
ভারতের আধ্যাত্মিক ভ্রমণপথে “দেওঘর” নামটি এক অনন্য শ্রদ্ধাস্থান। এখানে অবস্থিত বাবা বৈদ্যনাথ ধাম জ্যোতির্লিঙ্গ, যা দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম। হিন্দুধর্মে এই তীর্থক্ষেত্রকে বলা হয় “মনোকামনা পূর্ণ করার স্থান” — যেখানে ভক্তরা বিশ্বাস করেন, আন্তরিক প্রার্থনা করলে প্রভু শিব নিজ হাতে তাদের সকল ইচ্ছা পূর্ণ করেন। প্রকৃতি, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধনই দেওঘরকে করে তুলেছে এক অনন্য ভ্রমণ গন্তব্য।
️ দেওঘরের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব
দেওঘর শব্দের অর্থই হলো “দেবতার ঘর”। কথিত আছে, ত্রেতা যুগে রাবণ যখন শিবের অমরত্ব লাভের জন্য কাশী থেকে কৈলাসে যাওয়ার পথে শিবলিঙ্গ বহন করছিলেন, তখন তিনি এই ভূমিতেই সেই লিঙ্গ স্থাপন করেন। তখনই এই স্থানটি হয়ে ওঠে বৈদ্যনাথধাম।
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, বৈদ্যনাথ শিব “বৈদ্য” অর্থাৎ চিকিৎসক রূপে পরিণত হয়েছিলেন—যিনি ভক্তদের মানসিক ও শারীরিক কষ্ট দূর করেন।
বাবা বৈদ্যনাথ ধাম মন্দির
এই মন্দিরটি দেওঘরের প্রাণকেন্দ্র। মূল মন্দিরে শিবলিঙ্গটি কালো পাথরে নির্মিত এবং অত্যন্ত প্রাচীন। মন্দির কমপ্লেক্সে মোট ২২টি উপ-মন্দির রয়েছে, যার মধ্যে মা পার্বতীর মন্দির, গণেশ, কালভৈরব ও হনুমান মন্দির বিশেষভাবে পূজিত।
শ্রাবণ মাসে (জুলাই-আগস্ট) এখানে লক্ষাধিক ভক্ত কাঁভার যাত্রা করে জল নিয়ে আসে দূরবর্তী সুলতানগঞ্জ থেকে, প্রায় ১০৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে এসে শিবলিঙ্গে জলাঞ্জলি দেয়। এই মহাযাত্রা শুধু ধর্ম নয়, ভক্তির এক মহাসাগর।
দেওঘরের দর্শনীয় স্থানসমূহ
১️⃣ বাবা বৈদ্যনাথ ধাম মন্দির কমপ্লেক্স
প্রধান আকর্ষণ অবশ্যই এই জ্যোতির্লিঙ্গ। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ঘণ্টা-ঘণ্টা পূজার ধ্বনি ও ধূপের গন্ধে মন্দির চত্বর আধ্যাত্মিক পরিবেশে ভরে থাকে।
২️⃣ ত্রিকূট পাহাড় (Trikut Parvat)
দেওঘর শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পাহাড় তিনটি চূড়া নিয়ে গঠিত। কথিত আছে, এখানেই ত্রেতা যুগে রাবণ তপস্যা করেছিলেন। পাহাড়ে রোপওয়ে করে ওঠা যায়, এবং উপরে থেকে গঙ্গার শাখা মায়ূরাক্ষী নদীর দৃশ্য মনোমুগ্ধকর।
৩️⃣ নন্দন পাহাড় (Nandan Pahar)
একটি ছোট কিন্তু সুন্দর পাহাড়, যেখানে শিব, পার্বতী ও গণেশের মন্দির রয়েছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে দেওঘর শহরের দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য দেখা যায়। এখানে একটি শিশু বিনোদন পার্কও আছে, যা পরিবার-সহ ভ্রমণের জন্য আদর্শ।
৪️⃣ রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম
শান্তিপূর্ণ পরিবেশে গড়ে ওঠা এই আশ্রম ভক্ত ও সাধকদের জন্য এক শান্তির নীড়। এখানে প্রতিদিন প্রার্থনা, ধ্যান ও সমাজসেবার নানা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
৫️⃣ তপোবন ও বৈরাগিনাথ ধাম
দেওঘর শহরের বাইরে অবস্থিত তপোবনকে শ্রী রামচন্দ্রের তপস্যাস্থল বলা হয়। গুহার ভিতরে ছোট একটি শিবলিঙ্গ রয়েছে, যা অত্যন্ত প্রাচীন বলে মনে করা হয়।
দেওঘরে পৌঁছানোর উপায়
দেওঘর এখন সহজেই পৌঁছানো যায় —
- রেলপথে: দেওঘর জংশন (Deoghar Junction) ভারতের প্রধান শহরগুলির সঙ্গে যুক্ত।
- বিমানপথে: দেওঘর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (Baba Baidyanath Airport) সম্প্রতি চালু হয়েছে, যেখানে কলকাতা, দিল্লি ও পাটনা থেকে সরাসরি ফ্লাইট রয়েছে।
- সড়কপথে: ঝাড়খণ্ডের দোমকা, জামতাড়া, গিরিডিহ ও ভাগলপুরের সঙ্গে দেওঘরের সড়ক যোগাযোগ চমৎকার।
আবাসন ও খাবার
দেওঘরে পর্যটন দপ্তরের লজ, ধর্মশালা, ও আধুনিক হোটেল—সবই পাওয়া যায়। ভক্তদের জন্য বৈদ্যনাথধাম ধর্মশালা অত্যন্ত জনপ্রিয়।
খাবারের মধ্যে খিচুড়ি, পুরি-সবজি, ছানার মিষ্টি, লাড্ডু ও ঠান্ডাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
️ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত দেওঘর ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক সময়। তবে ভক্তিমূলক আবহ উপভোগ করতে চাইলে শ্রাবণ মাসের “শ্রাবণ মেলা”-র সময়ে যাওয়া এক অনন্য অভিজ্ঞতা — যদিও তখন প্রচুর ভিড় থাকে।
শেষ কথা
দেওঘর শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি ভক্তির সঙ্গে প্রকৃতির মিলনের এক প্রতীক। এখানে পাহাড়, নদী, বনের নিস্তব্ধতা ও ঘণ্টাধ্বনিতে মিশে আছে প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক শক্তি।
বাবা বৈদ্যনাথের ধ্যানে মগ্ন এই শহরে পৌঁছালে মনে হয়—
“ভক্তি যদি হৃদয়ে থাকে, তবে ঈশ্বরও আমাদের স্পর্শ করতে আসেন।”












Leave a Reply