত্রে বসে বোর্ড খেলা খেলতেন। এই ধরনের খেলা প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করত। প্রবীণরা ছোটদের নিয়ম শেখাতেন, ছোটরা নতুন কৌশল আবিষ্কার করত, আর খেলার মধ্য দিয়ে পারিবারিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হত।
বর্তমানে মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল বিনোদনের প্রসারের ফলে অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলার ব্যবহার কমে গেছে। তবুও অষ্ট চম্মার মতো খেলা ঘরে বসে একসঙ্গে সময় কাটানোর একটি বিকল্প হতে পারে। ডিজিটাল সংস্করণ থাকলেও বাস্তব বোর্ডে গুটি সরিয়ে খেলার অভিজ্ঞতা আলাদা।
ঐতিহ্য সংরক্ষণে কী করা যেতে পারে?
অষ্ট চম্মার মতো আঞ্চলিক খেলা সংরক্ষণের জন্য শুধু খেলার নাম মনে রাখাই যথেষ্ট নয়। এর নিয়ম, স্থানীয় নাম, বোর্ডের নকশা এবং প্রবীণ খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতাও নথিভুক্ত করা প্রয়োজন।
- বিদ্যালয়ে পরিচিতি: সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার কর্মসূচিতে খেলার পরিচয় দেওয়া যেতে পারে।
- নিয়মের নথি তৈরি: স্থানীয় খেলোয়াড়দের কাছ থেকে বিভিন্ন সংস্করণের নিয়ম সংগ্রহ করে লিখিত ও ভিডিও আকারে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
- পারিবারিক খেলার আয়োজন: সপ্তাহে একদিন পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বোর্ড খেলার সময় নির্ধারণ করতে পারেন।
- স্থানীয় উৎসব ও প্রদর্শনী: আঞ্চলিক সংস্কৃতির অনুষ্ঠানে খেলার বোর্ড ও উপকরণ প্রদর্শন করা যেতে পারে।
- ডিজিটাল সংরক্ষণ: বোর্ডের ছবি, গুটি, চালের নিয়ম এবং খেলার ইতিহাস অনলাইনে নথিভুক্ত করা যেতে পারে।
এই উদ্যোগগুলির মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম শুধু খেলার নাম জানবে না; খেলার বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে পারবে।
উপসংহার
অষ্ট চম্মা দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী বোর্ড খেলার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এর মধ্যে রয়েছে চালের হিসাব, কৌশল নির্ধারণ, প্রতিপক্ষকে পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ম মেনে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা। একই সঙ্গে এই খেলা আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও পারিবারিক বিনোদনের ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে আসে।
আধুনিক জীবনে বিনোদনের মাধ্যম অনেক বেড়েছে। তবুও ঐতিহ্যবাহী বোর্ড খেলার মূল্য কমে যায়নি। অষ্ট চম্মার মতো খেলাকে বিদ্যালয়, পরিবার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে নতুন করে পরিচিত করানো গেলে অতীতের এই বিনোদন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও পৌঁছতে পারে।












Leave a Reply