
স্টেশনের একেবারে শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান ছিল। টিনের ছাউনি, কাঠের বেঞ্চ আর সামনে কাচের বয়ামে রাখা বিস্কুট—এই ছিল দোকানটির সবকিছু।
দোকানের মালিক নিতাই কাকা প্রতিদিন ভোরে দোকান খুলতেন। আর প্রায় প্রতিদিন সকাল আটটার দিকে সেখানে আসত দু’জন মানুষ—অর্ক আর মেঘলা।
তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল, কিন্তু কেউ কাউকে ভালোবাসার কথা কখনো বলেনি।
মেঘলা প্রতিদিন এক কাপ চা নিত। অর্ক নিত লাল চা।
একদিন মেঘলা হেসে বলেছিল,
— তুমি দুধ-চা খাও না কেন?
অর্ক বলেছিল,
— তোমার মতো মিষ্টি জিনিস প্রতিদিন খেলে আর আলাদা করে চায়ে মিষ্টি লাগে না।
মেঘলা মুখ গম্ভীর করে বলেছিল,
— খুব বাজে কথা বলতে শিখেছ!
কিন্তু তার চোখের হাসি লুকোনো যায়নি।
দিনগুলো এভাবেই কেটে যাচ্ছিল।
অর্ক একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে কাজ করত। মেঘলা ছিল স্কুলশিক্ষিকা। দু’জনের বাড়ি আলাদা শহরে হলেও কাজের সূত্রে এই শহরে থাকত।
একদিন বিকেলে মেঘলা হঠাৎ বলল,
— অর্ক, আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
অর্কের হাতে থাকা চায়ের কাপটা থেমে গেল।
— কবে?
— আগামী মাসে।
— তুমি রাজি?
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— সব সিদ্ধান্ত কি নিজের ইচ্ছেমতো নেওয়া যায়?
অর্ক আর কিছু বলল না।
সেদিন তারা প্রথমবার পাশাপাশি বসেও একে অপরের দিকে তাকায়নি।
পরের কয়েক সপ্তাহ মেঘলা আর স্টেশনে এল না।
অর্ক প্রতিদিন নিতাই কাকার দোকানে এসে দু’কাপ চা অর্ডার করত।
এক কাপ নিজের জন্য।
আরেক কাপ মেঘলার জন্য।
নিতাই কাকা অবাক হয়ে বলতেন,
— যে মেয়েটা আসে না, তার চা কেন?
অর্ক হাসত।
— অভ্যাসটা তো একদিনে যায় না, কাকা।
বিয়ের আগের দিন সন্ধ্যায় অর্ক শেষবারের মতো স্টেশনে এল।
নিতাই কাকা তাকে একটি ছোট খাম দিলেন।
— মেয়েটা সকালে দিয়ে গেছে।
অর্ক খাম খুলল।
ভেতরে মাত্র কয়েকটি লাইন।
“অর্ক,
তুমি যদি কোনোদিন আমাকে জিজ্ঞেস করতে, আমি কী চাই—তাহলে হয়তো উত্তরটা অন্যরকম হতো।
কিন্তু তুমি কখনো জিজ্ঞেস করোনি।
আমিও সাহস করে বলিনি।
তাই আমাদের গল্পটা শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।
তুমি ভালো থেকো।
— মেঘলা”
অর্ক অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর খামটা ভাঁজ করে পকেটে রাখল।
নিতাই কাকা ধীরে বললেন,
— কিছু কথা সময়মতো বলা দরকার, বাবা।
অর্ক মৃদু হেসে বলল,
— এখন বলে কী হবে, কাকা?
তারপর সে চলে গেল।
পাঁচ বছর কেটে গেল।
স্টেশনের চেহারা বদলে গেল। পুরোনো চায়ের দোকানটাও আর নেই। সেখানে নতুন দোকান হয়েছে।
অর্কও বদলে গেছে।
সে এখন অন্য শহরে কাজ করে। বিয়েও করেছে। জীবন নিজের মতো করে এগিয়ে গেছে।
এক শীতের সকালে কাজের সূত্রে তাকে আবার সেই শহরে আসতে হলো।
পুরোনো অভ্যাসের টানে সে স্টেশনের শেষ প্রান্তে চলে গেল।
চায়ের দোকানটি নেই।
কিন্তু ঠিক তার পাশেই একটি ছোট বইয়ের দোকান হয়েছে।
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একজন নারী বই সাজাচ্ছিল।
অর্ক থেমে গেল।
মেঘলা।
দু’জনের চোখে চোখ পড়ল।
কেউ প্রথমে কথা বলল না।
শেষ পর্যন্ত মেঘলা বলল,
— তুমি কেমন আছ?
— ভালো। তুমি?
— আমিও।
অর্ক লক্ষ করল, মেঘলার হাতে কোনো বিয়ের আংটি নেই।
মেঘলা নিজেই বলল,
— বিয়েটা হয়নি।
অর্ক অবাক হয়ে তাকাল।
— কেন?
— শেষ মুহূর্তে আমি না বলেছিলাম।
— তারপর?
মেঘলা একটু হেসে বলল,
— তারপর বুঝলাম, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত অন্যের হাতে দিয়ে দিলে সারাজীবন আফসোস করতে হয়।
অর্ক কিছু বলতে পারল না।
মেঘলা তাকিয়ে বলল,
— তুমি কি সুখী?
অর্ক একটু ভেবে বলল,
— হ্যাঁ। আমার জীবন ভালোই চলছে।
মেঘলা মাথা নাড়ল।
— ভালো। সেটাই চাই।
দু’জনের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।
কিছুক্ষণ পর অর্ক বলল,
— একটা কথা আজ বলতে পারি?
— বলো।
— পাঁচ বছর আগে তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করতে, আমি তোমাকে কী বলতে চাই…
মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
— আজ আর সেই উত্তর শুনতে চাই না।
অর্ক অবাক হলো।
মেঘলা বলল,
— কারণ কিছু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নয়, মানুষকে বদলে দেওয়ার জন্য আসে।
অর্কের চোখে জল এসে গেল।
সে বুঝল, কিছু সম্পর্কের শেষ মানেই পরাজয় নয়।
কখনো কখনো দু’জন মানুষ একে অপরকে ভালোবেসেও আলাদা পথে হাঁটে।
কারণ ভালোবাসার সব গল্পের শেষ একসঙ্গে হওয়া নয়।
কিছু গল্পের শেষ হয়—একজন আরেকজনের স্মৃতিতে ভালো মানুষ হয়ে থেকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
অর্ক চলে যাওয়ার আগে মেঘলা তাকে একটি বই দিল।
— এটা তোমার জন্য।
বইয়ের প্রথম পাতায় লেখা ছিল—
“যে কথাগুলো সময়মতো বলা হয়নি, তারা কখনো হারিয়ে যায় না। শুধু স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকে।”
অর্ক বইটি বুকে চেপে স্টেশন থেকে বেরিয়ে গেল।
পেছনে দাঁড়িয়ে মেঘলা অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়া দেখল।
তারপর ধীরে দোকানের দরজা বন্ধ করল।
দু’জনের পথ আলাদা হয়ে গেল।
কিন্তু পাঁচ বছর আগের সেই চায়ের দোকানের দুই কাপ চা যেন তাদের জীবনের কোথাও চিরকাল পাশাপাশি রয়ে গেল।












Leave a Reply