রাতের হাসপাতালের ৩০৭ নম্বর কক্ষ।

শহরের পুরোনো সরকারি হাসপাতালের রাতের ডিউটি খুব একটা সহজ ছিল না। দিনের বেলায় যেখানে শত শত মানুষের ভিড়, রাত বাড়তেই সেই করিডরগুলো অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে যেত।

সেই রাতেও নার্স অনন্যা রাত দশটা থেকে ডিউটিতে ছিল।

রাত তখন প্রায় একটা।

হঠাৎ হাসপাতালের পুরোনো ইন্টারকম বেজে উঠল।

— ট্রিং… ট্রিং…

অনন্যা রিসিভ করল।

— নার্স স্টেশন, বলুন।

ওপাশ থেকে খুব ক্ষীণ একটা কণ্ঠ ভেসে এল,

— ৩০৭ নম্বর কক্ষে একটু আসবেন?

অনন্যা চমকে উঠল।

— ৩০৭? কিন্তু ওই কক্ষ তো বন্ধ!

কোনো উত্তর এল না।

লাইন কেটে গেল।

অনন্যা ভেবেছিল হয়তো কেউ মজা করেছে। কিন্তু পাঁচ মিনিট পর আবার ইন্টারকম বেজে উঠল।

একই কণ্ঠ।

— দিদি… দয়া করে আসুন।

অনন্যার মনে অস্বস্তি হলো।

সে টর্চ নিয়ে পুরোনো ভবনের তৃতীয় তলায় উঠল।

৩০৭ নম্বর কক্ষটি করিডরের একেবারে শেষ প্রান্তে। দরজায় বড় তালা ঝুলছিল।

অনন্যা তালাটা দেখে ফিরে আসতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই ভেতর থেকে তিনবার শব্দ হলো।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

সে দরজার কাছে গিয়ে বলল,

— কে আছেন?

ভেতর থেকে শিশুর কণ্ঠ,

— দিদি… আমার খুব ঠান্ডা লাগছে।

অনন্যা সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীকে খবর দিল।

দু’জন মিলে তালা পরীক্ষা করে দেখল, সেটি বাইরে থেকেই বন্ধ।

কিন্তু ভেতর থেকে শব্দ আসছিল।

নিরাপত্তারক্ষী শেষ পর্যন্ত তালা খুলে ফেলল।

ঘরটা বহুদিন ব্যবহার হয়নি। পুরোনো বিছানা, ধুলো জমা টেবিল আর ভাঙা একটি জানালা ছাড়া কিছুই নেই।

কেউ নেই।

অনন্যা অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল।

হঠাৎ তার টর্চের আলো বিছানার নিচে পড়তেই একটা ছোট্ট জিনিস দেখা গেল।

একটি শিশুর নীল জুতো।

সে জুতোটি হাতে তুলে নিতেই ইন্টারকম আবার বেজে উঠল।

কিন্তু এই ঘরে তো কোনো ইন্টারকম থাকার কথা নয়!

ওপাশ থেকে সেই শিশুকণ্ঠ বলল,

— দিদি, আমার মাকে বলবেন আমি ভয় পাইনি।

অনন্যার হাত থেকে রিসিভার পড়ে গেল।

পরদিন সকালে হাসপাতালের পুরোনো রেকর্ড ঘাঁটতে শুরু করল সে।

তখনই জানা গেল, প্রায় আঠারো বছর আগে ৩০৭ নম্বর কক্ষে একটি আট বছরের ছেলে ভর্তি হয়েছিল। নাম ছিল রাহুল।

অপারেশনের আগে হঠাৎ বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়। হাসপাতালের ব্যাকআপ ব্যবস্থা কাজ না করায় জরুরি চিকিৎসা ব্যাহত হয়। ছেলেটি মারা যায়।

সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়—তার মা সেই রাতে হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ হয়ে যান।

অনন্যার মনে প্রশ্ন জাগল, “মা কোথায় গেলেন?”

পুরোনো রেকর্ডে ঠিকানা ছিল।

পরদিন ছুটির সময় অনন্যা সেই ঠিকানায় গেল।

সেখানে এখন একটি ছোট মুদির দোকান।

দোকানের বৃদ্ধ মালিককে রাহুলের নাম বলতেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— ছেলেটার মা বহু বছর আগে মারা গেছেন। কিন্তু মৃত্যুর আগে একটা কথাই বলতেন—“আমার ছেলে হাসপাতালের ওই ঘরে একা নেই।”

অনন্যা স্তব্ধ হয়ে গেল।

— তিনি কি আর কিছু বলেছিলেন?

বৃদ্ধ একটি পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ বের করলেন।

ভেতরে ছিল একটি ছোট টেপ রেকর্ডার।

— এটা তিনি রেখে গিয়েছিলেন।

অনন্যা রেকর্ডার চালু করল।

একজন মহিলার কাঁপা কণ্ঠ শোনা গেল,

— আমার ছেলে মারা যাওয়ার আগে বলেছিল, সে একা নেই। ঘরের বাইরে কেউ কাঁদছিল। আমি দরজা খুলতে গিয়েছিলাম। কিন্তু একজন আমাকে আটকে দেয়। তারপর…

রেকর্ডিং হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

অনন্যা হাসপাতালের পুরোনো কর্মীদের সঙ্গে কথা বলল।

শেষ পর্যন্ত এক অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসাকর্মী সত্যিটা জানালেন।

সেই রাতে শুধু রাহুল নয়, পাশের একটি কক্ষেও এক বৃদ্ধ রোগী সংকটাপন্ন ছিলেন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর হাসপাতালের কিছু কর্মী ভুল করে জরুরি যন্ত্র অন্য কক্ষে সরিয়ে নিয়েছিল। ফলে রাহুলের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়।

ঘটনাটি চাপা পড়ে যায়।

রাহুলের মা প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রভাবশালী কয়েকজন তাকে চুপ করিয়ে দিয়েছিল।

অনন্যা বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানাল।

পুরোনো তদন্তের নথি বের হলো। পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা হলো এবং হাসপাতালের জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও নতুন করে পরীক্ষা করা হলো।

কিন্তু ৩০৭ নম্বর কক্ষটি আর খোলা হয়নি।

কয়েক মাস পর হাসপাতালের নতুন ভবন তৈরি হলো।

একদিন অনন্যা শেষবারের মতো পুরোনো ভবনের সামনে দাঁড়িয়েছিল।

হঠাৎ তার ফোনে একটি মেসেজ এল।

কোনো নম্বর নেই।

শুধু লেখা—

“দিদি, এবার আর ঠান্ডা লাগছে না।”

অনন্যা কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর অজান্তেই চোখের কোণে জল এসে গেল।

সে ধীরে বলল,

— ভালো থেকো, রাহুল।

সেই রাতের পর আর কখনো ৩০৭ নম্বর কক্ষ থেকে কোনো ফোন আসেনি।

তবে হাসপাতালের পুরোনো কর্মীরা আজও বলেন, গভীর রাতে তৃতীয় তলার করিডরে মাঝে মাঝে ছোট্ট পায়ের শব্দ শোনা যায়।

কেউ ভয় পায় না।

কারণ সবাই জানে—

সেটি কোনো অশুভ আত্মার পদচারণা নয়।

সেটি ছিল এমন এক শিশুর শেষ অপেক্ষা, যে শুধু চেয়েছিল কেউ তার কথাটা শুনুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *