শেষ চিঠি।।।


বীরভূম জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম—সোনাঝুরি। গ্রামটি যেমন শান্ত, তেমনি মানুষের মনও ছিল সহজ-সরল। এই গ্রামেরই একজন ডাকপিয়ন ছিলেন গণেশ মণ্ডল। টানা পঁয়ত্রিশ বছর ধরে তিনি সাইকেলে চেপে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন।
একসময় যখন মোবাইল ফোন ছিল না, তখন মানুষের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা, চাকরির খবর, পরীক্ষার ফল—সবই পৌঁছাত তাঁর হাত ধরে।
গণেশবাবু শুধু চিঠি দিতেন না; তিনি অনেক নিরক্ষর মানুষের হয়ে চিঠি পড়েও শোনাতেন। কারও চোখে আনন্দের জল, কারও চোখে অপেক্ষার অশ্রু—সবকিছুরই নীরব সাক্ষী ছিলেন তিনি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ এলো। ধীরে ধীরে চিঠির সংখ্যা কমে গেল। ডাকঘরেও আর আগের মতো ভিড় থাকত না।
একদিন পোস্টমাস্টার বললেন,
— “গণেশদা, আগামী মাসে আপনি অবসর নেবেন।”
গণেশবাবু শুধু মৃদু হেসে বললেন,
— “সময় তো একদিন থামবেই।”
কিন্তু তাঁর মনটা অদ্ভুতভাবে খালি হয়ে গেল।
অবসরের এক সপ্তাহ আগে ডাকঘরে একটি পুরোনো খাম এসে পৌঁছাল।
খামের ওপরে লেখা—
প্রাপক: সরলা দেবী, সোনাঝুরি গ্রাম।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, চিঠির ডাকমোহর ছিল ১৯৯৮ সালের।
ডাকঘরের সবাই অবাক।
এত বছর পরে একটি চিঠি কীভাবে এলো?
পোস্টমাস্টার বললেন,
— “গণেশদা, এই চিঠিটা আপনিই পৌঁছে দিন। হয়তো এটাই আপনার শেষ ডেলিভারি।”
সরলা দেবীর বাড়িতে পৌঁছে গণেশবাবু দেখলেন, তিনি এখন আশির কাছাকাছি বয়সের এক বৃদ্ধা।
গণেশবাবু বললেন,
— “আপনার নামে একটি চিঠি এসেছে।”
বৃদ্ধা বিস্ময়ে বললেন,
— “আমার নামে? এখন আর কে চিঠি লিখবে?”
কাঁপা হাতে খাম খুলতেই তাঁর চোখ ভিজে উঠল।
চিঠিটি লিখেছিলেন তাঁর স্বামী অমরেশ, যিনি সীমান্তে কর্মরত অবস্থায় নিখোঁজ হয়েছিলেন।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“সরলা, যদি কখনও এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছায়, জেনে রেখো, আমি তোমাকে শেষ দিন পর্যন্ত ভালোবেসেছি। যদি আমি আর ফিরতে না পারি, তবে আমার অপেক্ষায় জীবন নষ্ট কোরো না। হাসিমুখে বেঁচে থেকো।”
সরলা দেবী আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
পঞ্চাশ বছরের জমে থাকা কান্না যেন এক মুহূর্তে বেরিয়ে এল।
পরদিন পুরো গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ল।
সবাই সরলা দেবীর বাড়িতে এল।
গণেশবাবু চুপচাপ উঠোনে বসে ছিলেন।
সরলা দেবী তাঁর পাশে এসে বললেন,
— “এই চিঠি পঞ্চাশ বছর আগে পেলে হয়তো আমার জীবন অন্যরকম হতো।”
গণেশবাবু উত্তর দিলেন,
— “হয়তো। কিন্তু ভালোবাসার কথা কখনও পুরোনো হয় না।”
অবসরের দিন ডাকঘরে ছোট্ট একটি অনুষ্ঠান হলো।
গ্রামের মানুষ তাঁকে একটি নতুন সাইকেল উপহার দিল।
সবাই অবাক হয়ে বলল,
— “এখন তো আর আপনার চিঠি বিলি করার দরকার নেই।”
গণেশবাবু হেসে বললেন,
— “চিঠি হয়তো কমেছে, কিন্তু মানুষের খোঁজ নেওয়া তো কমেনি।”
অবসরের পর তিনি প্রতি বিকেলে গ্রামের প্রবীণ মানুষদের বাড়ি বাড়ি যেতেন।
কখনও ওষুধ পৌঁছে দিতেন, কখনও বই, কখনও শুধু দুটো কথা বলতেন।
একদিন স্কুলের এক ছাত্র তাঁকে জিজ্ঞেস করল,
— “কাকু, আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিঠি কোনটা ছিল?”
গণেশবাবু কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
— “যে চিঠিটা একজন মানুষকে জানিয়েছিল—সে কোনোদিন একা ছিল না।”
কয়েক মাস পরে গ্রামের স্কুলে একটি চিঠি লেখার প্রতিযোগিতা শুরু হলো।
শিশুরা বাবা-মা, দাদা-দিদা, শিক্ষক কিংবা বন্ধুর উদ্দেশে হাতে লেখা চিঠি লিখতে লাগল।
গণেশবাবুর চোখ ভিজে উঠল।
তিনি বললেন,
— “মোবাইল মুহূর্তে খবর পৌঁছে দেয়, কিন্তু হাতে লেখা চিঠি হৃদয়ের স্পর্শ পৌঁছে দেয়।”
বহু বছর পরে গণেশবাবু আর বেঁচে রইলেন না।
তাঁর স্মৃতিতে গ্রামের ডাকঘরের সামনে একটি ছোট্ট ফলক বসানো হলো।
সেখানে লেখা ছিল—
“যে মানুষ শুধু চিঠি নয়, মানুষের ভালোবাসাও পৌঁছে দিয়েছিলেন।”
আজও সোনাঝুরি গ্রামের মানুষ কোনো বিশেষ দিনে হাতে লেখা চিঠি লেখে।
কারণ তারা জানে—
কিছু অনুভূতি কেবল কালি আর কাগজেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকে।
সমাপ্ত। ✉️❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *