পেপে চাষের পদ্ধতি।

পেপে চাষের পদ্ধতি

(Papaya Cultivation Guide in Bengali)

 

ভূমিকা

পেপে (Carica papaya) একটি জনপ্রিয় ও পুষ্টিকর ফল। এটি দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলিতে উৎপত্তি হলেও বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল সহ বিশ্বের বহু দেশে এর চাষ হয়ে থাকে। পেপে একটি দ্রুত বৃদ্ধিশীল গাছ, অল্প সময়ে ফল দেয় এবং সারা বছর ধরেই ফল পাওয়া যায়।

চিকিৎসা গুণেও পেপে বিখ্যাত। এতে রয়েছে ভিটামিন A, C, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও ‘প্যাপেইন’ নামক একধরনের এনজাইম, যা হজমে সহায়তা করে। এ কারণে আজকাল বাণিজ্যিকভাবে পেপে চাষের চাহিদা বাড়ছে।

মাটির ধরন ও জলবায়ু

✅ আবহাওয়া:

গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া পেপে চাষের জন্য উপযুক্ত।

২৫°C থেকে ৩৫°C তাপমাত্রা ও ১৫০০–২০০০ মি.মি. বৃষ্টিপাত বিশিষ্ট এলাকা পেপে চাষে অনুকূল।

শীত বেশি হলে গাছ মারা যেতে পারে।

✅ মাটি:

দোআঁশ, বেলে-দোআঁশ ও অর্গানিক পদার্থ সমৃদ্ধ মাটি পেপে চাষের জন্য উত্তম।

মাটির pH মান ৫.৫ – ৭.০ এর মধ্যে হলে ভালো হয়।

পানি জমে না এমন উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে।

 

জাত নির্বাচন

পেপের কিছু জনপ্রিয় জাত হলো:

রাঁচি – বেশি চাষ হয়, ফল মাঝারি, মিষ্টি।

পুসা ডোয়ার্ফ – খাটো গাছ, তাড়াতাড়ি ফল দেয়।

রেড লেডি (Taiwan 786) – হাইব্রিড জাত, রোগ প্রতিরোধী ও অধিক ফলনশীল।

CO-2, CO-5, CO-7 – দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত জাত।

 

বীজ সংগ্রহ ও চারা তৈরি

1. বীজ সংগ্রহ:
পরিপক্ব পাকা ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। বীজ পরিষ্কার করে ১-২ দিন ছায়ায় শুকিয়ে নিতে হবে।

2. চারা তৈরি পদ্ধতি:

পলিথিন ব্যাগ বা নার্সারিতে বীজ বপন করুন।

২–৩ সপ্তাহে চারা গজাবে।

৪০–৫০ দিন পর রোপণের উপযুক্ত হবে।

প্রতি ব্যাগে ১–২টি করে চারা রাখা ভালো।

 

 

জমি প্রস্তুতি ও সার প্রয়োগ

✅ জমি তৈরির ধাপ:

জমিকে প্রথমে ২–৩ বার চাষ দিয়ে আগাছা ও গাছের শিকড় পরিষ্কার করতে হবে।

২ মিটার দূরত্বে ৪৫x৪৫x৪৫ সেমি আকারে গর্ত করতে হবে।

✅ গর্তে মিশিয়ে দেওয়া সারের পরিমাণ (প্রতি গর্তে):

পচা গোবর / ভার্মি কম্পোস্ট – ১০–১২ কেজি

সুপার ফসফেট – ২৫০ গ্রাম

মিউরেট অব পটাশ – ২০০ গ্রাম

ইউরিয়া – ১৫০ গ্রাম

নিমখোল / ট্রাইকোডার্মা – ৫০ গ্রাম

কিছু ছাই / চুন প্রয়োগ করা যেতে পারে।

 

রোপণ পদ্ধতি

বর্ষার শুরুতেই (জুন–জুলাই) রোপণ করলে ভালো হয়।

প্রতিটি গর্তে একটি করে সুস্থ চারা রোপণ করুন।

রোপণের সময় চারা সোজা রাখতে হবে ও গর্ত ভালোভাবে মাটি দিয়ে পূরণ করতে হবে।

চারা রোপণের পরে জল দিয়ে গাছ বসিয়ে দিতে হবে।

 

সেচ ও আগাছা নিয়ন্ত্রণ

✅ সেচ:

প্রথম দিকে সপ্তাহে ২ বার সেচ দিতে হবে।

পরে মাটি শুষ্ক হলে সেচ দিন।

বর্ষায় অতিরিক্ত জল জমা হলে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

✅ আগাছা:

আগাছা গাছের পুষ্টি শোষণ করে, তাই প্রতি মাসে ১ বার আগাছা পরিষ্কার করা জরুরি।

 

রোগ ও পোকা নিয়ন্ত্রণ

রোগ / পোকা লক্ষণ প্রতিকার

পাউডারি মিলডিউ পাতায় সাদা ছাপ সালফার স্প্রে
মোজাইক ভাইরাস পাতায় দাগ, গাছ বেঁকে যাওয়া রোগাক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা
মেলিডোজিন নেমাটোড শিকড় পচে যাওয়া জমিতে নিম তেল প্রয়োগ
ফল পোকা ফলের ভিতরে পোকা ঢুকে যায় জৈব কীটনাশক, ফাঁদ ব্যবহার

 

ফলন ও ফসল সংগ্রহ

 

রোপণের ৬–৮ মাস পর গাছে ফুল ও ফল ধরতে শুরু করে।

৯–১০ মাসের মধ্যে প্রথম ফল সংগ্রহ করা যায়।

একটি গাছ থেকে বছরে গড়ে ৪০–১০০টি ফল পাওয়া যায়।

ফল পরিপক্ব হলে হালকা হলুদ রঙ হয়। তখনই সংগ্রহ করতে হয়।

 

বাজারজাতকরণ

পাকা পেপে স্থানীয় হাটে, শহরের ফলের বাজারে কিংবা আড়তে বিক্রি করা যায়। হাইব্রিড জাত যেমন রেড লেডি-এর চাহিদা বেশি এবং বেশি দামে বিক্রি হয়। যদি সঠিকভাবে বাজারজাত করা যায় তবে কৃষকেরা লাভবান হতে পারেন।

আর্থিক দিক

১ বিঘা জমিতে ৪০০–৫০০টি গাছ বসানো যায়। খরচ হয় প্রায় ₹২০,০০০–₹৩০,০০০ টাকা এবং বছরে ফল বিক্রি করে প্রায় ₹৮০,০০০–₹১,৫০,০০০ পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।

উপকারিতা ও ব্যবহার

কাঁচা পেপে দিয়ে তরকারি ও পেপেইন এনজাইম তৈরি হয়।

পাকা পেপে খেতে মিষ্টি ও হজমে সহায়ক।

স্কিন কেয়ার, হজমী ট্যাবলেট, ক্যান্সার প্রতিরোধক ঔষধ তৈরিতেও পেপে ব্যবহার হয়।

 

উপসংহার

পেপে চাষ একটি লাভজনক ও টেকসই কৃষি উদ্যোগ। অল্প খরচে বেশি লাভ এবং অল্প সময়ে ফলন পাওয়া যায় বলে কৃষকেরা দিন দিন এর দিকে ঝুঁকছেন। সঠিক জাত নির্বাচন, যত্নসহকারে চাষ ও সময়মতো রোগ নিয়ন্ত্রণ করলে পেপে চাষ থেকে ভালো আয় করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *