
ভারতের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মানচিত্রে গয়া (Gaya) এক অনন্য নাম। এটি এমন এক শহর যেখানে ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস ও প্রকৃতি একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে। পবিত্র ফল্গু নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রাচীন শহরটি হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন — তিন ধর্মেরই অন্যতম তীর্থস্থান। আমার গয়া ভ্রমণ যেন এক আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, যা শুধু চোখে দেখা নয়, মনে গেঁথে যাওয়া এক শান্তির যাত্রা।
গয়ার প্রাচীন ইতিহাস ও তাৎপর্য
গয়ার ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’-এর যুগ থেকে এই ভূমি পুণ্যক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। কথিত আছে, ভগবান রাম এখানে এসে তাঁর পিতা দশরথের পিন্ডদান করেছিলেন। সেই থেকেই গয়া আজও হিন্দুদের শ্রাদ্ধ-পিণ্ডদানের অন্যতম পবিত্র স্থান। আবার এই গয়াতেই বোধগয়ায় ভগবান গৌতম বুদ্ধ লাভ করেছিলেন বোধি বৃক্ষের তলে চরম জ্ঞান — যা মানবজাতির ইতিহাসে এক মহৎ মুহূর্ত।
বোধগয়া – আলোকের ভূমি
গয়া শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বোধগয়া (Bodh Gaya), যা আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য স্থল। এখানে দাঁড়িয়ে আছে মহিমান্বিত মহাবোধি মন্দির, যার শান্ত সৌন্দর্য চোখে জল এনে দেয়। মন্দিরের পেছনেই রয়েছে সেই বোধিবৃক্ষ, যার নিচে বসে সিদ্ধার্থ গৌতম হয়েছিলেন “বুদ্ধ”।
এই স্থানে এসে এক অদ্ভুত নীরবতা অনুভব হয় — যেন প্রকৃতি নিজেই ধ্যানমগ্ন। ভিক্ষুদের প্রার্থনার ঘণ্টাধ্বনি, ধূপের গন্ধ, ও বিদেশি ভক্তদের শ্রদ্ধাভরা দৃষ্টি – সব মিলিয়ে মনে হয়, মানবজাতির সমস্ত বিভেদ এখানে এসে মিলেমিশে যায়।
বিষ্ণুপদ মন্দির – হিন্দুদের মুক্তিক্ষেত্র
গয়ার বিষ্ণুপদ মন্দির হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম পবিত্র স্থান। বিশ্বাস করা হয়, এখানে ভগবান বিষ্ণুর পায়ের ছাপ রয়েছে, যা ‘গয়াসুর’ নামে এক অসুরকে দমন করার সময় সৃষ্টি হয়েছিল। মন্দিরটি ফল্গু নদীর তীরে অবস্থিত, আর প্রতিদিন এখানে হাজার হাজার ভক্ত পিণ্ডদান করতে আসেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্য।
আমিও সেখানে গিয়েছিলাম ভোরের দিকে — ঘন্টাধ্বনি, আরতিতে ধূপের গন্ধ আর পুরোহিতদের স্তোত্রে এক অদ্ভুত পবিত্র অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশে।
ফল্গু নদী ও পিণ্ডদানের আচার
গয়া ভ্রমণের মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফল্গু নদীর ঘাটে পিণ্ডদান। কথিত আছে, এই নদীর জলে সীতা দেবী নিজ হাতে দশরথের পিণ্ডদান করেছিলেন। আজও শ্রাদ্ধ-পাক্ষে অসংখ্য মানুষ গয়া এসে তাঁদের পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তিল, গঙ্গাজল ও ধানমিশ্রিত পিণ্ড অর্পণ করেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলেও এই আচারটি মানবিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার এক গভীর প্রকাশ।
️ অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
- জাপানিজ পিস প্যাগোডা (Peace Pagoda): ধ্যান ও নীরবতার এক অপূর্ব স্থান, যেখানে সাদা বৌদ্ধ স্তূপ শান্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
- সুজাতা কুটির: এখানেই এক দয়ালু নারী সুজাতা, সিদ্ধার্থকে দুধ-ভাত খাইয়ে তাঁর শারীরিক শক্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
- বৌদ্ধ মঠসমূহ: থাইল্যান্ড, ভুটান, চীন, মায়ানমার, জাপান – প্রায় প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব মঠ রয়েছে এখানে, প্রতিটিই স্থাপত্যে ও আধ্যাত্মিকতায় অনন্য।
যাত্রাপথ ও ভ্রমণ অভিজ্ঞতা
আমি পাটনা থেকে ট্রেনে গয়া পৌঁছেছিলাম — প্রায় ৩ ঘণ্টার পথ। গয়া জংশন থেকেই সহজে ট্যাক্সি বা অটো করে পৌঁছানো যায় বোধগয়া বা বিষ্ণুপদ মন্দিরে। থাকার জন্য আছে বহু ধর্মশালা, হোটেল ও গেস্টহাউস। স্থানীয় মানুষজন অত্যন্ত সহৃদয় ও অতিথিপরায়ণ। গয়ার স্থানীয় বাজারে পেতাম বুদ্ধমূর্তি, কাঠের কাজ, পাথরের হাতের কারুকাজ ও নানা ধর্মীয় জিনিস।
আত্মার শান্তির ভূমি
গয়া এমন এক স্থান, যেখানে গিয়ে মনে হয় — পৃথিবীর সব ব্যস্ততা, লোভ আর অহংকার যেন গলে যায়। গয়া শুধু একটি শহর নয়, এটি এক অনুভূতি; এটি মানবজাতির আত্ম-অন্বেষণের কেন্দ্র। এখানে ইতিহাস, ধর্ম ও মানবতার এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে।
️ উপসংহার
বিহারের গয়া হল এক অনন্ত শান্তির তীর্থ। বিষ্ণুপদ মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, বোধিবৃক্ষের নীরবতা, ফল্গু নদীর পবিত্র জল – সব মিলিয়ে গয়া এমন এক স্থান, যা একবার দেখা মানেই জীবনের এক পবিত্র স্মৃতি অর্জন করা।
যারা আত্মার শান্তি ও ভক্তির মিলনস্থল খুঁজছেন, তাঁদের জীবনে একবার হলেও গয়া ভ্রমণ অবশ্যই করা উচিত।












Leave a Reply