
পূর্ব মেদিনীপুরের ছোট্ট গ্রাম চরনদীপুর। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে প্রশস্ত কংসাবতী নদী। নদীর এক পারে চরনদীপুর, আর অন্য পারে ছোট্ট গ্রাম দীপনগর। দুই গ্রামের মানুষের জীবন যেন একই সুতোয় বাঁধা। কেউ এপারে চাষ করে, কেউ ওপারে বাজার বসায়। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেয়ানৌকা চলত।
এই নৌকার মাঝি ছিলেন হরিপদ দাস। বয়স প্রায় ষাট। সাদা ধুতি, মলিন গামছা আর মুখভরা হাসি—এই ছিল তাঁর পরিচয়। গত চল্লিশ বছর ধরে তিনি নদী পার করে মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছিলেন।
হরিপদ বলতেন,
— “নদী শুধু দুই পাড়কে নয়, দুই হৃদয়কেও জুড়ে দেয়।”
গ্রামের সবাই তাঁকে খুব ভালোবাসত।
অদ্ভুত আলো
এক বর্ষার রাতে নদীর ওপারে একটি ক্ষীণ আলো জ্বলতে দেখা গেল।
প্রথমে কেউ গুরুত্ব দিল না।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিদিন রাত ঠিক দশটায় সেই আলো জ্বলে উঠত।
ভোর হওয়ার আগেই আবার নিভে যেত।
গ্রামের মানুষ নানা কথা বলতে লাগল।
কেউ বলল, ওটা নিশ্চয়ই ভূতের আলো।
কেউ বলল, নদীর দেবতার সংকেত।
কিন্তু হরিপদ এসব বিশ্বাস করতেন না।
তিনি বললেন,
— “প্রতিটি আলোর পেছনেই একটা কারণ থাকে।”
অচেনা যাত্রী
একদিন সন্ধ্যায় শেষ নৌকা ছাড়ার সময় একজন বৃদ্ধ এসে বললেন,
— “মাঝি, আমাকে নদীর ওপারে নিয়ে যাবে?”
হরিপদ বললেন,
— “এখন তো রাত হয়ে গেছে।”
বৃদ্ধ অনুরোধ করলেন,
— “খুব দরকার।”
হরিপদ রাজি হলেন।
নদীর মাঝখানে পৌঁছে বৃদ্ধ বললেন,
— “তুমি জানো, ওই আলোটা কে জ্বালায়?”
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
— “যে মানুষ অপেক্ষা করতে জানে, আলো তার সঙ্গ ছাড়ে না।”
ওপারে পৌঁছে বৃদ্ধ নেমে গেলেন।
হরিপদ কিছুক্ষণ নৌকা বেঁধে অপেক্ষা করলেন।
কিন্তু বৃদ্ধ যেন অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।
রহস্যের সন্ধানে
পরদিন সকালে হরিপদ ওপারের গ্রামে খোঁজ নিতে গেলেন।
এক বৃদ্ধা জানালেন,
— “ওই আলো জ্বালান কমলা মাসি।”
কমলা দেবীর বয়স আশির কাছাকাছি।
তিনি প্রতিদিন রাত দশটায় নদীর ধারে একটি কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে রাখেন।
হরিপদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— “কেন?”
বৃদ্ধা উত্তর দিলেন,
— “পঞ্চাশ বছর আগে তাঁর ছেলে শহরে কাজ করতে গিয়েছিল। যাওয়ার সময় বলেছিল, ‘মা, একদিন রাতে ফিরব। নদীর ধারে একটা আলো জ্বালিয়ে রেখো, যাতে বাড়ি চিনতে পারি।'”
তারপর আর সে কোনোদিন ফিরে আসেনি।
কিন্তু কমলা দেবী আজও প্রতিরাতে সেই আলো জ্বালান।
আলোর অর্থ
হরিপদ সন্ধ্যায় কমলা দেবীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন।
তিনি বললেন,
— “মাসি, এত বছর পরও আপনি অপেক্ষা করছেন?”
কমলা দেবী শান্ত গলায় বললেন,
— “জানি, আমার ছেলে হয়তো আর ফিরবে না। তবু আলোটা নিভিয়ে দিলে যদি সে সত্যিই একদিন ফিরে আসে?”
হরিপদ কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
সেদিন বাড়ি ফিরে তাঁর নিজের মায়ের কথা মনে পড়ল।
মা বলতেন,
— “যে ঘরে অপেক্ষা থাকে, সে ঘর কখনও অন্ধকার হয় না।”
বন্যার রাত
কয়েক সপ্তাহ পরে প্রবল বৃষ্টি শুরু হলো।
নদীর জল বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেল।
রাতের অন্ধকারে এক যাত্রীবাহী নৌকা পথ হারিয়ে ফেলল।
চারদিকে শুধু জল আর কুয়াশা।
ঠিক তখনই দূরে একটি কেরোসিনের আলো দেখতে পেল মাঝি।
সেই আলো লক্ষ্য করেই নৌকাটি নিরাপদে ঘাটে পৌঁছাতে পারল।
পরদিন সবাই জানতে পারল—
সেই আলো ছিল কমলা দেবীর জ্বালানো বাতি।
যে আলো তিনি ছেলের জন্য জ্বালাতেন, সেই আলোই সেদিন বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে।
শেষ দৃশ্য
কয়েক মাস পরে কমলা দেবী শান্তিতে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর গ্রামের মানুষ সিদ্ধান্ত নিল—
নদীর ধারে একটি স্থায়ী সৌরবাতি বসানো হবে।
বাতিটির নিচে একটি ফলক লাগানো হলো।
সেখানে লেখা—
“কমলা দেবীর স্মৃতিতে।
যে আলো একজনের অপেক্ষা থেকে শুরু হয়ে বহু মানুষের পথ দেখিয়েছে।”
আজও সন্ধ্যা নামলে সেই আলো জ্বলে ওঠে।
নতুন প্রজন্ম হয়তো কমলা দেবীকে চেনে না।
কিন্তু সবাই জানে—
একটি ছোট্ট আলো কখনও কখনও হাজার মানুষের আশা হয়ে ওঠে।
হরিপদ মাঝি যখনই রাতের নদী পার হন, তিনি একবার সেই আলোর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেন,
— “মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার ভালোবাসা পথ দেখিয়ে যায়।”
নদীর ঢেউ তখন ধীরে ধীরে ঘাটে এসে লাগে।
মনে হয়, যেন নদীও সেই কথার সঙ্গে নীরবে সম্মতি জানায়।
সমাপ্ত।
নদীর ওপারের আলো।।












Leave a Reply