
এক সময় পাড়ার গলি, বাড়ির উঠোন কিংবা গ্রামের মাটির রাস্তার পাশে চক, কাঠকয়লা বা একটি ছোট কাঠি দিয়ে মাটিতে কয়েকটি ঘর আঁকা হলেই শুরু হয়ে যেত খেলা। খেলোয়াড়ের হাতে থাকত ছোট একটি পাথর বা ইটের টুকরো। তারপর এক পায়ে লাফাতে লাফাতে একের পর এক ঘর পার হওয়ার চেষ্টা।
এই সহজ অথচ আনন্দময় খেলাটিই বাংলায় বহু জায়গায় পরিচিত ছিল এক্কা-দোক্কা নামে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এর নানা রকম নাম ও নিয়ম রয়েছে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এর অনুরূপ খেলা ‘হপস্কচ’ নামে পরিচিত।
আজকের শিশুদের কাছে এই খেলাটি অনেকটাই অপরিচিত। কিন্তু একসময় এক্কা-দোক্কা ছিল পাড়ার শিশুদের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন।
মাটিতে আঁকা হতো খেলার ঘর
এক্কা-দোক্কার জন্য প্রথমেই দরকার হতো একটি খোলা জায়গা। মাটিতে কাঠি দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে কয়েকটি ঘর আঁকা হতো।
ঘরগুলোর বিন্যাস অঞ্চলভেদে আলাদা হতে পারত। কোথাও একটির পর একটি ঘর, কোথাও পাশাপাশি দুটি ঘর, আবার কোথাও সংখ্যাযুক্ত কয়েকটি ঘর তৈরি করা হতো।
এরপর একজন খেলোয়াড় একটি ছোট পাথর বা অনুরূপ বস্তু নির্দিষ্ট ঘরে ছুড়ে দিত।
খেলার নিয়ম অনুযায়ী সেই ঘরটি এড়িয়ে বাকি ঘরগুলোতে এক পায়ে লাফিয়ে এগিয়ে যেতে হতো। ফেরার সময়ও ভারসাম্য বজায় রেখে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ফিরে আসতে হতো।
শুনতে সহজ হলেও খেলার সময় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা খুব স্বাভাবিক ছিল।
একটি ছোট পাথরেই জমত প্রতিযোগিতা
এক্কা-দোক্কার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর সরঞ্জামের সরলতা।
একটি ছোট পাথর, ভাঙা ইটের টুকরো কিংবা হাতের কাছে পাওয়া কোনো ছোট বস্তুই অনেক সময় খেলার ‘গুটি’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
খেলার আগে বিশেষ খেলনা কেনার দরকার ছিল না। মাঠ বা উঠোনে দাগ কেটে নিলেই প্রস্তুত হয়ে যেত খেলার জায়গা।
এই কারণেই অর্থনৈতিকভাবে বিভিন্ন পরিবারের শিশুরা সহজেই খেলাটিতে অংশ নিতে পারত।
ভারসাম্যের পরীক্ষা
এক্কা-দোক্কা মূলত শরীরের ভারসাম্য এবং নিয়ন্ত্রণের একটি চমৎকার অনুশীলন।
এক পায়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে হয়। একই সঙ্গে চোখ রাখতে হয় কোন ঘরে পা পড়ছে তার দিকে।
কখনও পাশাপাশি দুটি ঘর থাকলে নিয়ম অনুযায়ী দুই পা ব্যবহার করার সুযোগ মিলত। আবার পরের ঘরে যাওয়ার সময় ফের এক পায়ে লাফাতে হতো।
একটি ভুল পা পড়লেই পালা শেষ হয়ে যেতে পারত।
শিশুরা খেলতে খেলতেই নিজেদের শরীরের ভারসাম্য এবং গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে শিখত।
বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা
এক্কা-দোক্কা সাধারণত একাধিক খেলোয়াড় মিলে খেলত।
একজনের পালা শেষ হলে পরের খেলোয়াড় মাঠে নামত। কে কতদূর পর্যন্ত নিয়ম মেনে যেতে পারছে, কে গুটি সঠিক ঘরে ফেলতে পারছে—এসব নিয়েই তৈরি হতো প্রতিযোগিতা।
কখনও একজন খেলোয়াড় ভুল করলে অন্যরা মজা করে হাসত। আবার নিজের পালা এলে সেই খেলোয়াড়ও একইভাবে অন্য বন্ধুর ভুল নিয়ে হাসাহাসি করত।
তবে কয়েক মুহূর্তের প্রতিযোগিতার পরেই সবাই আবার একসঙ্গে খেলায় মেতে উঠত।
মেয়েদের মধ্যেও ছিল জনপ্রিয়
দেশি পাড়ার খেলাগুলোর মধ্যে এক্কা-দোক্কার একটি বিশেষ পরিচিতি ছিল। অনেক জায়গায় এটি মেয়েদের মধ্যেও অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।
বাড়ির উঠোন বা পাড়ার অপেক্ষাকৃত ছোট জায়গাতেও খেলা সম্ভব হওয়ায় বড় মাঠের প্রয়োজন হতো না।
ফলে অনেক পরিবারে বিকেলের অবসর সময়ে মেয়েদের দল এক্কা-দোক্কা খেলত।
এই খেলাকে ঘিরে বন্ধুত্ব, গল্প, হাসি এবং প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে তৈরি হতো এক প্রাণবন্ত পরিবেশ।
এক্কা-দোক্কার নানা আঞ্চলিক রূপ
ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের এক পায়ে লাফিয়ে ঘর পার হওয়ার খেলার নানা নাম রয়েছে।
বাংলায় এক্কা-দোক্কা নামটি পরিচিত হলেও অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহৃত হয়। কোথাও খেলার ঘরের সংখ্যা ও বিন্যাস বদলে যায়, কোথাও গুটি ছোড়ার নিয়মে পার্থক্য দেখা যায়।
এমনকি একই অঞ্চলের দুটি পাড়াতেও খেলার নিয়ম একরকম নাও হতে পারে।
এটাই ছিল লোকজ খেলাধুলার একটি সুন্দর বৈশিষ্ট্য—কোনও একক নিয়মের বই ছাড়াই স্থানীয় মানুষ নিজেদের মতো করে খেলাটিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিয়ে যেত।
কেন এত আনন্দ ছিল?
আজকের দিনে কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন—মাটিতে কয়েকটি ঘর আঁকা আর একটি পাথর নিয়ে খেলায় এত আনন্দ কীভাবে পাওয়া সম্ভব?
উত্তরটি লুকিয়ে আছে তখনকার সামাজিক জীবনে।
শিশুরা একসঙ্গে খেলত। তারা নিজেদের নিয়ম বানাত, নিজেদের মধ্যে বিচার করত এবং নিজেরাই সমস্যার সমাধান করত।
খেলার পাশাপাশি চলত গল্প, হাসি-ঠাট্টা এবং বন্ধুত্ব।
অর্থাৎ এক্কা-দোক্কা ছিল শুধু শারীরিক খেলা নয়; এটি ছিল সামাজিক যোগাযোগেরও একটি মাধ্যম।
মোবাইলের যুগে হারিয়ে যাচ্ছে উঠোনের খেলা
বর্তমানে শিশুদের অবসর কাটানোর পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
স্মার্টফোন ও অনলাইন গেমের পাশাপাশি টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল বিনোদন শিশুদের অনেক সময় ঘরের মধ্যে আটকে রাখে।
শহরাঞ্চলে খোলা উঠোন বা পাড়ার ফাঁকা জায়গাও আগের মতো নেই।
ফলে এক্কা-দোক্কার মতো খেলাগুলো অনেক জায়গায় আর নিয়মিত দেখা যায় না।
যে দাগগুলো একসময় বিকেল হলেই মাটিতে ফুটে উঠত, সেখানে এখন হয়তো কংক্রিটের রাস্তা বা গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে।
খেলাটির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব
এক্কা-দোক্কাকে ফিরিয়ে আনতে খুব বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই।
স্কুলের মাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা পাড়ার উৎসবে কয়েকটি ঘর এঁকে শিশুদের খেলাটি শেখানো যেতে পারে।
খেলার আগে তাদের এর ইতিহাস ও পুরনো দিনের ব্যবহার সম্পর্কে বলা যেতে পারে।
এতে শিশুরা শুধু একটি নতুন খেলা শিখবে না, বরং জানতে পারবে তাদের আগের প্রজন্ম কীভাবে অবসর কাটাত।
নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ
পুরনো দিনের খেলায় ব্যবহৃত পাথর বা ইটের টুকরো সবসময় নিরাপদ নাও হতে পারে। তাই বর্তমানে খেলাটি আয়োজন করলে ছোট ও হালকা গুটি ব্যবহার করা ভালো।
খেলার জায়গাটি সমতল হওয়া উচিত এবং আশেপাশে গাড়ি, ধারালো বস্তু বা অন্য কোনো বিপজ্জনক জিনিস থাকা উচিত নয়।
শিশুদের বয়স অনুযায়ী খেলার নিয়মও সহজ করা যেতে পারে।
শুধু খেলা নয়, স্মৃতির দরজাও খুলে দেয়
এক্কা-দোক্কার কথা উঠলেই বহু মানুষের মনে পড়ে যেতে পারে তাঁদের ছোটবেলার বিকেল।
মাটিতে আঁকা ঘর, হাতে ছোট পাথর, এক পায়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাওয়া, ভুল হলে বন্ধুদের হাসি—এসব স্মৃতি সময় পেরিয়ে গেলেও মনের মধ্যে থেকে যায়।
এই ধরনের খেলাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আনন্দ সবসময় ব্যয়বহুল খেলনা বা প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে না।
কখনও কয়েকটি মাটির দাগই যথেষ্ট ছিল একটি গোটা বিকেলকে আনন্দে ভরিয়ে দেওয়ার জন্য।
হারিয়ে যাওয়া খেলাকে মনে রাখা
এক্কা-দোক্কার মতো খেলাগুলো হয়তো একদিন সম্পূর্ণভাবে দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এগুলোর ইতিহাস লিখে রাখা, প্রবীণদের স্মৃতি সংগ্রহ করা এবং শিশুদের মাঝে পরিচিত করে তোলা গেলে ঐতিহ্যটি বেঁচে থাকবে।
বিদ্যালয়ে ‘পুরনো দিনের খেলা’ নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। সেখানে এক্কা-দোক্কার পাশাপাশি অন্যান্য দেশি খেলাও রাখা যেতে পারে।
এভাবে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পুরনো প্রজন্মের একটি সুন্দর সাংস্কৃতিক যোগাযোগ তৈরি হতে পারে।
আবার উঠোনে আঁকা হোক সেই ঘর
এক্কা-দোক্কা আমাদের শেখায়—খেলার জন্য সবসময় বড় মাঠ দরকার হয় না।
একটু জায়গা, কয়েকটি দাগ, একটি ছোট গুটি আর কয়েকজন বন্ধু থাকলেই আনন্দ শুরু হতে পারে।
আজ যখন শিশুদের জীবনে প্রযুক্তির উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে, তখন পুরনো দিনের এমন খেলাগুলোকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
হয়তো কোনো এক বিকেলে আবার দেখা যাবে—একটি উঠোনে কয়েকটি ঘর আঁকা হয়েছে, হাতে ছোট গুটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একদল শিশু। প্রথম খেলোয়াড় গুটি ছুড়ে দিয়ে এক পায়ে লাফাতে শুরু করেছে।
মাটির উপর আঁকা সেই ছোট ছোট ঘর তখন শুধু একটি খেলার মাঠ হবে না—হয়ে উঠবে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের এক সেতুবন্ধন।












Leave a Reply