ঝাড়খণ্ডের পারসনাথ পাহাড় – আধ্যাত্মিকতা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।

ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলায় অবস্থিত পারসনাথ পাহাড় (Parasnath Hill) ভারতের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান এবং প্রকৃতির এক অনন্য রত্ন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৪৭৯ ফুট উঁচু এই পাহাড়কে স্থানীয়ভাবে “শিখরজি” নামেও ডাকা হয়। এটি জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি পবিত্র, কারণ এখানে ২৪ জন তীর্থঙ্করের মধ্যে ২০ জন নির্বাণ লাভ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।


পাহাড়ের ধর্মীয় গুরুত্ব

পারসনাথ পাহাড় জৈন ধর্মের জন্য এক মহান তীর্থক্ষেত্র। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছালে অসংখ্য জৈন মন্দির চোখে পড়ে, যার প্রতিটিতে আছে ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া। এই মন্দিরসমূহের মধ্যে “গৌতমস্বামী মন্দির” এবং “চন্দ্রপ্রভ তীর্থঙ্কর মন্দির” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এই পাহাড়েই পার্শ্বনাথ তীর্থঙ্কর (২৩তম তীর্থঙ্কর) মোক্ষ লাভ করেছিলেন। তাই প্রতিবছর হাজার হাজার জৈন ধর্মাবলম্বী দেশ-বিদেশ থেকে এখানে তীর্থযাত্রায় আসেন।


প্রকৃতির রূপ ও সৌন্দর্য

পারসনাথ পাহাড় কেবল ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, বরং প্রকৃতি প্রেমীদের জন্যও স্বর্গ। পাহাড় ঘেরা বনাঞ্চলে রয়েছে নানা প্রজাতির বৃক্ষ, পশু-পাখি এবং বিরল প্রজাপতি। সকালবেলা মেঘে ঢাকা পাহাড়ের দৃশ্য যেন এক স্বপ্নের রাজ্য। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত পথ জুড়ে প্রকৃতি তার রঙ, ঘ্রাণ আর শব্দে এক সুরেলা আবহ তৈরি করে।


ট্রেকিং ও অভিযানের রোমাঞ্চ

পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছানোর জন্য প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রেকিং পথ রয়েছে। পথটি যদিও কিছুটা কষ্টকর, তবে প্রতিটি বাঁকেই মেলে নতুন দৃশ্য, নতুন অনুভূতি। যাত্রাপথে দেখা যায় অজস্র ছোট-বড় মন্দির ও ধ্যানস্থান। পর্যটক ও তীর্থযাত্রী উভয়েই এই পথ পেরিয়ে শীর্ষে পৌঁছে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করেন।


নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান

  • মাধুবন: পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এক মনোরম গ্রাম, যেখানে জৈন আশ্রম, ধ্যানকেন্দ্র ও অতিথিশালা রয়েছে।
  • গিরিডি শহর: পারসনাথ পাহাড় থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যেখানে ভ্রমণকারীদের জন্য হোটেল, রেস্টুরেন্ট এবং পরিবহন ব্যবস্থা সহজলভ্য।
  • তরুণা নদী: পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত এই নদী স্থানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

ভ্রমণের উপযুক্ত সময়

পারসনাথ পাহাড় ভ্রমণের সেরা সময় হলো অক্টোবর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত। এই সময়ে আবহাওয়া মনোরম, আকাশ পরিষ্কার, এবং ট্রেকিং-এর জন্য উপযুক্ত। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেড়ে যায়, আর বর্ষায় রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে পড়ে।


যাতায়াত ব্যবস্থা

  • রেলপথে: গিরিডি রেলস্টেশন পারসনাথের নিকটতম বড় স্টেশন।
  • সড়কপথে: রাঁচি, ধানবাদ, বা হজরিবাগ থেকে নিয়মিত বাস ও ট্যাক্সি পরিষেবা রয়েছে।
  • পাহাড়ে ওঠা: মাধুবন থেকে হাঁটা বা পালকি করে চূড়ায় ওঠা যায়।

উপসংহার

পারসনাথ পাহাড় এমন এক স্থান, যেখানে ধর্ম, প্রকৃতি ও শান্তি একসঙ্গে মিশে গেছে। এই পাহাড় শুধু জৈন ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান নয়, বরং প্রতিটি মানুষের আত্মার প্রশান্তি খোঁজার এক চমৎকার জায়গা। পাহাড়ের নীরবতা, ঠান্ডা হাওয়া, আর আকাশছোঁয়া মন্দিরচূড়া আপনাকে এনে দেবে এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা—যা মনে থাকবে সারাজীবন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *