শ্যামানন্দ ও রসিকানন্দের কালজয়ী ইতিহাস (পর্ব-১) : রাধাবিনোদিনী বিন্তি বণিক।

যেমন গুরু, তাঁর তেমন শিষ্য। গুরু শ্রীশ্যামানন্দ ঠাকুর এবং শিষ্য রসিকানন্দের কথা বলা হচ্ছে। শ্যামানন্দ প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রসম বা পুত্রাধিক ভালবাসেন, স্নেহ করেন, বাৎসল্য করেন রসিকানন্দকে ; যেন চোখে হারান তিনি তাঁকে । আর রসিকানন্দও গুরু-অন্ত-প্রাণ। শ্রীগুরু শ্যামানন্দ ঠাকুরের প্রতি যে তাঁর কি প্রচণ্ড টান, কতখানি শ্রদ্ধা এবং কতটা আজ্ঞানিষ্ঠ তিনি শ্যামানন্দের তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। একটা ঘটনা জানলে কিছুটা অন্তত বোঝা যাবে যে রসিকানন্দ কতখানি গুরুনিষ্ঠ ভক্তোত্তম ছিলেন।

শ্যামানন্দ ঠাকুর এসেছেন বলরামপুরে। তিনি পত্রী পাঠিয়ে রসিকানন্দকে চলে আসতে বললেন সেখানে। আদেশ করে পাঠালেন এই বলে যে, রসিকানন্দ যেন যত শীঘ্র পারে তাঁর কাছে হাজির হন। যখন পত্রী এসে দাঁড়ালো তখন মহাপ্রসাদ পেতে বসেছেন রসিকানন্দ। তিনি সবে মাত্র এক গ্রাস মুখে দিয়ে দ্বিতীয় গ্রাস হস্তে নিয়েছেন মুখে তুলবেন বলে। এমন সময় পত্রী সংবাদ দিলেন যে, যত শীঘ্র সম্ভব রসিকানন্দকে হাজির হতে বলেছেন প্রভু শ্যামানন্দ । সেই মুহূর্তেই রসিকানন্দ পাত ছেড়ে উঠে দ্বিতীয় গ্রাস হস্তে নিয়েই ঠিক যে অবস্থায় ছিলেন সেই অবস্থাতেই রওনা হয়ে গেলেন বলরামপুরের উদ্দেশ্যে। গুরু আজ্ঞা পালন করতে ধেয়ে চলতে লাগলেন। পথে সুবর্ণরেখা নদীর জল দেখে মনে পড়ল হস্ত ধৌত করতে হবে যে ! তিনি নদীর জলে হাত ধুয়ে আচমন করে সেই ভাবেই বিভোর হয়ে ছুটছেন , গুরুদেব বলেছেন যে যত শীঘ্র সম্ভব হাজির হতে! চলতে চলতে দিন শেষ হয়ে অন্ধকার নেমে আসলো। সম্মুখে বনপথ। বনে হস্তী, ব্যাঘ্র, ভল্লুক, গণ্ডারের উপস্থিতি। দিনের বেলাতেও কেউ সেখানে পশুর ভয়ে যায় না। প্রাণ হারানোর ভয়ঙ্কর আশঙ্কা । রসিকেন্দ্রের সেসবে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। নির্ভয়ে, প্রেমমনে তিনি চলে চলেছেন। তাতে আবার আকাশে মেঘ, মন্দ-মন্দ বৃষ্টি ঝরছে। এমন ঘন আঁধার বনপথ যে নিজেকে পর্যন্ত নিজে দেখা যাচ্ছে না ঠিক করে । কিন্তু, আনন্দিত অন্তরে, ‘হরেকৃষ্ণ’ নাম নিতে নিতে রসিকানন্দ একাকী হাঁটছেন। একটু পরেই শ্রীগুরুদেবের সঙ্গে বহুবাঞ্ছিত মিলন হবে তাঁর, আবার, গুরু আজ্ঞা পালন করতে চলেছেন তিনি—– এইসব আনন্দময় ভাবনায় মন তাঁর ময়ূরের মত পেখম মেলে নৃত্য করছে যেন তখন সেই মেঘের গর্জন ভরা রাত্রে।

শ্যামানন্দের কাছে পৌঁছালেন রসিকানন্দ। তিনি শ্রীগুরুদেব শ্যামানন্দকে দেখেই তাঁর পদতলে পড়লেন। শ্যামানন্দ সস্মিত বদনে তুলে নিয়ে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন প্রিয় শিষ্যকে। তবে মনে মনে একটু অবাক হলেন। তারপর নিজের কাছে বসিয়ে জিজ্ঞাসা করিলেন, “এত দ্রুত তুমি কীভাবে এলে, রসিক?”

রসিকানন্দ মস্তক হেঁট করে অনুগত বাধ্য বালকের মত হয়ে রয়েছেন । তুষ্ট হলেন শ্যামানন্দ শিষ‍্যের ভাব দেখে। গুরু আজ্ঞা পালনে রসিকেন্দ্রের নিষ্ঠা দেখে তিনি বাস্তবিক মুগ্ধ হয়েছেন মনে মনে। পরে পত্রবাহক যখন ফিরে এলেন, তখন তিনি জানালেন যে কেমন ভাবে আজ্ঞা শ্রবণ মাত্র রসিকানন্দ মহাপ্রসাদ হস্তে নিয়েই হাঁটা লাগিয়েছিলেন। বস্তুত, রসিকানন্দকে পরীক্ষা করতে, তাঁর গুণের মহিমা জগৎবাসীকে জানাতেই শ্যামানন্দ অমন রঙ্গ করেছিলেন।

এহেন রসিকানন্দকে একদিন শ্যামানন্দ বললেন, বাছা, তুমি কৃষ্ণ কথা শুনিও সকলকে আজ । তোমার মুখে কৃষ্ণামৃত বর্ষিত হোক।…….( ক্রমশ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *