গল্প : যে পুরোনো বাড়িটি শিখিয়েছিল নীরবতার ভাষা।

নদিয়ার এক ছোট্ট শহরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি। বাড়িটির দেওয়ালে শ্যাওলা জমেছিল, কাঠের জানালার রং উঠে গিয়েছিল, আর বারান্দার এক কোণে বটগাছের শিকড় দেওয়াল আঁকড়ে ধরেছিল। একসময় এই বাড়িতে প্রতিদিন মানুষের আনাগোনা ছিল। সকালে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত মশলার গন্ধ, দুপুরে উঠোনে বসে গল্প করতেন বাড়ির প্রবীণরা, আর সন্ধ্যায় ছাদে জড়ো হতো ছোটরা।

এখন সেখানে কেউ থাকে না।

বাড়িটির মালিক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ডাকঘরকর্মী অমলেশবাবু। তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ছেলেমেয়েরা নিজেদের সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ কলকাতায়, কেউ বিদেশে। অমলেশবাবু শেষ জীবনে একাই থাকতেন। তিন বছর আগে তিনিও চলে যাওয়ার পর বাড়িটি তালাবন্ধ হয়ে পড়ে।

তাঁর নাতি অর্ক ছোটবেলায় এই বাড়িতে অনেকটা সময় কাটিয়েছিল। কিন্তু বড় হওয়ার পর পড়াশোনা, চাকরি আর শহুরে জীবনের ব্যস্ততায় গ্রামের সঙ্গে তার যোগাযোগ কমে যায়। দাদুর মৃত্যুর পরে সে আর বাড়িটিতে আসেনি।

একদিন পরিবারের আলোচনায় ঠিক হলো, পুরোনো বাড়িটি বিক্রি করে দেওয়া হবে। বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন, মেরামতের খরচও কম নয়। অর্ককে দায়িত্ব দেওয়া হলো, সে যেন একবার গিয়ে বাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও জিনিসপত্র দেখে আসে।

অর্ক ছুটির দিনে শহরে পৌঁছল। স্টেশন থেকে রিকশায় চেপে পুরোনো পাড়ায় ঢুকতেই তার মনে হলো, রাস্তা যেন ছোট হয়ে গেছে। যে পুকুরটিকে সে একসময় বিশাল বলে ভাবত, সেটি এখন পাশের বাড়িগুলির আড়ালে প্রায় হারিয়ে গেছে। পুরোনো মিষ্টির দোকানটির জায়গায় উঠেছে নতুন একটি ওষুধের দোকান।

বাড়ির সামনে এসে সে থমকে দাঁড়াল।

জং ধরা তালা খুলে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ধুলোর গন্ধে তার নাক ভরে গেল। উঠোনে শুকনো পাতা জমে আছে। এক কোণে ভাঙা দোলনা, অন্যদিকে পড়ে রয়েছে কয়েকটি মাটির টব। বারান্দার দেওয়ালে দাদুর পুরোনো লাঠির দাগ এখনও স্পষ্ট।

অর্ক কাজ শুরু করল। আলমারি থেকে কাগজপত্র বের করল, পুরোনো বাসনপত্র আলাদা করল, নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবের তালিকা তৈরি করল। সবকিছু যেন খুব সহজেই বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা যায়।

কিন্তু দুপুরের দিকে দোতলার একটি ঘরে ঢুকে তার কাজ থেমে গেল।

ঘরটির জানালা বন্ধ ছিল। জানালার পাল্লা খুলতেই আলো এসে পড়ল একটি কাঠের টেবিলের ওপর। টেবিলের পাশে দাদুর চেয়ার। দেওয়ালে ঝুলছে একটি পুরোনো ক্যালেন্ডার, যার তারিখ বহু বছর আগেই থেমে গেছে। টেবিলের ওপর কোনও মূল্যবান জিনিস ছিল না—কয়েকটি পেন, শুকিয়ে যাওয়া কালির দোয়াত এবং একটি সাধারণ কাচের গ্লাস।

অর্কের মনে পড়ল, ছোটবেলায় দাদু এই ঘরে বসে চিঠি লিখতেন। কেউ কোনও সমস্যায় পড়লে তিনি চিঠি লিখে সাহায্য করতেন। কখনও গ্রামের কারও পেনশন সংক্রান্ত আবেদন, কখনও কোনও ছাত্রের বৃত্তির দরখাস্ত, আবার কখনও দূরে থাকা আত্মীয়ের কাছে খবর পাঠানো।

দাদু খুব বেশি কথা বলতেন না। কিন্তু কেউ তাঁর কাছে বসলে তিনি মন দিয়ে শুনতেন।

অর্কের ছোটবেলায় একবার পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়ে সে ভীষণ ভেঙে পড়েছিল। বাড়ির সবাই তাকে বকাবকি করলেও দাদু কিছু বলেননি। শুধু পাশে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,
—তুই কি সত্যিই চেষ্টা করেছিলি?

অর্ক মাথা নিচু করে বলেছিল,
—করেছিলাম। কিন্তু পারিনি।

দাদু তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন,
—চেষ্টা করেও না পারা আর চেষ্টা না করা এক জিনিস নয়। কোথায় ভুল হয়েছে, সেটা বুঝে আবার শুরু করিস।

সেই কথাটি অর্ক বহুদিন ভুলে গিয়েছিল।

ঘরের টেবিলের নিচে সে একটি ছোট কাঠের বাক্স পেল। বাক্সের মধ্যে ছিল কিছু চিঠি, কয়েকটি পুরোনো খাম এবং একটি পাতলা খাতা। খাতার প্রথম পাতায় দাদুর হাতের লেখা—

‘যে কথাগুলো মানুষ মুখে বলতে পারে না, সেগুলো কখনও কখনও লিখে রাখে। আর যে কথাগুলো লিখতেও পারে না, সেগুলো তার নীরবতায় থেকে যায়।’

অর্ক খাতাটি খুলল।

সেখানে দাদু নিজের দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনা লিখে রেখেছিলেন। কোনও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ফাঁস করার মতো বিবরণ নয়, বরং মানুষের ছোট ছোট অনুভূতির কথা।

একটি পাতায় লেখা ছিল—

‘আজ বাজারে হরেনের সঙ্গে দেখা। ছেলের চাকরি হয়নি বলে মন খারাপ। অনেকক্ষণ কথা বলল। কোনও উপদেশ দিইনি। শুধু শুনেছি। যাওয়ার সময় বলল, অনেকদিন পরে মনটা হালকা লাগছে।’

অন্য একটি পাতায় লেখা—

‘স্কুলের মেয়েটি বৃত্তির আবেদন করতে ভয় পাচ্ছিল। বলল, তার ইংরেজি ভালো নয়। তাকে বুঝিয়ে দিলাম, ভুল হওয়ার ভয়ে আবেদন না করলে সুযোগটাও হারাবে।’

আরেকটি পাতায় লেখা—

‘ছেলে ফোন করেছিল। বলল, কাজের চাপ খুব বেশি। আমি তাকে বলতে চেয়েছিলাম, আমারও একা লাগে। কিন্তু বললাম না। ওর কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল। কখনও কখনও ভালোবাসা মানে নিজের দুঃখটাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা।’

শেষের কথাটি পড়ে অর্কের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিল।

দাদু কি সত্যিই একা থাকতেন? তিনি কি কারও কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতেন না? অর্কের মনে পড়ল, দাদু ফোন করলে সে প্রায়ই তাড়াহুড়ো করে কথা শেষ করত।

—দাদু, এখন মিটিংয়ে আছি। পরে কথা বলব।

—আচ্ছা, কাজ কর।

তারপর আর সব সময় ফোন করা হতো না।

অর্ক খাতাটি বন্ধ করে চেয়ারে বসে পড়ল। বাড়ির নীরবতা যেন এবার তার কাছে অন্য অর্থ নিয়ে এল। এতদিন সে ভেবেছিল, বাড়িটি খালি হয়ে যাওয়ায় নীরব। আজ মনে হলো, এই দেওয়ালগুলির মধ্যে কত কথা জমে ছিল, যেগুলি কেউ শোনার সময় পায়নি।

ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন পাশের বাড়ির সরস্বতী পিসি। অর্ককে দেখে তিনি প্রথমে চিনতে পারলেন না। পরে কাছে এসে বললেন,
—তুই অর্ক? অমলেশদার নাতি?

অর্ক প্রণাম করল।

সরস্বতী পিসি বললেন,
—অনেকদিন পরে এলি বাবা। বাড়িটা বিক্রি করে দিবি শুনলাম?

অর্ক একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
—হ্যাঁ, পিসি। বাড়িটা তো আর কেউ দেখাশোনা করে না।

সরস্বতী পিসি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—তোর দাদু এই বাড়িতে অনেক মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। কেউ কাজের খোঁজে এসে দুদিন থেকেছে, কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর ঘরে বিশ্রাম নিয়েছে। কত ছেলেমেয়েকে চিঠি লিখে দিয়েছেন, কত মানুষকে সরকারি কাগজপত্র বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে তিনি কখনও কাউকে বলেননি যে তিনি কতটা সাহায্য করেছেন।

অর্ক অবাক হয়ে শুনছিল।

—তুমি এসব জানলে কীভাবে?

—আমি এই পাড়াতেই তো থাকি বাবা। তোর দাদু খুব চুপচাপ মানুষ ছিলেন। কিন্তু কারও দরকার হলে সবার আগে এগিয়ে যেতেন।

সরস্বতী পিসি চলে যাওয়ার পর অর্ক বাড়ির প্রতিটি ঘর নতুন করে দেখতে শুরু করল। রান্নাঘরের পাশে ছোট একটি ঘরে পুরোনো বই রাখা ছিল। সেখানে স্কুলের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ছিল আবেদনপত্র লেখার নমুনা, সাধারণ আইন ও নাগরিক পরিষেবা সম্পর্কে কয়েকটি বই এবং হাতে লেখা কিছু নির্দেশিকা।

অর্ক বুঝল, দাদু শুধু চিঠি লিখতেন না; মানুষের নিজের কাজ নিজে করার সাহসও জোগাতেন।

সন্ধ্যায় সে শহরের একটি হোটেলে না থেকে বাড়িতেই থাকার সিদ্ধান্ত নিল। ঝাড়পোঁছ করে একটি ঘর পরিষ্কার করল। পরদিন সকালে বাড়ি বিক্রির জন্য আসার কথা ছিল এক ব্যক্তির। অর্ক তাঁকে ফোন করে জানাল, আপাতত সে বাড়ি বিক্রির সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে চায়।

পরিবারে অবশ্য সবাই খুশি হলো না।

ফোনে তার কাকা বললেন,
—হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন? বাড়ি ফেলে রাখলে আরও নষ্ট হবে। আবেগ দিয়ে তো বাড়ি মেরামত করা যায় না।

অর্ক শান্তভাবে বলল,
—আমি আবেগ দিয়ে বাড়ি চালাতে চাইছি না। আগে দেখতে চাই, বাড়িটাকে এমন কোনও কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, যাতে রক্ষণাবেক্ষণের খরচের একটা ব্যবস্থা হয় এবং গ্রামের মানুষও উপকৃত হন।

—তুই কি এখানে থাকতে আসবি?

—না। কিন্তু সব সম্পত্তি শুধু বিক্রি করার জন্যই থাকে না। কিছু সম্পত্তি কাজে লাগানোও যায়।

কাকা আর কিছু বললেন না। তবে তিনি সম্মতি দিয়েছেন, এমনও নয়।

পরবর্তী কয়েক দিন অর্ক গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলল। জানতে পারল, গ্রামের অনেক প্রবীণ মানুষ সরকারি ফর্ম পূরণ করতে সমস্যায় পড়েন। কেউ অনলাইনে আবেদন করতে পারেন না, কেউ প্রয়োজনীয় নথি সম্পর্কে জানেন না। আবার অনেক ছাত্রছাত্রী চাকরির আবেদন কিংবা বৃত্তির ফর্ম পূরণ করতে সাহায্য পায় না।

অর্কের মনে একটি পরিকল্পনা এল।

দাদুর ঘরটিকে ছোট্ট একটি সহায়তা কেন্দ্রে পরিণত করা যায়। সেখানে মানুষ প্রয়োজনীয় সরকারি তথ্য জানতে পারবেন, শিক্ষার্থীরা আবেদনপত্র পূরণে সহায়তা পাবে, আর গ্রামের ছেলেমেয়েরা বই পড়ার সুযোগ পাবে।

তবে সে জানত, এই ধরনের কাজে সঠিক তথ্য এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই সে গ্রামের স্কুলের শিক্ষক, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মী এবং কম্পিউটার জানা কয়েকজন যুবকের সঙ্গে আলোচনা করল। ঠিক হলো, কেন্দ্রটি কোনও সরকারি দপ্তরের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে না; শুধু মানুষকে সঠিক দপ্তর, প্রয়োজনীয় নথি এবং আবেদন করার পদ্ধতি বুঝতে সাহায্য করবে। কোনও ব্যক্তির পাসওয়ার্ড বা গোপন তথ্য সংগ্রহ করা হবে না, আর প্রতিটি আবেদন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি নিয়েই করা হবে।

গ্রামের কয়েকজন যুবক সপ্তাহে দুদিন স্বেচ্ছায় সময় দিতে রাজি হলেন। অর্ক নিজের সঞ্চয় থেকে ঘর মেরামতের কিছু খরচ দিল। পুরোনো বইগুলি পরিষ্কার করে সাজানো হলো। একটি ব্যবহৃত কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা করা হলো।

প্রায় দুই মাসের মধ্যে কেন্দ্রটি চালু হলো।

নাম রাখা হলো—‘নীরব সহায়তা কেন্দ্র’।

উদ্বোধনের দিন কোনও বড় অনুষ্ঠান হয়নি। শুধু কয়েকজন প্রবীণ মানুষ, গ্রামের শিক্ষক এবং কিছু ছাত্রছাত্রী উপস্থিত ছিলেন। অর্ক দাদুর চেয়ারটি ঘরের এক কোণে রেখে দিল। চেয়ারের পাশে ছোট্ট একটি ফলক লাগানো হলো—

‘এখানে কথা বলার আগে শোনা হয়।’

প্রথম দিনেই এক বৃদ্ধ এলেন। তাঁর পেনশনের নথি সংক্রান্ত সমস্যা ছিল। অর্ক ও এক স্বেচ্ছাসেবক তাঁকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বুঝিয়ে দিলেন। পরের দিন এল একটি মেয়ে, যার বৃত্তির আবেদন করার শেষ তারিখ এগিয়ে আসছিল। কয়েকজন যুবকের সাহায্যে সে আবেদনটি সম্পূর্ণ করল।

ধীরে ধীরে কেন্দ্রটির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু অর্কের কাছে সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা ঘটল এক বিকেলে। একটি ছেলে আবেদনপত্র পূরণ করতে এসে কাজ শেষ হওয়ার পরে বলল,
—দাদা, আগে ভাবতাম এসব কাজ শুধু বড়লোক বা শিক্ষিত মানুষেরাই করতে পারে। এখন বুঝলাম, ঠিকভাবে জানলে আমরাও নিজের কাজ নিজেরা করতে পারি।

অর্কের মনে পড়ল দাদুর কথা—মানুষকে সাহায্য করার অর্থ সব সময় তার হয়ে কাজ করে দেওয়া নয়; কখনও তাকে নিজের কাজ করার পথটি চিনিয়ে দেওয়াও সাহায্য।

কয়েক মাস পর অর্কের কাকা বাড়িটি দেখতে এলেন। ঘরে ঢুকে তিনি দেখলেন, একদিকে বইয়ের তাক, অন্যদিকে কয়েকজন মানুষ নিজেদের কাজ নিয়ে বসে আছেন। উঠোনে কয়েকটি নতুন গাছ লাগানো হয়েছে। ভাঙা জানালাগুলি মেরামত করা হয়েছে।

তিনি কিছুক্ষণ সব দেখে বললেন,
—তুই তো বাড়িটাকে অন্য রকম করে ফেলেছিস।

অর্ক বলল,
—বাড়িটা আগে থেকেই এমন ছিল, কাকা। আমরা শুধু এর ব্যবহারটা বদলেছি।

কাকা দাদুর চেয়ারটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
—বাবা বেঁচে থাকতে আমরা ভাবতাম, উনি খুব বেশি কিছু করেন না। নিজের ঘরে বসে থাকেন, বই পড়েন, চিঠি লেখেন। এখন বুঝছি, উনি কত মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

অর্ক মাথা নিচু করে বলল,
—আমিও বুঝতে পারিনি। সময় থাকতে আরও একটু শুনলে ভালো হতো।

কাকা তার কাঁধে হাত রাখলেন।

—সব কথা সব সময় বোঝা যায় না। কখনও দেরিতে বুঝলেও সেই বোঝাপড়া দিয়ে নতুন কিছু শুরু করা যায়।

সেদিন সন্ধ্যায় কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার আগে অর্ক একা দাদুর ঘরে বসেছিল। জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছিল। বাইরে কয়েকজন শিশু নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরছিল। পাশের ঘরে একজন যুবক পরের দিনের কাজের তালিকা তৈরি করছিল।

অর্ক দাদুর খাতাটি আবার খুলল। শেষের দিকে একটি ছোট্ট লেখা পেল—

‘মানুষ আমাকে মনে রাখবে কি না, তা নিয়ে আমার চিন্তা নেই। শুধু চাই, কেউ যদি কোনও দিন আমার ঘরে এসে বসে, তবে যেন মনে হয়, এখানে তার কথা শোনার মতো কেউ আছে।’

অর্কের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

সে বুঝল, দাদুর রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় সম্পদ বাড়ির জমি বা আসবাব নয়। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ ছিল মানুষের প্রতি মনোযোগ, নীরবে পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস এবং অন্যের সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা।

বাড়িটি আর কখনও আগের মতো হবে না। সময়ের সঙ্গে তার দেওয়াল আরও পুরোনো হবে, নতুন মানুষ আসবে, নতুন প্রয়োজন তৈরি হবে। কিন্তু যতদিন সেখানে কেউ নিজের সমস্যার কথা বলতে পারবে, যতদিন কেউ সেখানে এসে নিজের কাজ করার সাহস পাবে, ততদিন বাড়িটি সত্যিকারের অর্থে খালি থাকবে না।

রাতের অন্ধকারে অর্ক দরজা বন্ধ করল। দাদুর চেয়ারটি জানালার পাশে রেখে দিল, যেন পরদিন আবার কেউ এসে বসতে পারে।

তার মনে হলো, পৃথিবীর সব নীরবতা শূন্যতার নয়। কিছু নীরবতা আমাদের শেখায়, অন্যের কথা মন দিয়ে শুনতে হয়। কারণ মানুষ কখনও কখনও সাহায্য চাওয়ার ভাষা খুঁজে পায় না; তার প্রয়োজন বোঝার জন্য দরকার ধৈর্য, সহমর্মিতা আর একটু সময়।

শিক্ষা: মানুষের প্রকৃত মূল্য সব সময় তার বড় বড় কাজের মধ্যে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় নীরবে অন্যের পাশে দাঁড়ানো, মন দিয়ে কথা শোনা এবং কাউকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করাই সবচেয়ে বড় অবদান। কোনও মানুষকে সত্যিকার অর্থে সম্মান করতে হলে শুধু তাঁর কথা নয়, তাঁর নীরবতাকেও বুঝতে শেখা দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *