
ভারতের রাজস্থান রাজ্যের রাজধানী জয়পুর, যাকে ভালোবেসে ডাকা হয় “পিঙ্ক সিটি”, ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। রাজকীয় ইতিহাস, দুর্গ-প্রাসাদ, ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, উজ্জ্বল বাজার ও রাজস্থানি খাবারের স্বাদ – সবকিছু মিলিয়ে জয়পুর ভ্রমণ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
ইতিহাস ও পরিচিতি
জয়পুর শহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহারাজা সাওয়াই জয়সিং দ্বিতীয় ১৭২৭ সালে। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি শহর গড়তে, যা হবে পরিকল্পিত, সুশৃঙ্খল এবং প্রতিরক্ষার দিক থেকে নিরাপদ। তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল – জয়পুর ভারতের প্রথম পরিকল্পিত শহর হিসেবে খ্যাত। শহরের সব রাস্তা গ্রিড প্যাটার্নে তৈরি, যা আর্কিটেকচারের এক অনন্য উদাহরণ।
গোলাপি শহরের সৌন্দর্য
জয়পুরের প্রতিটি বাড়ি ও বাজার গোলাপি রঙে রাঙানো, তাই এর নাম “পিঙ্ক সিটি”। সূর্যাস্তের সময় এই শহর যেন একেবারে গোলাপি আভায় ঝলমল করে ওঠে।
দর্শনীয় স্থান
১️⃣ আম্বের ফোর্ট
জয়পুরের সবচেয়ে জনপ্রিয় আকর্ষণগুলোর মধ্যে একটি হল আম্বের ফোর্ট। পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গ রাজপুত স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ। শীশ মহল (Mirror Palace), দেওয়ান-ই-আম এবং দেওয়ান-ই-খাস এখানে পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণ। হাতি চড়ে দুর্গে ওঠা ভ্রমণের রোমাঞ্চকে দ্বিগুণ করে দেয়।
২️⃣ সিটি প্যালেস
শহরের ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত সিটি প্যালেস এখনও রাজ পরিবারের বাসস্থান। এখানে রয়েছে মহারাজা সাওয়াই মান সিং মিউজিয়াম, যেখানে রাজপরিবারের অস্ত্র, রাজকীয় পোশাক ও শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়।
৩️⃣ হাওয়া মহল
পাঁচতলা হাওয়া মহল বা প্যালেস অফ উইন্ডস হল জয়পুরের আইকনিক স্থাপত্য। এর ৯৫৩টি ছোট জানালা দিয়ে হাওয়া চলাচল করে, যা প্রাসাদকে রাখে শীতল। পুরনো সময়ে রাজকন্যারা এখান থেকে রাজপথের অনুষ্ঠান দেখতেন।
৪️⃣ জান্তার মন্তর
জ্যোতির্বিদ্যা ও সময় পরিমাপের জন্য তৈরি বিশাল যন্ত্রগুলোর সমাহার হল জান্তার মন্তর। এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত।
৫️⃣ জয়গড় ও নাহারগড় ফোর্ট
জয়গড় দুর্গে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কামান জয়বাণ। আর নাহারগড় ফোর্ট থেকে পুরো শহরের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়, বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময়।
️ জয়পুরের বাজার
জয়পুরের বাজারগুলো রঙিন এবং প্রাণবন্ত। জহরী বাজার, ত্রিপোলিয়া বাজার ও বাপু বাজার থেকে কিনতে পারেন রাজস্থানি গয়না, হস্তশিল্প, ব্লক প্রিন্টেড কাপড়, মুজরিস এবং নীলপটারি।
জয়পুরের খাবার
জয়পুর ভ্রমণে রাজস্থানি খাবারের স্বাদ অবশ্যই নিতে হবে। দাল-বাটি-চুরমা, লাল মাংস, গট্টে কি সবজি, কচৌরি এবং ঘেভর এখানে বিশেষ জনপ্রিয়। রাস্তার ধারের মিষ্টির দোকানগুলো আপনাকে রাজস্থানি আতিথেয়তার অনুভূতি দেবে।
থাকার ব্যবস্থা
জয়পুরে রয়েছে রাজকীয় হেরিটেজ হোটেল, রিসোর্ট এবং আধুনিক স্টার হোটেল। যারা রাজকীয় অভিজ্ঞতা পেতে চান তারা রামবাগ প্যালেস বা সামোদ হাভেলি-তে থাকতে পারেন।
কীভাবে পৌঁছাবেন
- ✈️ বিমান পথে: জয়পুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ভারতের বড় বড় শহরের সঙ্গে যুক্ত।
- রেল পথে: জয়পুর জংশন থেকে দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা সহ ভারতের নানা শহরে সরাসরি ট্রেন রয়েছে।
- সড়ক পথে: দিল্লি থেকে NH48 ধরে প্রায় ৫ ঘণ্টার ড্রাইভ।
উপসংহার
জয়পুর শুধুমাত্র একটি শহর নয়, এটি রাজস্থানের ইতিহাস, শিল্পকলা এবং সংস্কৃতির এক জীবন্ত জাদুঘর। দুর্গ-প্রাসাদ ঘোরা, বাজারের রঙিন কোলাহল, রাজস্থানি সঙ্গীত ও নৃত্যের স্বাদ, আর পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত দেখা – সব মিলিয়ে জয়পুর ভ্রমণ প্রতিটি পর্যটকের জন্য এক রাজকীয় স্মৃতি হয়ে থাকে।












Leave a Reply