
চন্দনপুর গ্রামের বাজারের শেষ মাথায় একটি ছোট্ট ডাকঘর ছিল। লাল রঙের দেওয়াল, টিনের ছাদ আর দরজার পাশে ঝুলে থাকা পুরোনো একটি ডাকবাক্স।
ডাকঘরটির পোস্টম্যান ছিলেন গোপালবাবু।
বয়স ষাটের কাছাকাছি। প্রতিদিন ভোরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। কারও চিঠি, কারও মানিঅর্ডার, কারও সরকারি কাগজ—সবকিছু ঠিক মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ।
গ্রামের মানুষ তাঁকে ভালোবাসত।
কারণ গোপালবাবু শুধু চিঠি পৌঁছে দিতেন না।
তিনি মানুষের অপেক্ষার মূল্য বুঝতেন।
একটি মেয়ের অপেক্ষা
গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে থাকত রূপা।
রূপার বাবা কয়েক বছর আগে কাজের জন্য অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছিলেন। ফোনে কথা হত, কিন্তু রূপার বাবা চিঠি লিখতে খুব ভালোবাসতেন।
প্রতি মাসে একটা করে চিঠি আসত।
রূপা গোপালবাবুকে দূর থেকেই দেখলেই দৌড়ে আসত।
—“কাকু, আমার বাবার চিঠি আছে?”
গোপালবাবু হাসতেন।
—“আজ নেই।”
রূপার মুখটা একটু ম্লান হয়ে যেত।
আবার অন্যদিন সাইকেলের ঘণ্টা শুনে ছুটে আসত।
একদিন গোপালবাবুর ব্যাগ থেকে সত্যিই একটি চিঠি বেরোল।
খামের ওপর লেখা—
“রূপার জন্য।”
রূপা চিঠিটা হাতে নিয়ে এত খুশি হল যে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
গোপালবাবু বললেন,
—“যা, বাবার চিঠি পড়।”
রূপা দৌড়ে বাড়ির দিকে চলে গেল।
গোপালবাবু তাকিয়ে রইলেন।
তিনি জানতেন, তাঁর হাতে শুধু একটা কাগজ ছিল না।
ছিল একজন বাবার ভালোবাসা।
ডাকবাক্সের রহস্য
একদিন ডাকঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে গোপালবাবু পুরোনো একটি বাক্স পেলেন।
বাক্সের ভেতরে ছিল বহু বছরের কিছু ফেরত না নেওয়া চিঠি।
কেউ ঠিকানা বদলে ফেলেছে।
কেউ গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে।
কেউ চিঠি নিতে আসেনি।
গোপালবাবু চিঠিগুলো দেখে ভাবলেন,
“এগুলোর ভেতরেও তো মানুষের গল্প আছে।”
তিনি চিঠিগুলো কাউকে পড়লেন না।
কারণ সেগুলো ব্যক্তিগত।
কিন্তু একটা বিষয় তাঁকে ভাবিয়ে তুলল—
গ্রামের অনেক মানুষ এখনও ঠিকভাবে চিঠি লিখতে পারে না।
কেউ নিজের কথা লিখতে পারে না।
কেউ দূরে থাকা সন্তানকে নিজের অনুভূতি জানাতে পারে না।
চিঠি লেখার ক্লাস
পরের রবিবার গোপালবাবু ডাকঘরের সামনে একটি ছোট্ট বোর্ড লাগালেন।
তাতে লেখা—
“চিঠি লিখতে শিখবেন? বিনামূল্যে।”
প্রথম দিন এল মাত্র দু’জন।
একজন বৃদ্ধ কৃষক।
আর একজন স্কুলছাত্র।
গোপালবাবু বললেন,
—“চিঠি লেখার জন্য বড় পড়াশোনা দরকার নেই। নিজের মনের কথাটা পরিষ্কার করে লিখলেই হয়।”
বৃদ্ধ কৃষক বললেন,
—“আমি ছেলেকে বলতে চাই, বাড়িতে ফিরে আসুক। কিন্তু কীভাবে লিখব?”
গোপালবাবু কাগজ এগিয়ে দিলেন।
—“আপনি যেমন করে আমাকে বললেন, তেমন করেই লিখুন।”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করলেন।
চিঠির ভাষা
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চিঠি লেখার ক্লাসে দশ-বারোজন আসতে শুরু করল।
কেউ ছেলেকে চিঠি লিখছে।
কেউ মেয়েকে।
কেউ দূরে থাকা ভাইকে।
কেউ পুরোনো বন্ধুকে।
গোপালবাবু কাউকে চিঠির বিষয়বস্তু জিজ্ঞেস করতেন না।
শুধু বলতেন,
—“মনের কথা লিখুন।”
একদিন রূপা ক্লাসে এসে বলল,
—“কাকু, আমি বাবাকে চিঠি লিখব।”
—“লিখ।”
—“কিন্তু কী লিখব?”
—“তুমি বাবাকে যা বলতে চাও, সেটাই লিখবে।”
রূপা লিখল—
“বাবা, তুমি দূরে আছ বলে আমাদের বাড়িটা মাঝে মাঝে খুব চুপচাপ লাগে। তুমি তাড়াতাড়ি এসো।”
চিঠি লেখা শেষ করে রূপা বলল,
—“কাকু, এটা কি খুব ছোট হয়ে গেল?”
গোপালবাবু বললেন,
—“না। ছোট চিঠির মধ্যেও বড় ভালোবাসা থাকতে পারে।”
একটি বড় সমস্যা
সেই বছর গ্রামের অনেক মানুষ কাজের জন্য বাইরে চলে গেল।
কেউ কলকাতায়।
কেউ দিল্লিতে।
কেউ কেরলে।
বাড়িতে রয়ে গেল বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানরা।
ফোনে সব কথা বলা সম্ভব হত না।
তখন গোপালবাবুর চিঠির ক্লাস আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল।
তিনি গ্রামের মানুষদের শুধু চিঠি লিখতে শেখালেন না।
শেখালেন—
কীভাবে ঠিকানা লিখতে হয়।
কীভাবে সরকারি চিঠি বুঝতে হয়।
কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিরাপদে রাখতে হয়।
কীভাবে প্রাপকের নাম সঠিকভাবে লিখতে হয়।
ডাকঘরটা ধীরে ধীরে গ্রামের একটি ছোট শেখার জায়গায় পরিণত হল।
একদিন রূপার বাবা এলেন
অনেক মাস পর এক দুপুরে গোপালবাবু রূপাদের বাড়ির সামনে সাইকেল থামালেন।
রূপা ছুটে এল।
—“কাকু, বাবার চিঠি?”
গোপালবাবু বললেন,
—“আজ চিঠি নয়।”
রূপা অবাক।
—“তাহলে?”
পেছন থেকে একজন লোক এগিয়ে এলেন।
রূপা এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।
তারপর চিৎকার করে উঠল—
—“বাবা!”
সে দৌড়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
রূপার বাবা হাসতে হাসতে বললেন,
—“তোর চিঠি পেয়েছিলাম।”
রূপা বলল,
—“তাই এসেছ?”
বাবা মাথা নাড়লেন।
—“তোর চিঠিটা পড়ে বুঝলাম, অনেকদিন হয়ে গেছে।”
গোপালবাবু একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
রূপার বাবা তাঁর কাছে এসে বললেন,
—“আপনি চিঠিটা পৌঁছে না দিলে হয়তো আমি বুঝতেই পারতাম না।”
গোপালবাবু বললেন,
—“আমি শুধু পৌঁছে দিয়েছি। কথাগুলো তো তোমার মেয়ের।”
অবসরের সময়
আরও কয়েক বছর কেটে গেল।
গোপালবাবুর অবসরের সময় এসে গেল।
শেষ দিন ডাকঘরে গ্রামের অনেক মানুষ এল।
রূপাও এল।
তখন সে কলেজে পড়ে।
রূপা একটি খাম গোপালবাবুর হাতে দিল।
—“কাকু, এটা আপনার জন্য।”
গোপালবাবু অবাক হয়ে খাম খুললেন।
ভেতরে একটি চিঠি।
রূপা লিখেছে—
“আপনি আমাদের চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, আপনি আমাদের কথা বলতে শিখিয়েছেন। আপনি না থাকলে হয়তো আমি বাবাকে আমার মনের কথাগুলো কোনোদিন লিখতে পারতাম না।”
গোপালবাবু চিঠিটি পড়ে চোখ মুছলেন।
বললেন,
—“এবার তুই চিঠি লিখবি অন্যদের।”
রূপা হেসে বলল,
—“আপনার কাছ থেকেই শিখেছি।”
শেষ ডাক
অবসরের দিন সন্ধ্যায় গোপালবাবু একবার শেষবারের মতো ডাকঘরের সামনে দাঁড়ালেন।
লাল ডাকবাক্সটি তাঁর চোখে পড়ল।
তিনি হাত দিয়ে বাক্সটির গায়ে আলতো করে স্পর্শ করলেন।
কত হাজার চিঠি যে এই বাক্সে পড়েছে!
কত মানুষের আনন্দ।
কত মানুষের দুঃখ।
কত অপেক্ষা।
কত বিচ্ছেদ।
কত ফিরে আসা।
সবই যেন এই ছোট্ট ডাকবাক্সের মধ্যে জমে ছিল।
হঠাৎ পেছন থেকে রূপা বলল,
—“কাকু!”
তিনি ঘুরে তাকালেন।
রূপা বলল,
—“আপনি আর চিঠি পৌঁছে দেবেন না?”
গোপালবাবু হেসে বললেন,
—“চিঠি পৌঁছে দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে।”
—“তাহলে এখন কী করবেন?”
গোপালবাবু বললেন,
—“এখন মানুষের গল্প শুনব।”
রূপা বলল,
—“গল্প?”
—“হ্যাঁ। এত বছর চিঠি পৌঁছে দিয়েছি। এবার গল্পগুলো মনে রাখব।”
গোপালবাবু চলে গেলেন।
ডাকঘরের দরজা বন্ধ হল।
কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে তাঁর কাজ শেষ হল না।
চিঠি লেখার ছোট্ট ক্লাসটি চলতে থাকল।
রূপা সেটির দায়িত্ব নিল।
নতুন ছেলেমেয়েরা সেখানে এসে চিঠি লিখতে শিখতে লাগল।
ডাকবাক্সটিও রয়ে গেল।
প্রতিদিন তার ভেতরে নতুন চিঠি পড়ত।
আর প্রতিটি চিঠি যেন মনে করিয়ে দিত—
দূরত্ব যতই হোক, মনের কথা পৌঁছে দেওয়ার পথ মানুষ সবসময় খুঁজে নিতে পারে।
কখনও ফোনে।
কখনও কথায়।
কখনও একটি ছোট্ট কাগজে লেখা কয়েকটি শব্দে।
আর কখনও—
একজন মানুষের আন্তরিকতার মাধ্যমে।












Leave a Reply