শীলা শ্রী প্রকাশ: ভারতীয় স্থাপত্যে নারীর নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প।

একটি বাড়ি শুধু ইট, বালি, সিমেন্ট আর কংক্রিট দিয়ে তৈরি হয় না। একটি স্থাপত্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকে মানুষের জীবনযাপন, নিরাপত্তা, স্বপ্ন, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। সেই কারণেই স্থাপত্য কেবল একটি প্রযুক্তিগত পেশা নয়; এটি মানুষের জীবনকে সাজিয়ে দেওয়ার একটি সৃজনশীল কাজ।

ভারতের স্থাপত্যের ইতিহাসে শীলা শ্রী প্রকাশ এমন একজন নারী, যিনি সেই সৃজনশীল জগতের দরজা নারীদের জন্য আরও বিস্তৃত করেছিলেন। তিনি ভারতের প্রথমদিকের পেশাদার নারী স্থপতিদের অন্যতম এবং কয়েক দশক ধরে স্থাপত্য, নকশা ও নগর-পরিকল্পনার ক্ষেত্রে কাজ করেছেন।

তাঁর কর্মজীবনের বিশেষত্ব শুধু তিনি একজন নারী স্থপতি ছিলেন—এখানেই নয়। তাঁর কাজের মধ্যে পরিবেশ, মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক প্রয়োজন এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে একসঙ্গে বিবেচনা করার প্রবণতা ছিল।

স্থাপত্যের পথে যাত্রা

শীলা শ্রী প্রকাশ এমন এক সময়ে স্থাপত্যের জগতে প্রবেশ করেন, যখন এই পেশায় নারীদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং পেশাদার স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথও সহজ ছিল না।

তবু তিনি স্থাপত্যকে নিজের কর্মজীবনের কেন্দ্র করে নেন।

স্থাপত্য নিয়ে পড়াশোনার সময় থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল শুধু সুন্দর ভবন তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি ভবন কীভাবে মানুষের ব্যবহার, পরিবেশ এবং সামাজিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে—সেই বিষয়টিও তাঁর চিন্তার অংশ হয়ে ওঠে।

নিজের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান

১৯৭০ সালে তিনি নিজের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান Shilpa Architects Planners Designers প্রতিষ্ঠা করেন। এটি তাঁর পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

নিজের প্রতিষ্ঠান তৈরি করার অর্থ ছিল শুধু স্বাধীনভাবে ভবন নকশা করা নয়। একই সঙ্গে স্থাপত্যের নিজস্ব ধারণা ও দর্শনকে বাস্তব কাজে প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি করা।

শীলা শ্রী প্রকাশের কাজের মধ্যে তাই ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার পাশাপাশি একটি বৃহত্তর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও দেখা যায়।

স্থাপত্যে মানুষের জীবন

একজন স্থপতি যখন একটি বাড়ি, বিদ্যালয়, হাসপাতাল কিংবা অন্য কোনো ভবনের নকশা করেন, তখন তাঁকে অনেকগুলি বিষয় বিবেচনা করতে হয়।

আলো কোথা থেকে আসবে? বাতাস চলাচল করবে কীভাবে? মানুষ কীভাবে ভবনটি ব্যবহার করবে? স্থানটি কতটা নিরাপদ? ভবিষ্যতে এর রক্ষণাবেক্ষণ কতটা সহজ হবে?

শীলা শ্রী প্রকাশের স্থাপত্যচিন্তায় এই ব্যবহারিক প্রশ্নগুলির পাশাপাশি পরিবেশগত বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।

তাঁর কাজের মধ্যে প্রাকৃতিক আলো, বায়ু চলাচল, স্থানীয় উপকরণ এবং পরিবেশের সঙ্গে ভবনের সম্পর্কের মতো বিষয় দেখা যায়।

পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যের ধারণা

আজ ‘সাস্টেইনেবল আর্কিটেকচার’ বা পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য একটি পরিচিত ধারণা। কিন্তু কয়েক দশক আগে এই বিষয়টি নিয়ে এত ব্যাপক আলোচনা ছিল না।

শীলা শ্রী প্রকাশ সেই সময় থেকেই পরিবেশের সঙ্গে স্থাপত্যের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতেন।

একটি ভবন তৈরির সময় শুধু কতটা জায়গা পাওয়া যাচ্ছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; ভবনটি তার চারপাশের পরিবেশকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের ব্যবহার, শক্তির সাশ্রয় এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নকশা করা—এসব চিন্তা তাঁর স্থাপত্যের দর্শনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে আধুনিকতার সম্পর্ক

ভারতের স্থাপত্যে একটি বড় প্রশ্ন হলো—আধুনিক স্থাপত্য তৈরি করতে গিয়ে কীভাবে দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিবেশকে ধরে রাখা যায়?

শীলা শ্রী প্রকাশের কাজের মধ্যে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা দেখা যায়।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ু, জীবনযাত্রা এবং নির্মাণপ্রথা এক নয়। উত্তর ভারতের শুষ্ক পরিবেশ, দক্ষিণ ভারতের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া কিংবা উপকূলীয় অঞ্চলের নির্মাণপ্রয়োজন—সবকিছুর আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তাই একটি নির্দিষ্ট নকশা সব জায়গায় প্রয়োগ না করে স্থানীয় পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

নারী স্থপতি হিসেবে পথচলা

শীলা শ্রী প্রকাশের কর্মজীবনের সময় স্থাপত্য ছিল এমন একটি পেশা যেখানে পুরুষদের উপস্থিতি ছিল প্রবল।

একজন নারীকে পেশাগতভাবে নিজের জায়গা তৈরি করতে হলে শুধু স্থাপত্যের জ্ঞান থাকলেই চলত না। তাঁকে নিজের দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও প্রতিষ্ঠিত করতে হতো।

তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সেই নেতৃত্বের সুযোগ নিজেই তৈরি করেছিলেন।

এর ফলে পরবর্তী প্রজন্মের বহু নারী স্থপতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি হয়।

নগর-পরিকল্পনার দিকে অগ্রসর হওয়া

স্থাপত্যের পাশাপাশি শীলা শ্রী প্রকাশ বৃহত্তর নগর-পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করেছেন।

একটি শহর কেবল বড় বড় ভবনের সমষ্টি নয়। সেখানে রাস্তা, আবাসন, পরিবহন, জল, সবুজ এলাকা, জনসাধারণের স্থান এবং মানুষের চলাচলের মধ্যে একটি সম্পর্ক থাকে।

শহর পরিকল্পনা ভুল হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।

এই কারণে নগর-পরিকল্পনায় মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীলা শ্রী প্রকাশের কাজের মধ্যে এই মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।

‘Human-centered’ স্থাপত্য

স্থাপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো—ভবন মানুষের জন্য। ভবন যত সুন্দরই হোক, ব্যবহারকারীর প্রয়োজন পূরণ করতে না পারলে সেই নকশার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ হয় না।

শীলা শ্রী প্রকাশ মানুষের জীবনযাত্রাকে স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত করার দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

পরিবার কীভাবে একটি বাড়ি ব্যবহার করবে, শিশুরা কীভাবে একটি বিদ্যালয়ের পরিবেশে বেড়ে উঠবে, বয়স্ক মানুষ কীভাবে চলাফেরা করবেন—এই ধরনের প্রশ্ন স্থাপত্যকে আরও মানবিক করে তোলে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি

শীলা শ্রী প্রকাশের কাজ শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্থাপত্য ও নগর-পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আলোচনা ও উদ্যোগের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

তিনি দেখিয়েছেন, ভারতীয় স্থাপত্যের নিজস্ব অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব ও মানবকেন্দ্রিক নকশার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

ভারতের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল দেশে নগরায়ণ এবং পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি করা যায়—এই প্রশ্ন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তি ও স্থাপত্য

সময়ের সঙ্গে স্থাপত্যের প্রযুক্তি দ্রুত বদলেছে। কম্পিউটার-ভিত্তিক ডিজাইন, নতুন নির্মাণসামগ্রী, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং স্মার্ট বিল্ডিংয়ের মতো ধারণা স্থাপত্যকে অনেক পরিবর্তন করেছে।

তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, স্থাপত্যের মূল প্রশ্ন একই থাকে—মানুষ কীভাবে সেই স্থান ব্যবহার করবে এবং পরিবেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী হবে?

শীলা শ্রী প্রকাশের কাজের গুরুত্ব এখানেই। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেও মানবিক ও পরিবেশগত প্রয়োজনকে কেন্দ্রে রাখা যায়।

তরুণীদের জন্য অনুপ্রেরণা

আজ স্থাপত্য শিক্ষায় বহু নারী পড়াশোনা করছেন এবং পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন। কিন্তু কয়েক দশক আগে এই পথ এতটা সহজ ছিল না।

শীলা শ্রী প্রকাশের কর্মজীবন দেখায়, কোনো পেশায় প্রতিনিধিত্ব কম থাকলেও সেই ক্ষেত্রকে নিজের জন্য বেছে নেওয়া সম্ভব।

নিজের প্রতিষ্ঠান তৈরি, দীর্ঘদিন কাজ করা এবং নিজের চিন্তাধারাকে বাস্তব প্রকল্পে প্রয়োগ করার মাধ্যমে তিনি একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছেন।

তাঁর জীবন তরুণীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—পেশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণার সীমা মেনে চলার প্রয়োজন নেই।

স্থাপত্যের বাইরে বৃহত্তর দায়িত্ব

একজন স্থপতির কাজের প্রভাব একটি ভবনের বাইরেও যায়। একটি ভালোভাবে পরিকল্পিত বিদ্যালয় শিক্ষার পরিবেশ বদলাতে পারে। একটি হাসপাতালের সঠিক নকশা রোগী ও চিকিৎসাকর্মীদের কাজ সহজ করতে পারে। একটি ভালো আবাসন মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে।

এই কারণেই স্থাপত্যের সামাজিক গুরুত্ব অনেক বেশি।

শীলা শ্রী প্রকাশের কাজ আমাদের সেই বৃহত্তর দায়িত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

উপসংহার

শীলা শ্রী প্রকাশের জীবন ভারতীয় স্থাপত্যে নারীর পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এমন এক সময়ে তিনি পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন, যখন স্থাপত্য ছিল মূলত পুরুষ-প্রধান ক্ষেত্র। নিজের দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং সৃজনশীলতার মাধ্যমে তিনি সেখানে নিজের জায়গা তৈরি করেন।

কিন্তু তাঁর অবদান শুধু নারী স্থপতি হিসেবে পথ দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবেশবান্ধব নকশা, মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে স্থাপত্যের সম্পর্ক এবং নগর-পরিকল্পনার বৃহত্তর প্রশ্ন নিয়ে তাঁর কাজ স্থাপত্যকে আরও বিস্তৃত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত করেছে।

একটি সুন্দর ভবন চোখে আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু একটি ভালো স্থাপত্য মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে। শীলা শ্রী প্রকাশের কাজ সেই দ্বিতীয় অর্থটিকেই সামনে নিয়ে আসে।

তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন প্রমাণ করে, স্থাপত্য শুধু ভবন নির্মাণের শিল্প নয়—এটি মানুষ, সমাজ এবং পরিবেশের মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরির মাধ্যম। আর সেই সম্পর্ক নির্মাণে একজন নারী স্থপতির নেতৃত্বও সমান শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *