পুরোনো সিনেমা হলের শেষ শো।

শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল ‘রূপমহল’ নামে একটি পুরোনো সিনেমা হল। একসময় সন্ধ্যা নামলেই তার সামনে মানুষের ভিড় জমত। পোস্টারে পোস্টারে ঢাকা থাকত সামনের দেওয়াল। বাদামওয়ালা, ফুচকাওয়ালা, শরবতের দোকান—সব মিলিয়ে জায়গাটা ছিল উৎসবের মতো।

কিন্তু সময় বদলেছে।

নতুন মাল্টিপ্লেক্স এসেছে। মানুষ মোবাইলে সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত হয়েছে। একে একে বন্ধ হয়ে গেছে পুরোনো হলগুলো।

রূপমহলও বন্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

শেষ শোয়ের দিন ঠিক হলো শনিবার।

হলের ম্যানেজার অমলবাবু সকাল থেকেই মন খারাপ করে বসেছিলেন। ত্রিশ বছর এই হলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।

শেষ শোয়ের টিকিট বিক্রি হচ্ছিল প্রায় বিনামূল্যে।

তবু অদ্ভুতভাবে একটি টিকিট প্রতিদিনের মতোই কাউন্টারে আলাদা করে রাখা হয়েছিল।

সাদা কাগজে হাতে লেখা—

“সিট ১৭, সারি D”

অমলবাবু অবাক হয়ে কাউন্টারম্যানকে জিজ্ঞেস করলেন,

— এই টিকিটটা কার?

লোকটি বলল,

— জানি না। প্রতি মাসের শেষ শনিবার একজন এসে টাকা দিয়ে এই সিটটা বুক করে যায়। কিন্তু কাউকে দেখিনি।

অমলবাবু অবাক হলেন।

— কত বছর ধরে?

— প্রায় দশ বছর।

সেদিন শেষ শোয়ের আগে অমলবাবু সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি নিজেই দেখবেন কে আসে।

রাত আটটা।

হল ভর্তি হয়ে গেল।

আলো নিভল।

সিনেমা শুরু হলো।

অমলবাবু পিছনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সিট ১৭-এর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সিটটি খালি।

পুরো সিনেমা চলল।

কেউ এল না।

শেষ দৃশ্যের সময় হঠাৎ অমলবাবু দেখতে পেলেন, সিট ১৭-তে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন।

সাদা পাঞ্জাবি।

চোখে চশমা।

মুখে শান্ত হাসি।

অমলবাবু ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেলেন।

— আপনি?

বৃদ্ধ তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন,

— সিনেমাটা শেষ হতে দিন।

অমলবাবু আর কিছু বললেন না।

সিনেমা শেষ হলো।

আলো জ্বলে উঠতেই সিটটি আবার খালি।

কিন্তু সিটের ওপর পড়ে আছে একটি পুরোনো টিকিট।

তারিখ—পনেরো বছর আগের।

অমলবাবু টিকিটটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

পেছন থেকে এক বৃদ্ধ কর্মচারী বললেন,

— স্যার, এই টিকিটটা চিনতে পারছেন?

— না।

— এটা রমেনবাবুর টিকিট।

অমলবাবু চমকে উঠলেন।

রমেনবাবু ছিলেন রূপমহলের নিয়মিত দর্শক। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি প্রতি মাসে একা এসে একই সিটে বসে সিনেমা দেখতেন।

পনেরো বছর আগে একদিন সিনেমা দেখতে এসে হৃদরোগে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

সিট ১৭-তেই।

অমলবাবুর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

কিন্তু রহস্য এখানেই শেষ নয়।

পরদিন হল ভাঙার কাজ শুরু হওয়ার আগে অমলবাবু পুরোনো রেকর্ড ঘাঁটতে লাগলেন।

তিনি রমেনবাবুর পরিবারের ঠিকানা খুঁজে পেলেন।

সেদিনই তাঁর বাড়িতে গেলেন।

দরজা খুললেন এক বৃদ্ধা মহিলা।

অমলবাবু নিজের পরিচয় দিতেই মহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

— আপনি এত বছর পরে এলেন?

— কেন?

— রমেন বলত, রূপমহল বন্ধ হওয়ার আগে সে শেষবার সিনেমাটা দেখবে।

অমলবাবু অবাক হয়ে বললেন,

— কিন্তু উনি তো পনেরো বছর আগে মারা গেছেন।

মহিলা মৃদু হেসে বললেন,

— আমি জানি।

তারপর তিনি একটি পুরোনো খাম বের করলেন।

ভেতরে ছিল একটি ছবি।

ছবিতে রমেনবাবু, তাঁর স্ত্রী এবং ছোট্ট একটি ছেলে।

ছেলেটির বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর।

অমলবাবু ছবির দিকে তাকিয়ে বললেন,

— এই ছেলেটি কে?

মহিলা বললেন,

— আমাদের ছেলে। রমেনের মৃত্যুর পর সে সিনেমা দেখা ছেড়ে দিয়েছিল। কারণ শেষবার বাবার সঙ্গে ওই হলেই সিনেমা দেখতে গিয়েছিল।

— এখন কোথায়?

— বিদেশে থাকে।

অমলবাবু বাড়ি ফিরে সেদিন সারারাত ঘুমাতে পারলেন না।

পরদিন হল ভাঙার কাজ শুরু হওয়ার আগে তিনি সিট ১৭-তে গিয়ে দাঁড়ালেন।

সিটের নিচে একটি ছোট কাঠের বাক্স পেলেন।

ভেতরে একটি পুরোনো ফিল্মের টুকরো এবং একটি কাগজ।

কাগজে লেখা—

“যে জায়গায় আমাদের হাসি জমে থাকে, সেটাকে শুধু ইট-পাথর দিয়ে মাপা যায় না।”

অমলবাবু সিদ্ধান্ত নিলেন, হলটি পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হবে না।

মালিকের সঙ্গে কথা বলে তিনি হলের সামনের অংশটি রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন।

সেখানে তৈরি হলো একটি ছোট সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

পুরোনো পোস্টারগুলো দেওয়ালে লাগানো হলো। রূপমহলের ইতিহাস রাখা হলো। আর সিট ১৭ রাখা হলো আগের জায়গাতেই।

উদ্বোধনের দিন অমলবাবু দেখলেন, বিদেশ থেকে এক যুবক এসেছে।

সে সিট ১৭-এর সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— আমি রমেনবাবুর ছেলে।

অমলবাবু কিছু বলার আগেই যুবকটি সিটে বসে পড়ল।

চোখ বন্ধ করে বলল,

— বাবা আমাকে বলেছিল, একদিন আবার এখানে আসবে।

অমলবাবুর চোখ ভিজে উঠল।

সেদিন রাতে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ করার সময় অমলবাবু শেষবার সিট ১৭-এর দিকে তাকালেন।

সিটটি খালি।

কিন্তু তার ওপর রাখা ছিল একটি তাজা সাদা ফুল।

কে রেখেছিল, কেউ জানে না।

অমলবাবু শুধু মৃদু হেসে বললেন,

— রমেনবাবু, এবার আপনার সিনেমা হলটা বেঁচে গেল।

বাইরে তখন শহরের আলো জ্বলছে।

পুরোনো রূপমহল আর সিনেমা হল নেই।

কিন্তু তার স্মৃতি এখনও বেঁচে আছে।

কারণ কিছু জায়গা শুধু সিনেমা দেখায় না—

তারা মানুষের জীবনের গল্পও জমিয়ে রাখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *