গ্রামের কারিগর, রিপেয়ার অর্থনীতি ও টেকসই জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে মেরামত-সংস্কৃতি গবেষক অর্কদীপ সেনের সঙ্গে মুখোমুখি
বিশেষ সাক্ষাৎকার | কাল্পনিক
সাংবাদিক: একটা সময় ছিল, কোনও জিনিস নষ্ট হলে মানুষ সেটি ফেলে দিতেন না। জুতো, ছাতা, সাইকেল, রেডিও, ঘড়ি, চেয়ার, কৃষির সরঞ্জাম—প্রায় সবকিছুই সারাই করা হতো। এখন সেই সংস্কৃতি অনেকটাই বদলে গেছে। কেন?
অর্কদীপ সেন: পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, বাজারে তৈরি পণ্যের বৈচিত্র্য বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, অনেক পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে এমন পর্যায়ে এসেছে যেখানে মানুষ কখনও কখনও মেরামতের পরিবর্তে নতুন জিনিস কেনাকে সহজ মনে করেন।
তৃতীয়ত, আধুনিক অনেক পণ্য এমনভাবে তৈরি হয় যেগুলো সাধারণ কারিগরের পক্ষে খোলা বা মেরামত করা কঠিন। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক পণ্যে বিশেষ সরঞ্জাম, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং নির্দিষ্ট যন্ত্রাংশ দরকার হতে পারে।
আরও একটি পরিবর্তন হয়েছে মানুষের জীবনযাত্রায়। আগে একটি জিনিস দীর্ঘদিন ব্যবহার করার প্রবণতা বেশি ছিল। এখন দ্রুত নতুন মডেল বাজারে আসে। ফলে পুরনো জিনিস মেরামত করার আগ্রহও কিছু ক্ষেত্রে কমে যায়।
তবে “মেরামত সংস্কৃতি শেষ হয়ে গেছে”—এমন কথা আমি বলব না। এখনও বহু মানুষ জিনিস সারাই করেন। শুধু পেশার ধরন ও চাহিদা বদলেছে।
সাংবাদিক: “মেরামত সংস্কৃতি” কথাটির মধ্যে আসলে কী রয়েছে?
অর্কদীপ সেন: এর মধ্যে শুধু একটি নষ্ট জিনিস ঠিক করার বিষয় নেই। এর সঙ্গে রয়েছে ব্যবহার করার মানসিকতা।
একটি চেয়ারের পায়া ভেঙে গেলে সেটি মেরামত করা যায়। একটি জামার বোতাম খুলে গেলে নতুন বোতাম লাগানো যায়। সাইকেলের ব্রেক নষ্ট হলে সেটি ঠিক করা যায়। ছাতার কাপড় ছিঁড়লে সেটি সারাই করা যায়।
অর্থাৎ জিনিসের জীবন শেষ হওয়ার আগে তার ব্যবহারযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।
এর সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়ও জড়িত। নতুন জিনিস কেনার পরিবর্তে পুরনো জিনিস মেরামত করলে অনেক সময় পরিবারের খরচ কমতে পারে।
আবার পরিবেশগত দিকও আছে। একটি জিনিস যত বেশি সময় ব্যবহার করা যায়, নতুন পণ্য তৈরির জন্য কিছুটা কম চাহিদা তৈরি হতে পারে এবং পুরনো পণ্য দ্রুত বর্জ্যে পরিণত হওয়া ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
সাংবাদিক: গ্রামের মেরামতকারীদের মধ্যে কোন কোন পেশা ঐতিহ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
অর্কদীপ সেন: তালিকা অনেক বড়।
সাইকেল মিস্ত্রি, জুতো সারাইকারী, ছাতা মেরামতকারী, ঘড়ি মেরামতকারী, রেডিও-টিভি মিস্ত্রি, কাঠের আসবাব সারাইকারী, লোহার সরঞ্জাম মেরামতকারী, কৃষির যন্ত্রপাতি ঠিক করা কারিগর—এমন অসংখ্য পেশা ছিল।
কিছু কারিগর আবার একাধিক ধরনের কাজ করতেন।
একজন সাইকেল মিস্ত্রি হয়তো পাম্প, ছোট যান্ত্রিক সরঞ্জাম বা অন্য সাধারণ যন্ত্রও সারাই করতেন। কাঠের কারিগর পুরনো দরজা-জানালা বা আসবাবের পাশাপাশি নতুন জিনিসও তৈরি করতেন।
এই পেশাগুলোর একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে বইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি হাতে-কলমে দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিক: এই দক্ষতাগুলো কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যেত?
অর্কদীপ সেন: অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষানবিশ পদ্ধতিতে।
একজন তরুণ কোনও অভিজ্ঞ কারিগরের সঙ্গে কাজ করতে করতে শিখতেন। প্রথমে ছোটখাটো কাজ, তারপর ধীরে ধীরে জটিল কাজ।
ধরা যাক, একজন সাইকেল মিস্ত্রির কাছে একজন কিশোর কাজ শিখছে। প্রথমে সে হয়তো শুধু সরঞ্জাম চিনবে। তারপর টায়ার খোলা, টিউব পরীক্ষা, ব্রেক ঠিক করা, চেন পরিষ্কার করা—ধীরে ধীরে কাজ শিখবে।
এই শিক্ষায় শুধু “কী করতে হবে” শেখানো হয় না। শেখানো হয় কোন শব্দ শুনে সমস্যাটি বোঝা যায়, কোন অংশে কতটা চাপ দিতে হয়, কোন যন্ত্রাংশ কখন বদলাতে হবে—এই সূক্ষ্ম জ্ঞানও।
এ ধরনের জ্ঞানকে আমরা অনেক সময় “হাতের জ্ঞান” বলতে পারি।
সাংবাদিক: এখনকার তরুণরা কি এই পেশায় আসতে চাইছেন না?
অর্কদীপ সেন: অনেক ক্ষেত্রেই তরুণদের পেশার পছন্দ বদলেছে। তবে কারণ শুধু পেশাটিকে ছোট মনে করা নয়।
তরুণরা স্থায়ী আয়, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং ভবিষ্যতের সুযোগ বিবেচনা করেন।
একজন কারিগর যদি প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করেও অনিশ্চিত আয় করেন, অথচ অন্য কোনও পেশায় প্রশিক্ষণ নিয়ে স্থির আয়ের সুযোগ পান, তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় পথটি বেছে নিতে পারেন।
তাই তরুণদের ধরে রাখতে হলে শুধু বলা যাবে না, “এই ঐতিহ্য রক্ষা করো।” পেশাটিকে অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়ও করতে হবে।
সাংবাদিক: মেরামতের পেশা কি সত্যিই পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
অর্কদীপ সেন: হ্যাঁ, তবে বিষয়টি একটু সতর্কভাবে দেখতে হবে।
মেরামত করলে কোনও পণ্য দীর্ঘদিন ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। এর ফলে সেই পণ্য দ্রুত বর্জ্যে পরিণত না-ও হতে পারে।
কিন্তু মেরামত সবসময় পরিবেশের ওপর প্রভাব শূন্য করে দেয় না। মেরামতের জন্য যন্ত্রাংশ, পরিবহন এবং কখনও নতুন উপকরণও দরকার হয়।
তাই সঠিকভাবে বলতে গেলে, মেরামত হলো পণ্যের জীবনকাল বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বৃহত্তর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উৎপাদনের সঙ্গে এটি মিলিয়ে দেখতে হবে।
সাংবাদিক: ইলেকট্রনিক জিনিসের ক্ষেত্রে সমস্যাটা কি আরও বেশি?
অর্কদীপ সেন: অনেক ক্ষেত্রে হ্যাঁ।
পুরনো রেডিও বা কিছু বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সারাই স্থানীয় কারিগররা করতে পারতেন। কিন্তু আধুনিক ডিভাইস অত্যন্ত ছোট ও জটিল হতে পারে।
সার্কিট বোর্ড, বিশেষ ধরনের ব্যাটারি, সেন্সর, সফটওয়্যার-নির্ভর সমস্যা—এসবের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ দরকার।
তবে এটিই আবার নতুন সুযোগ।
আগে যে মিস্ত্রি শুধু রেডিও সারাই করতেন, তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল ডিভাইস, সৌর সরঞ্জাম বা আধুনিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রের মেরামতের প্রশিক্ষণ নিতে পারেন।
অর্থাৎ পেশাটি হারিয়ে না গিয়ে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে বদলে যেতে পারে।
সাংবাদিক: “Right to Repair” নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে বিষয়টি কীভাবে বোঝাবেন?
অর্কদীপ সেন: সহজভাবে বললে, কোনও পণ্য কিনে ব্যবহার করার পর সেটি নষ্ট হলে সেটি মেরামত করার সুযোগ থাকা নিয়ে এই ধারণার আলোচনা।
এর মধ্যে প্রশ্ন থাকে—পণ্যটি কি এমনভাবে তৈরি যে তা সহজে খোলা যায়? যন্ত্রাংশ কি পাওয়া যায়? মেরামতের তথ্য বা নির্দেশিকা কি পাওয়া যায়? নির্মাতা কি দীর্ঘ সময় যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেন?
অবশ্যই সব পণ্যের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। নিরাপত্তা, গুণমান এবং প্রযুক্তিগত বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়।
কিন্তু ভোক্তার দৃষ্টিকোণ থেকে মেরামতের সুযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিক: গ্রামের ছোট মেরামতের দোকানগুলো আধুনিক হতে পারে কীভাবে?
অর্কদীপ সেন: প্রথমেই দক্ষতা বাড়াতে হবে।
একজন সাইকেল মিস্ত্রি চাইলে আধুনিক গিয়ার সাইকেল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। কৃষিযন্ত্র মেরামতকারী আধুনিক পাম্প বা ছোট যান্ত্রিক সরঞ্জাম সম্পর্কে জ্ঞান নিতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, দোকানে কাজের হিসাব রাখা দরকার। কোন যন্ত্রাংশ বদলানো হলো, কত টাকা নেওয়া হলো—এসব লিখে রাখলে গ্রাহকের বিশ্বাস বাড়ে।
তৃতীয়ত, মোবাইলের মাধ্যমে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায়। কেউ ফোন করে জানতে পারেন, “আমার যন্ত্রটি তৈরি হয়েছে কি না?”
চতুর্থত, নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক বা যান্ত্রিক কাজ প্রশিক্ষণ ছাড়া করা উচিত নয়।
সাংবাদিক: মেরামতকারীদের কাজের মূল্যায়ন কি সমাজে যথেষ্ট হয়?
অর্কদীপ সেন: আমার মনে হয়, অনেক সময় হয় না।
আমরা একটি জিনিস নতুন কিনতে গেলে তার দাম বুঝি। কিন্তু সেটি পাঁচ বছর ধরে সচল রাখার জন্য যে কারিগর বারবার কাজ করেছেন, তাঁর শ্রমের মূল্য অনেক সময় চোখে পড়ে না।
একজন দক্ষ মেরামতকারী একটি সমস্যার সমাধান কয়েক মিনিটে করে দিতে পারেন। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে কাজটি সহজ। কিন্তু সেই দক্ষতা তৈরি করতে তাঁর বহু বছর সময় লেগেছে।
তাই “মাত্র পাঁচ মিনিটের কাজ”—এইভাবে কারিগরের পারিশ্রমিক বিচার করা ঠিক নয়।
আমাদের বুঝতে হবে, আমরা শুধু সময়ের জন্য টাকা দিচ্ছি না; আমরা দক্ষতার জন্য টাকা দিচ্ছি।
সাংবাদিক: মেরামত না করে নতুন জিনিস কেনার অভ্যাসের আরেকটি কারণ কি সামাজিক মর্যাদা?
অর্কদীপ সেন: কিছু ক্ষেত্রে হতে পারে। নতুন মডেলের ফোন, নতুন পোশাক, নতুন আসবাব বা নতুন গাড়ি কখনও কখনও ব্যক্তির সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
পুরনো জিনিস ব্যবহার করাকে কেউ কেউ কম আধুনিক ভাবতে পারেন।
কিন্তু সব ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। মানুষ অনেক সময় নতুন জিনিস কেনেন কারণ পুরনোটি মেরামত করা সম্ভব নয়, যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না, বা নতুন পণ্যের কার্যকারিতা তাঁদের প্রয়োজনের সঙ্গে বেশি মানানসই।
তাই ভোক্তাকে দোষ দেওয়ার বদলে পণ্যের নকশা, বাজারব্যবস্থা ও মেরামতের সুযোগ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে।
সাংবাদিক: কৃষিক্ষেত্রে মেরামতের গুরুত্ব কতটা?
অর্কদীপ সেন: খুব বেশি।
গ্রামের কৃষক ছোট যন্ত্রপাতি, পাম্প, স্প্রে সরঞ্জাম, নল, হাতিয়ার বা বিভিন্ন কৃষি উপকরণের ওপর নির্ভর করেন।
ফসলের মরশুমে একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র নষ্ট হলে দ্রুত মেরামত না হলে কৃষকের সমস্যা হতে পারে।
স্থানীয় দক্ষ মেরামতকারী তাই কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একটি গ্রামের কাছেই যদি দক্ষ মেকানিক থাকেন, তাহলে কৃষককে ছোটখাটো সমস্যার জন্য দূরের শহরে যেতে হয় না।
এতে সময় ও পরিবহন খরচ দুটোই কমতে পারে।
সাংবাদিক: মেরামত সংস্কৃতির সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির সম্পর্ক কী?
অর্কদীপ সেন: এটি একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করে।
কারিগর শ্রমের বিনিময়ে আয় করেন। তিনি যন্ত্রাংশ কেনেন স্থানীয় বা আঞ্চলিক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। গ্রাহক নতুন জিনিস কেনার বদলে পুরনো জিনিস ব্যবহার চালিয়ে যান।
একজন সাইকেল মিস্ত্রির দোকান শুধু তাঁর নিজের জীবিকা নয়। আশপাশের যন্ত্রাংশ বিক্রেতা, সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গেও তার সম্পর্ক থাকতে পারে।
একে স্থানীয় অর্থনীতির একটি ক্ষুদ্র কিন্তু বাস্তব অংশ হিসেবে দেখা যায়।
সাংবাদিক: মেরামত শেখানোর জন্য কি গ্রামে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে?
অর্কদীপ সেন: অবশ্যই।
প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হলে সেখানে একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা শেখানো যেতে পারে।
যেমন—
- সাইকেল ও ছোট যানবাহনের মেরামত
- কৃষিযন্ত্রের প্রাথমিক রক্ষণাবেক্ষণ
- বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের নিরাপদ মেরামত
- কাঠের আসবাব সারাই
- জুতো ও চামড়াজাত পণ্যের মেরামত
- সেলাই ও পোশাক সংস্কার
- ছোট গৃহস্থালি যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ
তবে প্রতিটি বিষয়ে উপযুক্ত প্রশিক্ষক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দরকার।
সাংবাদিক: মহিলারা কি এই মেরামত অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা নিতে পারেন?
অর্কদীপ সেন: অবশ্যই।
মেরামত মানেই শুধু লোহার যন্ত্র বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র নয়।
পোশাক মেরামত, সেলাই, ব্যাগ সারাই, আসবাবের কিছু কাজ, গৃহস্থালি সামগ্রীর সংস্কার—এসব ক্ষেত্রেও দক্ষতা তৈরি করা যায়।
অনেক মহিলা বাড়িতে বসেই ছোট মেরামতের কাজ করতে পারেন।
এমনকি অনলাইন মাধ্যমে “repair service” বুকিং নেওয়া, বাড়ি থেকে পণ্য সংগ্রহ করা এবং মেরামত শেষে ফেরত দেওয়ার মতো ছোট ব্যবসার মডেলও তৈরি হতে পারে।
সাংবাদিক: পুরনো জিনিসকে নতুনভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা—যাকে অনেকে upcycling বলেন—এটি কি মেরামত সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত?
অর্কদীপ সেন: সম্পর্ক আছে, যদিও দুটো একই বিষয় নয়।
মেরামতের উদ্দেশ্য সাধারণত পুরনো জিনিসের মূল ব্যবহার ফিরিয়ে দেওয়া।
আর upcycling-এর ক্ষেত্রে পুরনো জিনিসকে পরিবর্তন করে অন্য ব্যবহার তৈরি করা হতে পারে।
যেমন পুরনো কাঠ দিয়ে নতুন তাক তৈরি করা, পুরনো কাপড় দিয়ে ব্যাগ তৈরি করা—এগুলো পুনর্ব্যবহারের সৃজনশীল উদাহরণ।
এতে কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি নকশার জ্ঞানও দরকার।
ভবিষ্যতে এই ক্ষেত্রটি ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাজার তৈরি করতে পারে।
সাংবাদিক: একটি জিনিস কখন মেরামত করা উচিত আর কখন নতুন কেনা যুক্তিযুক্ত?
অর্কদীপ সেন: এখানে কোনও একক নিয়ম নেই।
প্রথমে দেখতে হবে জিনিসটি নিরাপদভাবে মেরামত করা সম্ভব কি না। দ্বিতীয়ত, মেরামতের পর কতদিন ব্যবহার করা যাবে। তৃতীয়ত, মেরামতের খরচ এবং নতুন জিনিসের খরচের পার্থক্য কতটা।
চতুর্থত, পুরনো পণ্যটি পরিবেশগত বা আবেগগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কি না।
যদি একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রের মেরামত নিরাপদ না হয়, শুধু পুরনো বলে সেটি ব্যবহার করা উচিত নয়।
আবার একটি কাঠের ভালো চেয়ারের সামান্য অংশ ভেঙেছে বলে সেটি ফেলে দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।
সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে।
সাংবাদিক: কারিগরদের কাছে পুরনো জিনিসের ইতিহাসও কি জমা থাকে?
অর্কদীপ সেন: অসাধারণভাবে জমা থাকে।
একজন ঘড়ি মিস্ত্রি হয়তো জানেন, কোন পরিবার বহু বছর ধরে একই ঘড়ি ব্যবহার করছে।
একজন সাইকেল মিস্ত্রি জানেন, কোন সাইকেলটি গ্রামের কোন মানুষের সঙ্গে কত বছর ধরে চলছে।
একজন রেডিও মিস্ত্রির কাছে হয়তো এমন পুরনো যন্ত্র আসে, যেগুলো এখন আর বাজারে দেখা যায় না।
অর্থাৎ মেরামতের দোকান কখনও কখনও স্থানীয় বস্তু-ইতিহাসের ছোট আর্কাইভও হয়ে ওঠে।
এই গল্পগুলো নথিভুক্ত করা গেলে স্থানীয় ইতিহাসের একটি অন্যরকম ছবি পাওয়া সম্ভব।
সাংবাদিক: তাহলে কি মেরামতের দোকানও এক ধরনের জ্ঞানকেন্দ্র?
অর্কদীপ সেন: এক অর্থে অবশ্যই।
একজন মিস্ত্রির দোকানে গেলে আপনি শুধু যন্ত্র মেরামত হতে দেখেন না। সেখানে সমস্যা সমাধানের জ্ঞান, উপকরণ চেনার জ্ঞান, পুরনো প্রযুক্তির জ্ঞান এবং স্থানীয় মানুষের ব্যবহার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থাকে।
একজন অভিজ্ঞ কারিগর অনেক সময় যন্ত্রের শব্দ শুনেই সমস্যার সম্ভাব্য কারণ বুঝতে পারেন।
এই জ্ঞান লিখে রাখা কঠিন। তাই দক্ষ কারিগরদের কাছ থেকে শেখার ব্যবস্থা থাকা দরকার।
সাংবাদিক: স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মেরামত শেখানো উচিত কি?
অর্কদীপ সেন: বয়স অনুযায়ী নিরাপদ কাজ শেখানো যেতে পারে।
ছোটদের শেখানো যেতে পারে জিনিসের যত্ন নেওয়া, স্ক্রু-ড্রাইভার বা ধারালো সরঞ্জামের নিরাপদ ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা, পোশাকের ছোটখাটো সংস্কার কিংবা কোনও জিনিস নষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে না দিয়ে সমস্যাটি বোঝার অভ্যাস।
বয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণসহ basic repair skills শেখানো যেতে পারে।
এতে তাদের মধ্যে হাতে-কলমে কাজের আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
তবে বৈদ্যুতিক, রাসায়নিক বা বিপজ্জনক যন্ত্রের কাজ প্রশিক্ষিত ব্যক্তির তত্ত্বাবধান ছাড়া করা উচিত নয়।
সাংবাদিক: ভবিষ্যতে মেরামতের পেশায় প্রযুক্তি কী পরিবর্তন আনতে পারে?
অর্কদীপ সেন: প্রযুক্তি এখানে প্রতিদ্বন্দ্বীও হতে পারে, আবার সহযোগীও হতে পারে।
ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক যন্ত্র দিয়ে সমস্যা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গ্রামের কারিগর নতুন প্রযুক্তি শিখতে পারেন। ভিডিও দেখে কোনও নির্দিষ্ট মডেলের যন্ত্র সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যায়।
3D printing-এর মতো প্রযুক্তি কিছু ক্ষেত্রে বিরল বা অপ্রচলিত ছোট যন্ত্রাংশ তৈরিতে ভবিষ্যতে ভূমিকা রাখতে পারে—যদিও পণ্যের নিরাপত্তা ও উপকরণের মান অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে।
অর্থাৎ প্রযুক্তি পুরনো মিস্ত্রির দক্ষতা মুছে দেবে এমন নয়; বরং দক্ষ মিস্ত্রি প্রযুক্তিকে নিজের কাজে ব্যবহার করলে তাঁর সক্ষমতা বাড়তে পারে।
সাংবাদিক: আপনার মতে ভবিষ্যতের আদর্শ “রিপেয়ার ইকোনমি” কেমন হতে পারে?
অর্কদীপ সেন: আমি এমন একটি ব্যবস্থা কল্পনা করি যেখানে পণ্য কেনার সঙ্গে মেরামতের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
পণ্য তৈরি করার সময় মেরামতযোগ্যতা, দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত কারিগর থাকবে। তাঁদের কাছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকবে। গ্রাহক সহজে মেরামত পরিষেবা পাবেন।
একই সঙ্গে পুরনো পণ্য থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ আলাদা করার ব্যবস্থাও থাকবে।
অর্থাৎ “কিনলাম—নষ্ট হলো—ফেলে দিলাম”—এই সরল চক্রের পরিবর্তে হতে পারে:
কেনা → ব্যবহার → রক্ষণাবেক্ষণ → মেরামত → পুনরায় ব্যবহার → পুনর্ব্যবহার।
এটি অর্থনীতি ও পরিবেশ—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সাংবাদিক: শেষ প্রশ্ন। সাধারণ মানুষ আজ থেকেই কী করতে পারেন?
অর্কদীপ সেন: খুব সহজ কয়েকটি অভ্যাস তৈরি করা যায়।
প্রথমত, কোনও জিনিস নষ্ট হলেই সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দেবেন না। আগে দেখুন মেরামত সম্ভব কি না।
দ্বিতীয়ত, জিনিসের নিয়মিত যত্ন নিন। অনেক নষ্ট হওয়া আসলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঘটে।
তৃতীয়ত, দক্ষ স্থানীয় কারিগরদের কাজের মূল্য দিন।
চতুর্থত, অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার আগে ভাবুন—সত্যিই কি এটি দরকার?
আর পঞ্চমত, সন্তানদের শেখান যে কোনও জিনিসের মূল্য শুধু তার নতুন হওয়ার মধ্যে নেই। যত্ন করে দীর্ঘদিন ব্যবহার করাও একটি দক্ষতা।
আমরা যদি “ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া”র পাশাপাশি “ব্যবহার করে যত্ন নেওয়া এবং মেরামত করা”—এই সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিই, তাহলে আমাদের ঘর, অর্থনীতি এবং পরিবেশ—তিনটিই উপকৃত হতে পারে।
প্রতিবেদকের শেষ কথা
মেরামতের দোকানকে আমরা অনেক সময় খুব সাধারণ একটি জায়গা হিসেবে দেখি। কিন্তু সেই ছোট দোকানের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে বহু বছরের কারিগরি জ্ঞান, স্থানীয় অর্থনীতির গল্প এবং মানুষের দীর্ঘদিন ব্যবহার করা জিনিসের ইতিহাস।
আধুনিক বাজারে নতুন পণ্যের সংখ্যা বাড়লেও মেরামতের প্রয়োজন শেষ হয়নি। বরং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে মেরামতের দক্ষতাকেও নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
একটি পুরনো সাইকেল, একটি কাঠের চেয়ার, একটি ছাতা কিংবা কোনও কৃষিযন্ত্র—সবকিছুর ক্ষেত্রেই প্রশ্নটি একই: নষ্ট হলেই কি তার জীবন শেষ?
সবসময় নয়।
অনেক সময় সামান্য যত্ন, দক্ষ হাত এবং একটি উপযুক্ত যন্ত্রাংশ একটি পুরনো জিনিসকে আবার ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে পারে।
সম্ভবত ভবিষ্যতের টেকসই জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—নতুন জিনিস কেনার পাশাপাশি পুরনো জিনিসকে আরও দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখার দক্ষতাও আমাদের শিখতে হবে।
—এই সাক্ষাৎকারটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক; প্রকাশের উদ্দেশ্যে সৃজনশীলভাবে নির্মিত।













Leave a Reply