রাজস্থানের চিত্তোরগড় – সাহস, বীরত্ব ও গৌরবের নগরী।।

রাজস্থানের ইতিহাসে যদি সাহস, আত্মত্যাগ আর বীরত্বের প্রতীক খুঁজতে হয়, তবে তার নাম হবে চিত্তোরগড়। মেওয়ার রাজ্যের এই প্রাচীন রাজধানী আজও তার দুর্গপ্রাচীর, প্রাসাদ, মন্দির আর যুদ্ধক্ষেত্রের নিদর্শনে অতীতের কাহিনী শোনায়। চিত্তোরগড় শুধু একটি শহর নয়, এটি রাজপুত সাহসিকতার এক জীবন্ত স্মারক।


চিত্তোরগড় দুর্গ – ইতিহাসের সাক্ষী

চিত্তোরগড়ের প্রাণ হলো তার বিশাল দুর্গ – চিত্তোরগড় ফোর্ট

  • এটি ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্গ, প্রায় ৭০০ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
  • ৭ম শতকে মোর্য রাজবংশের রাজা চিত্রাংগদ মর্য এই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন।
  • দুর্গটি ১৩৪টি প্রাচীন স্থাপত্য, প্রাসাদ, জলাধার, এবং অসংখ্য মন্দিরের সমষ্টি।

দুর্গের প্রধান আকর্ষণ

1️⃣ বিজয় স্তম্ভ (Vijay Stambh) – রানা কুম্ভা ১৪৪৮ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ খিলজির বিরুদ্ধে বিজয়ের স্মৃতিতে নির্মাণ করেন। ৯ তলা বিশিষ্ট এই স্তম্ভ রাতের আলোয় ঝলমল করে ওঠে।
2️⃣ কীর্তি স্তম্ভ (Kirti Stambh) – জৈন তীর্থঙ্কর আদিনাথের উদ্দেশ্যে নির্মিত, এটি জৈন শিল্পকলার অনন্য নিদর্শন।
3️⃣ পদ্মিনী মহল (Padmini Palace) – রানি পদ্মিনীর স্মৃতিবিজড়িত প্রাসাদ, যা রানা রতন সিং-এর সময়ের। এখানেই আলাউদ্দিন খিলজি পদ্মিনীর প্রতিচ্ছবি আয়নায় দেখেছিলেন।
4️⃣ রানা কুম্ভা প্যালেস – সাহসী রানি পদ্মিনী ও অন্যান্য রাজপুত নারীদের জহর (জোহর) দেওয়ার করুণ ইতিহাসের সাক্ষী।


⚔️ বীরত্বের কাহিনী

চিত্তোরগড় তিনবার আক্রমণের শিকার হয়েছিল – আলাউদ্দিন খিলজি (১৩০৩), বাহাদুর শাহ (১৫৩৫), আকবর (১৫৬৮)। প্রতিবারই রাজপুতরা অসম সাহস নিয়ে যুদ্ধ করেছে এবং রাজপুত নারীরা জহর দিয়ে নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করেছেন।
এই কাহিনীগুলো আজও চিত্তোরগড়কে বীরত্বের প্রতীক করে তুলেছে।


মন্দিরসমূহ

চিত্তোরগড় দুর্গের ভিতরে বহু প্রাচীন মন্দির রয়েছে –

  • কালিকা মাতা মন্দির
  • মীরাবাই মন্দির – ভক্ত মীরাবাই শ্রীকৃষ্ণ ভজন করতেন এখানে।
  • শ্রীরামচন্দ্র মন্দির
    এই মন্দিরগুলি দুর্গকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্যে ভরিয়ে তুলেছে।

দর্শনীয় স্থান

  • গোমুখ কুণ্ড – একটি পবিত্র জলাধার, যেখান থেকে অবিরাম জলপ্রবাহ হয়।
  • ফতেহ প্রাকাশ প্যালেস – এখানে চিত্তোরগড়ের ইতিহাস নিয়ে একটি জাদুঘর রয়েছে।
  • জলাশয় ও স্টেপওয়েল – দুর্গের ভেতরে প্রায় ৮৪টি প্রাচীন জলাধার ও কুণ্ড রয়েছে।

খাবার ও সংস্কৃতি

চিত্তোরগড়ে রাজস্থানি খাবারের আসল স্বাদ পাবেন।

  • দাল-बाटি-চুরমা
  • গট্টে কি সবজি
  • কচৌরি আর মালপুয়া
    শহরে প্রতি বছর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবও অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রাজস্থানি লোকসংগীত, নৃত্য ও হস্তশিল্পের প্রদর্শনী হয়।

কীভাবে পৌঁছাবেন

  • ✈️ বিমানপথে: নিকটবর্তী বিমানবন্দর উদয়পুর (প্রায় ৯০ কিমি দূরে)।
  • রেলপথে: চিত্তোরগড় রেলওয়ে স্টেশন সরাসরি দিল্লি, জয়পুর, উদয়পুরের সঙ্গে যুক্ত।
  • সড়কপথে: জাতীয় সড়ক ধরে বাস ও গাড়িতে সহজে পৌঁছানো যায়।

️ উপসংহার

চিত্তোরগড় হলো রাজপুতদের বীরত্ব, আত্মত্যাগ এবং সম্মানের এক মহাকাব্য। এর দুর্গে দাঁড়িয়ে আপনি শুধু স্থাপত্য দেখবেন না, অনুভব করবেন সেই অতীত যুগের ধ্বনি – যুদ্ধের ডঙ্কা, বীরদের গৌরব আর নারীদের অগ্নি-অর্ঘ্য। রাজস্থানের ইতিহাস জানতে চাইলে চিত্তোরগড় একবার অবশ্যই ঘুরে আসা উচিত।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *