
ডিমের নানা পদ আমাদের রান্নাঘরে খুব পরিচিত। কিন্তু ডিমকে যদি মশলাদার ব্যাটারে কোট করে ভেজে, তারপর রসুন, কাঁচালঙ্কা, কারিপাতা ও বিভিন্ন মশলার সঙ্গে টস করা হয়, তাহলে তৈরি হয় একেবারে অন্যরকম একটি পদ—ডিমের ৬৫।
বাইরে মচমচে, ভেতরে নরম এবং ঝাল-মশলাদার এই পদটি বিকেলের জলখাবার, পার্টি, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা স্টার্টার হিসেবে পরিবেশন করা যায়।
রান্নার সময়
- প্রস্তুতি: ১৫ মিনিট
- রান্না: ২০ মিনিট
- মোট সময়: প্রায় ৩৫ মিনিট
- পরিবেশন: ৩–৪ জন
উপকরণ
ডিমের জন্য
- ডিম — ৫টি
- ময়দা — ৩ টেবিল চামচ
- কর্নফ্লাওয়ার — ৩ টেবিল চামচ
- আদা-রসুন বাটা — ১ চা চামচ
- লঙ্কা গুঁড়ো — ১ চা চামচ
- গোলমরিচ গুঁড়ো — ½ চা চামচ
- হলুদ — ¼ চা চামচ
- লবণ — স্বাদমতো
- লেবুর রস — ১ চা চামচ
- জল — প্রয়োজনমতো
- তেল — ভাজার জন্য
টস করার জন্য
- রসুন — ৬–৭ কোয়া, কুচি
- কাঁচালঙ্কা — ৩–৪টি, লম্বালম্বি কাটা
- কারিপাতা — ১ মুঠো
- পেঁয়াজ — ১টি ছোট, কুচি
- শুকনো লঙ্কা — ২টি
- লঙ্কা গুঁড়ো — ½ চা চামচ
- গোলমরিচ গুঁড়ো — ¼ চা চামচ
- সয়া সস — ১ চা চামচ, ঐচ্ছিক
- লেবুর রস — ½ চা চামচ
- লবণ — প্রয়োজনমতো
- তেল — ১½ টেবিল চামচ
ধাপ ১: ডিম সেদ্ধ
একটি পাত্রে ৫টি ডিম রাখুন।
ডিম ডুবে যায় এমন পরিমাণ জল দিয়ে মাঝারি আঁচে প্রায় ৯–১০ মিনিট সেদ্ধ করুন।
সেদ্ধ হয়ে গেলে গরম জল ফেলে ঠান্ডা জল দিন।
ডিম ঠান্ডা হলে খোসা ছাড়িয়ে নিন।
এরপর প্রতিটি ডিম চার টুকরো করে কেটে রাখুন।
খুব ছোট করে কাটবেন না, তাহলে ভাজার সময় ডিম ভেঙে যেতে পারে।
ধাপ ২: ব্যাটার তৈরি
একটি বড় বাটিতে ময়দা ও কর্নফ্লাওয়ার নিন।
এর মধ্যে আদা-রসুন বাটা, লঙ্কা গুঁড়ো, গোলমরিচ, হলুদ ও লবণ দিন।
সঙ্গে লেবুর রস দিন।
অল্প অল্প করে জল দিয়ে ঘন ব্যাটার তৈরি করুন।
ব্যাটার যেন খুব পাতলা না হয়। ডিমের গায়ে ভালোভাবে লেগে থাকার মতো ঘন হওয়া উচিত।
ধাপ ৩: ডিম কোট করা
সেদ্ধ ডিমের টুকরোগুলো ব্যাটারের মধ্যে দিন।
চামচ দিয়ে খুব সাবধানে মেশান।
প্রতিটি ডিমের টুকরোর চারপাশে সমানভাবে ব্যাটার লেগে থাকা দরকার।
ধাপ ৪: ডিম ভাজা
কড়াইয়ে পর্যাপ্ত তেল গরম করুন।
তেল মাঝারি গরম হলে ব্যাটারে কোট করা ডিমগুলো একে একে তেলে দিন।
একসঙ্গে বেশি ডিম দেবেন না।
মাঝারি আঁচে ডিমগুলো ভাজুন।
বাইরের আবরণ সোনালি ও ক্রিসপি হয়ে গেলে তুলে নিন।
ঝাঁঝরিতে রেখে অতিরিক্ত তেল ঝরিয়ে নিন।
ধাপ ৫: রসুন ও মশলা ভাজা
এবার একটি চওড়া প্যান বা কড়াইয়ে ১½ টেবিল চামচ তেল গরম করুন।
তেলে শুকনো লঙ্কা ও কারিপাতা দিন।
সাবধানে করবেন, কারণ কারিপাতা গরম তেলে পড়লে ছিটকে উঠতে পারে।
এরপর কুচি করা রসুন দিন।
রসুনের সুন্দর গন্ধ বের হওয়া পর্যন্ত কয়েক সেকেন্ড ভাজুন।
ধাপ ৬: কাঁচালঙ্কা ও পেঁয়াজ
এবার কাঁচালঙ্কা ও কুচি করা পেঁয়াজ দিন।
উচ্চ আঁচে দ্রুত নাড়াচাড়া করুন।
পেঁয়াজ একেবারে নরম করার দরকার নেই। সামান্য ক্রাঞ্চি থাকলে ভালো লাগে।
ধাপ ৭: মশলা যোগ
এবার লঙ্কা গুঁড়ো ও গোলমরিচ গুঁড়ো দিন।
প্রয়োজন হলে সামান্য লবণ দিন।
চাইলে ১ চা চামচ সয়া সস যোগ করতে পারেন।
সবকিছু দ্রুত মিশিয়ে নিন।
ধাপ ৮: ভাজা ডিম যোগ
এবার ভেজে রাখা ডিমের টুকরোগুলো কড়াইয়ে দিয়ে দিন।
উচ্চ আঁচে ১–২ মিনিট টস করুন।
চামচ দিয়ে বেশি নাড়বেন না। এতে ডিমের ক্রিসপি আবরণ খুলে যেতে পারে।
প্রতিটি ডিমের টুকরোর গায়ে মশলা ভালোভাবে লেগে গেলেই চুলা বন্ধ করুন।
ধাপ ৯: লেবুর রস
সবশেষে সামান্য লেবুর রস ছড়িয়ে দিন।
একবার হালকা করে টস করে নামিয়ে নিন।
লেবুর রস একেবারে শেষে দিলে ঝাল ও মশলার মধ্যে একটি সুন্দর টক স্বাদ তৈরি হয়।
ডিমের ৬৫-এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য
এই পদটির মূল আকর্ষণ হলো এর টেক্সচার।
বাইরের অংশ হবে মচমচে এবং মশলাদার, আর ভেতরের ডিম থাকবে নরম।
তার সঙ্গে রসুন, কারিপাতা ও কাঁচালঙ্কার ঝাঁঝ মিশে তৈরি করবে দারুণ একটি স্টার্টার।
আরও ক্রিসপি করার কৌশল
ডিমের ৬৫ আরও ক্রিসপি করতে চাইলে ব্যাটারে কর্নফ্লাওয়ারের পরিমাণ সামান্য বাড়ানো যায়।
তবে কর্নফ্লাওয়ার অতিরিক্ত দেবেন না।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তেল যথেষ্ট গরম থাকতে হবে।
তেল ঠান্ডা থাকলে ডিম বেশি তেল শুষে নেবে এবং বাইরের আবরণ মচমচে হবে না।
ডাবল ফ্রাই পদ্ধতি
আরও বেশি ক্রিসপি চাইলে প্রথমবার ডিমগুলো হালকা সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।
কিছুক্ষণ রেখে দ্বিতীয়বার একটু বেশি আঁচে অল্প সময়ের জন্য ভেজে নিন।
তারপর সরাসরি মশলার সঙ্গে টস করুন।
এতে বাইরের অংশ আরও মচমচে থাকবে।
ঝাল বেশি পছন্দ করলে
যারা ঝাল পছন্দ করেন, তারা কাঁচালঙ্কার পরিমাণ বাড়াতে পারেন।
লঙ্কা গুঁড়োর পাশাপাশি সামান্য চিলি ফ্লেক্স ব্যবহার করা যায়।
চাইলে অল্প পরিমাণ রেড চিলি সসও যোগ করতে পারেন।
তবে সবকিছু পরিমিত রাখলে ডিমের নিজস্ব স্বাদও বজায় থাকবে।
কম ঝালের সংস্করণ
কম ঝাল চাইলে শুকনো লঙ্কা ও কাঁচালঙ্কার পরিমাণ কমিয়ে দিন।
লঙ্কা গুঁড়োও অর্ধেক করে দিতে পারেন।
শিশুদের জন্য তৈরি করলে ঝাল উপকরণ বাদ দিয়ে হালকা মশলায় তৈরি করা ভালো।
কারিপাতার গুরুত্ব
ডিমের ৬৫-এ কারিপাতা ব্যবহার করলে একটি বিশেষ সুগন্ধ পাওয়া যায়।
তাই সম্ভব হলে তাজা কারিপাতা ব্যবহার করুন।
কারিপাতা গরম তেলে দেওয়ার পর যে সুগন্ধ বের হয়, সেটিই এই ধরনের দক্ষিণ ভারতীয় ধাঁচের রান্নাকে আলাদা করে তোলে।
রেস্তোরাঁর মতো পরিবেশন
একটি সমতল প্লেটে ডিমের ৬৫ সাজিয়ে তার ওপর কুচি করা স্প্রিং অনিয়ন বা ধনেপাতা ছড়িয়ে দিন।
পাশে পেঁয়াজের রিং, লেবুর টুকরো এবং সামান্য চাটনি দিতে পারেন।
গরম গরম পরিবেশন করুন।
কীসের সঙ্গে খাওয়া যায়?
ডিমের ৬৫ মূলত স্টার্টার বা স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া যায়।
তবে চাইলে এটি পরিবেশন করতে পারেন—
- ফ্রাইড রাইসের সঙ্গে
- নুডলসের সঙ্গে
- চাউমিনের সঙ্গে
- রুটি বা পরোটার সঙ্গে
- সালাদের সঙ্গে
ডিমের ৬৫ গ্রেভি
এই একই রেসিপি দিয়ে গ্রেভি সংস্করণও তৈরি করা যায়।
সেক্ষেত্রে টস করার সময় একটু বেশি জল যোগ করে কর্নফ্লাওয়ার-জলের পাতলা মিশ্রণ দিতে হবে।
গ্রেভি ঘন হয়ে এলে ভাজা ডিম দিয়ে ১ মিনিট রান্না করুন।
তবে ক্রিসপি স্বাদ চাইলে শুকনো ডিমের ৬৫-ই বেশি ভালো।
রান্নার গুরুত্বপূর্ণ টিপস
১. ডিম অতিরিক্ত সেদ্ধ করবেন না।
২. সেদ্ধ ডিম কাটার সময় ধারালো ছুরি ব্যবহার করুন।
৩. ব্যাটার খুব পাতলা করবেন না।
৪. ডিম ভাজার সময় কড়াই অতিরিক্ত ভরে ফেলবেন না।
৫. মশলা উচ্চ আঁচে দ্রুত টস করুন।
৬. ডিম মশলার মধ্যে বেশি সময় রান্না করবেন না।
৭. পরিবেশনের ঠিক আগে লেবুর রস দিন।
৮. তৈরি হওয়ার পর যত দ্রুত পরিবেশন করবেন, বাইরের অংশ তত বেশি ক্রিসপি থাকবে।
সংরক্ষণ
ডিমের ৬৫ তাজা অবস্থায় সবচেয়ে সুস্বাদু।
তৈরি করে অনেকক্ষণ রেখে দিলে বাইরের ক্রিসপি আবরণ নরম হয়ে যাবে।
তাই সম্ভব হলে পরিবেশনের ঠিক আগে ভেজে মশলার সঙ্গে টস করুন।
উপসংহার
সাধারণ সেদ্ধ ডিমকে একটু ভিন্নভাবে উপভোগ করতে চাইলে ডিমের ৬৫ চমৎকার একটি রেসিপি। ক্রিসপি আবরণ, নরম ডিম, রসুনের সুগন্ধ, কারিপাতা, কাঁচালঙ্কা এবং ঝাল-মশলার স্বাদ একসঙ্গে মিলে এই পদটিকে করে তোলে আকর্ষণীয় ও মুখরোচক।
বিকেলের জলখাবার থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন—সব ক্ষেত্রেই এই পদটি পরিবেশন করা যায়। আর সবচেয়ে ভালো বিষয় হলো, সাধারণ কয়েকটি উপকরণ দিয়েই বাড়িতে সহজে তৈরি করা সম্ভব।












Leave a Reply