দাঁড়িয়াবান্ধা: দাগ কাটা মাঠে দৌড় আর কৌশলের হারিয়ে যাওয়া খেলা।

ভূমিকা

এক সময় বিকেলের দিকে গ্রামের মাঠ কিংবা পাড়ার ফাঁকা জায়গায় গেলেই দেখা যেত একদল ছেলে-মেয়ের ব্যস্ততা। মাটিতে কাঠি দিয়ে কয়েকটি লাইন টানা হয়েছে। সেই লাইনের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকজন। অন্যরা সুযোগের অপেক্ষায় এদিক-ওদিক ছুটছে। হঠাৎ একজন দৌড়ে গেল, কেউ তাকে ধরার চেষ্টা করল, আবার কেউ চিৎকার করে সতীর্থকে সাবধান করে দিল।

এই দৃশ্য ছিল দাঁড়িয়াবান্ধা খেলার পরিচিত ছবি।

দাঁড়িয়াবান্ধা ছিল বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত একটি দলগত লোকজ খেলা। অঞ্চলভেদে এর নিয়ম, মাঠের নকশা এবং খেলোয়াড়দের ভূমিকার কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। তবে খেলাটির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল—নির্দিষ্ট দাগ বা ঘরের মধ্যে থাকা খেলোয়াড়দের এড়িয়ে অন্য খেলোয়াড়দের এগিয়ে যাওয়া।

দৌড়ের সঙ্গে কৌশল মিশিয়ে তৈরি এই খেলা এক সময় শিশু-কিশোরদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল।

নামের মধ্যেই রয়েছে খেলার ধারণা

‘দাঁড়িয়াবান্ধা’ নামটির মধ্যেই খেলাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়। মাঠে আঁকা নির্দিষ্ট রেখা বা অংশে কিছু খেলোয়াড় দাঁড়িয়ে থাকে এবং অন্য দল সেই রেখা অতিক্রম করার চেষ্টা করে।

স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী কে কোথায় দাঁড়াবে এবং কীভাবে প্রতিপক্ষকে আটকানো যাবে, তা ভিন্ন হতে পারে।

কিন্তু খেলাটির কেন্দ্রে থাকে একটি বিষয়—দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে নিরাপদে এগিয়ে যাওয়া।

মাঠ তৈরি করা

দাঁড়িয়াবান্ধার জন্য কোনো বিশেষ মাঠের প্রয়োজন হতো না।

খোলা মাটিতে একটি কাঠি দিয়ে লম্বালম্বি ও আড়াআড়ি কয়েকটি রেখা টেনে খেলার এলাকা তৈরি করা যেত। রেখাগুলোর ফলে মাঠটি কয়েকটি অংশে ভাগ হয়ে যেত।

কোথাও ঘরগুলো তুলনামূলক বড় করা হতো, কোথাও ছোট।

মাঠ তৈরির সময় খেলোয়াড়রাই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নিত—

“এখান থেকে দাগটা যাবে।”

“এই অংশটা কার?”

“এখানে দাঁড়াবে কে?”

কয়েক মিনিটের মধ্যেই খেলার মাঠ প্রস্তুত।

দল তৈরি

খেলোয়াড়দের সাধারণত দুই দলে ভাগ করা হতো। দলভাগের সময় চেষ্টা করা হতো যাতে দুই দলে খেলোয়াড়ের সংখ্যা ও দক্ষতা মোটামুটি সমান থাকে।

দল তৈরি হয়ে গেলে শুরু হতো কৌশল নিয়ে আলোচনা।

কে দ্রুত দৌড়াতে পারে?

কে প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দিতে পারে?

কে সাহস করে ঝুঁকি নিতে পারে?

কে প্রতিপক্ষের গতিবিধি ভালোভাবে লক্ষ্য করতে পারে?

এই ছোট্ট আলোচনার মধ্যেই শিশুদের মধ্যে দলগত পরিকল্পনার অভ্যাস তৈরি হতো।

খেলা শুরু হলেই উত্তেজনা

খেলার এক পর্যায়ে নির্দিষ্ট খেলোয়াড়রা মাঠের দাগের ওপর বা নির্ধারিত অংশে অবস্থান নিত। অন্য দলের খেলোয়াড়রা সুযোগ খুঁজত কীভাবে সেই বাধা অতিক্রম করা যায়।

একজন হয়তো হঠাৎ সামনে এগিয়ে গেল।

দাঁড়িয়ে থাকা খেলোয়াড় তাকে ধরার চেষ্টা করল।

সে আবার দ্রুত পিছিয়ে এল।

ঠিক সেই মুহূর্তে তার সতীর্থ অন্য দিক দিয়ে ছুটে গেল।

মাঠজুড়ে শুরু হয়ে গেল চিৎকার—

“সাবধানে!”

“ওদিকে যাস না!”

“এখন যা!”

এই উত্তেজনাই দাঁড়িয়াবান্ধাকে শিশুদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলত।

শুধু দৌড়ালেই হবে না

দাঁড়িয়াবান্ধার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সময় বুঝে দৌড়ানো

খেলোয়াড় যদি প্রতিপক্ষের অবস্থান না বুঝে এগিয়ে যায়, তাহলে সহজেই ধরা পড়তে পারে।

তাই অনেক সময় একজন খেলোয়াড় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করত। প্রতিপক্ষের নজর কোন দিকে, সেটি লক্ষ্য করত।

তারপর সুযোগ বুঝে আচমকা ছুটে যেত।

এই কৌশলটি ছোটদের মধ্যে পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করত।

ফাঁকি দেওয়ার আনন্দ

খেলাটির সবচেয়ে মজার মুহূর্তগুলোর একটি ছিল প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেওয়া।

একজন খেলোয়াড় এমন ভান করল যেন সে একদিকে যাবে। প্রতিপক্ষও সেইদিকে নজর দিল। ঠিক তখনই সে অন্যদিকে ছুটে গেল।

কখনও আবার সামনে এগিয়ে এসে শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে যেত।

প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করার এই কৌশলগুলো খেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলত।

বন্ধুরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকলে তারা নিজেদের দলের খেলোয়াড়কে নানা পরামর্শ দিত।

দলের জন্য খেলতে হতো

দাঁড়িয়াবান্ধার বড় শিক্ষা ছিল—একজন খেলোয়াড় একা সবসময় দলকে জেতাতে পারে না।

কখনও একজন নিজে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করত, যাতে অন্যজন এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।

আবার কেউ ধরা পড়লে অন্যরা নিজেদের পরিকল্পনা বদলে নিত।

ফলে খেলায় ব্যক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি দলগত বোঝাপড়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত।

শরীরচর্চার সহজ মাধ্যম

আজ শিশুদের শরীরচর্চার জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করতে হয়। এক সময় খেলাধুলাই ছিল শরীরচর্চার অন্যতম স্বাভাবিক মাধ্যম।

দাঁড়িয়াবান্ধায় বারবার দৌড়াতে হতো। দ্রুত থামতে হতো। আবার দিক পরিবর্তন করতে হতো। কখনও নিচু হয়ে এড়িয়ে যেতে হতো।

এসবের ফলে শরীর সক্রিয় থাকত।

কিন্তু শিশুরা সেটিকে ব্যায়াম হিসেবে দেখত না। তাদের কাছে এটি ছিল শুধুই মজার খেলা।

মাঠের খেলায় তৈরি হতো বন্ধুত্ব

দাঁড়িয়াবান্ধা শুধু শারীরিক খেলা ছিল না। এটি পাড়ার শিশুদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কও তৈরি করত।

একসঙ্গে খেলার সময় নতুন বন্ধুত্ব তৈরি হতো। ছোটরা বড়দের কাছ থেকে নিয়ম শিখত। বড়রা ছোটদের খেলার সুযোগ দিত।

কখনও খেলা নিয়ে তর্ক হতো—

“ওকে ধরা হয়েছে!”

“না, দাগের মধ্যে ছিল!”

“ওটা আউট হবে না!”

এই ধরনের ছোটখাটো তর্ক কয়েক মিনিট পরেই আবার হাসিতে পরিণত হতো।

গ্রামের বিকেলের চেনা ছবি

একসময় স্কুল ছুটির পর গ্রামের রাস্তায় শিশুদের ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য ছিল খুব পরিচিত।

কেউ বই বাড়িতে রেখে বন্ধুদের ডাকতে বেরিয়ে গেছে। কেউ আবার মাঠে পৌঁছে অন্যদের জন্য অপেক্ষা করছে।

সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। মাঠের ধারে বাবা-মায়েরা দাঁড়িয়ে বা বসে আছেন। আর মাঝখানে শিশুদের খেলা চলছে।

দাঁড়িয়াবান্ধার মতো খেলাগুলো সেই সামাজিক পরিবেশেরই অংশ ছিল।

কোনো দামি সরঞ্জাম লাগত না

এই খেলাটির সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এর সরলতা।

ব্যাট নেই, বল নেই, জার্সি নেই, জুতোও বাধ্যতামূলক নয়।

শুধু দরকার—

  • কয়েকজন খেলোয়াড়
  • একটি খোলা জায়গা
  • মাটিতে দাগ কাটার জন্য একটি কাঠি
  • আর খেলতে চাওয়ার ইচ্ছা

এই কারণেই গ্রামবাংলার সাধারণ পরিবারের শিশুরাও সহজে খেলায় অংশ নিতে পারত।

নিয়ম শেখা হতো দেখে দেখে

আজকের মতো অনেক খেলায় নিয়ম শেখার জন্য বই বা ভিডিও দেখা যায়। কিন্তু দাঁড়িয়াবান্ধার মতো লোকজ খেলায় নিয়ম সাধারণত শেখানো হতো দেখে ও খেলতে খেলতে

একজন বড় ছেলে বা মেয়ে বলত—

“এই দাগ পার হওয়া যাবে না।”

“এখানে দাঁড়িয়ে ধরতে হবে।”

“ওখানে গেলে নিরাপদ।”

ছোটরা কয়েকবার খেললেই নিয়ম বুঝে যেত।

এইভাবেই এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে খেলার জ্ঞান পৌঁছাত।

অঞ্চলভেদে পরিবর্তন

লোকজ খেলার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সব অঞ্চলে নিয়ম একই ছিল না।

দাঁড়িয়াবান্ধার ক্ষেত্রেও মাঠের আকার, দাগের বিন্যাস, খেলোয়াড়ের সংখ্যা এবং ধরার নিয়মে স্থানীয় পার্থক্য থাকতে পারে।

কোনো অঞ্চলে এক ধরনের নিয়মকে দাঁড়িয়াবান্ধা বলা হয়েছে, অন্য অঞ্চলে সামান্য ভিন্ন নিয়ম প্রচলিত ছিল।

তাই এই খেলাকে বোঝার সময় স্থানীয় স্মৃতি ও সংস্কৃতিকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

কেন হারিয়ে গেল?

দাঁড়িয়াবান্ধার মতো মাঠের খেলাগুলো হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি সামাজিক পরিবর্তন কাজ করেছে।

শহর ও শহরতলিতে খোলা মাঠ কমেছে। গ্রামেও অনেক পুরনো খেলার জায়গা অন্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পাশাপাশি শিশুদের পড়াশোনার চাপ বেড়েছে। অবসর সময়ে মোবাইল, টেলিভিশন ও অনলাইন বিনোদনের ব্যবহারও বেড়েছে।

ফলে মাঠে গিয়ে দল বেঁধে খেলার সুযোগ এবং আগ্রহ—দুই-ই অনেক ক্ষেত্রে কমেছে।

আবার ফিরিয়ে আনা যেতে পারে

দাঁড়িয়াবান্ধার মতো খেলা ফিরিয়ে আনতে বড় কোনো প্রকল্পের প্রয়োজন নেই।

স্কুলের মাঠে সপ্তাহে একটি দিন দেশি খেলাধুলার আয়োজন করা যেতে পারে। পাড়ার ক্লাবও পুরনো খেলার প্রতিযোগিতা করতে পারে।

এমনকি কোনো উৎসব উপলক্ষে এক ঘণ্টার জন্য দাঁড়িয়াবান্ধা খেলানো হলেও শিশুদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কেউ একজন যেন নিয়মগুলো নতুন প্রজন্মকে শেখান।

পুরনো খেলার নতুন মূল্য

পুরনো খেলাগুলোকে শুধু অতীতের স্মৃতি হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলোর মধ্যে স্থানীয় সংস্কৃতি, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সহজ জীবনযাপনের অনেক গল্প লুকিয়ে আছে।

দাঁড়িয়াবান্ধা আমাদের শেখায়, বিনোদনের জন্য সবসময় প্রযুক্তি বা দামি সরঞ্জাম দরকার হয় না।

একটি খোলা মাঠ এবং কয়েকজন বন্ধুই যথেষ্ট।

উপসংহার

দাঁড়িয়াবান্ধা ছিল এমন একটি খেলা যেখানে দৌড়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল কৌশল, সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি এবং দলগত সহযোগিতা। মাঠের মাটিতে কয়েকটি দাগ টেনেই যে কতটা আনন্দ তৈরি করা যায়, এই খেলাটি তারই উদাহরণ।

আজ অনেক জায়গায় দাঁড়িয়াবান্ধা আগের মতো দেখা যায় না। কিন্তু এর স্মৃতি এখনও বহু মানুষের শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

সময়ের পরিবর্তনকে থামানো সম্ভব নয়। তবে হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলোর গল্প সংরক্ষণ করা যায়, নতুন প্রজন্মকে সেগুলোর সঙ্গে পরিচয় করানো যায়।

হয়তো কোনো এক বিকেলে আবার কোনো স্কুলের মাঠে কাঠি দিয়ে দাগ কাটা হবে, কয়েকজন শিশু দল তৈরি করবে, আর বহু বছর পর আবার শোনা যাবে—

“চল, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলি!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *