
শালিকপুর গ্রামের এক প্রান্তে ছিল বিশাল একটি আমবাগান। একসময় সেখানে শতাধিক আমগাছ ছিল। গ্রীষ্ম এলেই চারদিক ভরে যেত কাঁচা আমের গন্ধে। দুপুরে গাছের ছায়ায় গ্রামের মানুষ বিশ্রাম নিত, শিশুরা খেলত, আর পাখিরা সারাদিন ডাকাডাকি করত।
কিন্তু সময় বদলাতে লাগল।
একটার পর একটা গাছ কেটে বাড়ি তৈরি হতে লাগল। কোথাও দোকান, কোথাও গ্যারেজ, কোথাও পাকা রাস্তা।
শেষ পর্যন্ত আমবাগানে মাত্র একটি বড় আমগাছ বেঁচে রইল।
গাছটির বয়স কত, কেউ জানত না।
গ্রামের বৃদ্ধেরা বলতেন,
—“এই গাছটা আমাদের থেকেও পুরনো।”
সেই গ্রামেরই দশ বছরের ছেলে অয়ন প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে গাছটির নিচে বসত।
গাছটি ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা।
একদিন অয়ন গাছের গায়ে হাত রেখে বলল,
—“তুই কিন্তু কোথাও যাবি না, বুঝলি?”
তার দিদা পাশ থেকে শুনে হেসে বললেন,
—“গাছ কি কোথাও যায় নাকি?”
অয়ন বলল,
—“মানুষ তো কেটে নিয়ে যায়।”
দিদার মুখটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
তিনি বললেন,
—“তাই তোকে এই গাছটাকে বাঁচাতে হবে।”
অয়ন কথাটা মনে রাখল।
কয়েকদিন পর খবর এল—ওই জায়গায় একটি বড় গুদাম তৈরি হবে। গাছটি কেটে ফেলতে হবে।
অয়ন খবরটা শুনে দৌড়ে বাড়ি এল।
—“দিদা! ওরা গাছটা কেটে ফেলবে!”
দিদা চুপ করে রইলেন।
অয়ন বলল,
—“আমরা কিছু করব না?”
দিদা বললেন,
—“কী করতে পারিস তুই?”
অয়ন জানত না।
কিন্তু সে ঠিক করল, চেষ্টা করবে।
পরদিন সে স্কুলে গিয়ে শিক্ষককে সব বলল।
শিক্ষক বললেন,
—“একটা গাছ বাঁচানো শুধু গাছ বাঁচানো নয়। কিন্তু তার জন্য যুক্তি দেখাতে হবে।”
অয়ন জিজ্ঞেস করল,
—“কীভাবে?”
শিক্ষক বললেন,
—“তুই গ্রামের মানুষদের বোঝা। গাছটা কেন দরকার, তার একটা তালিকা তৈরি কর।”
অয়ন কাজ শুরু করল।
সে গাছটির নিচে কতজন মানুষ বসে, কত পাখি আসে, গ্রীষ্মে কত ছায়া পাওয়া যায়—সব লিখে রাখল।
গ্রামের বৃদ্ধদের কাছ থেকে সে পুরনো গল্প সংগ্রহ করল।
কেউ বললেন, এই গাছের আম দিয়ে একসময় পুরো গ্রামের পুজোর ভোগ রান্না হত।
কেউ বললেন, একবার ভয়াবহ ঝড়ের সময় বহু মানুষ এই গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছিল।
আর দিদা বললেন,
—“তোর বাবা যখন ছোট ছিল, এই গাছের ডালে দোলনা বেঁধে দিতাম।”
অয়ন সব লিখে রাখল।
তারপর স্কুলে একটি ছোট প্রদর্শনী করল।
শিরোনাম—
“আমাদের শেষ আমগাছ”
সেখানে সে গাছটির ছবি, পুরনো স্মৃতি, পাখিদের তালিকা এবং গাছটির ছায়ায় গ্রামের মানুষের ব্যবহার তুলে ধরল।
প্রদর্শনী দেখে অনেকেই ভাবতে শুরু করল।
কিন্তু গুদাম তৈরির কাজ থামল না।
এক সকালে কয়েকজন শ্রমিক এসে গাছের পাশে দাগ দিয়ে গেল।
অয়নের বুক ধক করে উঠল।
সে ছুটে গিয়ে গাছটাকে জড়িয়ে ধরল।
—“কেউ কাটবে না!”
শ্রমিকরা বলল,
—“আমাদের কাজ করতে হবে।”
অয়ন কাঁদতে কাঁদতে স্কুলের শিক্ষককে ফোন করল।
শিক্ষক গ্রামের মানুষদের নিয়ে সেখানে এলেন।
তারপর শুরু হল আলোচনা।
গুদাম নির্মাণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বললেন,
—“গাছটা সরানো না হলে নকশা বদলাতে হবে।”
গ্রামের এক বৃদ্ধ বললেন,
—“নকশা বদলানো যায়। একশো বছরের গাছ ফিরিয়ে আনা যায় না।”
কথাটা সবাইকে থামিয়ে দিল।
অবশেষে নির্মাণ সংস্থা নতুন পরিকল্পনা করল।
গাছটি কাটা হবে না।
বরং গাছটিকে কেন্দ্র করে একটি ছোট খোলা জায়গা রাখা হবে।
সেখানে বসার বেঞ্চ হবে।
আর গাছটির চারপাশে আরও নতুন গাছ লাগানো হবে।
অয়ন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
সে দিদাকে বলল,
—“গাছটা বেঁচে গেল!”
দিদা হাসলেন।
—“শুধু গাছটা নয়। তোর ভেতরের সাহসটাও বেঁচে গেল।”
কাজ শুরু হল।
গ্রামের শিশুরা মিলে গাছের চারপাশ পরিষ্কার করল।
তারপর একদিন স্কুলের শিক্ষক বললেন,
—“আজ প্রত্যেকে একটা করে গাছ লাগাবে।”
সেদিন পঞ্চাশটি চারা রোপণ করা হল।
কয়েক মাসের মধ্যে জায়গাটা বদলে গেল।
আগে যেখানে শুধু একটি পুরনো আমগাছ দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে এখন ছোট ছোট গাছের সারি।
অয়ন প্রতিদিন তাদের দেখতে যেত।
একদিন সে লক্ষ্য করল, নতুন লাগানো একটি গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে।
সে সঙ্গে সঙ্গে জল দিল।
পরদিনও দিল।
তারপর নিয়ম করে জল দেওয়ার দায়িত্ব নিল।
কয়েক সপ্তাহ পর গাছটিতে নতুন পাতা এল।
অয়ন আনন্দে বলল,
—“দিদা! ও বেঁচে গেছে!”
দিদা বললেন,
—“গাছকে বাঁচাতে শুধু একদিনের ভালোবাসা যথেষ্ট নয়। প্রতিদিন যত্ন করতে হয়।”
এই কথাটাও অয়নের মনে গেঁথে গেল।
বছর কেটে গেল।
অয়ন বড় হল।
সে পরিবেশ নিয়ে পড়াশোনা করল।
শহরে চাকরির সুযোগ পেলেও নিজের গ্রামকে ভুলল না।
গ্রামে ফিরে সে একটি ছোট পরিবেশ ক্লাব তৈরি করল।
নাম দিল—
“শেষ আমগাছের বন্ধুরা।”
এখন সেই ক্লাবে গ্রামের শিশুরা গাছ লাগায়, পুকুর পরিষ্কার করে, পাখিদের জন্য জল রাখে এবং প্লাস্টিক কম ব্যবহারের প্রচার করে।
বহু বছর পর এক গ্রীষ্মের দুপুরে অয়ন আবার সেই পুরনো আমগাছের নিচে এসে দাঁড়াল।
গাছটি আরও বিশাল হয়েছে।
তার ডালে অসংখ্য পাতা।
চারপাশে নতুন গাছগুলোও বড় হয়েছে।
একটি ছোট ছেলে এসে অয়নকে জিজ্ঞেস করল,
—“কাকু, এই গাছটা এত পুরনো?”
অয়ন হেসে বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“কে লাগিয়েছিল?”
অয়ন একটু চুপ করে বলল,
—“জানি না।”
ছেলেটি আবার জিজ্ঞেস করল,
—“তাহলে এটা কে বাঁচিয়েছিল?”
অয়ন গাছটির দিকে তাকিয়ে বলল,
—“অনেক মানুষ।”
তারপর সে শিশুটির হাতে একটি ছোট চারা দিয়ে বলল,
—“এবার তুই একটা লাগা।”
ছেলেটি মাটিতে গর্ত করে চারাটি পুঁতে দিল।
অয়ন দূর থেকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হল, একটা গাছ বাঁচানোর গল্প কখনও শুধু একটা গাছের গল্প নয়।
একটি গাছের ছায়া যেমন বহু মানুষকে আশ্রয় দেয়, তেমনই একটি ভালো কাজও বহু মানুষের মনে নতুন ভালো কাজের বীজ বুনে দেয়।
শালিকপুরের সেই পুরনো আমগাছ আজও দাঁড়িয়ে আছে।
তার নিচে এখনও শিশুরা খেলে।
বৃদ্ধরা বসে গল্প করেন।
পাখিরা বাসা বাঁধে।
আর বাতাস যখন পাতার ফাঁক দিয়ে বয়ে যায়, মনে হয় গাছটি যেন নীরবে বলে—
“আমাকে বাঁচিয়েছিলে বলে শুধু আমি বাঁচিনি; তোমাদের ভবিষ্যতের একটু সবুজও বেঁচে গেছে।”












Leave a Reply