পাহাড়ের পথে সুন্দর অভিজ্ঞতা ।

সামনেই বড় দিন। খ্রিস্টমাস ডে। এই দিন গুলোতে প্রতিটি মানুষ প্রাণভরে ছুটি উপভোগ করে। কেউ পিকনিক, কেউ বেরিয়ে পড়ে ভ্রমনের নেষায়। আসুন আমরা জেনে নেবো এমন একটি ভ্রমনের স্থান।

হিমালয়ের ছবি দেখলে ঘরে বসে থাকলেও মন ছোটে তার কাছে কাছে তার পাহাড়ের দুর্গম পথে পথে।হারিয়ে যাই এই রুদ্ধদ্বারে বসে সেই খোলা আকাশের নীচে উঁচু নীচু পাহাড়ী চড়াই উতরাই এর আনাচে কানাচে।

অনেক কাল আগে বছর চল্লিশ তো হবেই । সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তুষৃরাবৃত স্নাউট পয়েন্ট ।তার মধ্যে সগর্বে সগর্জনে গঙ্গা মাঈজী নেমে চলেছেন মর্তে।এখন গঙ্গোত্রী পর্যন্ত বাস যায় তখন আমরা ভৈরোঘাটি থেকে লঙ্কা র চড়াই পেরিয়ে হেঁটে গঙ্গোত্রী পৌঁছেছিলাম।রাতে এক বাবার আশ্রমে রাত কাটিয়েছি।আর কোনও থাকার জায়গা ছিল না।প্রচন্ড ঠান্ডা খাওয়া দাওয়ার পর যে যার বর্তন ধুয়ে রাখতে গিয়ে মালুম হয়েছিল ঠান্ডা কাকে বলে।
চিরবাসা ভূজবাসার সুন্দর সবুজ পথটুকু পেরিয়ে এবার ন্যাড়া ন্যাড়া পাহাড়ের চড়াই ।গিলাপাহাড় ভয়ের থেকে মজা পেয়েছিলাম সবসময়ই গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে।আর গাইডের সাবধান জলদি জলদি পার হো না চাইয়ে।
গোমুখে থাকার ডেরা ছিল একমাত্র লালবাবার আশ্রম ।প্রচন্ড মাথার যন্ত্রণা খিদে নেই।লালবাবার হুকুম যটা রুটি তটি কম্বল। আজ আর উনি নেই।গোমুখ দর্শনার্থীদের সেবা করেই জীবন কাটিয়ে ছিলেন ।এইসব মহাত্মা রা না থাকলে আমরা হয়তো এরকম করে আরামে ওই রকম দুর্গম জায়গায় রাত কাটাতে পারতাম না ।
আমার আসল কথা এখন বলবো।হাঁটাপথে যে কখন কোথায় কি অবস্থা হবে কেউ জানে না । একমাত্র ঈশ্বর জানেন কোথায় রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে ।কোথায় হঠাৎ বরফ পড়ে আটকে থাকতে হবে সবকিছুর জন্য মানসিকভাবে তৈরী থাকতে হয়। অনেক ট্রেকিং করতে গিয়ে এরকম কতো যে অভিজ্ঞতা হয়েছে আজ একটা ছোট্ট ঘটনা খুব বলতে ইচ্ছে করছে ।
গোমুখ দর্শন করে বেশ পুণ্যি পুণ্যি ভাব নিয়ে ফিরছি।আমাদের সেই ছ জনের দল এবারে একজন সঙ্গী বেশী।আমার আট বছরের পুত্র। তাই আমার বেপরোয়া ভাব টি কম। একটু সাবধানী।তাছাড়া ওর এই প্রথম হাঁটা।তাই বেশ রিল্যাক্সড মুডে ফিরছি।ভালোভাবে ই নেমে আসছি।গাঙনানি বলে একটি জায়গায় পৌছে শুনলাম রাস্তা ভাঙা বাস বন্ধ আছে। রাস্তা না সারানো পর্যন্ত আমাদের এখানেই থাকতে হবে।আমরা আকাশ থেকে পড়লাম । এখানে এই নদীর ধারে জঙ্গলের মধ্যে কীভাবে থাকবো। কখন বাস আসবে কেউ জানে না ।দু তিন দিন ও হতে পারে।গ্রামের বেশ কিছু লোক আমাদের অনেক সহায়তা করার চেষ্টা করছে।হঠাৎ ওদের মধ্যে একজন বললো সাবলোক তপ্ত পানি বাংলা মে ঠারনে সেকেগা।সবাই হৈ হৈ করে উঠলো।ঠিক বোলা একদম ।পাহাড়ের বেশ কিছু টা ওপরে একটি বাংলো আছে।সেখানে গরম জলের একটা কুন্ড আছে।সেটির জন্য সরকারি ছোট্ট একটি বাংলো আছে।বড় বড় অফিসার রা কদাচিত্ আসেন ।একেবারে ঘন সবুজ পাহাড়ী জঙ্গলের মধ্যে বাংলোটি।নীচে খরস্রোতা নদী তার পাশ দিয়ে এবড়োখেবড়ো সরু পাহাড়ীরাস্তা উঠে গেছে ।কয়েক জন লোক্যাল লোক আমাদের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে এলো।চৌকিদার নেই।তালাবন্ধ বাংলো।ওরা চৌকিদারে র খোঁজ করতে গেল ।আমাদের দলনেতা বললেন দূর ছাড় তো তালা ভেঙে দে। ও বেটা মাল খেয়ে কোথায় পড়ে আছে।খুব উৎসাহের সঙ্গে তালা ভাঙা হোলো।কি সুন্দর ছোট্ট বাংলো আমরা সাতজন দিব্বি থেকে যাবো।সামনেই উষ্ণ কুন্ড।সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো সিঁড়ি ।খাবারের স্টক বলতে মুড়ি ছিঁড়ে চানাচুর বাদাম ।গোবিন্দ বললো এতো এক সপ্তাহ কেটে যাবে রে।ভীম নাগের সন্দেশের বাক্সে ও কিছু আছে। ব্যাস চালাও পানসী বেলঘরিয়া।শর্টস পড়ে গরম জলে ঝপাং ।সে যে কী আনন্দ ।নিস্তব্ধ পাহাড়ের কোলে আমাদের হুল্লোড় গরম পানির মতো টগবগ করে ফুটতে থাকলো।চানটান করে ফ্রেশ হয়ে বাংলোর ঘরে জম্পেশ করে খাওয়া দাওয়া করে আমরা আহা কি আনন্দ গাইতে গাইতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম জানি না ।
সকাল বেলায় চৌকিদার এসে হাজির ।সে তো আমাদের দেখে চোখ কপালে তুলে বলে মহারাজ তালা তোড় দিয়া? আমাদের দলনেতা শুদ্ধ বাংলায় বললেন হ্যাঁরে হতভাগা সারারাত বাইরে পাহারা দেব নাকি? কি বুঝলো কে জানে ভেতরে ঢুকে যখন দেখলো কামরার চাবি ও ভাঙা আরও কপালে চোখ তুলে বললো এ ভি তোড় দিয়া মহারাজ ।
আমরা তাকে একটা সন্দেশ দিয়ে বললাম খা কে দেখো।অবাক হয়ে নেড়েচেড়ে খেতে খেতে বললো আভি বাস আয়েগা মহারাজ । ওকে বাইরে ঠেলে আমরা ঝটপট পিট্টু গুছিয়ে ওকে বাই বাই করে নীচে বাস রাস্তার উদ্দেশ্য রওনা দিলাম ।পেছন ফিরে দেখি ও তখনও ভাঙা তালাগুলি নিয়ে অবাক হয়ে দেখছে।ওর সেই হতভম্ব মুখ মনে পড়লে এখনও দমকা হাসি থামাতে পারি না ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *