
একজন চিকিৎসকের কাজ শুধু রোগ নির্ণয় করা বা ওষুধ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসা কখনও কখনও হয়ে ওঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দীর্ঘ সামাজিক দায়িত্ব। ভারতের ক্যানসার চিকিৎসার ইতিহাসে ড. ভি. শান্তা এমনই এক চিকিৎসক, যাঁর জীবন চিকিৎসাবিজ্ঞান, মানবিকতা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
চেন্নাইয়ের আদয়ার ক্যানসার ইনস্টিটিউট-এর সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ক্যানসার চিকিৎসাকে কেবল বড় শহরের ধনী মানুষের পরিষেবা না রেখে সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তাঁর কর্মজীবনের কেন্দ্রে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস—রোগীর আর্থিক সামর্থ্য যেন চিকিৎসা পাওয়ার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
চিকিৎসক হওয়ার সিদ্ধান্ত
ভি. শান্তার জন্ম ১৯২৭ সালে চেন্নাইয়ে। তাঁর পরিবারে শিক্ষার পরিবেশ ছিল এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগও ছিল।
তিনি মাদ্রাজ মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। সেই সময়ে একজন নারীর চিকিৎসক হওয়া অবশ্যই উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও বড়—চিকিৎসাবিদ্যাকে মানুষের সেবার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা।
চিকিৎসাশিক্ষা শেষ করার পর তিনি সাধারণ চিকিৎসা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে ক্যানসার চিকিৎসার দিকে এগিয়ে আসেন।
ক্যানসার চিকিৎসার কঠিন সময়
যে সময়ে ড. শান্তা চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, ভারতে ক্যানসার চিকিৎসার পরিকাঠামো আজকের মতো উন্নত ছিল না।
ক্যানসার সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব ছিল। অনেক রোগী রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতেন না। আবার চিকিৎসার খরচ, হাসপাতালের অভাব এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতার কারণে বহু মানুষ যথাযথ পরিষেবা থেকে দূরে থাকতেন।
এই বাস্তবতা ড. শান্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
তিনি বুঝেছিলেন, ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু হাসপাতালের চার দেওয়ালের মধ্যে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার চিকিৎসা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, সচেতনতা এবং সাধারণ মানুষের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা।
আদয়ার ক্যানসার ইনস্টিটিউট
১৯৫৪ সালে চেন্নাইয়ের আদয়ারে ক্যানসার ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে ছিলেন চিকিৎসক ড. মুথুলক্ষ্মী রেড্ডি এবং তাঁর উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আরও অনেক মানুষ।
ড. ভি. শান্তা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তী কয়েক দশকে প্রতিষ্ঠানটির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি দীর্ঘদিন এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কর্মজীবনের বড় অংশ কেটেছে এই হাসপাতালকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কাজে, যেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি গবেষণা ও প্রশিক্ষণও সমান গুরুত্ব পায়।
চিকিৎসা শুধু ধনীদের জন্য নয়
ড. শান্তার কাজের একটি বিশেষ দিক ছিল ক্যানসার চিকিৎসার সামাজিক চরিত্রকে গুরুত্ব দেওয়া।
ভারতের মতো দেশে আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের একজন রোগীর কাছে ক্যানসারের চিকিৎসা অনেক সময় বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। চিকিৎসার পাশাপাশি ওষুধ, পরীক্ষা, যাতায়াত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার খরচও থাকে।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখে আদয়ার ক্যানসার ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন আর্থিক স্তরের মানুষের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ড. শান্তার কাছে রোগী ছিলেন প্রথমত একজন মানুষ। তাঁর আর্থিক পরিচয় চিকিৎসার অধিকার নির্ধারণ করবে—এই ধারণার সঙ্গে তিনি একমত ছিলেন না।
চিকিৎসা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ
ক্যানসারের মতো জটিল রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শুধু চিকিৎসা পরিষেবা যথেষ্ট নয়। নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা, রোগের কারণ বোঝা এবং দক্ষ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করাও জরুরি।
ড. শান্তা এই তিনটি ক্ষেত্রকে সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
আদয়ার ক্যানসার ইনস্টিটিউট চিকিৎসা পরিষেবার পাশাপাশি গবেষণা ও চিকিৎসা-প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
এর ফলে ক্যানসার চিকিৎসার জ্ঞান শুধু একটি হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর চিকিৎসাক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়।
প্রাথমিক শনাক্তকরণের গুরুত্ব
ক্যানসারের ক্ষেত্রে রোগ যত দ্রুত শনাক্ত করা যায়, অনেক ধরনের ক্যানসারে চিকিৎসার সম্ভাবনাও তত বাড়তে পারে। কিন্তু বহু মানুষ রোগের লক্ষণকে গুরুত্ব না দিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন।
ড. শান্তা ক্যানসার সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
নারীদের ক্ষেত্রে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, নিয়মিত পরীক্ষা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার গুরুত্ব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া ছিল তাঁর বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য ভাবনার অংশ।
গ্রাম ও প্রান্তিক মানুষের কথা
ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বড় শহরগুলিতে কেন্দ্রীভূত থাকলে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
এই সমস্যা দূর করার জন্য ক্যানসার চিকিৎসা ও সচেতনতার পরিসর আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেছিলেন।
শহরের বড় হাসপাতালের পাশাপাশি মানুষের নিজস্ব এলাকায় রোগ সম্পর্কে সচেতনতা, প্রাথমিক পরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ—এসব বিষয় তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
এভাবে তিনি ক্যানসারকে শুধু হাসপাতালের রোগ হিসেবে নয়, একটি বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখেছিলেন।
একজন নারী চিকিৎসকের দীর্ঘ কর্মজীবন
ড. শান্তার কর্মজীবন ছিল কয়েক দশকব্যাপী। এই দীর্ঘ সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রযুক্তি যেমন বদলেছে, তেমনই বদলেছে ক্যানসার চিকিৎসার পদ্ধতি।
কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তিনি মানুষের প্রতি চিকিৎসার মূল দায়িত্বটিকে সামনে রেখেছিলেন।
একজন নারী হিসেবে তিনি যে সময়ে পেশাজীবন শুরু করেছিলেন, সেই সময় চিকিৎসাক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা আজকের তুলনায় অনেক কম ছিল। কিন্তু তাঁর পরিচয় শেষ পর্যন্ত একজন দক্ষ চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্বীকৃতি
ক্যানসার চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘ অবদানের জন্য ড. ভি. শান্তা বহু সম্মান পেয়েছেন।
ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ এবং পদ্মবিভূষণ-এর মতো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক সম্মানে ভূষিত করে।
তিনি র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারও পান। তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক স্তরেও স্বীকৃতি লাভ করে।
তবে তাঁর জীবনের মূল্যায়ন শুধু পুরস্কারের তালিকা দিয়ে করা যায় না। বহু বছর ধরে একটি প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তোলা এবং সাধারণ মানুষের জন্য ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর কাজই তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
চিকিৎসক থেকে প্রতিষ্ঠান নির্মাতা
ড. শান্তার বিশেষত্ব ছিল তিনি নিজের ব্যক্তিগত চিকিৎসা-সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি।
তিনি বুঝেছিলেন, একজন চিকিৎসক দিনে যতজন রোগীকে সরাসরি চিকিৎসা দিতে পারেন, একটি শক্তিশালী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে।
তাই তাঁর কাজের একটি বড় অংশ ছিল প্রতিষ্ঠান তৈরি ও শক্তিশালী করা।
হাসপাতাল, গবেষণাগার, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা—এই সমস্ত ক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি ক্যানসার চিকিৎসার একটি বিস্তৃত কাঠামো গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।
মানবিকতার জায়গা
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি যতই হোক, একজন রোগীর কাছে চিকিৎসা শেষ পর্যন্ত একটি মানবিক অভিজ্ঞতা।
রোগী যখন ক্যানসারের মতো গুরুতর রোগের কথা জানতে পারেন, তখন তাঁর পরিবারও মানসিক ও আর্থিক চাপে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের আচরণ, হাসপাতালের পরিবেশ এবং রোগীর প্রতি সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ড. শান্তার কর্মদর্শনে রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসার এই মানবিক দিকটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।
তাঁর জীবন থেকে যে শিক্ষা
ড. ভি. শান্তার জীবনকে কেবল একজন সফল চিকিৎসকের জীবনী হিসেবে দেখলে তাঁর বৃহত্তর কাজটি ধরা পড়ে না।
তিনি দেখিয়েছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সমাজসেবা একে অপরের থেকে আলাদা নয়। একটি হাসপাতাল একই সঙ্গে চিকিৎসা, গবেষণা, শিক্ষা এবং মানবসেবার কেন্দ্র হতে পারে।
তাঁর কর্মজীবন আরও দেখায়, বড় পরিবর্তন ঘটাতে সব সময় নতুন কোনো আবিষ্কার করাই একমাত্র পথ নয়। কখনও একটি প্রতিষ্ঠানকে বহু বছর ধরে সঠিক লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও সমাজের জন্য গভীর পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে।
পরবর্তী প্রজন্মের কাছে উত্তরাধিকার
আজ ভারতে ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে বহু উন্নত প্রযুক্তি এসেছে। রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি, সার্জারি, ইমিউনোথেরাপি এবং বিভিন্ন আধুনিক রোগনির্ণয় পদ্ধতি চিকিৎসার পরিসর বদলে দিয়েছে।
কিন্তু প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন মানবিক ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
ড. শান্তার জীবন সেই দিকটিই বারবার মনে করিয়ে দেয়—চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকৃত অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের মানুষের কাছে পৌঁছায়।
উপসংহার
ড. ভি. শান্তা ছিলেন এমন একজন চিকিৎসক, যাঁর কর্মজীবনের বিস্তার একটি হাসপাতালের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ক্যানসার চিকিৎসা, গবেষণা, চিকিৎসা-শিক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা—সব ক্ষেত্রেই তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো তাঁর পাওয়া পুরস্কার নয়; বরং একটি দীর্ঘ কর্মজীবন ধরে রোগীর পাশে থাকা এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে তোলার প্রচেষ্টা।
ভারতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে ড. ভি. শান্তার নাম তাই এক বিশেষ অধ্যায়। তিনি দেখিয়েছেন, চিকিৎসকের হাতে শুধু স্টেথোস্কোপ বা অস্ত্রোপচারের যন্ত্র থাকে না—থাকে একটি বৃহত্তর সমাজকে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাও।
মানুষের কষ্টকে নিজের পেশাগত দায়িত্বের কেন্দ্রে রেখে কয়েক দশক ধরে কাজ করে যাওয়া ড. শান্তার জীবন সেই সম্ভাবনারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।












Leave a Reply