
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। নদীর ওপর পাতলা কুয়াশা। দূরে কোথাও একটা পাখি ডাকছে। জলের ওপর ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে একটি ছোট নৌকা।
নৌকার মাঝখানে বসে আছে ষোলো বছরের নীলয়।
হাতে বৈঠা।
চোখ নদীর দিকে।
নীলয়ের বাবা হরিপদ ছিলেন জেলে। ছোটবেলা থেকেই নীলয় বাবার সঙ্গে নদীতে যেত। কিন্তু নদীকে সে কখনও শুধু জীবিকার জায়গা হিসেবে দেখেনি।
তার কাছে নদী ছিল এক বিশাল রহস্য।
বাবা মাঝে মাঝে বলতেন,
—“নদীকে কখনও ছোট করে দেখিস না। নদী শান্ত থাকলে বন্ধু, রেগে গেলে কাউকে ক্ষমা করে না।”
নীলয় কথাটা মনে রাখত।
এক বর্ষার সকালে বাবা নদীতে যাওয়ার সময় বললেন,
—“আজ তুই বাড়িতে থাক।”
নীলয় অবাক হয়ে বলল,
—“কেন?”
—“আকাশ ভালো নয়।”
নীলয় আকাশের দিকে তাকাল। কালো মেঘ জমছিল।
—“তুমি একা যাবে?”
বাবা হাসলেন।
—“আমি তো কত বছর ধরে নদীতে আছি।”
সেদিন দুপুরের পর হঠাৎ ঝড় উঠল।
বৃষ্টি শুরু হল মুষলধারে।
নীলয় বারবার নদীর দিকে তাকাচ্ছিল।
তার বাবা তখনও ফেরেননি।
সন্ধ্যা হয়ে গেল।
মা উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন।
গ্রামের আরও কয়েকজন জেলে নদীর দিকে ছুটে গেল।
রাত বাড়ল।
অবশেষে অনেক দূরে একটি নৌকা দেখা গেল।
হরিপদ ফিরেছেন।
কিন্তু নৌকাটি ভাঙা।
হরিপদের হাতে গভীর চোট।
সেই ঘটনার পর ডাক্তার জানিয়ে দিলেন—কিছুদিন নদীতে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেল।
নীলয় স্কুলে পড়ত। কিন্তু সংসারের অবস্থা দেখে সে স্কুল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
মা বাধা দিলেন।
—“তুই পড়াশোনা ছাড়বি না।”
নীলয় বলল,
—“সংসার চলবে কী করে?”
মা চোখ মুছে বললেন,
—“কিছু একটা ব্যবস্থা হবে।”
কিন্তু নীলয় জানত, ব্যবস্থা নিজে থেকে হয় না।
সে নদীতে মাছ ধরার কাজ শুরু করল।
ভোরে নদীতে যেত, দুপুরে ফিরত, তারপর বিকেলে বাজারে মাছ বিক্রি করত।
রাতে ক্লান্ত শরীরে বই খুলে বসত।
অনেক সময় বইয়ের ওপরই তার চোখ লেগে যেত।
একদিন স্কুলের শিক্ষক অরিন্দমবাবু তাকে বাজারে মাছ বিক্রি করতে দেখে থমকে গেলেন।
—“নীলয়! তুই স্কুলে আসছিস না কেন?”
নীলয় মাথা নিচু করে বলল,
—“বাবা অসুস্থ।”
শিক্ষক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
—“তুই পড়াশোনা চালিয়ে যা। বাকিটা আমরা দেখব।”
নীলয় বলল,
—“স্যার, আমার সময় নেই।”
অরিন্দমবাবু বললেন,
—“সময় তৈরি করতে হয়।”
পরদিন থেকে নীলয় আবার স্কুলে যেতে শুরু করল।
ভোরে নদীতে কাজ।
দুপুরে স্কুল।
সন্ধ্যায় বাজার।
রাতে পড়াশোনা।
জীবন যেন একটা দৌড়ে পরিণত হল।
কিন্তু নীলয় হাল ছাড়ল না।
একদিন বিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক নদীর স্রোত নিয়ে পড়াচ্ছিলেন।
নীলয় হঠাৎ হাত তুলল।
—“স্যার, নদীর স্রোত দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা যায়?”
অরিন্দমবাবু বললেন,
—“যায়। তবে তার জন্য নির্দিষ্ট প্রযুক্তি লাগে।”
নীলয়ের চোখ চকচক করে উঠল।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে নদীর স্রোত নিয়ে ভাবতে লাগল।
তাদের গ্রামে প্রায়ই বিদ্যুৎ চলে যেত।
তাহলে নদীর স্রোতকে কাজে লাগিয়ে যদি ছোট কোনও যন্ত্র বানানো যায়?
সে পুরনো সাইকেলের চাকা, ভাঙা মোটরের অংশ, তার আর কাঠের টুকরো জোগাড় করল।
প্রথম যন্ত্র তৈরি করল।
নদীতে নামাতেই সেটা ভেঙে গেল।
দ্বিতীয়বার বানাল।
সেটাও কাজ করল না।
তৃতীয়বার সে নকশা বদলাল।
এবার একটি ছোট বাল্ব মৃদু আলো দিল।
নীলয় আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
—“মা! আলো জ্বলেছে!”
মা ছুটে এসে দেখলেন।
ছোট্ট বাল্বটা সত্যিই জ্বলছে।
মা অবাক হয়ে বললেন,
—“তুই এটা বানিয়েছিস?”
নীলয় হাসল।
—“নদী বানিয়েছে। আমি শুধু ওর শক্তিটা ধরেছি।”
অরিন্দমবাবু যন্ত্রটি দেখে নীলয়কে বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিতে বললেন।
নীলয় মেলায় গেল।
তার ছোট্ট জলচাকা দেখে বিচারকরা আগ্রহী হলেন।
একজন জিজ্ঞেস করলেন,
—“এটা কোথায় ব্যবহার করতে চাও?”
নীলয় বলল,
—“আমাদের গ্রামের মতো ছোট নদী বা খালের পাশে। যেখানে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র করা সম্ভব নয়, সেখানে ছোট আলো জ্বালানোর জন্য।”
বিচারকরা আরও প্রশ্ন করলেন।
নীলয় সবকিছুর উত্তর দিল।
শেষে সে বিশেষ পুরস্কার পেল।
কিন্তু তার আসল পুরস্কার ছিল অন্য কিছু।
একটি সংস্থা তার প্রকল্পটি উন্নত করার জন্য তাকে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিল।
নীলয় শহরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিল।
কয়েক মাস পর সে আরও উন্নত একটি ছোট জলবিদ্যুৎ যন্ত্র তৈরি করল।
সেটি নদীর স্রোতে বসালে কয়েকটি বাড়ির বাতি জ্বালানো সম্ভব।
গ্রামে ফিরে সে প্রথমে নিজের বাড়িতে যন্ত্রটি বসাল।
রাতে ঘরের বাতি জ্বলে উঠল।
হরিপদ অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“যে নদী আমার হাত ভেঙে দিয়েছিল, সেই নদীই আজ তোর হাত ধরে আলো জ্বালাল।”
নীলয় বাবার হাত ধরে বলল,
—“নদী কাউকে শত্রু ভাবে না বাবা। আমরা যদি তাকে বুঝতে শিখি, সে আমাদের অনেক কিছু দিতে পারে।”
ধীরে ধীরে গ্রামের আরও কয়েকটি বাড়িতে সেই ব্যবস্থা বসানো হল।
ছোট্ট জলচাকা ঘুরতে লাগল।
নদীর স্রোত থেকে আলো জন্ম নিতে লাগল।
নীলয় আবার পড়াশোনা শুরু করল।
বহু বছর পর সে প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা শেষ করল।
শহরে চাকরির সুযোগও পেল।
কিন্তু সে গ্রাম ছেড়ে স্থায়ীভাবে চলে গেল না।
সে নদীর ধারে একটি ছোট কর্মশালা তৈরি করল।
সেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা এসে পুরনো জিনিস দিয়ে নতুন যন্ত্র বানানো শেখে।
একদিন এক ছোট ছেলে তাকে জিজ্ঞেস করল,
—“দাদা, তুমি এত কিছু কীভাবে শিখলে?”
নীলয় নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—“আমি নদীর কাছ থেকে শিখেছি।”
ছেলেটি অবাক হয়ে বলল,
—“নদী আবার শেখায়?”
নীলয় হাসল।
—“শেখায়। নদী থামে না। পাথর এলে পথ বদলায়, বাঁধ এলে রাস্তা খোঁজে, শুকিয়ে গেলে আবার বৃষ্টির অপেক্ষা করে। জীবনও ঠিক তেমন।”
সন্ধ্যায় নদীর ওপর সূর্যের শেষ আলো পড়ছিল।
জল ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছিল।
কোথাও কোনও শব্দ নেই।
শুধু স্রোতের একটানা ছন্দ।
নীলয় দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবল—
একদিন এই নদী তার বাবাকে কেড়ে নিতে বসেছিল।
আজ সেই নদীই তার স্বপ্নের সঙ্গী।
জীবনও হয়তো এমনই।
যে বাধাকে আমরা শেষ বলে মনে করি, কখনও কখনও সেই বাধাই আমাদের নতুন পথ খুঁজতে শেখায়।
আর সাহসী মানুষ সেই পথেই হাঁটে।












Leave a Reply