সাত মিনিটের বিদ্যুৎ।

রাত তখন সাড়ে আটটা। নদিয়ার ছোট্ট শহর কৃষ্ণনগরের প্রান্তে অবস্থিত একটি আবাসিক বিদ্যালয়ে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি, আর কিছুক্ষণ পরপর ভেসে আসছে মেঘের গর্জন।

বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে তখন পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল। পরদিন অঙ্কের পরীক্ষা। হঠাৎ আলো নিভে যাওয়ায় ছাত্রদের মধ্যে হইচই শুরু হয়ে গেল। কেউ মোবাইলের আলো জ্বালল, কেউ জানলার কাছে গিয়ে বৃষ্টি দেখতে লাগল।

নবম শ্রেণির ছাত্র অর্কের কিন্তু অন্য চিন্তা। তার পাশের ঘরে থাকত ছোট্ট সুমন। জন্মের পর থেকেই সুমনের হৃদ্‌যন্ত্রে একটি জটিল সমস্যা ছিল। নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি তার কিছু চিকিৎসা-সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রয়োজন হতো। বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক ও তার পরিবার আগে থেকেই জরুরি পরিস্থিতির ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকলে সমস্যার আশঙ্কা ছিল।

অর্ক ছুটে গেল তত্ত্বাবধায়ক মৃণালবাবুর ঘরে।

“স্যার, সুমনের ঘরে আলো নেই। ওর যন্ত্রগুলো ঠিকমতো চলছে তো?”

মৃণালবাবু সঙ্গে সঙ্গে ঘরটি পরীক্ষা করতে গেলেন। দেখা গেল, জরুরি ব্যাটারির সাহায্যে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম চলছে, তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ কখন ফিরবে তা জানা নেই। তিনি সুমনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বললেন।

এদিকে বিদ্যালয়ের জেনারেটরটি চালু করা যাচ্ছিল না। বহুদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেটির একটি সংযোগে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। মৃণালবাবু বিদ্যুৎকর্মীকে ফোন করলেন, কিন্তু প্রবল বৃষ্টির জন্য তিনি আসতে দেরি করবেন বলে জানালেন।

বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক সৌমেনবাবু পরিস্থিতি বুঝে সবাইকে শান্ত থাকতে বললেন। তিনি জানালেন, ছাত্ররা যেন নিজেরা বৈদ্যুতিক তার বা জেনারেটর নিয়ে হাত না দেয়। বিদ্যুতের কাজ প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরাই করবেন।

অর্কের মাথায় তখন একটি কথা ঘুরছিল। বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানাগারে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে একটি প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল। সেই প্রকল্পে একটি ছোট সৌর প্যানেল ও ব্যাটারি ছিল। তবে সেটি শুধু পরীক্ষামূলক কাজের জন্য, চিকিৎসার সরঞ্জাম চালানোর উপযোগী নয়।

সে সৌমেনবাবুকে বলল, “স্যার, বিজ্ঞানাগারের সৌর প্যানেল দিয়ে কি অন্তত করিডরের আলো জ্বালানো যাবে? তাহলে সবাই অন্ধকারে থাকবে না।”

শিক্ষক প্রথমে বিদ্যমান ব্যবস্থাটি পরীক্ষা করলেন। নিশ্চিত হলেন, সেটি থেকে আলাদা একটি ছোট এলইডি বাতি চালানো সম্ভব। তিনি নিজেই সংযোগ তৈরি করলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছাত্রাবাসের করিডরে একটি ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল।

সেই আলোয় ছাত্ররা আবার নিজেদের ঘরে ফিরে গেল। কেউ বই খুলল, কেউ টর্চের সাহায্যে পড়তে লাগল। মৃণালবাবুও অন্ধকারে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি না করে সুমনের পাশে বসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারলেন।

ঠিক সাত মিনিট পর বিদ্যুৎ ফিরে এল।

ছাত্রাবাসে আনন্দের চিৎকার উঠল। সবাই ভাবল, সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু সৌমেনবাবু অর্ককে ডেকে বললেন, “তুমি আজ ভালো একটা কাজ করেছ। তবে মনে রেখো, সাত মিনিটের আলো আমাদের সাহায্য করেছে ঠিকই, কিন্তু জরুরি চিকিৎসা-ব্যবস্থার বিকল্প কখনোই হতে পারে না।”

অর্ক মাথা নাড়ল।

পরদিন সকালে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একটি বৈঠক ডাকলেন। সেখানে সিদ্ধান্ত হলো, শুধু বিদ্যুৎ চলে গেলে কী করতে হবে তা নয়, আরও অনেক জরুরি পরিস্থিতির জন্য লিখিত পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। জেনারেটরের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, জরুরি আলোর ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় ব্যাটারির পরীক্ষা এবং অসুস্থ ছাত্রদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা-পরিকল্পনা তৈরি করা হলো।

বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ক্লাবও নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিল—কম খরচে নিরাপদ জরুরি আলোর ব্যবস্থা তৈরি করা। তবে তারা ঠিক করল, প্রকল্পটি আগে শিক্ষক ও প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদদের দিয়ে পরীক্ষা করানো হবে। কোনও পরীক্ষামূলক যন্ত্রকে সরাসরি চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা হবে না।

কয়েক সপ্তাহ পরে বিদ্যালয়ে একটি ছোট প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলো। অর্ক সেখানে তার সৌরবিদ্যুতের মডেলটি দেখাল। মডেলের পাশে সে একটি বাক্য লিখেছিল—

“ছোট আলো অন্ধকার কমায়, কিন্তু নিরাপত্তার জন্য চাই প্রস্তুতি।”

প্রদর্শনী দেখতে এসে সুমনও তার পাশে দাঁড়াল। সে অর্ককে বলল, “সেদিন তুমি শুধু আলো জ্বালাওনি। সবাইকে শান্ত থাকতেও সাহায্য করেছিলে।”

অর্ক একটু লজ্জা পেয়ে হেসে ফেলল।

সেদিনের সাত মিনিটের ঘটনা বিদ্যালয়ের সবাইকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছিল। সমস্যার সময় মাথা ঠান্ডা রাখা, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করা এবং বিপজ্জনক কাজ বিশেষজ্ঞদের হাতে ছেড়ে দেওয়া—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে থাকলেই প্রকৃত সমাধানের পথ তৈরি হয়।

শিক্ষা: সংকটের সময় ছোট উদ্যোগও বড় সাহায্য করতে পারে। তবে মানবিকতা, বিচক্ষণতা এবং নিরাপত্তার নিয়ম মেনে চলাই দায়িত্বশীল কাজের প্রকৃত পরিচয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *