গোল্লাছুট: মাঠজুড়ে দৌড় আর কৌশলের এক হারিয়ে যাওয়া দেশি খেলা।

ভূমিকা

একটা সময় ছিল, যখন বিকেল নামলেই গ্রামের মাঠ, পাড়ার খোলা জায়গা কিংবা বাড়ির সামনের ফাঁকা উঠোনে ছোটদের ভিড় জমে যেত। হাতে দামি খেলনা ছিল না, মোবাইল ফোন তো দূরের কথা—তবু আনন্দের কোনো অভাব ছিল না। কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে হলেই শুরু হয়ে যেত নানা ধরনের দেশি খেলা। সেই খেলাগুলোর মধ্যেই অন্যতম ছিল গোল্লাছুট

গোল্লাছুট ছিল এমন একটি দলগত খেলা, যেখানে দৌড়, কৌশল, সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি এবং দলগত সহযোগিতা—সবকিছুরই প্রয়োজন হতো। খেলাটির বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মের কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও মাঠের মাঝখানে নির্দিষ্ট রেখা বা ঘর তৈরি করা হতো, কোথাও আবার একটি নির্দিষ্ট স্থানকে ‘গোল্লা’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই খেলাটির মূল আকর্ষণ ছিল প্রতিপক্ষকে এড়িয়ে দৌড়ে নিজের লক্ষ্য পূরণ করা।

আজকের ব্যস্ত জীবনে সেই খেলা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কিন্তু গোল্লাছুটের স্মৃতিতে এখনও বহু মানুষের শৈশব লুকিয়ে আছে।

গোল্লাছুট কী?

গোল্লাছুট মূলত একটি দলগত দৌড় ও কৌশলনির্ভর লোকজ খেলা। সাধারণত দুইটি দল তৈরি করে খেলা হতো। মাঠে কিছু নির্দিষ্ট স্থান বা সীমারেখা চিহ্নিত করা থাকত। এক দলকে প্রতিপক্ষের নজর এড়িয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা ‘গোল্লা’ স্পর্শ করে আবার নিজেদের এলাকায় ফিরে আসার চেষ্টা করতে হতো।

অন্য দল তাদের আটকানোর চেষ্টা করত।

খেলাটির সৌন্দর্য এখানেই—শুধু দ্রুত দৌড়ালেই জেতা যায় না। কখন দৌড় শুরু করতে হবে, কখন থামতে হবে, কোন দিক দিয়ে গেলে প্রতিপক্ষকে এড়ানো সম্ভব, কখন সতীর্থকে সাহায্য করতে হবে—এসব বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কীভাবে মাঠ তৈরি করা হতো?

গোল্লাছুটের জন্য সাধারণত খুব বেশি সরঞ্জামের প্রয়োজন হতো না। একটি খোলা মাঠই যথেষ্ট ছিল।

মাটিতে কাঠি দিয়ে বা পায়ের সাহায্যে কয়েকটি রেখা টেনে খেলার এলাকা নির্ধারণ করা যেত। কোথাও ছোট একটি বৃত্ত বা নির্দিষ্ট জায়গাকে ‘গোল্লা’ বলা হতো। আবার কোথাও দলের নিজস্ব ঘর বা নিরাপদ এলাকা থাকত।

গ্রামের মাঠে চুন বা রং দিয়ে দাগ দেওয়ার প্রয়োজন হতো না। শুকনো মাটিতে একটি কাঠি দিয়েই কয়েক মিনিটে খেলার মাঠ তৈরি হয়ে যেত।

এই সরলতাই ছিল দেশি খেলাগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

খেলোয়াড়দের দলবিভাগ

প্রথমে খেলোয়াড়দের দুই দলে ভাগ করা হতো। দুই দলে যতটা সম্ভব সমান সংখ্যক খেলোয়াড় রাখা হতো।

দলের সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করত—

  • কে দ্রুত দৌড়াতে পারে
  • কে প্রতিপক্ষকে সহজে ফাঁকি দিতে পারে
  • কে সাহসী
  • কে সতীর্থকে সাহায্য করতে পারবে
  • কে শেষ মুহূর্তে ঝুঁকি নিতে পারবে

অর্থাৎ খেলা শুরু হওয়ার আগেই দলের মধ্যে এক ধরনের কৌশল তৈরি হয়ে যেত।

কখনও কখনও খেলোয়াড়দের মধ্যে একজনকে দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হতো। তার কাজ হতে পারত প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত রাখা বা সতীর্থকে লক্ষ্যস্থানে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেওয়া।

শুরু হতো উত্তেজনা

খেলা শুরু হওয়ার পরেই মাঠের পরিবেশ বদলে যেত।

এক দলের খেলোয়াড় সুযোগের অপেক্ষায় থাকত। প্রতিপক্ষও চোখ রাখত তাদের গতিবিধির দিকে। হঠাৎ একজন দৌড়ে বেরিয়ে গেলেই শুরু হয়ে যেত উত্তেজনা।

“ধর!”

“ওদিকে গেল!”

“ফিরে আয়!”

“সামনে যাস না!”

বন্ধুদের চিৎকারে পুরো মাঠ সরগরম হয়ে উঠত।

একজন প্রতিপক্ষের নজর এড়িয়ে এগিয়ে গেলে অন্যরা তাকে অনুসরণ করত। কখনও একজন ইচ্ছা করে সামনে গিয়ে প্রতিপক্ষকে ব্যস্ত রাখত, আর সেই সুযোগে তার সতীর্থ অন্য দিক দিয়ে এগিয়ে যেত।

এই কৌশলগত দিকটাই গোল্লাছুটকে সাধারণ দৌড়ের খেলা থেকে আলাদা করে তুলত।

শুধু দৌড় নয়, চাই বুদ্ধিও

গোল্লাছুটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—শুধু শক্তি দিয়ে সবসময় জয় পাওয়া যায় না।

একজন খুব দ্রুত দৌড়াতে পারলেও যদি ভুল সময়ে দৌড় শুরু করে, তাহলে সহজেই প্রতিপক্ষের হাতে ধরা পড়তে পারে। আবার অপেক্ষাকৃত ধীর খেলোয়াড়ও সঠিক সময়ে সঠিক কৌশল ব্যবহার করে সফল হতে পারে।

তাই খেলোয়াড়দের সবসময় মাঠের পরিস্থিতি বুঝতে হতো।

কোথায় প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়ে আছে?

কে কার দিকে নজর রাখছে?

কোন দিক দিয়ে যাওয়া নিরাপদ?

কখন ফিরে আসতে হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খুঁজে নিতে হতো।

বন্ধুত্ব ও দলগত সহযোগিতা

গোল্লাছুটের আরেকটি বড় দিক ছিল দলগত সহযোগিতা।

একজন খেলোয়াড় যখন দৌড়ে যেত, তখন তার সতীর্থরা শুধু দাঁড়িয়ে দেখত না। তারা নানা উপায়ে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করত। কেউ প্রতিপক্ষকে অন্যদিকে ব্যস্ত রাখত, কেউ সতর্ক করত, আবার কেউ নিজে ঝুঁকি নিয়ে সতীর্থকে সুযোগ করে দিত।

এই কারণে খেলাটি শিশুদের মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা তৈরি করতে সাহায্য করত।

জয় শুধু একজনের ছিল না—পুরো দলের জয় ছিল।

হার-জিতের উত্তেজনা

যেকোনো খেলায় জয়-পরাজয় থাকবেই। গোল্লাছুটেও তাই ছিল।

কিন্তু এই খেলার বিশেষত্ব ছিল, একটি ছোট ভুলও পুরো পরিস্থিতি বদলে দিতে পারত।

এক মুহূর্তে মনে হচ্ছে একটি দল জিতে যাচ্ছে, পরের মুহূর্তেই একজন খেলোয়াড় ধরা পড়ায় পরিস্থিতি পাল্টে গেল।

তাই শেষ পর্যন্ত কে জিতবে, তা নিয়ে মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকরাও উত্তেজিত থাকত।

খেলা শেষ হওয়ার পর অবশ্য অনেক সময় সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবার বন্ধুত্বে ফিরে যেত। কারণ খেলাটি ছিল আনন্দের জন্য, সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য নয়।

গ্রামের বিকেলের অবিচ্ছেদ্য অংশ

একসময় গোল্লাছুট শুধু একটি খেলা ছিল না। এটি ছিল পাড়ার সামাজিক জীবনের অংশ।

বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে শিশুরা বই-খাতা রেখে বন্ধুদের ডাকতে বেরিয়ে পড়ত। মাঠে পৌঁছানোর পর শুরু হতো দল তৈরি।

কখনও বড়রা ছোটদের সঙ্গে খেলত। কখনও বড় ছেলেমেয়েরা ছোটদের নিয়ম শেখাত।

কেউ খেলত, কেউ দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকত। আবার কেউ পরের দলে খেলার অপেক্ষায় থাকত।

এইভাবেই একটি খেলা পুরো পাড়ার শিশুদের একসঙ্গে নিয়ে আসত।

কোনো দামি সরঞ্জাম লাগত না

আজকের অনেক খেলায় ব্যাট, বল, জুতো, গ্লাভস কিংবা অন্যান্য সরঞ্জাম লাগে। গোল্লাছুটের ক্ষেত্রে সেসবের প্রয়োজন ছিল না।

এক টুকরো খোলা মাঠ এবং কয়েকজন খেলোয়াড়ই যথেষ্ট।

এমনকি মাঠও খুব বড় না হলে চলত। পাড়ার ফাঁকা জায়গা, গ্রামের উঠোনের পাশের জমি কিংবা স্কুলের মাঠ—যেকোনো উপযুক্ত জায়গায় স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী খেলা যেত।

এই কারণেই অর্থনৈতিকভাবে সাধারণ পরিবারের শিশুরাও সহজে অংশ নিতে পারত।

শরীরচর্চার স্বাভাবিক মাধ্যম

গোল্লাছুট শিশুদের শরীরচর্চারও একটি স্বাভাবিক মাধ্যম ছিল।

দৌড়ানো, দ্রুত দিক পরিবর্তন করা, হঠাৎ থেমে যাওয়া, আবার ছুটে যাওয়া—এসবের ফলে শরীর সক্রিয় থাকত।

একই সঙ্গে চোখ ও শরীরের সমন্বয়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং পরিস্থিতি বুঝে প্রতিক্রিয়া দেখানোর অভ্যাস তৈরি হতো।

সবচেয়ে বড় কথা, শিশুদের শরীরচর্চা করতে আলাদা করে ‘ব্যায়াম করতে হবে’—এমন অনুভূতিও হতো না। খেলতে খেলতেই শরীরচর্চা হয়ে যেত।

বর্তমান সময়ে কেন হারিয়ে যাচ্ছে?

গোল্লাছুটের মতো বহু লোকজ খেলা আজ আগের তুলনায় অনেক কম দেখা যায়। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।

প্রথমত, শহর ও শহরতলিতে খোলা মাঠের পরিমাণ কমেছে। বাড়িঘর, রাস্তা এবং অন্যান্য নির্মাণের কারণে শিশুদের স্বাধীনভাবে খেলার জায়গা অনেক কমে গেছে।

দ্বিতীয়ত, পড়াশোনা ও বিভিন্ন অতিরিক্ত কার্যক্রমের চাপ বেড়েছে।

তৃতীয়ত, মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম, ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের অবসর কাটানোর পদ্ধতি বদলে দিয়েছে।

ফলে মাঠে গিয়ে দল বেঁধে খেলার অভ্যাস অনেকটাই কমেছে।

হারিয়ে যাওয়া খেলাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?

অবশ্যই সম্ভব।

স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান, পাড়ার উৎসব, গ্রামীণ মেলা কিংবা স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গোল্লাছুটের মতো পুরনো খেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

শিশুদের শুধু খেলাটির নাম বললেই হবে না। তাদের মাঠে নিয়ে গিয়ে নিয়ম বুঝিয়ে দিতে হবে। বড়রা নিজেদের শৈশবের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন।

প্রয়োজনে স্থানীয় অঞ্চলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী খেলার সহজ সংস্করণ তৈরি করা যেতে পারে।

এতে পুরনো খেলা নতুন প্রজন্মের কাছে আবার পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।

গোল্লাছুটের স্মৃতিতে একটি সময়

গোল্লাছুটের মতো খেলাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আনন্দ পাওয়ার জন্য সবসময় দামি খেলনা বা প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না।

কয়েকজন বন্ধু, একটি খোলা মাঠ আর কিছুটা অবসর—এই সামান্য উপকরণেই একসময় তৈরি হয়ে যেত অসাধারণ আনন্দের জগৎ।

সন্ধ্যা নামার সময় বাড়ি থেকে ডাক আসত। কেউ বলত, “আর পাঁচ মিনিট খেলি।” সেই পাঁচ মিনিট কখনও আধঘণ্টা হয়ে যেত। তারপর সবাই হাসতে হাসতে বাড়ির পথে ফিরত।

আজ সেই দৃশ্য অনেক জায়গায় আর দেখা যায় না। কিন্তু যারা সেই সময়ের সাক্ষী, তাদের স্মৃতিতে গোল্লাছুট এখনও জীবন্ত।

উপসংহার

গোল্লাছুট শুধু একটি পুরনো খেলার নাম নয়। এটি এক সময়ের গ্রামীণ ও পাড়ার সামাজিক জীবনের একটি অংশ। এই খেলায় ছিল দৌড়, কৌশল, প্রতিযোগিতা, বন্ধুত্ব এবং দলগত সহযোগিতা।

সময়ের পরিবর্তনে অনেক লোকজ খেলা হারিয়ে গেলেও সেগুলোর স্মৃতি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে রয়েছে।

নতুন প্রজন্ম যদি একবার মাঠে ফিরে আসে এবং গোল্লাছুটের মতো পুরনো খেলাগুলো হাতে-কলমে শেখে, তাহলে হয়তো হারিয়ে যাওয়া সেই বিকেলগুলোর কিছুটা আনন্দ আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

কারণ মাঠে খেলা শুধু শরীরকে সক্রিয় করে না—বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং একসঙ্গে আনন্দ করার সংস্কৃতিকেও বাঁচিয়ে রাখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *