
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের দক্ষিণতম প্রান্তে, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত এক অপূর্ব দ্বীপনগরী — রামেশ্বরম। এই স্থান কেবল ভ্রমণপ্রেমীদের নয়, ভক্তি ও আধ্যাত্মিকতার অনুরাগীদের কাছেও এক অমলিন তীর্থক্ষেত্র। পুরাণে বলা হয়, এখানেই ভগবান শ্রী রামচন্দ্র লঙ্কা জয়ের আগে শিবলিঙ্গ স্থাপন করে পূজা করেছিলেন। তাই রামেশ্বরমকে বলা হয় চারধামের অন্যতম এক পবিত্র স্থান।
রামেশ্বরমের ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক গুরুত্ব
‘রামেশ্বরম’ নামটির অর্থই হলো “রামের ঈশ্বর”, অর্থাৎ যেখানে শ্রী রাম ভগবান শিবকে পূজা করেছিলেন।
রামায়ণ অনুযায়ী, লঙ্কায় রাবণবধের আগে ভগবান রাম এই স্থানেই শিবের আরাধনা করেন নিজের পাপক্ষালনের জন্য। ভগবান রামের নির্দেশে হনুমান কৈলাস থেকে শিবলিঙ্গ এনে এখানে প্রতিষ্ঠা করেন — সেটিই আজকের বিখ্যাত রামনাথস্বামী মন্দির।
এই ঐশ্বরিক কাহিনি রামেশ্বরমকে ভারতের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। হিন্দু ধর্মমতে, একবার কাশী দর্শনের পর রামেশ্বরম দর্শন করলে তীর্থযাত্রা সম্পূর্ণ হয়।
রামনাথস্বামী মন্দির — স্থাপত্যের এক বিস্ময়
রামেশ্বরমের প্রাণকেন্দ্র হলো রামনাথস্বামী মন্দির, যা দ্রাবিড় স্থাপত্যশৈলীর এক অসাধারণ নিদর্শন। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের টাওয়ার (গোপুরম) প্রায় ৫০ মিটার উঁচু, আর ভেতরের লম্বা করিডরটি বিশ্বের দীর্ঘতম মন্দির করিডরগুলির মধ্যে একটি — প্রায় ১,২০০ মিটার।
প্রতিটি স্তম্ভে সূক্ষ্ম খোদাই, পৌরাণিক দৃশ্য ও দেবমূর্তি যেন প্রাচীন শিল্পকলার মহিমা বর্ণনা করে।
মন্দিরের ভিতরে রয়েছে ২২টি তীর্থকূপ (পবিত্র কূপ), যেগুলির জলে স্নান করাকে অত্যন্ত পুণ্যকর বলা হয়। প্রতিটি কূপের জল স্বাদ ও গুণে আলাদা, যা এক অপূর্ব রহস্যের আভাস দেয়।
ধনুষ্কোটি — “ভারতের শেষ প্রান্ত”
রামেশ্বরম থেকে মাত্র ১৮ কিমি দূরে অবস্থিত ধনুষ্কোটি এক অনন্য স্থান। পুরাণ অনুযায়ী, এখান থেকেই ভগবান রাম তাঁর ধনুষের অগ্রভাগ দিয়ে সমুদ্রের ওপর রামসেতু (আদমস ব্রিজ) নির্মাণের সূচনা করেছিলেন, যাতে বানরসেনা লঙ্কায় পৌঁছাতে পারে।
আজ ধনুষ্কোটি এক “ঘোস্ট টাউন”, কারণ ১৯৬৪ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে পুরো শহর ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু সমুদ্রের নীল জল, বালুকাবেলা, আর দিগন্তবিস্তৃত আকাশ মিলিয়ে এই জায়গাটি ভ্রমণকারীদের কাছে এক স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা দেয়।
কীভাবে পৌঁছাবেন
- রেলপথে: রামেশ্বরমে নিজস্ব রেলস্টেশন রয়েছে, যা চেন্নাই, মাদুরাই, ত্রিচি প্রভৃতি শহরের সঙ্গে সংযুক্ত।
- সড়কপথে: মাদুরাই থেকে প্রায় ১৭০ কিমি দূরত্ব। নিয়মিত বাস ও ক্যাব পরিষেবা পাওয়া যায়।
- বিমানপথে: নিকটতম বিমানবন্দর মাদুরাই (প্রায় ১৭৪ কিমি)। সেখান থেকে সড়কপথে রামেশ্বরম যাওয়া যায়।
পামবান সেতু — প্রকৌশলের বিস্ময়
রামেশ্বরমের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডকে যুক্ত করেছে বিখ্যাত পামবান ব্রিজ, যা ভারতের প্রথম সমুদ্র-সেতু। ১৯১৪ সালে নির্মিত এই সেতুটি রেল ও সড়ক উভয় পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। সমুদ্রের উপর দিয়ে ট্রেন চলার সময় যে দৃশ্য দেখা যায়, তা একেবারে অবিশ্বাস্য সুন্দর— নীল জল, ঢেউ, আর দূরে দিগন্ত ছোঁয়া আকাশ যেন এক জীবন্ত চিত্রকল্প।
রামেশ্বরমে ঘোরার আরও স্থান
রামেশ্বরম কেবল মন্দিরনগরী নয়; এখানে রয়েছে আরও অনেক দর্শনীয় স্থান—
- অগ্নিতীর্থ: মন্দিরের কাছেই অবস্থিত সমুদ্রতীর, যেখানে ভক্তরা পবিত্র স্নান করেন।
- হনুমান মন্দির: যেখানে রামায়ণের বিভিন্ন ঘটনার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।
- কোথান্ডরমার মন্দির: সমুদ্রের ধারে প্রাচীন এক মন্দির, যেখানে বিভীষণ রামের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
উপসংহার
রামেশ্বরম এমন এক স্থান, যেখানে সমুদ্রের গর্জন, শঙ্খধ্বনি, পূজার ঘণ্টা ও ইতিহাসের নিঃশব্দ ছোঁয়া একসঙ্গে মিশে যায়। এখানে আসলে কেবল ভ্রমণ হয় না— হয় আত্মার শুদ্ধিকরণ।
দক্ষিণ ভারতের এই পবিত্র দ্বীপে সূর্যাস্তের সময় সমুদ্রের নীল জলে যখন সোনালি আলো ঝিলমিল করে, তখন মনে হয়— রামেশ্বরম শুধু এক শহর নয়, এটি যেন এক অন্তর্জাগরণের তীর্থ।












Leave a Reply