গল্প : মাটির ঘ্রাণে যে স্বপ্ন।।

পশ্চিম মেদিনীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রাম—নাম কুসুমডাঙা। গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল কয়েকটি কুমোরের বাড়ি। বর্ষায় কাদা, শীতে ধুলো আর গ্রীষ্মে ফেটে যাওয়া মাটির রাস্তা—এই ছিল তাদের জীবন।

সেই গ্রামেরই ছেলে নীলয়। বয়স মাত্র চৌদ্দ।

তার বাবা হরিপদ কুমোর। সারাদিন মাটির সঙ্গে লড়াই করে সংসার চালাতেন। ভোরে ঘুম থেকে উঠে পুকুরপাড়ের মাটি সংগ্রহ করা, তা ছেঁকে নেওয়া, মেখে রাখা, তারপর চাক ঘুরিয়ে একের পর এক হাঁড়ি, কলসি, প্রদীপ, ফুলদানি তৈরি করা—এই ছিল তাঁর প্রতিদিনের কাজ।

নীলয় ছোট থেকেই বাবার কাজ দেখত।

কিন্তু তার একটা প্রশ্ন ছিল।

একদিন সে বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—“বাবা, এত সুন্দর জিনিস বানাও, কিন্তু আমাদের বাড়িতে এত অভাব কেন?”

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

—“কারণ আমরা মাটি দিয়ে জিনিস বানাতে জানি, কিন্তু সেই জিনিসের মূল্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে জানি না।”

নীলয় কথাটা পুরোপুরি বুঝতে পারল না।

তবে কথাটা তার মনে গেঁথে গেল।

পুরোনো চাক

হরিপদের কুমোরের চাকটি ছিল বহু বছরের পুরোনো।

চাক ঘোরাতে পা দিয়ে বারবার চাপ দিতে হত। একটু অসাবধান হলেই চাকের গতি কমে যেত।

একদিন নীলয় বাবাকে বলল,

—“বাবা, চাকটা কি একটু অন্যভাবে বানানো যায় না?”

বাবা হেসে বললেন,

—“আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য নতুন চাক কোথায়?”

নীলয় বলল,

—“নতুন কিনতে হবে না। পুরোনোটাকেই বদলানো যায় কি না দেখি।”

হরিপদ ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

—“তুই পড়াশোনা কর। এসব নিয়ে মাথা ঘামাস না।”

কিন্তু নীলয় মাথা ঘামানো বন্ধ করল না।

স্কুলের বিজ্ঞান বই খুলে সে বিভিন্ন ধরনের চাকা, গতি ও যন্ত্রের ছবি দেখতে লাগল।

তারপর গ্রামের পুরোনো সাইকেলের দোকান থেকে কয়েকটি অকেজো যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করল।

তার বন্ধু সুমনও তাকে সাহায্য করতে শুরু করল।

দু’জনে মিলে একটা ছোট মডেল বানাল।

প্রথম দিনেই সেটা ভেঙে গেল।

দ্বিতীয় দিনেও।

তৃতীয় দিনেও।

সুমন বিরক্ত হয়ে বলল,

—“আর করিস না। হবে না।”

নীলয় বলল,

—“একদিনে না হলে দশ দিনে হবে।”

—“আর দশ দিনেও না হলে?”

নীলয় মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,

—“তাহলে একশো দিন চেষ্টা করব।”

বাবার অসুস্থতা

এর মধ্যেই হরিপদ অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

কয়েকদিন চাক ঘোরাতে না পারায় কাজ বন্ধ হয়ে গেল।

সংসারে টান পড়ল।

নীলয়ের মা বললেন,

—“তুই যদি বাবার সঙ্গে একটু কাজ করিস, কিছু টাকা আসত।”

নীলয় স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজ শুরু করল।

কিন্তু চাক ঘোরাতে ঘোরাতে তার পা ব্যথা হয়ে যেত।

একদিন সন্ধ্যায় সে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল।

বাবা বললেন,

—“বুঝলি তো, এই কাজটা কত কঠিন?”

নীলয় মাথা নাড়ল।

—“হ্যাঁ বাবা।”

—“তাই বলি, তুই অন্য কিছু কর। পড়াশোনা করে বড় হ।”

নীলয় বাবার হাত ধরে বলল,

—“আমি বড় হবই। কিন্তু তোমার কাজটাকেও বড় করব।”

হরিপদ কিছু বললেন না।

শুধু ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।

পরিবর্তনের শুরু

কয়েক সপ্তাহ পর নীলয় তার তৈরি মডেলটি আবার বানাল।

এবার সে সাইকেলের পুরোনো বেয়ারিং ব্যবহার করল। চাকের ঘর্ষণ কমানোর চেষ্টা করল।

মডেলটি ঘোরাতেই চাক আগের তুলনায় অনেক সহজে ঘুরতে লাগল।

নীলয় দৌড়ে বাবাকে ডাকল।

—“বাবা! এসো!”

হরিপদ এসে দেখলেন।

নীলয় বলল,

—“এটা দিয়ে পা দিয়ে কম চাপ দিলেই চাক ঘুরবে।”

হরিপদ নিজে বসে চেষ্টা করলেন।

চাক ঘুরল।

তিনি অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।

—“তুই এটা কীভাবে করলি?”

নীলয় হেসে বলল,

—“বই দেখে।”

হরিপদের চোখে জল এসে গেল।

তিনি বললেন,

—“আমি তোকে পড়তে বলেছিলাম। তুই সত্যিই পড়েছিস।”

শুধু চাক নয়

কিন্তু নীলয়ের স্বপ্ন শুধু চাক বদলানোতে থামল না।

সে বুঝতে পারল, গ্রামের কুমোরদের আসল সমস্যা অন্য জায়গায়।

তাঁরা সুন্দর জিনিস তৈরি করেন, কিন্তু বিক্রি করতে পারেন না।

মাটির প্রদীপ, ফুলদানি, পুতুল, টব—সবকিছুই পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হয়।

নীলয় স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষককে বলল,

—“স্যার, মোবাইলে ছবি তুলে কি এই জিনিসগুলো বিক্রি করা যায়?”

শিক্ষক বললেন,

—“অবশ্যই যায়। তবে ভালো ছবি, সঠিক দাম আর মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা দরকার।”

সেদিন থেকে নীলয় গ্রামের কুমোরদের তৈরি জিনিসের ছবি তুলতে শুরু করল।

প্রতিটি জিনিসের নাম লিখল।

দাম লিখল।

কীভাবে তৈরি হয়, সেটাও লিখল।

তারপর পরিচিতদের মাধ্যমে শহরের মানুষের কাছে ছবিগুলো পাঠাতে লাগল।

প্রথমে অর্ডার এল মাত্র পাঁচটি প্রদীপের।

নীলয় খুশিতে বাবাকে বলল,

—“বাবা, পাঁচটা প্রদীপ শহরে যাবে!”

হরিপদ বললেন,

—“পাঁচটা দিয়ে কী হবে?”

নীলয় হেসে বলল,

—“শুরু তো হল।”

প্রথম বড় অর্ডার

কয়েক মাস পর পুজোর সময় শহরের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গ্রামের মাটির প্রদীপ ও পুতুলের ছবি দেখে যোগাযোগ করল।

তারা একসঙ্গে পাঁচশো প্রদীপ এবং একশো মাটির পুতুলের অর্ডার দিল।

গ্রামে যেন উৎসব শুরু হয়ে গেল।

যে বাড়িগুলোতে অনেকদিন চাক ঘোরেনি, সেখানে আবার মাটি মাখা শুরু হল।

বৃদ্ধ কুমোরেরা কাজে ফিরলেন।

মহিলারা প্রদীপে রং করতে শুরু করলেন।

ছোটরা মাটি শুকোতে সাহায্য করল।

নীলয় সব কাজ ভাগ করে দিল।

কেউ মাটি তৈরি করবে।

কেউ জিনিস বানাবে।

কেউ শুকোবে।

কেউ রং করবে।

কেউ প্যাক করবে।

কয়েকদিনের মধ্যে পাঁচশো প্রদীপ তৈরি হয়ে গেল।

অর্ডার পাঠানো হল শহরে।

টাকা এল সরাসরি গ্রামের মানুষের হাতে।

হরিপদ সেই টাকা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর ছেলেকে বললেন,

—“তুই শুধু আমার চাকটা বদলাসনি। তুই আমাদের কাজটার সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছিস।”

নতুন সকাল

এরপর কুসুমডাঙার কুমোরপাড়া ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।

গ্রামের মানুষ বুঝতে পারল, মাটির কাজ শুধু পুরোনো পেশা নয়।

এটা শিল্প।

এটা ঐতিহ্য।

এটা জীবিকা।

আর সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে এই শিল্প দিয়েও ভবিষ্যৎ তৈরি করা যায়।

নীলয় বড় হয়ে কী হবে, সে তখনও জানত না।

কেউ বলত ইঞ্জিনিয়ার হবে।

কেউ বলত ব্যবসায়ী হবে।

কেউ বলত শিল্পী হবে।

কিন্তু নীলয় শুধু বলত,

—“আমি এমন কিছু করতে চাই, যাতে আমাদের গ্রামের মানুষ নিজেদের কাজ নিয়ে গর্ব করতে পারে।”

বছর কয়েক পরে গ্রামের সেই পুরোনো কুমোরপাড়ায় একটি ছোট প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি হল।

দরজার সামনে কাঠের ফলকে লেখা হল—

“মাটির স্বপ্ন”

হরিপদ প্রতিদিন সেখানে বসে নতুন ছেলেমেয়েদের মাটির কাজ শেখাতেন।

আর দেওয়ালে টাঙানো ছিল তাঁর ছেলের বানানো সেই প্রথম ছোট মডেল চাকটি।

একদিন এক শিশু সেটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, এটা কী?”

হরিপদ মৃদু হেসে বললেন,

—“এটা একটা চাক নয় রে। এটা একটা স্বপ্নের শুরু।”

শিশুটি বুঝতে পারল না।

হরিপদ মাটির একটা দলা হাতে নিয়ে বললেন,

—“মাটি যেমন মানুষের হাতে আকার পায়, তেমনই স্বপ্নও চেষ্টা করলে আকার পায়।”

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে।

কুমোরপাড়ার প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলছে।

চাক ঘুরছে।

মাটি ঘুরছে।

মানুষের হাত চলছে।

আর সেই মাটির গন্ধের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে এক নতুন ভবিষ্যতের গন্ধ।

কারণ কখনও কখনও বড় পরিবর্তন বড় শহর থেকে আসে না—একটি ছোট গ্রামের মাটির ঘর থেকেও শুরু হতে পারে।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *