
পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি ছোট্ট গ্রাম—চাঁদপুর। গ্রামটির চারদিকে ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, ছোট ছোট পুকুর আর আমবাগান। শহরের মতো বিদ্যুতের ঝলমলে আলো এখানে ছিল না। রাত নামলেই চারদিক অন্ধকারে ঢেকে যেত। কিন্তু বর্ষাকালের শেষে একটি দৃশ্য পুরো গ্রামকে অন্যরকম করে তুলত।
হাজার হাজার জোনাকি একসঙ্গে জ্বলে উঠত।
মনে হতো, যেন আকাশের সব তারারা নেমে এসেছে মাটিতে।
গ্রামের মানুষ বলত,
— “যাদের মন পরিষ্কার, তারাই জোনাকির সত্যিকারের আলো দেখতে পায়।”
সেই গ্রামেই থাকত অভ্র। দশ বছরের এক কৌতূহলী ছেলে। পড়াশোনায় ভালো, কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল রাতে জোনাকি ধরা। যদিও তার ঠাকুমা বারবার বলতেন,
— “জোনাকিকে কখনও বন্দি করবি না। ওরা আলো নিয়ে জন্মায়, অন্ধকার দূর করার জন্য।”
অভ্র হেসে উড়িয়ে দিত।
একদিন স্কুলে নতুন শিক্ষক এলেন—অরিন্দম স্যার। তিনি প্রথম দিনেই ছাত্রদের বললেন,
— “বই শুধু পরীক্ষায় পাশ করায় না, মানুষকেও বড় করে।”
অভ্র স্যারের কথা খুব মন দিয়ে শুনল।
কিছুদিন পর স্যার ঘোষণা করলেন, গ্রামের শিশুদের নিয়ে একটি রাতের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ শিবির হবে। সবাই জোনাকি, পাখি আর গাছপালা সম্পর্কে জানবে।
সেদিন রাতে ছাত্রছাত্রীরা মাঠে জড়ো হলো।
অরিন্দম স্যার একটি জোনাকি হাতে নিয়ে বললেন,
— “জানো, জোনাকির আলো নিজের জন্য নয়। সে অন্যদের পথ দেখানোর জন্য আলো জ্বালায়।”
অভ্র বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “তাহলে আমরা মানুষ কি জোনাকির মতো হতে পারি?”
স্যার মৃদু হেসে বললেন,
— “অবশ্যই। একজন মানুষের জ্ঞান, ভালোবাসা আর সততা হলো তার নিজের আলো।”
সেই রাতের কথা অভ্রের মনে গভীর ছাপ ফেলল।
কয়েকদিন পর গ্রামের ওপর ভয়াবহ ঝড় এল।
বজ্রপাতের পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। চারদিকে অন্ধকার।
ঠিক সেই সময় গ্রামের এক বৃদ্ধ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
ডাক্তারকে খবর দিতে হবে।
কিন্তু কাঁচা রাস্তা, অন্ধকার আর ঝড়ে কেউ বেরোতে সাহস পাচ্ছিল না।
অভ্র বলল,
— “আমি যাব।”
মা বাধা দিলেন।
— “এত রাতে?”
অভ্র বলল,
— “যদি আমরা না যাই, কাকু বাঁচবেন কীভাবে?”
সে হাতে একটি লণ্ঠন নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
কিছুদূর যাওয়ার পর বাতাসে লণ্ঠনের আলো নিভে গেল।
চারদিকে ঘোর অন্ধকার।
হঠাৎ সে দেখল—
রাস্তার দুপাশে হাজার হাজার জোনাকি জ্বলে উঠেছে।
তাদের আলোয় পথটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
অভ্র যেন নতুন সাহস পেল।
সে দৌড়ে পাশের গ্রামের চিকিৎসককে নিয়ে এল।
সময়মতো চিকিৎসা হওয়ায় বৃদ্ধ মানুষটির প্রাণ বাঁচল।
পরদিন গ্রামে সবাই অভ্রের সাহসের প্রশংসা করল।
ঠাকুমা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
— “দেখলি? জোনাকির আলো কখনও বৃথা যায় না।”
বছর কেটে গেল।
অভ্র বড় হয়ে পরিবেশবিজ্ঞানী হলো।
সে গবেষণা শুরু করল কেন দিন দিন জোনাকির সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
সে বুঝতে পারল, অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক, বনভূমি ধ্বংস এবং আলোকদূষণের কারণে জোনাকিরা হারিয়ে যাচ্ছে।
অভ্র নিজের গ্রামে ফিরে এসে “জোনাকি বাঁচাও অভিযান” শুরু করল।
গ্রামের মানুষ রাসায়নিকের ব্যবহার কমাল।
বাঁশঝাড়, ঝোপঝাড় আর জলাভূমি সংরক্ষণ করা হলো।
স্কুলে শিশুদের নিয়ে প্রকৃতি শিক্ষার ক্লাস শুরু হলো।
দুই বছর পর বর্ষার এক রাতে আবার চাঁদপুরের মাঠে হাজার হাজার জোনাকি ফিরে এল।
সেদিন গ্রামের সবাই আনন্দে হাততালি দিল।
অরিন্দম স্যার, যিনি তখন অবসর নিয়েছেন, অভ্রকে দেখে বললেন,
— “তুমি শুধু জোনাকিদেরই ফিরিয়ে আনোনি, মানুষের মনেও আলো ফিরিয়ে এনেছ।”
অভ্র আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— “আলো কখনও হারিয়ে যায় না স্যার। আমরা শুধু অনেক সময় তাকে দেখতে ভুলে যাই।”
সেই থেকে প্রতি বছর বর্ষার শেষে চাঁদপুরে “জোনাকি উৎসব” পালিত হয়।
সন্ধ্যা নামলে গ্রামের সব বৈদ্যুতিক আলো এক ঘণ্টার জন্য নিভিয়ে দেওয়া হয়।
তারপর শিশুরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখে—
অন্ধকারের বুক চিরে হাজার হাজার ছোট্ট আলো জ্বলে উঠছে।
আর গ্রামের প্রবেশপথে একটি ফলকে লেখা আছে—
“নিজে আলো হয়ে জ্বলো, তবেই অন্যের পথ আলোকিত হবে।”
সমাপ্ত ✨
জোনাকির আলো।












Leave a Reply