যে বিচারক নিজের ভুল স্বীকার করেছিলেন।।

শহরের পুরোনো পৌরসভা ভবনের একটি ঘরে বসত নাগরিক অভিযোগ শোনার ছোট্ট আদালত। সেখানে বড় কোনও অপরাধের বিচার হতো না। রাস্তার দখল, বাড়ির সীমানা, নিকাশি নিয়ে বিবাদ কিংবা প্রতিবেশীদের মধ্যে জমে থাকা ছোটখাটো বিরোধের নিষ্পত্তি করা হতো।

সেই আদালতের বিচারক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসনিক আধিকারিক অরুণাভ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সততা নিয়ে কারও সন্দেহ ছিল না। কিন্তু একটি বিষয়ে তিনি একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন—তিনি মনে করতেন, বহু বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের কথা শুনেই সত্য-মিথ্যা বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে।

একদিন তাঁর আদালতে এলেন দুই প্রতিবেশী, নীলমাধব দাস ও শশাঙ্ক পাল। তাঁদের বাড়ির মাঝখানে একটি সরু নিকাশিনালা ছিল। শশাঙ্কের অভিযোগ, নীলমাধব নালার ওপর দেওয়াল তুলে দিয়েছেন, ফলে বৃষ্টির জল তাঁর বাড়িতে ঢুকে পড়ছে।

নীলমাধব বললেন, “আমি নিজের জমির মধ্যেই কাজ করেছি। বরং ওঁর বাড়ির নতুন সিঁড়িটাই নালার দিকে বাড়ানো হয়েছে।”

দুজনেই নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে কাগজপত্র নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু নথিগুলো পুরোনো, আর বাড়ির সীমানা নিয়ে তাঁদের বর্ণনাও ছিল পরস্পরবিরোধী।

অরুণাভবাবু কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। শশাঙ্কের কথা তাঁর কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো। তিনি নীলমাধবকে নালার ওপর থেকে দেওয়াল সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন।

নীলমাধব প্রতিবাদ করলেন না। শুধু বললেন, “স্যার, আপনি যদি একবার পুরোনো নকশাটা ভালো করে দেখতেন!”

অরুণাভবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, “নথি তো দেখেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

সেদিন শুনানি শেষ হয়ে গেল। কিন্তু সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অরুণাভবাবুর মনে নীলমাধবের শেষ কথাটি ঘুরতে লাগল। লোকটির চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক ধরনের হতাশা।

পরদিন আদালতে যাওয়ার আগে অরুণাভবাবু নথিগুলো আবার খুললেন। প্রথমে সবকিছু আগের মতোই মনে হলো। তারপর একটি পুরোনো নকশার কোণে তাঁর চোখ আটকে গেল। সেখানে লেখা ছিল, রাস্তার পাশের নিকাশিনালার একটি অংশ বহু বছর আগে পৌরসভার অনুমোদনে স্থানান্তরিত হয়েছিল।

কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি নথি ফাইলে ছিল না।

অরুণাভবাবু বুঝতে পারলেন, তিনি অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা তাঁকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার ওপর অতিরিক্ত ভরসা করেই তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষা করেছিলেন।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে পৌরসভার নথি বিভাগে যোগাযোগ করলেন। পুরোনো রেজিস্টার খুঁজে দেখা হলো। কয়েক দিন পরে প্রয়োজনীয় নথি পাওয়া গেল। তাতে বোঝা গেল, নিকাশিনালার সীমানা নিয়ে দুই প্রতিবেশীরই কিছু ভুল ধারণা ছিল। নীলমাধবের দেওয়ালের একটি অংশ নিয়ম মেনে তৈরি হলেও অন্য অংশের অবস্থান যাচাই করা দরকার ছিল। একইভাবে শশাঙ্কের সিঁড়ির বিস্তারও নতুন করে মাপার প্রয়োজন ছিল।

অরুণাভবাবু চাইলে আগের নির্দেশটি বহাল রাখতে পারতেন। কেউ হয়তো বুঝতেই পারত না যে তিনি ভুল করেছেন। কিন্তু তিনি নিজেই নতুন শুনানির তারিখ ঘোষণা করলেন।

সেদিন আদালতঘর ভর্তি ছিল। নীলমাধব ও শশাঙ্ক দুজনেই উপস্থিত। অরুণাভবাবু তাঁদের সামনে বসে বললেন, “আগের শুনানিতে আমি একটি অসম্পূর্ণ নথির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, আরও তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। তাই আগের নির্দেশ পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।”

ঘরে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল।

একজন কর্মচারী অবাক হয়ে তাকালেন। এমন প্রকাশ্যে নিজের ভুল স্বীকার করতে তিনি অরুণাভবাবুকে কখনও দেখেননি।

এরপর নিরপেক্ষভাবে জমির মাপ নেওয়া হলো। দুই পক্ষের নথি পরীক্ষা করা হলো এবং পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বক্তব্য শোনা হলো। নতুন প্রমাণের ভিত্তিতে নির্দেশ দেওয়া হলো—নিকাশিনালার নির্ধারিত প্রবাহপথ খোলা রাখতে হবে, দুই বাড়ির যে অংশে নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ রয়েছে তা সংশোধন করতে হবে এবং ভবিষ্যতে জলনিকাশি নিয়ে সমস্যা হলে পৌরসভা যৌথভাবে পরিদর্শন করবে।

রায় ঘোষণার পর শশাঙ্ক বললেন, “আমি ভেবেছিলাম, আজও হয়তো আমার কথাই শুধু শোনা হবে। কিন্তু এবার দুজনেরই ভুল দেখা গেল।”

নীলমাধবও মাথা নাড়লেন। তাঁদের বিরোধ পুরোপুরি মুছে গেল না, তবে সমস্যার সমাধানের একটি ন্যায্য পথ তৈরি হলো।

আদালত ফাঁকা হয়ে গেলে অরুণাভবাবুর সহকারী জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, আপনি চাইলে তো আগের সিদ্ধান্তটা বদলানোর কথা না বলেও নতুন করে তদন্ত করতে পারতেন।”

অরুণাভবাবু জানলার বাইরে তাকিয়ে বললেন, “তাহলে হয়তো সিদ্ধান্তটা ঠিক হতো, কিন্তু মানুষ জানত না যে বিচারকেরও ভুল হতে পারে। ভুল স্বীকার করলে সম্মান কমে না। বরং ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়।”

সেই দিন থেকে তিনি প্রতিটি শুনানির শেষে নিজের নোটে একটি প্রশ্ন লিখতে শুরু করলেন—‘আমি কি সব প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করেছি?’

প্রশ্নটি তাঁকে কখনও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দিয়েছে, কখনও নতুন তথ্য খুঁজতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝলেন, ন্যায়বিচারের জন্য শুধু অন্যের বক্তব্য পরীক্ষা করলেই চলে না; নিজের ধারণাকেও প্রশ্ন করতে হয়।

শিক্ষা: নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রমাণ যাচাই এবং ভুল সংশোধনের মানসিকতাই একজন মানুষকে প্রকৃত অর্থে ন্যায়পরায়ণ করে তোলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *