হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ প্রযুক্তি ও তার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে মুখোমুখি
বিশেষ সাক্ষাৎকার | কল্পিত
গ্রামবাংলার পুরনো বাড়ির উঠোনে একসময় ভোরের আলো ফুটতেই শোনা যেত একটি পরিচিত শব্দ—ঢেঁকির ছন্দময় আওয়াজ। কাঠের তৈরি দীর্ঘ দণ্ডের এক প্রান্তে পা বা শরীরের ভার দিয়ে অন্য প্রান্তে থাকা কাঠের মুষলটি উঠিয়ে আবার নামানো হতো। তার আঘাতে ধানের খোসা আলাদা হয়ে তৈরি হতো চাল। শুধু চাল তৈরি নয়, ঢেঁকির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা, পারিবারিক শ্রম, উৎসব, খাদ্যসংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্পর্ক।
আজ যন্ত্রচালিত ধানকলের যুগে সেই ঢেঁকির ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে। অধিকাংশ গ্রামেই ঢেঁকি এখন নিয়মিত ব্যবহারের বস্তু নয়; বরং পুরনো বাড়ির এক কোণে পড়ে থাকা স্মৃতি। কিন্তু এই সরল কাঠের যন্ত্রটির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে গ্রামীণ প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। বিদ্যুৎ বা আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই কীভাবে মানুষ স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে দৈনন্দিন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, ঢেঁকি তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
ঢেঁকির ইতিহাস, এর ব্যবহার, খাদ্যসংস্কৃতিতে ভূমিকা এবং আধুনিক সময়ে এর সম্ভাবনা নিয়ে কথা বললাম কল্পিত গ্রামীণ প্রযুক্তি গবেষক ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডলের সঙ্গে।
প্রতিবেদক: প্রথমেই জানতে চাই, ঢেঁকিকে আপনি কীভাবে দেখেন? এটি কি শুধুই একটি পুরনো কৃষিযন্ত্র?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
না, ঢেঁকিকে শুধু কৃষিযন্ত্র বললে এর গুরুত্ব অনেকটাই কমিয়ে দেখা হবে। এটি একই সঙ্গে একটি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি, একটি সামাজিক স্মৃতি এবং স্থানীয় জ্ঞানব্যবস্থার নিদর্শন।
একটি প্রযুক্তি যে সবসময় ধাতু, বিদ্যুৎ বা জটিল যন্ত্রের ওপর নির্ভর করবে এমন নয়। ঢেঁকি তার বিপরীত উদাহরণ। কাঠ, মাটি, পাথর বা স্থানীয়ভাবে পাওয়া অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে মানুষ এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, যার সাহায্যে ধান থেকে খোসা ছাড়িয়ে চাল তৈরি করা সম্ভব হতো।
এখানে বিশেষ বিষয় হলো—ঢেঁকির নকশা তৈরি করতে স্থানীয় মানুষকে পদার্থবিদ্যার কোনো আনুষ্ঠানিক বই পড়তে হয়নি। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তারা বুঝেছিল কোথায় ভার দিতে হবে, কাঠের কোন অংশ কতটা মোটা হবে, মুষলের ওজন কেমন হবে এবং আঘাতের মাত্রা কতটা হওয়া দরকার।
এটি আসলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হওয়া ব্যবহারিক জ্ঞান।
প্রতিবেদক: ঢেঁকি কীভাবে কাজ করত, একটু সহজভাবে বলবেন?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
ঢেঁকির মূল নীতি খুব সহজ—লিভার বা দণ্ডের ভারসাম্য। একটি দীর্ঘ কাঠের দণ্ড সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর ওপর ভর করে থাকে। একদিকে থাকে মুষল বা আঘাত করার অংশ, অন্যদিকে থাকে পা দেওয়ার বা চাপ প্রয়োগের স্থান।
কেউ একদিকে চাপ দিলে অন্য প্রান্ত উঠে যায়। চাপ ছেড়ে দিলে ভারের কারণে মুষল নিচে নেমে আসে। এই ওঠানামার ফলে ধানের ওপর বারবার আঘাত পড়ে। ধানের বাইরের খোসা ধীরে ধীরে আলাদা হয়।
অর্থাৎ, মানুষের শরীরের শক্তিকে একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজে লাগানো হচ্ছে। বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই, জ্বালানির প্রয়োজন নেই। এটাই ঢেঁকির প্রযুক্তিগত সৌন্দর্য।
প্রতিবেদক: একসময় ঢেঁকি কি প্রতিটি গ্রামে ছিল?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
প্রতিটি বাড়িতে ছিল—এমন কথা বলা ঠিক হবে না। অঞ্চল, পরিবার এবং আর্থিক অবস্থার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করত। তবে বাংলার বহু গ্রামীণ এলাকায় ঢেঁকির ব্যবহার ছিল পরিচিত বিষয়।
অনেক বাড়িতে পরিবারের নিজস্ব ঢেঁকি থাকত। আবার কোথাও কয়েকটি পরিবার মিলেও ব্যবহার করত। বিশেষ করে ধান কাটার পর নতুন ধান থেকে চাল তৈরির সময় এর ব্যবহার বাড়ত।
ঢেঁকির সঙ্গে পারিবারিক শ্রমের একটি সম্পর্কও ছিল। পরিবারের সদস্যরা পালা করে কাজ করতেন। ফলে এটি শুধু খাদ্য তৈরির যন্ত্র ছিল না, বরং দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ ছিল।
প্রতিবেদক: ঢেঁকির সঙ্গে নারীদের সম্পর্কের কথা প্রায়ই শোনা যায়। বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ সমাজে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের অনেক কাজ ঐতিহাসিকভাবে নারীদের শ্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ধান পরিষ্কার করা, চাল তৈরি করা, চাল থেকে বিভিন্ন খাদ্য প্রস্তুত করা—এসব কাজে নারীদের বড় ভূমিকা ছিল।
ঢেঁকি চালানোর ক্ষেত্রেও বহু গ্রামীণ পরিবারের নারীরা নিয়মিত কাজ করতেন। কিন্তু এখানে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার—এই শ্রমকে শুধু ঐতিহ্যের রোমান্টিক ছবি হিসেবে দেখলে চলবে না।
কারণ ঢেঁকিতে কাজ করা শারীরিকভাবে পরিশ্রমসাধ্য ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে একই কাজ করতে হতো। আধুনিক ধানকল আসার ফলে এই কঠিন শ্রমের অনেকটাই কমেছে। তাই প্রযুক্তির পরিবর্তনকে শুধু ঐতিহ্য হারানো হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
প্রতিবেদক: তাহলে আধুনিক ধানকল আসা কি খারাপ কিছু?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
একেবারেই নয়। আধুনিক ধানকল দ্রুত বিপুল পরিমাণ ধান প্রক্রিয়াকরণ করতে পারে। কৃষক ও সাধারণ মানুষের সময় ও শ্রম বাঁচে। বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য এটি অপরিহার্য।
আমাদের ভুলটা হয় তখনই, যখন আমরা মনে করি নতুন প্রযুক্তি এলেই পুরনো প্রযুক্তির সব জ্ঞান মূল্যহীন হয়ে যায়।
ঢেঁকির ক্ষেত্রে আমাদের উচিত দুটো বিষয়কে আলাদা করে দেখা—একদিকে দৈনন্দিন বৃহৎ পরিমাণ চাল উৎপাদনের জন্য আধুনিক ধানকল, অন্যদিকে ঐতিহ্য, বিশেষ খাদ্যপণ্য, পর্যটন এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে ঢেঁকির সংরক্ষণ।
প্রতিবেদক: ঢেঁকিতে তৈরি চালের সঙ্গে আধুনিক মেশিনে তৈরি চালের কি কোনো পার্থক্য থাকত?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
প্রক্রিয়ার ধরন আলাদা হওয়ার কারণে কিছু পার্থক্য দেখা দিতে পারে। তবে ঢেঁকিতে তৈরি চাল মানেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি পুষ্টিকর বা স্বাস্থ্যকর—এমন সরল সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
ধানের জাত, প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতি, সংরক্ষণ এবং রান্নার পদ্ধতি—সবই খাদ্যের গুণমানকে প্রভাবিত করে।
তবে ঢেঁকি ব্যবহারের একটি বিশেষত্ব হলো ছোট পরিমাণে ধান প্রক্রিয়াকরণ করা সম্ভব। পারিবারিক ব্যবহারের জন্য এটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
প্রতিবেদক: ঢেঁকির সঙ্গে কি বাঙালির উৎসবেরও সম্পর্ক রয়েছে?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
অবশ্যই। বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে নতুন ধান এবং নতুন চালের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিভিন্ন ঋতু ও উৎসবকে কেন্দ্র করে চালের গুঁড়ো, চিঁড়ে, বিভিন্ন ধরনের পিঠে এবং অন্যান্য খাদ্য প্রস্তুত করা হতো।
ঢেঁকি শুধু ধান থেকে চাল তৈরির কাজে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন খাদ্য উপকরণ প্রক্রিয়াকরণেও এর ব্যবহার ছিল।
তাই ঢেঁকির শব্দ অনেক পরিবারের কাছে শুধু শ্রমের শব্দ ছিল না; সেটি ছিল উৎসব আসার সংকেতও।
প্রতিবেদক: আজকের প্রজন্ম ঢেঁকি সম্পর্কে অনেকটাই অজ্ঞ। কেন এমন হলো?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
এর প্রধান কারণ জীবনযাত্রার পরিবর্তন। এখন মানুষ দ্রুত ফল চায়। বাজারে প্রস্তুত চাল, চালের গুঁড়ো এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্য সহজেই পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, বাড়িতে ধান মজুত করে রাখার প্রবণতা অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে কমেছে। কৃষি ব্যবস্থাও বদলেছে।
তৃতীয়ত, গ্রামে বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রের প্রসার ঘটেছে। ফলে মানুষের হাতে থাকা সময়ের মূল্য বেড়েছে। যে কাজ কয়েক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় নিয়ে করা হতো, সেটি এখন অনেক দ্রুত করা যায়।
ফলে ঢেঁকি ধীরে ধীরে দৈনন্দিন প্রয়োজনের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেছে।
প্রতিবেদক: ঢেঁকি কি আবার জনপ্রিয় হতে পারে?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
দৈনন্দিন জীবনে আগের মতো ব্যাপকভাবে ফিরে আসবে—এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। কিন্তু সীমিত ও বিশেষায়িত ব্যবহারে এর পুনর্জাগরণ সম্ভব।
যেমন, ঐতিহ্যবাহী খাদ্য উৎপাদন, গ্রামীণ পর্যটন, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, লোকঐতিহ্য প্রদর্শনী কিংবা বিশেষ ধরনের স্থানীয় খাদ্যপণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ে ঢেঁকিকে ব্যবহার করা যেতে পারে।
কেউ যদি বলে, প্রত্যেক বাড়িতে আবার ঢেঁকি ফিরিয়ে আনতে হবে, সেটি বাস্তবসম্মত নয়। বরং যেখানে এর ব্যবহার অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক মূল্য তৈরি করতে পারে, সেখানে সংরক্ষণ ও পুনর্ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রতিবেদক: গ্রামীণ পর্যটনের সঙ্গে ঢেঁকিকে কীভাবে যুক্ত করা সম্ভব?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
ধরুন, কোনো গ্রামে একটি ঐতিহ্যবাহী খাদ্যকেন্দ্র তৈরি হলো। সেখানে পর্যটকরা দেখতে পেলেন কীভাবে আগে ধান থেকে চাল তৈরি করা হতো। তাঁরা নিজেরাও নিরাপদ পরিবেশে সেই প্রক্রিয়ার একটি অংশ দেখতে বা অভিজ্ঞতা নিতে পারলেন।
সেখানেই তৈরি হতে পারে পিঠে, চিঁড়ে বা অন্যান্য স্থানীয় খাবার। সঙ্গে থাকতে পারে গ্রামের কৃষিপণ্য।
এতে একদিকে পুরনো প্রযুক্তি সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে গ্রামের মানুষের আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে অবশ্যই এটিকে শুধু প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ থাকতে হবে।
প্রতিবেদক: ঢেঁকি তৈরির কারিগরদের কী অবস্থা?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। যখন ব্যবহার কমে যায়, তখন শুধু যন্ত্রটি হারায় না, তার সঙ্গে যুক্ত কারিগরি জ্ঞানও হারিয়ে যায়।
কোন কাঠ উপযুক্ত, কাঠ কীভাবে শুকাতে হবে, কোন অংশ কোথায় বসবে, ভারসাম্য কীভাবে ঠিক করতে হবে—এসব বিষয় বই পড়ে পুরোপুরি শেখা যায় না। হাতে-কলমে শেখার দরকার হয়।
যে কারিগররা আগে ঢেঁকি বানাতেন, তাঁদের অনেকেই এখন অন্য পেশায় চলে গেছেন। ফলে ভবিষ্যতে কেউ যদি একটি ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি পুনর্নির্মাণ করতে চান, দক্ষ কারিগর পাওয়াই কঠিন হতে পারে।
প্রতিবেদক: তাহলে কি ঢেঁকির নকশা নথিভুক্ত করা উচিত?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
অবশ্যই। শুধু ছবি তুলে রাখলেই হবে না। বিভিন্ন অঞ্চলের ঢেঁকির নকশা, মাপ, ব্যবহৃত কাঠ, নির্মাণপদ্ধতি, স্থানীয় নাম এবং ব্যবহারের ধরন নথিভুক্ত করা দরকার।
ভিডিও করে কারিগরের কাজ রেকর্ড করা যেতে পারে। বয়স্ক মানুষদের সাক্ষাৎকার নেওয়া যেতে পারে।
এমনকি একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা সম্ভব, যেখানে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী কৃষি ও খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি সংরক্ষিত থাকবে।
প্রতিবেদক: স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে এই বিষয়টি শিখতে পারে?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
এটি প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার জন্য খুব ভালো বিষয়।
একজন ছাত্র তার গ্রামের পুরনো একটি ঢেঁকি খুঁজে বের করতে পারে। তার ছবি তুলতে পারে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যের কাছ থেকে জানতে পারে সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হতো।
তারপর সে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে—‘আমাদের গ্রামের হারিয়ে যাওয়া প্রযুক্তি’ নামে।
এতে ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং পরিবেশবিদ্যা—সবকিছুকে একসঙ্গে শেখা সম্ভব।
প্রতিবেদক: পরিবেশের দিক থেকে ঢেঁকির কোনো বিশেষ গুরুত্ব আছে?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
স্থানীয় উপকরণ এবং মানুষের শ্রমনির্ভর হওয়ায় এর সরাসরি শক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন কম। তবে এটিকে আধুনিক যন্ত্রের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।
আধুনিক যন্ত্র বৃহৎ পরিমাণ উৎপাদন করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে সময় ও শ্রমের ব্যবহার কমায়।
তাই পরিবেশগত তুলনা করতে হলে পুরো জীবনচক্র বিবেচনা করতে হবে—যন্ত্র তৈরির উপকরণ, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, উৎপাদনের পরিমাণ ইত্যাদি।
ঢেঁকির বড় শিক্ষা হলো—স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে সহজ প্রযুক্তিও কার্যকর হতে পারে।
প্রতিবেদক: আপনি কি মনে করেন, আধুনিক ডিজাইনের সঙ্গে ঢেঁকির প্রযুক্তিকে যুক্ত করা সম্ভব?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
অবশ্যই। এটিকে বলা যায় ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংযোগ।
ধরা যাক, ঢেঁকির মূল লিভার পদ্ধতি রেখে এমন একটি নকশা তৈরি করা হলো, যাতে কম শারীরিক পরিশ্রমে ছোট পরিমাণ খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ করা যায়।
তবে নতুন নকশা তৈরি করার আগে ঐতিহ্যবাহী প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য বুঝতে হবে। শুধু দেখতে ঢেঁকির মতো একটি যন্ত্র বানালেই ঐতিহ্য সংরক্ষণ হয় না।
প্রতিবেদক: ঢেঁকির সঙ্গে গ্রামের সামাজিক সম্পর্কের বিষয়টিও কি গুরুত্বপূর্ণ?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুরনো গ্রামীণ জীবনে অনেক কাজ ছিল সমষ্টিগত। একটি বাড়ির কাজ করতে প্রতিবেশীরা সাহায্য করতেন, আবার অন্য বাড়ির কাজে সেই পরিবারও সাহায্য করত।
ঢেঁকির কাজও অনেক সময় একা করার বিষয় ছিল না। এর সঙ্গে কথা, গান, হাসি-আড্ডা—সবকিছু যুক্ত হতে পারত।
আজকের দ্রুতগতির জীবনে আমরা অনেক সময় কাজকে শুধু উৎপাদন হিসেবে দেখি। কিন্তু পুরনো গ্রামীণ সমাজে কিছু কাজ সামাজিক যোগাযোগেরও মাধ্যম ছিল।
প্রতিবেদক: তাহলে ঢেঁকি হারিয়ে যাওয়া মানে কি একটি সামাজিক সংস্কৃতিও হারিয়ে যাওয়া?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
একটি অংশ অবশ্যই হারিয়ে গেছে। তবে সংস্কৃতি কখনও পুরোপুরি একই অবস্থায় থাকে না। সমাজ বদলালে সংস্কৃতিও বদলে যায়।
আমাদের কাজ অতীতকে হুবহু ফিরিয়ে আনা নয়। বরং অতীতের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান ও স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
ঢেঁকিকে তাই আমরা একটি ‘জীবন্ত ঐতিহ্য’ হিসেবে দেখতে পারি—যদি তার জ্ঞান, নির্মাণপদ্ধতি এবং সামাজিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়।
প্রতিবেদক: গ্রামের বাড়িতে যদি পুরনো ঢেঁকি পড়ে থাকে, পরিবারের কী করা উচিত?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
প্রথমে সেটিকে ফেলে না দিয়ে তার ইতিহাস জানুন। কে ব্যবহার করতেন, কত বছর আগে তৈরি হয়েছিল, কোন কাঠ দিয়ে তৈরি—এসব তথ্য লিখে রাখুন।
সম্ভব হলে ছবি তুলুন। পরিবারের প্রবীণ সদস্যের স্মৃতি রেকর্ড করুন।
যদি ঢেঁকিটি এখনও ব্যবহারযোগ্য হয় এবং নিরাপদভাবে ব্যবহার করার জ্ঞান থাকে, তাহলে বিশেষ অনুষ্ঠানে বা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আর যদি একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়, সেটিকে ফেলে দেওয়ার আগে স্থানীয় সংগ্রহশালা, সাংস্কৃতিক সংগঠন বা ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
প্রতিবেদক: ঢেঁকিকে কেন্দ্র করে কি ছোট ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
সীমিত পরিসরে অবশ্যই পারে। যেমন ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি বিশেষ খাদ্যপণ্য, স্থানীয় চাল, চালের গুঁড়ো বা পিঠের উপকরণকে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড হিসেবে বাজারজাত করা যায়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘ঢেঁকিতে তৈরি’ কথাটি যেন শুধু বিপণনের কৌশল না হয়। সত্যিই যদি ঐ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তবেই সেই পরিচয় ব্যবহার করা উচিত।
ভোক্তার বিশ্বাস নষ্ট হলে ঐতিহ্যবাহী পণ্যের বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রতিবেদক: আজকের তরুণদের জন্য ঢেঁকির কী শিক্ষা রয়েছে?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—প্রযুক্তি শুধু আধুনিক কারখানায় তৈরি হয় না। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়েও প্রযুক্তি তৈরি হয়।
ঢেঁকি খুব সাধারণ দেখতে। কিন্তু তার মধ্যে লিভার, ভারসাম্য, শক্তি স্থানান্তর এবং মানবশ্রমের দক্ষ ব্যবহার রয়েছে।
একজন তরুণ যদি এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করে, সে বুঝতে পারবে—নিজের গ্রামের পুরনো জিনিসগুলোর মধ্যেও বিজ্ঞান লুকিয়ে থাকতে পারে।
প্রতিবেদক: শেষ প্রশ্ন। ভবিষ্যতে আপনি ঢেঁকিকে কোথায় দেখতে চান?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
আমি চাই না ঢেঁকি শুধু জাদুঘরের কাচের বাক্সে বন্দি হয়ে থাকুক। আবার এটাও চাই না যে আধুনিক যন্ত্র বাদ দিয়ে সবাইকে অতীতে ফিরে যেতে বলা হোক।
আমি চাই, ঢেঁকির জ্ঞানটি বেঁচে থাকুক।
কোনো গ্রামীণ সংগ্রহশালায় একটি আসল ঢেঁকি থাকবে। কোনো পর্যটনকেন্দ্রে মানুষ সেটির কাজ দেখবে। কোনো স্কুলের বিজ্ঞান প্রকল্পে শিশুরা লিভারের নীতি বুঝবে। কোনো কারিগর পুরনো নকশা দেখে নতুন একটি ঢেঁকি তৈরি করতে পারবে। কোনো পরিবার তাদের পূর্বপুরুষের ব্যবহৃত ঢেঁকির গল্প সংরক্ষণ করবে।
তাহলেই একটি পুরনো প্রযুক্তি শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে না; নতুন প্রজন্মের শিক্ষার অংশ হয়ে উঠবে।
প্রতিবেদক: পাঠকদের উদ্দেশে আপনার শেষ বার্তা কী?
ড. অনিরুদ্ধ মণ্ডল:
আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করব, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আধুনিক হওয়ার অর্থ অতীতকে ভুলে যাওয়া নয়।
আমাদের বাড়ির পুরনো কাঠের যন্ত্র, কৃষির পুরনো পদ্ধতি, রান্নার পুরনো সরঞ্জাম—এসবের মধ্যে হয়তো আমাদের পূর্বপুরুষদের বহু বছরের অভিজ্ঞতা লুকিয়ে আছে।
সব পুরনো জিনিসকে সংরক্ষণ করতে হবে এমন নয়। কিন্তু যেগুলোর মধ্যে ইতিহাস, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে, সেগুলোকে অন্তত নথিভুক্ত করা দরকার।
ঢেঁকির শব্দ হয়তো আর আগের মতো প্রতিটি গ্রামে শোনা যায় না। কিন্তু সেই শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের স্মৃতি, শ্রম এবং প্রযুক্তির ইতিহাস যেন হারিয়ে না যায়—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদকের শেষকথা
গ্রামবাংলার পরিবর্তনের ইতিহাস শুধু বড় রাস্তা, বিদ্যুৎ, মোবাইল ফোন কিংবা আধুনিক যন্ত্রের ইতিহাস নয়। এর আরেকটি দিক রয়েছে—যে সমস্ত ছোট ছোট প্রযুক্তি একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
ঢেঁকি সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আজকের প্রজন্মের কাছে এটি হয়তো একটি অদ্ভুত কাঠের যন্ত্র। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, এর মধ্যে রয়েছে মানুষের পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, শ্রম, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস।
সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তি বদলাবে, মানুষের কাজের ধরন বদলাবে, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতিও বদলাবে। কিন্তু অতীতের প্রযুক্তিগুলোকে নথিভুক্ত করে রাখা আমাদের বর্তমানকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
হয়তো একদিন কোনো গ্রামের পুরনো বাড়ির কোণে পড়ে থাকা ঢেঁকিকে দেখে একটি শিশু প্রশ্ন করবে—“এটা কীভাবে কাজ করত?”
সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো ইতিহাস যদি আমরা আজ সংরক্ষণ করে রাখতে পারি, তাহলেই হারিয়ে যাওয়া প্রযুক্তির একটি অংশ ভবিষ্যতের কাছে বেঁচে থাকবে।













Leave a Reply