দামাল মেয়ে কুহেলি (ধারাবাহিক উপন্যাস, অন্তিম পর্ব) : দিলীপ রায় (৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

পুবালীদের পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর ব্যাপারে প্রদীপ্ত এবার নড়েচড়ে বসলো । সারা জীবন পাচারকারী চক্রের ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে রাখাটা প্রদীপ্ত মেনে নিতে পারছে না । সে চায়, পুবালী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক । তাই পুবালীকে নিয়ে প্রদীপ্ত যথেষ্ট চিন্তিত । নারী পাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে পুবালী যে ভীষণভাবে নাজেহাল, সে বিষয়ে নিশ্চিত । এত বড় ধকল কীভাবে সামলাচ্ছে সেটা প্রদীপ্তের ভাবনার বাইরে । বেশ কিছুদিন যাবৎ তারা দুটি মেয়ে বাড়ির বাইরে । এখনও কবে বাড়ি ফিরবে, সে ব্যাপারে অনিশ্চিত !
পুবালীকে নিয়ে প্রদীপ্ত একটা কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে চায় । এইভাবে গা-ঢাকা দিয়ে কতদিন তাদের জীবন চলবে । এটা এক ধরনের উপর্যুপরি অশান্তি । তাদের দোষ কোথায় ? মেয়ে হয়ে জন্মানোই কী তাদের একমাত্র দোষ ! তারা এখনও আপন মানুষ/স্বজন হারা, ঘর ছাড়া । ছন্নছাড়া জীবন । অসহনীয় জীবন যাপন । এইরকম একটা চিন্তা ভাবনার মধ্যে তার মাথায় হঠাৎ পাগল মানুষটার কথা মনে পড়লো । সেই মানুষটার জন্যেই আজ পুলিশের হাতে ধরা পড়লো না । এখানেই প্রদীপ্তের খটকা ? তাদের মূল স্রোতে ফেরার জন্য পুলিশের কী ভূমিকা বা পাগল লোকটার কী পাগলামী ? সেটা প্রদীপ্তকে জানতে হবে । সে আর চাইছে না, নিরপরাধ দুটি অল্প বয়সের মেয়ে এভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য গা-ঢাকা দিয়ে থাকুক !
আশ্রমের শর্ত পালনের ঘনঘটা না থাকলে প্রদীপ্ত এক্ষুণি পুবালীকে বিয়ে করে ঘর সংসার পাতার কথা ভাবতো । কিন্তু সে আশ্রমের কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তাই তাকে সারাজীবন অকৃতদার হয়ে থাকতে হবে ! পুবালীকে কাছে পাওয়ার পর বিশেষভাবে তার সিদ্ধান্তের মত পরিবর্তন করা নিয়ে প্রদীপ্ত দিন-রাত ভাবছে । প্রয়োজনে পাকাপাকিভাবে আশ্রম ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছে । সেইক্ষেত্রে তাকে অন্যত্র চাকরি বা কাজ পেতে হবে । কাজের ব্যাপারে কয়েকটা জায়গায় খোঁজখবর নিয়েছে বা নিচ্ছে । কিন্তু এখনও আশাপ্রদ কোনো খবর পায়নি । তবে কোহিমা শহরে নামী একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রাথমিক বিভাগে সহকারী শিক্ষকের অফার পেয়েছে । কিন্তু প্রদীপ্ত চাইছে, তার নিজের রাজ্যে কিছু একটা কাজ করতে । আশ্রমের গেট থেকে হঠাৎ তাকে ডাকার আওয়াজ কানে ভেসে এলো । তৎক্ষণাত ঘর থেকে বেরিয়ে আশ্রমের গেটে চলে গেলো । গেটে আবার পুলিশ । তবে একজন মাত্র পুলিশ ! পুলিশ দেখলেই প্রদীপ্ত ক্ষেপে যাচ্ছে । আশ্রমে এত বেশী সখ্যায় পুলিশ কোনোদিন ঢোকেনি । তাই গেটে দণ্ডায়মান পুলিশ দেখে তার এত উষ্মা ! তবুও সরকারি পদাধিকারি ব্যক্তি । তাঁকে যথাযথ সম্মান দেওয়া প্রদীপ্তের সৌজন্যবোধের মধ্যে পড়ে ।
স্যার, কাকে খোঁজ করছেন ? প্রদীপ্ত জিজ্ঞাসা করলো ।
আমি আশ্রমের হেডকে খোঁজ করছি । তার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই ।
আমি প্রদীপ্ত । এই আশ্রম আমার তত্ত্বাবধানে চলে । বলুন, কী বলবেন ?
একটু ভিতরে বসে কথা বলি ? পুলিশ সাহেব আর্জি জানালো ।
মনে মনে প্রদীপ্ত ভাবলো, আবার উৎপাত ! প্রচুর প্রশ্ন ? এখন তাকে সেগুলির উত্তর দিতে হবে । মনের ভিতর বিরক্তি থাকলেও বাইরে সেটা প্রকাশ না করে হাসিমুখে প্রদীপ্ত বলল, “আসুন স্যার, আমরা অফিসে বসি ।“
ভিতরে যাওয়ার সময় পুলিশ আধিকারিক বললেন, “একটা অনুরোধ করছি প্রদীপ্তবাবু, আমাকে “স্যার” সম্বোধনে ডাকবেন না । আমি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো একজন সাধারণ মানুষ । আমি থানায় গিয়েছিলাম, সেইজন্য পুলিশের ড্রেস । কিন্তু আমি আপনার সাথে স্বাভাবিক ছন্দে কথা বলতে চাই । আমি ভরতপুর থানায় কর্মরত । আমি বিশেষ দরকারে আলিপুরদুয়ার এসেছি । সেই কথাটাই আমি আপনাকে খুলে বলতে চাই ।
চেয়ারের দিকে হাত বাড়িয়ে প্রদীপ্ত বলল, আগে বসুন । তারপর আপনার সব কথা শুনছি । প্রদীপ্ত মাসিকে হেকে দু-কাপ চা দিতে বলল ।
পুলিশের দিকে তাকিয়ে প্রদীপ্ত বলল, আপনার নামটাই জানতে পারলাম না ।
আমার নাম জগন্নাথ । আগেই বললাম, ভরতপুর থানায় কর্মরত । বাড়িটা ঐ থানার অন্তর্গত আমলাইতে ।
এবার বলুন, আপনি কী জানতে চান ?
জগন্নাথ শুরু করলো । আমি কাঞ্চন নগরের কুহেলিকে ভালবাসি । কাঞ্চন নগরের মোড়ে তার রেস্টুরেন্ট । সেটা এখন বন্ধ । দোকান বন্ধ থাকার একটাই কারণ, সে নিখোঁজ । পাচারকারী দুস্কৃতিরা তাকে তুলে নিয়ে পালিয়েছে । কুহেলির সাথে সেখানকার মেয়ে পুবালীকেও তুলে নিয়ে দুস্কৃতিরা পালিয়েছে । আমি তাদের হন্যে হয়ে খুঁজছি । কুহেলির শেষ ফোনে বুঝতে পারি, তারা এই কোচবিহার অঞ্চলে গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে । এখানকার থানা থেকে জানালো, আপনাদের আশ্রমে দুইজন মহিলা আশ্রয় নিয়েছে । কিন্তু গতকাল তাঁরা (থানার পুলিশ) আপনার আশ্রমে খোঁজ নিয়ে তাদের হদিস পায়নি । এইজন্য আমি উপযাজক হয়ে আপনার স্মরণাপন্ন হলাম । কুহেলিকে আমি ভালবাসি । আমার ভালবাসার মানুষটার শুধুমাত্র নারী পাচারকারী দলের ভয়ে ছন্নছাড়া জীবন ! তাকে আমি কাছে পেতে চাই । তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে চাই । যার জন্য দুটি মেয়েকে খুঁজে পাওয়া ভীষণ জরুরি । খুঁজে পেতে আপনার সহযোগিতা দরকার ।
মাথা চুলকিয়ে প্রদীপ্ত বলল, আমি নিজেও চাই তারা জীবনের মূল স্রোতে ফিরে আসুক । কিন্তু তারা কোথায় ? গতকাল পুলিশ তল্লাশি চালানোর সময় আমি জানতে পারি ভরতপুর থানার দুটি মেয়ে নিখোঁজ ! ঘটনাচক্রে একটি মেয়েকে আমি খুব ভাল করে চিনি । সুতরাং বুঝতে পারছেন, আমিও তাদের খুঁজে পেতে চাই ।
আপনি কী পুবালীর কথা বলছেন ?
ঠিক ধরেছেন । পুবালী আমার প্রিয় বান্ধবী ।
তাহলে আপনার বাড়ি কোথায় ?
আমার বাড়ি ঐখানেই । একই থানার অধীনে ।
এভাবে আপনি এখানে কেন ?
সেটাও পুবালীর জন্য বলতে পারেন । জাতিগত কারণে ও সামাজিক বাধার কারণে আমরা দুজন ছন্নছাড়া ! তাই আমিও পুবালীকে খুঁজে পেতে চাই !
তাহলে দুজনের ইচ্ছা-আকাঙ্খা ঐ দুইজন নিখোঁজ মহিলাকে ঘিরে ?
ইত্যবসরে মাসি চায়ের কাপ নিয়ে হাজির ! চায়ে চুমুক দিয়ে প্রদীপ্ত বলল, “আপনি পুলিশের বড় সাহেব । এখনও আমি ধন্দের মধ্যে রয়েছি, আপনি অন্যভাবে আমার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নিতে এসেছেন কিনা ? কিন্তু আমি ঐ দুই মহিলার ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত কিছুই জানিনা ।
আবার আপনি আমাকে অবিশ্বাস করছেন কেন ? আপনার অবিশ্বাস দূরে সরিয়ে ঐ দুই মহিলাকে খুঁজে বের করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ুন । আমি আপনার সঙ্গে আছি । তাতে অনির্দিষ্ট কালের ছুটি নেওয়ার জন্য আমার চাকরি চলে যায়, যাবে । তবুও তাদের উদ্ধার না করে বাড়ি ফিরছি না ।
প্রদীপ্ত নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারলো, জগন্নাথ আন্তরিকভাবে চাইছে পুবালী ও কুহেলি স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক ।
অতঃপর কী করা করনীয় ? কীভাবে তল্লাশি শুরু করবে, প্রদীপ্ত ভাবতে লাগলো । তার মাথায় হঠাৎ একটি আইডিয়া । প্রথমে পাগল লোকটাকে ধরতে হবে । সে নিশ্চয় কিছু জানে । নতুবা সেদিন পুলিশের হাত থেকে দুজনকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠতো না । তাদের পালাতে সাহায্য করার পেছনে অবশ্যই কোনো কারণ আছে ! সেই কারণটাই বা কী ? আর তা ছাড়া মেয়ে দুটোকে বাঁচাতে তার এত কেন মাথা ব্যথা ? পাগল মানুষটাকে ঘিরে অনেকগুলি প্রশ্ন ?
দুজনে গ্রামে ছুটলো । খোঁজ নিয়ে জেনেছে, পাগল মানুষটার গ্রামের বট গাছ তলায় ডেরা । সেখানে তাকে পাওয়া যাবে । তাই যেমনি ভাবনা, তেমনি তাদের গ্রামে ছোটা । বট গাছ তলায় পৌঁছে দেখে পাগল মানুষটা সেখানে নেই । কোথাও কাজে গেছে । বট গাছ তলায় কয়েকজন ছেলে খেলছিল । তাদের মধ্যে একজনকে প্রদীপ্ত চিনতে পেরেছে । ঐদিন পাগল মানুষটার সাথে ছেলেটা আশ্রমে গিয়েছিল । প্রদীপ্ত তাকে ডাকলো, “এখানে যে পাগল মানুষটা থাকে সে এখন কোথায় ?”
নিশ্চয় গাঁয়ের কোনো বাড়িতে কাজ করছে । ছেলেটি আবার পাল্টা প্রশ্ন করলো, আপনি কী আশ্রম থেকে এসেছেন ?
হ্যাঁ । তুই তো সেদিন পাগল মানুষটার সাথে আশ্রমে গিয়েছিলি । নাম কী তোর ?
দেবরূপ । তারপর দেবরূপ জিজ্ঞাসা করলো, তোমরা পাগল লোকটাকে কেন খোঁজ করছ ?
তার সঙ্গে দেখা করা দরকার । ব্যাপারটা আরজেন্ট !
তবে এসো আমার সঙ্গে । তারপর দেবরূপ তাদের সঙ্গে নিয়ে গ্রামের ভিতর ঢুকে গেলো । যে বাড়িতে কাজ করছিল, তাদের দোরগড়ায় পৌঁছে দেবরূপ প্রদীপ্তকে বলল, “আপনারা এখানে একটু দাঁড়ান । আমি তাকে ডেকে আনছি ।“
ভিতরে ঢুকে দেবরূপ জানতে পারলো পাগল মানুষটা মাঠে জমির কাজ থেকে ফিরে গেরস্ত বাড়ির মালিককে বিড় বিড় করে জানালো, “মেয়ে দুটোর খুব বিপদ ! আমি নারানপুর চললাম ।“
বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে দেবরূপ প্রদীপ্তকে জানালো, মেয়ে দুটির নাকি খুব বিপদ ! তাই পাগল মানুষটা নারানপুর গেছে ।
সর্বনাশ ! নারানপুরে আবার কেন ? নারানপুরে মেয়ে দুটি কারা ?
দেবরূপ বিজ্ঞ ভাব দেখিয়ে প্রদীপ্তকে বলল, মেয়ে দুটি আমাদের দিদি । আমি জানি তারা কোথায় আছে ?
কথাটা আগে বললে পারতিস্‌ । মেয়ে দুটি তোর দিদি । তাহলে তুই নিশ্চয় দিদিদের খবর জানিস । আমরা তোর দিদিদের খোঁজ করছি । দিদিদের সঙ্গে দেখা হলে আর পাগল লোকটাকে দরকার নেই ।
দিদিদের ব্যাপারে আপনি আগে কিছুই বলেননি । এবার বলুন তো, দিদি দুজনকে আপনাদের কেন দরকার । কেননা যখন-তখন দিদিদের সঙ্গে যাকে-তাকে সাক্ষাৎ না করানোর কড়া নির্দেশ আছে ! এবার আপনি বলুন, কেন দিদিদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন ।
আচ্ছা জ্বালায় পড়া গেলো ! দিদিদের সঙ্গে দেখা হলেই বুঝতে পারবি তোদের দিদি আমাদের কতো পরিচিত ।
ঠিক আছে তোমরা আমার সাথে যেতে পারো, তবে একটা শর্ত !
শর্ত কেন ?
আমি নারানপুর গ্রামে ঢুকে কাছাকাছি গিয়ে তোমাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে রাখব । তারপর দিদিদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তোমাদের ভেতরে ঢোকাবো । নতুবা তোমাদের বাড়ি ফিরে আসতে হবে ।
সেটাই হবে দেবরূপ । এখন খুব দ্রুত নারানপুরে চলো ।
তিনজন একরকম ছুটে নারানপুরে পৌঁছে গেলো । প্রদীপ্ত ও জগন্নাথকে রাস্তায় বসিয়ে রেখে দেবরূপ বিদিশাদের বাড়ির দিকে ছুটলো । সেখানে পৌঁছে দেখে রাস্তায় অনেক মানুষের জটলা ! অত মানুষের জটলা দেখে ঘাবড়ে গেলো দেবরূপ । ইতিমধ্যে পাগল লোকটাকে দেখতে পেয়ে তার কাছে ছুটে গেলো দেবরূপ । পাগল মানুষটা তখন কাঁদছে ।
অন্যদিকে প্রদীপ্ত ও জগন্নাথ রাস্তার উপর ঠায় দাঁড়িয়ে । অথচ দেবরূপ ফিরে আসছে না । হঠাৎ তারা লক্ষ করলো, “কতিপয় গ্রামের মানুষ হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে ।“ কৌতুহলবশত জগন্নাথ জিজ্ঞাসা করলো, দাদা, আপনারা এভাবে ছুটে কোথায় যাচ্ছেন ।
একজন গ্রামবাসী হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আর বলবেন না দাদা । গাঁয়ে নারী পাচারকারীরা ঢুকে দুটি মেয়েকে তুলে নিয়ে পালিয়েছে ।“
“সে কী ?” অবাক বিষ্ময়ে প্রদীপ্ত কথাটা বলল ।
আর বলছি কী ভায়া ! সরেজমিনে ঘটনাটা জানতে ছুটছি । শুনলাম , অপহৃত মেয়ে দুটি নাকি এই গ্রামের মেয়ে নয় । তারা বিদিশাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল । তারপর ভদ্রলোক বিদিশাদের বাড়ির দিকে মুখ করে ঊর্ধ্বশাসে ছুটলো ।
উদ্ভ্রান্তের মতো তারা দুজনও বিদিশাদের বাড়ির দিকে ছুটলো ।
পাগল লোকটাকে দেখে জগন্নাথ ও প্রদীপ্ত সোজা তার কাছে গেলো । পাগল মানুষটাকে তাদের চেনা চেনা লাগলো । তাই শ্রদ্ধা ভক্তিতে জগন্নাথ সানাইবাবুকে প্রণাম করলো । তাদেরকে সানাইবাবু বললেন, “আমি কুহেলির বাবা । কাঞ্চন নগরের সানাই । কপাল দোষে আমি পাগল সেজে রয়েছি । আমি স্ত্রী ও শ্যালিকার চক্রান্তের শিকার । তাদের হাত থেকে নিস্তার পেতে এখন ভবঘুরে ! লজ্জায় বাড়ি ফিরে যেতে পারিনি । যাই হোক কুহেলিকে চিনতে পেরেও আমি ধরা দিইনি । কিছুদিন পরেই মেয়ের সাথে দেখা করার পরিকল্পনা ছিল । কিন্তু তার আগেই পুলিশের তল্লাশি । প্রদীপ্তের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছি, পুবালীর সঙ্গে বিয়ে না হওয়ার কারণে বিবাগী হয়ে আশ্রমে আশ্রয় নেওয়া । আলাপ করার তাগিদে সেদিন আশ্রমে গিয়েছিলাম । তারপর পুলিশের ধাওয়া ! তবে জগন্নাথের কথা এখানকার থানার একজন কন্সটেবল আমাকে জানিয়েছিল । কিন্তু সে যে আমার মেয়ের খুব কাছের মানুষ সেটা আমি ঘুণাক্ষরেও জানতাম না । যাই হোক তোমাদের দুজনকে দেখে আমি মনে অনেক বল পেলাম !
এখন আমাদের কী করণীয় ?
আদাজল খেয়ে তাদের উদ্ধারের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া । পুলিশ তাদের মতো অনুসন্ধান করছে, করুক । কিন্তু আমরা আমাদের মতো তল্লাশিতে ঝাঁপিয়ে পড়বো । মেয়েদের নিয়ে তারা বেশীদূর যেতে পারেনি । আজ রাতেই দুস্কৃতিদের সম্ভাব্য ঘাঁটিগুলিতে খোঁজ নিতে হবে ।
“সম্ভাব্য ঘাঁটিগুলি কী আপনি চেনেন ?” প্রদীপ্ত জিজ্ঞাসা করলো ।
কথাটা এড়িয়ে গিয়ে সানাইবাবু বললেন, “আমি চাই, সমস্ত ঘটনা জানিয়ে জগন্নাথ থানাকে রিপোর্ট দিক । তারপর পুলিশ নড়েচড়ে বসুক এবং পুলিশি জালে পাচার চক্র ধরা পড়ুক ।“
পুলিশি অভিযানের ফলে কুহেলি ও পুবালী ধরা পড়লে কী হবে ?
প্রদীপ্তের দিকে তাকিয়ে সানাইবাবু বললেন, আহাম্ম্‌কের মতো কীসব কথাবার্তা বলছো ! পুলিশি অভিযানটাই তো মেয়ে দুটিকে উদ্ধারের জন্য এবং পাচার চক্রটাকে ধরার জন্য । আমরা চাই, আমাদের মেয়ে আমাদের কোলে ফিরে আসুক । পাচার চক্রের ঘাঁটি যে অনেক বড়, সেটা তোমরা নিশ্চয় আন্দাজ করতে পারছো । সুতরাং সময় নষ্ট না করে ফিল্ডে নেমে যাও ।
রাত তখন দুটো । খবর পেয়ে কুহেলির বাবা সানাইবাবু ছুটেছিলেন আলিপুরদুয়ার স্টেশনে । ঘাপটি মেরে বসেছিলেন । খবর ছিল দুর্বৃত্তরা রাতের ট্রেনে কুহেলিদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাবে । কিন্তু রাত দুটোর গৌহাটি যাওয়ার ট্রেনে আলিপুরদুয়ার থেকে সন্দেহজনক কাউকে ট্রেনে উঠতে দেখা গেলো না । খবরটা পুলিশের কাছেও ছিল । পুলিশের একটা টীমকে সিভিল ড্রেসে স্টেশনে ঘরাফেরা করতে দেখা গেছে । অবশেষে ব্যর্থ হয়ে সকলেই বাড়ি ফিরে গেলো ।
কয়েকদিন যাবৎ সানাইবাবু ও জগন্নাথ আশ্রমের অতিথি । সেখানেই খাওয়া-দাওয়া ও থাকা । সানাইবাবুর চারিদিকে তীক্ষ্ণ নজর । তা ছাড়া থানার খবরাখবরও নিয়মিত পাচ্ছে । এইজন্য সানাইবাবুর নিজস্ব মাধ্যম ছাড়াও থানার মাধ্যমে চক্রের মুভমেন্ট কিছুটা হলেও টের পাচ্ছেন । পাচার চক্র ধরার জন্য জেলা থেকে অভিজ্ঞ পুলিশ বাহিনী থানায় দুই একদিনের মধ্যে ঢুকে যাবে । তা ছাড়া আই-জি র‍্যাঙ্কের পুলিশ আধিকারিক নিজে সরেজমিনে কেসটার তদারকি করছেন । দিনের বেলায় সানাইবাবু খুব সকালে আশ্রম থেকে বেরিয়ে নানান জায়গায় দরবার করেন, যদি কোনো কুহেলিদের উদ্ধারের খবর মেলে । যার জন্য সানাইবাবু খোঁজখবর নিতে শহর থেকে অনেক দূরে চলে এলেন । তারপর সামনে চায়ের দোকান দেখতে পেয়ে চায়ের দোকানে চা খেতে বসলেন । উদ্দেশ্য একটাই, যদি কোনো ক্লু মেলে । সেখানেও কয়েকজন খরিদ্দারের মধ্যে ফিসফিসানি, এলাকায় নারী পাচার চক্রের দুস্কৃতিদের ঘোরাঘুরি । কিন্তু ঐ ফিসফিসানি থেকে তাদের গতিবিধির কোনো খবর পেলেন না । সেখান থেকে সোজা নারানপুরে হাজির । নারানপুরে গিয়ে শুনলেন, বিদিশাদের বাড়িতে অনেক পুলিশ ! সরেজমিনে তদন্তে এসেছে । সেখানে গিয়ে জানতে পারলেন পুলিশ গুরুত্ব দিয়েছে দুবৃর্ত্তদের চেহারা কেমন, ঠিক কটার সময় তারা এসেছিল, তখন মেয়ে দুজন কী করছিল, তারা পালালো কোন্‌ পথে, ইত্যাদির উপর পুঙ্খানুপুঙ্খ জিজ্ঞাসা । বিদিশার মা পুলিশের সঙ্গে সবরকম সহযোগিতা করছেন । বিশেষ করে পুলিশ জানতে চাইছিল গাড়ির নম্বর । পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে ! নারী পাচারের এই গ্যাংটা যে প্রভাবশালী সেটা পুলিশের কর্মকর্তারা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন । সারা বিশ্ব জুড়ে এদের নেট ওয়ার্ক !
পুরো উত্তরবঙ্গ জুড়ে পুলিশের টহল ! সমস্ত শহরে রেড অ্যালার্ট । সমস্ত থানা, পুলিশ ফাঁড়ি, বর্ডার এলাকায় রেড এলার্ট জারি । পুলিশের তৎপরতা দেখে বোঝা যাচ্ছে, মেয়ে দুজনকে উদ্ধারের তাগিদে পুলিশের বিশাল কর্মযজ্ঞ ।
সানাইবাবু কোনোরকম সূত্র পেলেই সেখানে ছুটছেন । তাঁর চোখ,কান খোলা । মেয়েকে ঐভাবে কাঞ্চন নগরের বাড়িতে ফেলে এসে তিনি অনেক মনোকষ্টে ভুগেছেন । শ্যালিকার দুরভিসন্ধিমূলক চক্রান্ত ধরতে না পারার জন্য তাঁর আজ এই হাল । তবুও মেয়ের কাছে ছুটে যেতে পারেননি । একটাই কারণ, তিনি মেয়ের কাছে কীভাবে মুখ দেখাবেন । ভেবেছিলেন, পরের বাড়ি কাজকর্ম করে কিছু টাকা জমিয়ে মেয়ের কাছে ফিরে যাবেন । সেই ভাবনার মাঝখানে মেয়ে অপহৃত হয়ে তাঁর কাছাকাছি । এটা তাঁর স্বপ্নেরও অতীত । সেই মেয়ের সাথে দেখা হলো, কিন্তু বাপ-বেটির মিলন হলো না । এটা যে কী যন্ত্রণার সানাইবাবু ষোলোআনা টের পাচ্ছেন । সকলের অগোচরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদেন । মাঝখানে একবার শুধুমাত্র জানতে পেরেছিল, কুহেলি কাঞ্চন নগরের মোড়ে চায়ের দোকান দিয়েছে । সেই সময় তাঁর আনন্দোচ্ছাসের জীবন যাপন । বৌ-শ্যালিকার সাথে মধুর সম্পর্ক । সেই সময় সানাইবাবু ভেবেছিলেন, দোকান দেওয়ায় মেয়েটার বেঁচে থাকার একটা গতি হলো । মেয়ের ভাগ্যে অপহরণ রয়েছে সেটা সানাইবাবু ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি ।
ভোরবেলা । পরিষ্কার আকাশ । সূর্য উঠতে তখনও দেরী । ভোরের আলো চারিদিকে । হঠাৎ থানার পুলিশ কন্সটেবল খবর দিলো, পাচারকারীর দুর্বৃত্তরা ডুয়ার্স জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অজানা উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছে ।
যেই শোনা সেই প্রদীপ্ত ও জগন্নাথকে সঙ্গে নিয়ে সানাইবাবু প্রথমে লাটাগুড়িতে উপস্থিত । ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে গাড়িতে তিস্তা ব্যারেজের পাশ দিয়ে সোজা লাটাগুড়ি । তাঁদের ধারণা, লাটাগুড়ির জঙ্গলের পথ ধরতে পারে । সেখানেও নিরাশ ! লাটাগুড়িতে কোনোরকম হদিস না পেয়ে তারা ছুটলো, ডুয়ার্সের অভয়ারণ্যে । সেখানেই দেখা কোচবিহারের রতন কুণ্ডর । রতন কুণ্ড জঙ্গলমহলে ট্যুরিস্ট পার্টিদের ঘোরায় । যার জন্য জলপাইগুড়ির জঙ্গল তার নখদর্পণে । ষাট জনের ট্যুরিস্ট পার্টি নিয়ে ডুয়ার্সের সে জঙ্গল সাফারি করছে । সানাইবাবুকে দেখে রতন কুণ্ডু বলল, “দাদা কী ব্যাপার ? ডুয়ার্সে কী বেড়াতে এসেছেন ?“
না ভাই । ডুয়ার্সে বেড়াতে আসিনি । বেড়াবার আমার সামর্থ কোথায় ? ডুয়ার্সে এসেছি একটা কাজে ।
কাজটা কী ? জিজ্ঞাসা করলো রতন কুণ্ডু ।
তারপর রতনবাবু সানাইবাবুকে বলল, “চলুন দাদা । একটা চায়ের দোকানে বসা যাক ।“
দাদা, আমাদের চারটি চা । ভাঁড়ে দেবেন প্লীজ । রতন কুণ্ড চায়ের অর্ডার দিলো । তারপর জগন্নাথের দিকে তাকিয়ে বলল, সঙ্গের ভদ্রলোকদের আমি ঠিক চিনতে পারলাম না । কোচবিহার টাউনে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না ।
“প্রদীপ্ত ও তার পাশের জন, জগন্নাথ । দুজনেই আমার ছেলের চেয়ে বেশী !” আলাপ করিয়ে দিলেন সানাইবাবু ।
তারপর রতন কুণ্ডু সানাইবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা খুব বিপদের মধ্যে আছি । আমার মেয়েটাকে পাচারকারীরা ধরে নিয়ে গেছে । আমার মেয়ের সাথে আমাদের গ্রামের এলাকার আরও একটা মেয়ে আছে । সে আমার মেয়ের বান্ধবী । তারা কয়েক মাস যাবৎ নিখোঁজ । মাঝখানে মেয়ে দুটি দুর্দান্ত সাহস দেখিয়ে চক্রের হাত থেকে পালিয়ে প্রদীপ্তের আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছিল । কিন্তু আবার চক্রের কবলে তারা আবদ্ধ । আমাদের কাছে খবর আছে, তারা ডুয়ার্সের জঙ্গলে গা-ঢাকা দিয়ে আছে । সেইজন্য আমাদের ঘোরাঘুরি ! যদি মেয়ে দুটিকে উদ্ধারের কোনো হদিস মেলে ।
রতন কুণ্ডু সোজা হয়ে বসে বলল, আমি সেই খবর জানি । তারা জিপ গাড়িতে জঙ্গল সাফারির নাম করে দুটি মেয়েকে নিয়ে শিলিগুড়ির দিকে গেলো । তারা তো গরুমারার চা বাগানের মধ্যে দিয়ে গেছে । আমিই ট্যুরিস্ট পার্টিদের বললাম, নারী পাচারকারীরা গোপন পথে মেয়ে পাচার করছে ।
আপনি জানা সত্ত্বেও পুলিশে খবর দিলেন না কেন ?
চোখ-মুখ বুজে বিরক্ত সহকারে রতন কুণ্ডু বলল, “মাথা খারাপ ! এর আগে পুলিশে খবর দিয়ে আমার উচিত শিক্ষা হয়েছে । সেইদিন রাত থেকে আমার ছোট বোনটা নিখোঁজ ! পাচারকারীরা আমার ছোট বোনটাকে তুলে নিয়ে পালিয়েছে । রতন কুণ্ডুর চোখ ছলছল ! তারপর থেকে ঐসব কীর্তিকলাপ দেখেও আমি দেখি না । আজ পর্যন্ত আমার ছোট বোনটি ফিরে আসেনি । সে যে কোথায়, বেঁচে আছে না মরে গেছে তার হদিস নেই । তবে জীপের মধ্যে ঐ দুটো আপনার মেয়ে আমি নিশ্চিত ! আমার ধারণা, দুর্বৃত্তরা ওদের “বৌ সাজিয়ে” শিলিগুড়ির বাগডোগরা বিমান বন্দর দিয়ে বিদেশে চালান করে দেবে ।
রতনবাবুর কথা শোনার পর এক মুহুর্তও তারা দাঁড়ালো না । মোবাইলে থানায় ঘটনাটা জানিয়ে দিলো । থানা থেকে জগন্নাথের কথার গুরুত্ব দিচ্ছিলো না । সেই মুহুর্তে সানাইবাবু মোবাইলটা জগন্নাথের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলল, “আপনি ফোনটা থানার বড়বাবুকে দিন ।“
কে বলছেন ? থানার বড়বাবু জানতে চাইলেন ।
আমি অপহৃত দুটি মেয়ের মধ্যে কুহেলি নামে মেয়ের বাবা বলছি ।
বলুন, কী বলছেন ?
“আপনারা যেমন তাদের উদ্ধারের এবং গ্যাংটা ধরার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন, তেমনি আমি বাপ হয়ে হন্যে হয়ে মেয়ের খোঁজ করে যাচ্ছি । দায়িত্ব নিয়ে বলছি আর তা ছাড়া বিশ্বস্ত মাধ্যমে জানতে পেরেছি, জীপে করে পাচারকারীর দল মেয়ে দুটিকে “বৌ সাজিয়ে” শিলিগুড়ির বাগডোগরা বিমান বন্দরে নিয়ে যাচ্ছে । এতক্ষণ সম্ভবৎ পৌঁছে গেছে । আমার ধারণা, তারা এখন বিমান বন্দরে ফ্লাইট ধরার অপেক্ষায় । এই মুহুর্তে আপনারা ঝাঁপিয়ে পড়লে ঐ দুটি মেয়েকে উদ্ধার করা সম্ভব !” ফোন কেটে দিলেন সানাইবাবু ।
চারিদিকে পুলিশি তৎপরতা । যদিও সম্পূর্ণটা গোপনীয় অভিযান । শিলিগুড়ি থেকে বিশাল পুলিশ বাহিনী গোটা বিমান বন্দর ঘিরে ফেললো । ইতিমধ্যে দিল্লি ও কলকাতার ফ্লাইট ছাড়লো । সেখানে চিরুনী তল্লাশী চালিয়েও কোনো সন্দেহজনক কাউকে পাওয়া গেলো না । বাগডোগরা বিমান বন্দরে সিভিল ড্রেসে পুলিশ টহলরত । ফুড সেন্টারে একটা বোরখা পরা মহিলা ও দাড়িওয়ালা একজন ভদ্রলোক পির্জা খেতে ব্যস্ত । তাদের দেখে কিছুতেই সন্দেহ করার উপায় নেই । অথচ তাদের চালচলন, তাকানোর চাহনী, গতিবিধি সন্দেহজনক !
অন্যদিকে দুর্বৃত্তরা দুটো ভাগে ভাগ হয়ে তাদের অপারেশন চালাচ্ছে । দুটো ক্ষেত্রেই কুহেলি ও পুবালীকে বোরখা পরানো । পুলিশি তৎপরতা আন্দাজ করতে পেরে দুর্বৃত্তরা পুবালীকে নিয়ে এ্যায়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে কাছাকাছি কোথাও গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে । কিন্তু ভিতরে কুহেলিকে নিয়ে দাড়িওয়ালা ফুট কোর্টে সেভ জোন ভেবেছিল । কিন্তু সেখানে পুলিশের ঘোরাফেরা অহরহ ।
সানাইবাবু দুজনকে সঙ্গে নিয়ে টিকিট কেটে এ্যায়ারপোর্টে ঢুকলো । তারাও ঘুরেফিরে ফুটকোর্টে হাজির । কুহেলি বাবাকে দেখে চিনতে পেরেছে । বুদ্ধিমান মেয়ে কুহেলি । অল্প বয়সে অনেক অভিজ্ঞতা ! কুহেলি বুঝতে পারলো, বাবা এসে গেছে । সঙ্গে জগন্নাথ ও প্রদীপ্ত । কুহেলির ধারণা ফুট কোর্টে আরও দুস্কৃতিদের ঘোরাফেরা । তেমনি নিশ্চয় পুলিশেরও টহল । বাবার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কুহেলি অতিরিক্ত ঝুঁকি নিলো । কুহেলি চুপচাপ প্রমাদ গুণতে থাকলো, কীভাবে বাবাকে নজরে আনা যায় ।
কুহেলি পায়ের দিকের নীচের কাপড় তুলে দিলো যাতে বাবা অন্তত তার পা দেখার সুযোগ পান । বাগডোগরা বিমান বন্দর আকারে ছোট । সুতরাং যাত্রীদের ঘোরাফেরার জায়গা কম । সানাইবাবু হাঁটাহাঁটি করে ফুট কোর্টের পাশে পুনরায় এসে হাজির । তাঁর চোখ পড়লো কুহেলির ঠিক পায়ের দিকে । কুহেলির পায়ের পাতায় ছোটবেলা থেকে একটা ছোট্ট কাটা দাগ ! কুহেলির যখন নয় বছর বয়স, তখন সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে কাটার দাগ । কুহেলির পায়ের কাটা দাগ দেখে সানাইবাবু নিশ্চিত হলেন, এটা তাঁর মেয়ে ।
সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পায়ে সিভিল পুলিশের যিনি হেড তাঁর সঙ্গে দেখা করলেন । যদিও পেছনে দুজন মানুষ তাঁকে অনুসরণ করছিল । তাদের সানাইবাবু আর পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না । তাঁর মাথায় একটাই চিন্তা, মেয়েকে নিজের কোলে ফিরে পাওয়া ।
পুলিশ বিমান বন্দরের ফুড কোর্ট ঘিরে ফেললো ।
কুহেলি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভান করে ঠিক তার বাবার পায়ের উপর মাথাটা রেখে শুয়ে পড়লো । দাড়িওয়ালা করুণ সুরে জিজ্ঞাসা করলো, ‘ডার্লিং তোমার কী হলো ?’ তারপর ঝটাপট কুহেলিকে দাঁড় করিয়ে কুহেলির মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে সকলের উদ্দেশে বলল, “আপনারা সরে যান । নতুবা আমি মেয়েটাকে পিস্তলের গুলিতে মেরে দেবো ।“
সিভিল ড্রেসের পুলিশ চুপচাপ ! পাচারকারীর সাগরেদদের চারিদিকে ছোটাছুটি । দূরে মাইকিং হচ্ছে, বিমান বন্দরের সমস্ত মানুষ ভি-আই-পি লাউঞ্জে ঢুকে বসুন । আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করুন । এ্যায়ারপোর্ট পুরোটাই পুলিশে ঘেরা । খুব তাড়াতাড়ি আমরা আসল দুস্কৃতিদের ধরে ফেলব । আপনারা অযথা উতলা হবেন না । সকলেই সঠিক সময়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থানে পৌঁছে যাবেন ।“
পুলিশি অভিযান চলছে । দাড়িওয়ালা দুস্কৃতিটা কুহেলির মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ধীর পায়ে এক্সিট গেটের দিকে এগোচ্ছে । দাড়িওয়ালাকে সমানে ফলো করছে সানাইবাবু । সানাইবাবুর নিশানা দাড়িওয়ালাকে ঘায়েল করা । যেনতেন প্রকারে কুহেলিকে দাঁড়িওয়ালার হাত থেকে উদ্ধার করা । তাই ভুলে গেছেন, পুলিশ উদ্ধারের কাজটা অতি যত্নের সঙ্গে করছেন । ঠিক গেটের কাছাকাছি, অমনি সানাইবাবু শুয়ে পড়ে পা দিয়ে দাড়িওয়ালার পায়ে সজোরে লাথি । সেই মুহূর্তে দূর থেকে পিস্তলের গুলি । বোঝাই যাচ্ছে, গুলির নিশানা সানাইবাবু । কিন্তু গুলিটা সানাইবাবুর না লেগে দাড়িওয়ালার পায়ে লাগলো । দাড়িওয়ালা পুলিশের কব্জায় ধরা পড়লো ।
অন্যদিকে খবর পেয়ে পুবালীকে নিয়ে দুস্কৃতিরা উধাও ।
মোট পাঁচজন চাঁই ধরা পড়লো ।
কুহেলিকে নিয়ে প্রদীপ্ত পুলিশি সাহায্যে সোজা আশ্রমে । কুহেলিকে রাখা হলো পুলিশি নিয়ন্ত্রণে । আশ্রমে পুলিশ পিকেট বসলো । ছয়জন পুলিশ আশ্রমে রইল কুহেলিকে আগলানোর জন্য ।
পাঁচজনকে পুলিশি হেফাজতে জেরা করে জানতে পারলো, পুবালীকে নিয়ে তুলেছে শিলিগুড়ির উত্তর বঙ্গ হাসপাতালের লেবার রুমের বেডে ।
পুলিশ ছুটলো । উত্তর বঙ্গ হাসপাতাল পুলিশ ঘিরে ফেললো । হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের কাছে পুলিশ জানতে পারলো, “সন্তান সম্ভবা দেখিয়ে লেবার রুমে মোট আঠারো জন মেয়েকে তারা আটকে রেখেছে ।“
পুলিশ খতিয়ে দেখছে, মেয়েদের হাসপাতালের লেবার রুমে রাখার ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দুস্কৃতিদের কোনো দুরভিসন্ধিমূলক যোগসূত্র আছে কিনা ? কেননা লেবার পেইন না থাকা সত্ত্বেও, আঠারোটি মেয়েকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কী করে একটা ঘরে আটকে রাখে ?
চারিদিকে হৈ-চৈ । মিডিয়ায় সারাক্ষণ প্রচার, “নারী পাচার চক্রের চাঁইদের সাথে পুলিশের মুখোমুখি সংঘাত !” টিভিতে খবর দেখে সাধারণ মানুষদের হাসপাতালে ভিড় । জেলা প্রশাসনিক দপ্তর থেকে ঘনঘন ফোন । জেলার পুলিশ লাইন থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স । রাজ্য পুলিশের হেড কোয়ার্টার থেকে ঘটনার উপর তীক্ষ্ণ নজর । বিশাল পুলিশ বাহিনী চক্রটা ধরার জন্য মরিয়া ।
হাসপাতালের অন্যান্য রোগীরা যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে সেদিকে পুলিশ বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে ।
বাইরে মাইকে দুস্কৃতিদের উদ্দেশে ডি-আই-জি’র ঘোষণা, “আপনারা ধরা দিন । নতুবা পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হবে ।“
উপর থেকে নারী পাচার চক্রের কাছ থেকে কাগজে লেখা চিরকূট পুলিশের হাতে পড়লো । তাতে লেখা, “তাদের চক্রকে বিনা বাধায় নিশর্ত ছেড়ে দিতে হবে । নতুবা হাসপাতালের কোনো রোগী জ্যান্ত বাড়ি ফিরবে না ।“
সারা রাত্রি হাসপাতালের বাইরে পুলিশের টহল ! বাইরে রোগীদের আত্নীয় স্বজনদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা । আত্নীয় স্বজনদের ভয়ার্ত চাহনী । মিডিয়ার মানুষের ঘোরাঘুরি । প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের চোখ থেকে ঘুম উধাও ! সকলের চিন্তা, দুস্কৃতিদের কবল থেকে আঠারোটি মেয়েকে উদ্ধার । তার জন্য হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, কর্মীদের ও সর্বোপরি রোগীদের অক্ষত রাখা । কাজটা ভীষণ কঠিন !
স্পটে জেলা শাসক হাজির । তিনি যথেষ্ট উদ্বিগ্ন !
এমন সময় জগন্নাথ এগিয়ে গিয়ে ডি-আই-জি স্যারকে স্যালুট দিয়ে বলল, “স্যার ! আমাকে কয়েকজন প্রশিক্ষিত পুরুষ ও মহিলা ফোর্স দিন । আমরা ডাক্তার ও নার্স সেজে হাসপাতালে ঢুকে আটকে পড়া মেয়েদের উদ্ধারের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ব ।“
এর জন্য বিপদ কী হতে পারে, সে ব্যাপারে তোমার ধারণা আছে কী ?
এই মুহূর্তে বিপদের ভয়ে বসে থাকার চেয়ে উদ্ধারের অপারেশনে নামা, আমার মতে বুদ্ধিমানের কাজ ! আপনি সহায় থাকলে, আমরা কাজটাতে সফল হবোই স্যার ।
ঠিক আছে । তোমার পরিকল্পনা আমাকে ছক একে দেখাও ও বোঝাও ।
স্যালুট দিয়ে বলল, “ঠিক আছে স্যার ! এক্ষুণি দেখাচ্ছি স্যার ।“
উদ্ধারের পরিকল্পনার ছক দেখে ডি-আই-জি স্যার খুব খুশী ।
ফিল্ডে নেমে পড়লো জগন্নাথ । যদিও জগন্নাথের বাগদত্তা অনেক আগেই মুক্ত । তবুও ডিয়ার্টমেন্টের সম্মানের কথা ও আঠারোটি মেয়ের উদ্ধারের কথা ভেবে জগন্নাথ জীবনকে বাজি রেখে সরাসরি দুস্কৃতিদের সাথে সংঘাতের অপারেশনে নেমে পড়লো । গাঁয়ের ছেলে জগন্নাথ । খুব খেটে বড় হয়েছে । অনেক কষ্টে চাকরিটা পেয়েছে । শারীরিক তাকত যথেষ্ট । গাঁয়ের ছেলে হওয়ার সুবাদে ভয়ডর কম । তিনজন ডাক্তার সাজলো । আটজন মহিলা পুলিশ নার্স সাজলো । দুপুর দুটো থেকে শুরু হলো অপারেশন “আঠারো মুক্তি” ।
একজন মহিলা পুলিশ নার্সকে পাচারকারীর দুস্কৃতি তার হাত ধরে টেনে বারান্দায় নিয়ে এলো । বেঞ্চে বসে হুকুম দিলো, আমার পা টিপে দে । অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রয়েছি, তাই পায়ে যন্ত্রণা ।
বাবু, রোগীকে ইঞ্জেকশন দেওয়ার টাইম !
রোগী মরে যাক্‌ । আগে আমাকে সেবা করবি, তারপর রোগীর কাছে যাবি ।
পা টেপা শুরু করলো মহিলা পুলিশ নার্স । দুস্কৃতিটা ঘুমে ঢুলু, ঢুলু । রুমাল বের করে নাকের কাছে রাখলো সেই মহিলা পুলিশ । দুস্কৃতিটা একেবারেই ঘুমিয়ে পড়লো । সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলটা তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে শাড়ির আচলে লুকালো । অন্যদিকে জগন্নাথ লেবার রুমের দরজায় পৌঁছে গেছে । তিনটি মহিলা পুলিশ লেবার রুমে খুটি সাজিয়ে ফেলেছে । জানলা দিয়ে চারটি থালা নীচে ফেলে দিয়ে দুস্কৃতিদের দৃষ্টি সেইদিকে ঘুরিয়ে দিলো । গেটে দণ্ডায়মান দুস্কৃতিটাকে জগন্নাথ ঘাড়ে আঘাত করা মাত্র সে নীচে লুটিয়ে পড়লো । সেই মহিলা পুলিশ নার্স পিস্তল উঁচিয়ে শুন্যে এক রাউণ্ড গুলি চালিয়ে তিনজন পাচার চক্রের দুস্কৃতির উদ্দেশে আওয়াজ দিলো, “ঘর থেকে বেরিয়ে যা । নতুবা তোরা তিনটি এখানেই শেষ ।“
ততক্ষণে মাটিতে পড়ে যাওয়া থালাকে লক্ষ করে খানিকক্ষণ চলল গুলির আওয়াজ ! তারপর দুস্কৃতিরা যখন বুঝলো থালার আওয়াজটা ফাঁকা আওয়াজ, তখন তারা নিজেদের জায়গায় ফিরে যেতে ছুটলো । তখন জগন্নাথ বুঝতে পারলো, পাচারকারী দুস্কৃতিদের সংখ্যা খুব কম ।
জানালা দিয়ে শক্ত দড়ি নীচে ফেলে দিলো । সেই দড়ি বেয়ে আটকরত মেয়েগুলি নীচে নামতে শুরু করলো । ঐ ফাঁকে বিশাল পুলিশ বাহিনী হৈ-হৈ করে হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে পড়লো । অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশের হাতে মোট এগারোজন দুস্কৃতি খুব সহজে ধরা পড়লো । অন্যদিকে আঠারজন মেয়েকে উদ্ধার করা সম্ভব হলো ।
পরে জানা গেলো, নারী পাচারের একটা বড় চক্র পুলিশের জালে করায়ত্ব ।
ভরতপুর থানা থেকে একশ জন ঢাকী ঢাক বাজাতে বাজাতে কুহেলি ও পুবালীকে নিয়ে কাঞ্চন নগরের মোড়ে পৌঁছালো । মিছিলের সামনে ছিল সানাইবাবু । কানাই খবর পেয়ে কুহেলিকে কাঁধে নিয়ে তাঁর কী নৃত্য ! তাঁর চোখে আনন্দাশ্রু ! পুবালীর ভাবী শ্বশুর এগিয়ে এসে পুবালিকে আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমার জন্যেই আমার ছেলে ঘরে ফিরলো । আমাকে তুমি ক্ষমা করো মা । তারপর তাঁর কী কান্না !” জগন্নাথকে ডি-আই-জি স্বয়ং নিজের গাড়িতে নিয়ে কাঞ্চন নগর মোড়ে হাজির । তারপর ডি-আই-জি স্যারের আওয়াজ, “রেস্টুরেন্টের মালিক কে ?”
কুহেলি কাচুমাচু হয়ে ডি-আই-জি স্যারের সামনে দাঁড়ালো ।
তারপর কুহেলির দিকে তাকিয়ে ডি-আই-জি সাহেব বললেন, “এক কাপ চা প্লীজ ?”
উপস্থিত সকলের মুখে প্রচণ্ড উচ্ছ্বাসের হাসি । প্রশান্তির হাসি !
———-০————

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *