গল্প : লাল সিগন্যালের মানুষ।

মাধবপুর থেকে একটু দূরে ছিল একটি ছোট রেলস্টেশন। স্টেশনের নাম শিউলিডাঙা। সেখানে দিনে মাত্র কয়েকটি লোকাল ট্রেন থামত। স্টেশনটি এতটাই ছোট যে অনেক সময় ট্রেনের কামরার অর্ধেক যাত্রীও জানত না, তারা কোন স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে।

স্টেশনের পাশেই ছিল একটি রেলগেট।

সেই গেটের দায়িত্বে ছিলেন নিতাইবাবু

বয়স প্রায় পঞ্চান্ন।

প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে গেট বন্ধ করা, ট্রেন চলে গেলে আবার খুলে দেওয়া, সিগন্যাল দেখা—এই ছিল তাঁর কাজ।

কাজটা বাইরে থেকে খুব সাধারণ মনে হলেও নিতাইবাবু জানতেন, তাঁর সামান্য ভুলের মূল্য অনেক বড় হতে পারে।

তাই তিনি কখনও কাজে অবহেলা করতেন না।

গ্রামের লোকেরা তাঁকে বলত,

—“নিতাইকাকু, আপনি তো একই কাজ রোজ করেন। বিরক্ত লাগে না?”

তিনি হাসতেন।

—“রোজ সূর্য ওঠে বলে কি সূর্যকে বিরক্ত মনে হয়?”

লোকেরা হেসে চলে যেত।

কিন্তু নিতাইবাবু কথাটা সত্যিই বিশ্বাস করতেন।


ছোট্ট মেয়েটি

রেলগেটের কাছেই থাকত দশ বছরের মেয়ে পিউ

পিউয়ের বাবা ভ্যান চালাতেন।

মা বাড়িতে সেলাই করতেন।

পিউ প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে নিতাইবাবুর সঙ্গে কথা বলত।

—“কাকু, আজ কয়টা ট্রেন যাবে?”

—“তুই গুনবি?”

—“হ্যাঁ।”

নিতাইবাবু মজা করে বলতেন,

—“তাহলে আজ চারটে।”

পিউ খাতায় লিখে রাখত।

একদিন সে জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, আপনি কি ট্রেন চালাতে পারেন?”

নিতাইবাবু হেসে বললেন,

—“না।”

—“তাহলে ট্রেন থামাতে পারেন?”

—“সেটাও সবসময় না।”

—“তাহলে আপনার কাজ কী?”

নিতাইবাবু একটু ভেবে বললেন,

—“আমার কাজ হল, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।”

পিউ কথাটা মনে রাখল।


সেই ঝড়ের রাত

বর্ষার এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় হল।

বৃষ্টি এত জোরে পড়ছিল যে সামনে দশ হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছিল না।

নিতাইবাবু ডিউটিতে ছিলেন।

রাত প্রায় সাড়ে দশটা।

দূরে ট্রেনের হর্ন শোনা গেল।

নিতাইবাবু গেট বন্ধ করলেন।

কিন্তু হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল—রেললাইনের পাশে কিছু একটা পড়ে আছে।

ঝড়ে একটা বড় গাছের ডাল ভেঙে লাইনের ওপর এসে পড়েছিল।

নিতাইবাবু সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেলেন।

তিনি বুঝলেন, কয়েক মিনিটের মধ্যে ট্রেন চলে আসবে।

তিনি লাল আলো নিয়ে লাইনের দিকে দৌড়লেন।

তারপর রেল কর্তৃপক্ষকে জরুরি সংকেত পাঠালেন।

কয়েক মিনিটের মধ্যে ট্রেন থামানো হল।

বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেল।

পরদিন গ্রামের মানুষজন জানতে পারল কী হয়েছে।

পিউ দৌড়ে এসে বলল,

—“কাকু, আপনি ট্রেন থামিয়ে দিয়েছেন!”

নিতাইবাবু মাথা নাড়লেন।

—“আমি একা না। অনেক মানুষ মিলে ট্রেন থামিয়েছে।”

পিউ বলল,

—“কিন্তু আপনি না দেখলে?”

নিতাইবাবু বললেন,

—“তাই তো নিজের কাজটা মন দিয়ে করতে হয়।”


একটি বদলে যাওয়া মানুষ

ঘটনার পর পিউ নিতাইবাবুর কাজকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করল।

আগে সে ভাবত, রেলগেট খোলা-বন্ধ করা খুব সাধারণ কাজ।

এখন সে বুঝল, ছোট কাজ বলে কোনো কাজ ছোট নয়।

পিউ স্কুলে গিয়ে শিক্ষককে বলল,

—“স্যার, নিতাইকাকু খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন।”

শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন,

—“কেন?”

পিউ পুরো ঘটনা বলল।

শিক্ষক বললেন,

—“ঠিক বলেছ। দায়িত্বের গুরুত্ব কাজের আকারে নয়, তার প্রভাবের মধ্যে।”

সেদিন শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের একটি কাজ দিলেন।

প্রত্যেকে এমন একজন মানুষের কথা লিখবে, যিনি প্রতিদিন নীরবে সমাজের জন্য কাজ করেন।

পিউ লিখল—

“নিতাই কাকু—রেলগেটের মানুষ।”


অপমানের দিন

কয়েক মাস পর একদিন একজন বাইকচালক রেলগেট বন্ধ থাকা অবস্থায় জোর করে গেটের পাশ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।

নিতাইবাবু তাকে থামালেন।

লোকটি রেগে গিয়ে বলল,

—“আপনারা এত দেরি করেন কেন?”

নিতাইবাবু শান্তভাবে বললেন,

—“ট্রেন চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।”

লোকটি গালাগাল করতে শুরু করল।

চারপাশের মানুষ দাঁড়িয়ে দেখছিল।

নিতাইবাবু কোনো উত্তর দিলেন না।

ট্রেন চলে যাওয়ার পর গেট খুললেন।

লোকটি চলে গেল।

পিউ তখন স্কুল থেকে ফিরছিল।

সে সব দেখেছিল।

সে জিজ্ঞেস করল,

—“কাকু, আপনি কিছু বললেন না কেন?”

নিতাইবাবু বললেন,

—“সব কথার উত্তর দিতে হয় না।”

—“আপনার খারাপ লাগেনি?”

—“লেগেছে।”

—“তাহলে?”

নিতাইবাবু মৃদু হেসে বললেন,

—“আমার কাজটা যদি ঠিক থাকে, তাহলে একটা মানুষের রাগ আমার কাজকে ভুল করে দিতে পারে না।”


পিউয়ের পরীক্ষা

বছর কয়েক কেটে গেল।

পিউ বড় হল।

সে পড়াশোনায় ভালো করতে লাগল।

একদিন সে নিতাইবাবুকে বলল,

—“কাকু, আমি রেলওয়েতে চাকরি করতে চাই।”

নিতাইবাবু হেসে বললেন,

—“কেন?”

—“আপনার মতো মানুষের সঙ্গে কাজ করতে চাই।”

নিতাইবাবু বললেন,

—“আমার মতো হওয়ার দরকার নেই। নিজের মতো ভালো মানুষ হও।”

পিউ বলল,

—“কিন্তু আপনি আমাকে শিখিয়েছেন—দায়িত্ব মানে কী।”

নিতাইবাবু আর কিছু বললেন না।

শুধু বললেন,

—“তাহলে পড়াশোনা কর।”


একটি চিঠি

বহু বছর পর নিতাইবাবু অবসর নিলেন।

শেষ দিন তিনি রেলগেটের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

যে গেট তিনি হাজার হাজার বার খুলেছেন ও বন্ধ করেছেন, আজ সেটি অন্য একজনের দায়িত্বে চলে যাবে।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিনি একটি চিঠি পেলেন।

চিঠিটি পিউয়ের।

সে তখন রেলওয়েতে চাকরি পেয়েছে।

চিঠিতে লেখা ছিল—

“কাকু, আপনি একদিন বলেছিলেন, ছোট কাজ বলে কোনো কাজ নেই। আমি সেই কথাটা ভুলিনি। আজ আমি রেলওয়েতে যোগ দিয়েছি। আমার প্রথম পোস্টিং অন্য জায়গায়। কিন্তু আমার কাজের প্রথম শিক্ষা আপনার কাছ থেকেই।”

নিতাইবাবু চিঠিটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।

তার চোখে জল এসে গেল।


শেষবারের মতো রেলগেট

অবসরের কয়েকদিন পর নিতাইবাবু একদিন পুরোনো রেলগেটের কাছে গেলেন।

নতুন কর্মী তাঁকে দেখে বললেন,

—“কাকু, আপনি আসবেন ভাবিনি।”

নিতাইবাবু হাসলেন।

—“দেখতে এলাম।”

ঠিক তখনই ট্রেনের হর্ন শোনা গেল।

নতুন কর্মী গেট নামিয়ে দিলেন।

নিতাইবাবু দাঁড়িয়ে দেখলেন।

ট্রেন চলে গেল।

গেট আবার উঠে গেল।

তিনি মৃদু হেসে বললেন,

—“ঠিক সময়ে।”

তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

পেছনে রেললাইন।

সামনে নতুন রাস্তা।

জীবনের মতোই।


শেষ কথা

নিতাইবাবুর গল্প কোনো বড় পুরস্কারের গল্প নয়।

কোনো সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় তাঁর ছবি ছাপা হয়নি।

কোনো বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বক্তৃতা দেননি।

তিনি শুধু নিজের কাজটা ঠিকভাবে করেছেন।

প্রতিদিন।

বছরের পর বছর।

কারণ তিনি জানতেন—

একজন মানুষের সতর্কতা কখনও কখনও বহু মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারে।

আর একটি শিশুর চোখে একজন সাধারণ কর্মীও হয়ে উঠতে পারেন জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।

শিউলিডাঙার সেই রেলগেট আজও আছে।

ট্রেন আসে।

ট্রেন চলে যায়।

গেট বন্ধ হয়।

আবার খুলে যায়।

কিন্তু পিউয়ের মনে নিতাইবাবুর সেই কথাটি আজও রয়ে গেছে—

“কাজ ছোট নয়। ছোট হয় শুধু আমাদের তাকে দেখার চোখ।”

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *