ভাঙা সাইকেলের দোকান।

কানাইডাঙা গ্রামের বাজারের একেবারে শেষ মাথায় ছিল ছোট্ট একটি টিনের দোকান। দোকানের সামনে ঝুলত একটি পুরনো বোর্ড—

“হরেন সাইকেল সারাই”

দোকানটি এত ছোট ছিল যে দুজন মানুষ দাঁড়ালে তৃতীয়জনকে বাইরে অপেক্ষা করতে হত।

দোকানের মালিক হরেনবাবু। বয়স প্রায় ষাট। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে তিনি সাইকেল সারাই করতেন।

গ্রামের মানুষ কেউ পাংচার হলে, ব্রেক নষ্ট হলে কিংবা চেন খুলে গেলে হরেনবাবুর দোকানেই আসত।

কিন্তু সময় বদলাচ্ছিল।

গ্রামে মোটরবাইক বেড়েছে। ইলেকট্রিক স্কুটার এসেছে। সাইকেলের ব্যবহার কমেছে।

হরেনবাবুর দোকানে আগের মতো ভিড় হয় না।

তাঁর ছেলে রবি শহরে গিয়ে চাকরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাবাকে একা রেখে যেতে পারছিল না।

একদিন রবি বলল,

—“বাবা, দোকানটা বন্ধ করে দিই?”

হরেনবাবু অবাক হয়ে তাকালেন।

—“কেন?”

—“কাজ নেই।”

হরেনবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

—“কাজ নেই, না আমরা নতুন কাজ খুঁজিনি?”

রবি উত্তর দিল না।

পরদিন সকালে হরেনবাবু দোকান খুললেন যথারীতি।

দুপুর পর্যন্ত মাত্র একটি সাইকেল এল।

রবি বিরক্ত হয়ে বলল,

—“এভাবে কতদিন?”

হরেনবাবু হেসে বললেন,

—“যতদিন মানুষ সাইকেল চালাবে।”

কিন্তু সেই সন্ধ্যাতেই একটা ঘটনা ঘটল।

গ্রামের স্কুলের প্রধান শিক্ষক হরেনবাবুর কাছে এলেন।

—“একটা কাজ করতে পারবেন?”

—“বলুন।”

—“স্কুলের অনেক গরিব ছাত্রছাত্রীর সাইকেল নষ্ট হয়ে থাকে। তারা মেরামত করতে পারে না। আপনি যদি সপ্তাহে একদিন বিনা পয়সায় সাইকেলগুলো ঠিক করে দেন?”

হরেনবাবু এক মুহূর্তও ভাবলেন না।

—“অবশ্যই।”

পরের শনিবার স্কুল থেকে দশটি সাইকেল এল।

কেউ ব্রেক নষ্ট।

কারও চেন ছিঁড়ে গেছে।

কারও টায়ার পাংচার।

হরেনবাবু সব ঠিক করে দিলেন।

রবি অবাক হয়ে বলল,

—“সব বিনা পয়সায়?”

হরেনবাবু বললেন,

—“ওরা স্কুলে যাচ্ছে। ওদের সাইকেল চললে আমাদের দোকান না চললেও ক্ষতি নেই।”

কিন্তু সেদিনই একটি নতুন ঘটনা ঘটল।

একটি ছেলে সাইকেল নিয়ে এসে বলল,

—“কাকু, আমার সাইকেলটা ঠিক করে দিন। কাল পরীক্ষা।”

হরেনবাবু সাইকেলটি হাতে নিয়ে বললেন,

—“চিন্তা করিস না।”

ছেলেটি চলে যাওয়ার সময় বলল,

—“কাকু, আমি বড় হয়ে আপনার মতো ভালো মানুষ হব।”

হরেনবাবু হেসে ফেললেন।

কিন্তু রবি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল—চোখের কোণে জল।

সেই দিন থেকে সপ্তাহে একদিন “ফ্রি সাইকেল সারাই” শুরু হল।

খবর ছড়িয়ে পড়ল।

শুধু স্কুলের ছাত্র নয়, গ্রামের বৃদ্ধ, কৃষক, দিনমজুর—যার সামর্থ্য নেই, তার সাইকেলও হরেনবাবু বিনা পয়সায় ঠিক করে দিতেন।

কেউ চাল, কেউ সবজি, কেউ ডিম দিয়ে যেত।

হরেনবাবু নিতেন না।

বলতেন,

—“যেদিন পারবে, সেদিন অন্য কাউকে সাহায্য করো।”

একদিন শহর থেকে এক যুবক এল।

সে বলল,

—“কাকু, আপনার দোকানের একটা ছবি তুলতে পারি?”

হরেনবাবু অবাক।

—“কেন?”

—“আমি সাইকেল নিয়ে একটা অনলাইন পেজ চালাই। আপনার কাজের কথা লিখব।”

হরেনবাবু এসব বুঝতেন না।

কয়েকদিন পর তার দোকানের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল।

অনেক মানুষ জানতে চাইল—

“এই দোকান কোথায়?”

কেউ কেউ দূর থেকে সাইকেল নিয়ে আসতে শুরু করল।

কেউ আবার পুরনো সাইকেল দান করতে লাগল।

হরেনবাবু তখন একটি নতুন ভাবনা ভাবলেন।

তিনি বললেন,

—“পুরনো সাইকেলগুলো ঠিক করে যেসব ছেলেমেয়ের সাইকেল নেই, তাদের দেব।”

রবি বলল,

—“বাবা, এটা করা সম্ভব?”

হরেনবাবু বললেন,

—“চেষ্টা করলে সম্ভব।”

শুরু হল নতুন কাজ।

মানুষ পুরনো সাইকেল দান করতে লাগল।

হরেনবাবু ও রবি সেগুলো সারাই করে নতুনের মতো করে তুলতে লাগলেন।

কয়েক মাসের মধ্যে পনেরোটি সাইকেল প্রস্তুত হল।

স্কুলের শিক্ষকরা গরিব ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সাইকেলগুলো বিতরণ করলেন।

একটি মেয়ে সাইকেল পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“কাকু, এবার আমি আর স্কুল কামাই করব না।”

হরেনবাবু বললেন,

—“কেন?”

—“বাড়ি থেকে স্কুল অনেক দূর। হেঁটে যেতে পারতাম না।”

হরেনবাবু তার মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“এই সাইকেলটা যত্ন করে চালাবি। আর একদিন তুইও কাউকে সাহায্য করবি।”

রবি পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

তার মনে হল, এই ছোট্ট দোকানটা আর শুধু সাইকেল সারাইয়ের দোকান নেই।

এটা যেন মানুষের পথ সারাই করার জায়গা হয়ে গেছে।

কিছুদিন পর রবি বাবাকে বলল,

—“দোকানের নাম বদলাব?”

হরেনবাবু হেসে বললেন,

—“কী নাম দিবি?”

রবি দোকানের পুরনো বোর্ড নামিয়ে নতুন বোর্ড লাগাল।

সেখানে লেখা—

“চলার পথ”

সাইকেল সারাই ও স্বপ্নের সহায়তা কেন্দ্র

হরেনবাবু বোর্ডটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

—“নামটা ভালো হয়েছে।”

রবি হাসল।

—“তোমার দোকান তো শুধু সাইকেল সারায় না বাবা।”

হরেনবাবু বললেন,

—“মানুষের পথ যদি একটু সহজ করতে পারি, সেটাই বড় কথা।”

বছর দুয়েকের মধ্যে দোকানের কাজ অনেক বেড়ে গেল।

রবি আর শহরে যাওয়ার কথা ভাবল না।

সে বাবার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করল।

দুজন মিলে একটি ছোট প্রশিক্ষণকেন্দ্রও খুলল। গ্রামের কয়েকজন বেকার যুবক সেখানে সাইকেল সারাই শেখে।

হরেনবাবু বলতেন,

—“কাজ ছোট-বড় হয় না। কাজকে ভালোবাসতে হয়।”

একদিন বিকেলে হরেনবাবু দোকানের সামনে বসে ছিলেন।

একটি তরুণী সাইকেল নিয়ে এল।

হরেনবাবু তাকিয়ে বললেন,

—“কী হয়েছে?”

মেয়েটি হেসে বলল,

—“কিছু হয়নি কাকু। আপনাকে একটা খবর দিতে এসেছি।”

—“কী খবর?”

—“আমি শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছি।”

হরেনবাবু অবাক হয়ে গেলেন।

মেয়েটি বলল,

—“আপনি যে সাইকেলটা আমাকে দিয়েছিলেন, সেটা নিয়ে আমি স্কুলে যেতাম। তখন বলেছিলেন, একদিন অন্য কাউকে সাহায্য করতে। আমি চাকরি পাওয়ার পর প্রথম বেতন দিয়ে পাঁচটা সাইকেল কিনেছি।”

হরেনবাবু কিছু বলতে পারলেন না।

মেয়েটি পাঁচটি নতুন সাইকেল দোকানের সামনে রেখে বলল,

—“এগুলো আপনি যাদের দরকার, তাদের দেবেন।”

হরেনবাবু চোখ মুছে বললেন,

—“তুই কথা রেখেছিস।”

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নেমে আসছিল।

দোকানের সামনে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটি সাইকেল।

কিছু পুরনো।

কিছু নতুন।

কিন্তু প্রত্যেকটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি করে মানুষের গল্প।

হরেনবাবু দোকান বন্ধ করার আগে বোর্ডটির দিকে তাকালেন।

“চলার পথ।”

তিনি মৃদু হেসে বললেন,

—“সাইকেল ঠিক করতে করতে বুঝলাম, মানুষের জীবনেও মাঝে মাঝে শুধু একটু ঠেলা দরকার। তারপর সে নিজেই চলতে শেখে।”

রাস্তার ওপর তখন একের পর এক সাইকেল ছুটে যাচ্ছিল।

কেউ স্কুলে যাচ্ছে।

কেউ কাজে।

কেউ বাড়ি ফিরছে।

আর সেই ছোট্ট দোকানের সামনে জ্বলতে থাকা একটি বাতি যেন নীরবে বলে যাচ্ছিল—

যে মানুষ অন্যের চলার পথ সহজ করে দেয়, তার নিজের পথ কখনও সত্যিই থেমে যায় না।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *