
দক্ষিণ ভারতের কর্নাটক রাজ্যের উত্তরে অবস্থিত বিজয়পুরা (Bijapur) হলো এক ঐতিহাসিক শহর, যেখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি গম্বুজ, প্রতিটি পথ বয়ে আনে সমৃদ্ধ ইসলামী স্থাপত্য, রাজকীয় ইতিহাস এবং অসাধারণ শিল্পের ছোঁয়া। প্রাচীনকালে এই শহরের নাম ছিল বিজয়নগর বা বিজয়পুর, যা পরবর্তীতে বিজয়পুরা নামে পরিচিত হয়। আজ এটি দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসপ্রেমী ও স্থাপত্যরসিকদের জন্য এক অপরিহার্য ভ্রমণ গন্তব্য।
️ ইতিহাসের পাতা থেকে
বিজয়পুরার ইতিহাস শুরু হয় ১১শ শতাব্দীতে, যখন এটি চালুক্য রাজবংশের অধীনে ছিল। পরে এটি বাহমনি সুলতানাতের শাসনাধীনে আসে, আর ১৪৯০ সালে আদিল শাহি রাজবংশ এই শহরকে তাদের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
আদিল শাহিরা শুধু শাসকই ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন শিল্প, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের মহান পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের সময়েই বিজয়পুরা হয়ে ওঠে “দক্ষিণ ভারতের ইসলামি শিল্পের রাজধানী”। আজও শহরের আকাশে সেই গম্বুজ ও মিনারের ছায়া ইতিহাসের মহিমা ছড়িয়ে রাখে।
গোল গুম্বজ — বিজয়পুরার হৃদয়
বিজয়পুরার পরিচয় বলতে যা বোঝায়, সেটি হলো গোল গুম্বজ (Gol Gumbaz)।
এই বিশাল সমাধিটি আদিল শাহি রাজবংশের সপ্তম শাসক মোহম্মদ আদিল শাহ-এর সমাধি।
- এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম্বুজযুক্ত স্থাপত্য, যার ব্যাস প্রায় ৪৪ মিটার।
- এর ভিতরে রয়েছে এক অনন্য “Whispering Gallery”, যেখানে একপ্রান্তে ফিসফিস করলে সেটি পুরো গম্বুজে প্রতিধ্বনি তোলে।
- গোল গুম্বজের স্থাপত্যে ইসলামি, পারসিক ও ভারতীয় শৈলীর এক অনবদ্য সংমিশ্রণ দেখা যায়।
সূর্যাস্তের সময় গম্বুজের ছায়া যখন লালচে আকাশে মিশে যায়, তখন তার দৃশ্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর।
ইব্রাহিম রওজা — স্থাপত্যের এক সুরেলা সৃষ্টি
“দক্ষিণ ভারতের তাজমহল” নামে পরিচিত ইব্রাহিম রওজা (Ibrahim Rauza) বিজয়পুরার আরেকটি রত্ন।
এটি নির্মাণ করেছিলেন ইব্রাহিম আদিল শাহ II, যিনি শিল্প ও সংগীতের অনুরাগী ছিলেন।
এই সমাধি ও মসজিদের যুগল স্থাপত্য একেবারে নিখুঁত সমমিতি (symmetry)-র উদাহরণ।
সবুজ বাগানের মাঝখানে স্থাপিত এই সৌধে সূক্ষ্ম খোদাই, পাথরের নকশা এবং খিলানের সৌন্দর্য সত্যিই বিমোহিত করে।
অন্যান্য দর্শনীয় স্থান
বিজয়পুরার প্রতিটি কোণেই ইতিহাসের ছাপ রয়ে গেছে —
- বারা কামান (Bara Kaman): অসমাপ্ত হলেও এটি একটি স্থাপত্যকীর্তি। ১২টি বিশাল পাথরের খিলান একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে তৈরি করেছে বিস্ময়কর দৃশ্য।
- আসার মহল (Asar Mahal): আদালতের কাজের জন্য নির্মিত এই ভবনটি বিজয়পুরার অন্যতম মনোরম স্থাপনা। এখানে নবী মোহম্মদের চুল সংরক্ষিত আছে বলে কথিত।
- জামা মসজিদ: কর্নাটকের বৃহত্তম মসজিদ, যা আদিল শাহ প্রথম নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদের ভিতরে খচিত কুরআনের আয়াত ও সুন্দর মিনার পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
- মালিক-এ-মাইদান: এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কামান, যার ওজন প্রায় ৫৫ টন! বলা হয়, কামান দাগলে এটি বজ্রধ্বনির মতো শব্দ তুলত।
প্রকৃতি ও পরিবেশ
যদিও বিজয়পুরা একটি ঐতিহাসিক শহর, এর চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও কম নয়। শুষ্ক কিন্তু শান্ত আবহাওয়া, প্রাচীন স্থাপত্যের ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা বোগেনভেলিয়া ফুল, আর গোধূলি লগ্নে গম্বুজে পড়া রোদ—এই সবকিছু মিলে শহরটিকে এক প্রাকৃতিক চিত্রে পরিণত করে।
ভ্রমণ অভিজ্ঞতা
যে কেউ প্রথমবার বিজয়পুরা গেলে তার মনে হবে, সময় যেন এখানে থেমে গেছে।
গোল গুম্বজের গম্বুজের নীচে দাঁড়িয়ে নিজের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি শোনা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
ইব্রাহিম রওজার সবুজ বাগানে বসে মনে হয়, স্থাপত্যও কখনও সঙ্গীতের মতো মধুর হতে পারে।
রাতের আলোয় শহরের গম্বুজগুলি যেন ইতিহাসের চাঁদ হয়ে জ্বলজ্বল করে।
ভ্রমণ নির্দেশিকা
- কীভাবে পৌঁছাবেন:
বেঙ্গালুরু থেকে বিজয়পুরার দূরত্ব প্রায় ৫৩০ কিমি। ট্রেন বা বাসে সহজে যাওয়া যায়। নিকটতম বিমানবন্দর কালাবুরগি (Kalaburagi), সেখান থেকে প্রায় ১৬০ কিমি দূরত্ব। - থাকার ব্যবস্থা:
শহরে নানা বাজেটের হোটেল ও পর্যটন লজ রয়েছে। গোল গুম্বজের আশেপাশে ভালো মানের থাকার ব্যবস্থা সহজেই পাওয়া যায়। - সেরা সময়:
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি — শীতকালে আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং ভ্রমণ উপভোগ্য হয়।
উপসংহার
বিজয়পুরা শুধু একটি শহর নয়, এটি দক্ষিণ ভারতের স্থাপত্য, শিল্প, সংগীত ও ইতিহাসের এক জীবন্ত গ্রন্থ।
যেখানে পাথরের দেয়ালে লেখা আছে রাজাদের গৌরব, গম্বুজে প্রতিধ্বনিত হয় অতীতের সুর, আর বাতাসে ভেসে আসে সংস্কৃতির মিষ্টি গন্ধ।
যে ভ্রমণকারীরা ইতিহাস ভালোবাসেন, স্থাপত্যে সৌন্দর্য খোঁজেন, বা কেবল নীরবতা ও অতীতের স্পর্শে কিছুক্ষণের প্রশান্তি চান — তাঁদের জন্য বিজয়পুরা এক অনন্য অভিজ্ঞতার স্থান।
এই শহরে ভ্রমণ মানে, সময়ের নদী পেরিয়ে এক গৌরবময় যুগে ফিরে যাওয়া। ✨












Leave a Reply