
আজকের শিশুদের বিনোদনের জগৎ অনেকটাই প্রযুক্তিনির্ভর। স্মার্টফোন, ট্যাব, কম্পিউটার এবং অনলাইন গেম তাদের অবসর কাটানোর পরিচিত মাধ্যম। কিন্তু কয়েক দশক আগেও ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তখন একটি ছোট্ট উঠোন, কয়েকটি কাঠি, কিছু গুটি কিংবা পাথরের টুকরো দিয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত।
গ্রামবাংলার সেই সরল খেলাধুলার জগতে নানা ধরনের স্থানীয় খেলার প্রচলন ছিল। তার মধ্যে কাঠি-গুটি নামটি বিভিন্ন অঞ্চলের ছোটদের লোকজ খেলায় নানা রূপে ব্যবহৃত হয়েছে। কোথাও কাঠি ও গুটি দিয়ে লক্ষ্যভেদ করা হতো, কোথাও গুটি সরানোর সঙ্গে কাঠির ব্যবহার থাকত, আবার কোথাও এটি ছিল ছোটখাটো দলগত প্রতিযোগিতা।
তাই কাঠি-গুটিকে একটি নির্দিষ্ট সর্বজনীন নিয়মের খেলা না বলে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত কাঠি ও ছোট গুটি-নির্ভর লোকজ খেলার একটি পরিচিত ধারা হিসেবে দেখা যায়।
খেলাটির সরঞ্জাম ছিল অত্যন্ত সাধারণ
এই ধরনের খেলায় সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল—খেলার সরঞ্জাম তৈরি করতে কোনও দোকানে যেতে হতো না।
শুকনো ডাল থেকে ছোট কাঠি বানিয়ে নেওয়া যেত। গুটি হিসেবে ব্যবহার করা যেত ছোট পাথর, বীজ, মাটির তৈরি টুকরো কিংবা কাঠের ছোট অংশ।
খেলার জায়গা হিসেবে বাড়ির উঠোন, গ্রামের রাস্তার পাশে সমতল মাটি অথবা গাছের নিচের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করা হতো।
অর্থাৎ হাতের কাছে যা পাওয়া যেত, তা দিয়েই খেলার ব্যবস্থা হয়ে যেত।
খেলার জায়গা তৈরি
অনেক লোকজ খেলায় যেমন মাটিতে দাগ কেটে খেলার এলাকা নির্ধারণ করা হতো, কাঠি-গুটির বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপেও তেমন ব্যবস্থা দেখা যেত।
মাটিতে ছোট গোল দাগ, রেখা কিংবা নির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থল তৈরি করা হতো। গুটিগুলো কোথায় থাকবে এবং খেলোয়াড়কে কোথা থেকে কাঠি ব্যবহার করতে হবে, তা আগে ঠিক করে নেওয়া হতো।
খেলার নিয়ম সাধারণত খেলোয়াড়রাই নিজেদের মধ্যে স্থির করতেন।
এই কারণে একই গ্রামের পাশের পাড়াতেও খেলার নিয়ম কিছুটা আলাদা হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।
কাঠি দিয়ে লক্ষ্যভেদ
কাঠি-গুটির কিছু প্রচলিত ধরনে কাঠি ব্যবহার করে গুটিকে নির্দিষ্ট দিকে সরানো বা লক্ষ্যস্থানে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হতো।
এখানেই খেলাটির মজা।
খেলোয়াড়কে কাঠির আঘাতের শক্তি বুঝতে হতো। বেশি জোরে আঘাত করলে গুটি লক্ষ্য অতিক্রম করে যেতে পারে, আবার কম জোরে আঘাত করলে গুটি প্রয়োজনীয় দূরত্বে পৌঁছাবে না।
ফলে খেলায় হাতের নিয়ন্ত্রণ ও অনুমানের গুরুত্ব ছিল যথেষ্ট।
ছোট্ট গুটি, বড় প্রতিযোগিতা
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কয়েকটি ছোট গুটি নিয়ে খেলা খুব সাধারণ ব্যাপার।
কিন্তু যারা খেলত, তাদের কাছে প্রতিটি গুটিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
কে কতটা নিখুঁতভাবে গুটি সরাতে পারছে, কে প্রতিপক্ষের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারছে এবং কে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারছে—এসব নিয়েই তৈরি হতো প্রতিযোগিতা।
একটি ছোট গুটি নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে জেতার লড়াই কখন যে ঘণ্টাখানেক ধরে চলত, তার হিসাব থাকত না।
শিশুদের শেখার স্বাভাবিক মাধ্যম
এই ধরনের খেলায় শিশুরা খেলার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাও অনুশীলন করত।
গুটির দূরত্ব বিচার করা, আঘাতের শক্তি নিয়ন্ত্রণ করা, নিজের পালার অপেক্ষা করা এবং অন্য খেলোয়াড়ের চাল পর্যবেক্ষণ করা—এসবই খেলার স্বাভাবিক অংশ ছিল।
কেউ প্রথম দিকে ভালো খেলতে না পারলেও বারবার চেষ্টা করতে করতে ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে উঠত।
এই শেখার প্রক্রিয়ায় কোনও আলাদা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল না।
খেলায় তৈরি হতো বন্ধুত্ব
পুরনো দিনের পাড়ার খেলাগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এগুলো মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসত।
একজন শিশু অন্যজনকে খেলার নিয়ম শেখাত। বড়রা ছোটদের ভুল ধরিয়ে দিতেন। আবার ছোটরাও কখনও বড়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চাইত।
খেলায় জেতা যেমন আনন্দের ছিল, তেমনই হেরে গিয়ে পরের দিন আবার জেতার চেষ্টা করাও ছিল খেলাটির অংশ।
এভাবেই খেলার মাধ্যমে বন্ধুত্ব তৈরি হতো এবং পাড়ার শিশুদের মধ্যে পরিচিতি বাড়ত।
গ্রামের বিকেলের দৃশ্য
ভাবা যায়—বিকেলের শেষ আলো। বাড়ির কাজ কিছুটা শেষ হয়েছে। কয়েকজন শিশু উঠোনের এক পাশে জড়ো হয়েছে।
কেউ কাঠি নিয়ে এসেছে, কেউ গুটি। একজন মাটিতে দাগ কাটছে। অন্যরা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে কখন খেলা শুরু হবে।
খেলা শুরু হওয়ার পর চারপাশে হাসি-ঠাট্টা, তর্ক, জেতার আনন্দ আর হারার আফসোস।
আজকের ডিজিটাল স্ক্রিনে সেই দৃশ্য দেখা যায় না। কিন্তু একসময় এমন দৃশ্যই ছিল বহু গ্রামের সাধারণ বিকেলের পরিচিত ছবি।
কেন হারিয়ে গেল?
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের স্থানীয় খেলাগুলোও পিছিয়ে পড়েছে।
গ্রামে আগের মতো বড় খোলা জায়গা সবসময় পাওয়া যায় না। শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন।
তার ওপর শিশুদের হাতে এখন বিনোদনের অসংখ্য বিকল্প রয়েছে।
অনলাইন গেমে প্রতিযোগিতা, ভিডিও দেখার সুযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণের কারণে মাটিতে বসে ছোট গুটি নিয়ে খেলার প্রতি আগ্রহ অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে।
ফলে স্থানীয় নিয়মে প্রচলিত বহু খেলা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
লিখিত নিয়ম না থাকাই বড় সমস্যা
লোকজ খেলাগুলোর একটি বড় সমস্যা হলো—এগুলোর নিয়ম অনেক সময় লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়নি।
একজন প্রবীণ মানুষ যেভাবে খেলাটি শিখেছেন, তিনিই পরবর্তী প্রজন্মকে তা শিখিয়েছেন।
কিন্তু সেই ধারার একজন মানুষ চলে গেলে তার সঙ্গে খেলার নিয়মের একটি অংশও হারিয়ে যেতে পারে।
তাই কোনও অঞ্চলে কাঠি-গুটি নামে নির্দিষ্ট কোনও খেলা প্রচলিত থাকলে স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে তার নিয়ম, সরঞ্জাম ও খেলার ইতিহাস সংগ্রহ করে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
লোকজ খেলায় স্থানীয় বৈচিত্র্য
একই নামের খেলা দুই জেলায় দুই রকম হওয়া লোকজ সংস্কৃতিতে অস্বাভাবিক নয়।
কারণ এসব খেলা কোনও কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করেনি। মানুষের মুখে মুখে, মাঠে মাঠে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মে এগুলো পরিবর্তিত হয়েছে।
কেউ নতুন নিয়ম যোগ করেছেন, কেউ পুরনো নিয়ম বাদ দিয়েছেন। ফলে একই ধরনের খেলার একাধিক আঞ্চলিক রূপ তৈরি হয়েছে।
কাঠি-গুটির ক্ষেত্রেও এই বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
আধুনিক সময়ে ফিরিয়ে আনার উপায়
পুরনো খেলাকে ফিরিয়ে আনতে প্রথমেই শিশুদের কাছে সেটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে।
স্কুলের লোকজ খেলা দিবস, পাড়ার অনুষ্ঠান কিংবা গ্রামীণ মেলায় নিরাপদ সংস্করণে কাঠি-গুটি খেলার আয়োজন করা যেতে পারে।
খেলার নিয়ম সহজ ভাষায় লিখে রাখা যেতে পারে। মাটির বদলে কাঠের বা প্লাস্টিকের নিরাপদ বোর্ডও ব্যবহার করা যায়।
এতে পুরনো খেলার মূল ধারণা বজায় রেখেই নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তার পরিচয় করানো সম্ভব।
নিরাপত্তার বিষয়টি জরুরি
কাঠি ব্যবহার করা খেলায় শিশুদের নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।
ধারালো বা ভাঙা কাঠি ব্যবহার করা যাবে না। খেলার সময় অন্য কেউ যেন আঘাতের পরিসরের মধ্যে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
গুটি হিসেবে ছোট বস্তু ব্যবহার করলে খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার, কারণ তারা ভুল করে তা মুখে দিতে পারে।
খেলার জায়গা সমতল এবং পরিষ্কার হওয়াও জরুরি।
একটি হারিয়ে যাওয়া বিকেলের গল্প
কাঠি-গুটির মতো খেলা হয়তো আজ অনেকের কাছে অপরিচিত। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে এমন একটি সময়ের স্মৃতি, যখন বিনোদন ছিল অনেক বেশি সরল এবং সামাজিক।
খেলার জন্য কোনও চার্জার লাগত না, ইন্টারনেট সংযোগ দরকার হতো না, কোনও অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হতো না।
বন্ধুদের ডাকলেই খেলা শুরু।
হারলে আবার খেলা। জিতলে আনন্দ। আর খেলা শেষে সবাই মিলে বাড়ি ফেরা—এই ছিল বিনোদনের সহজ সংজ্ঞা।
নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাক পুরনো খেলার গল্প
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পাশাপাশি পুরনো দিনের খেলাগুলোর সামাজিক মূল্যও মনে রাখা দরকার।
কাঠি-গুটির মতো স্থানীয় খেলাগুলো আমাদের জানায়, মানুষের সৃজনশীলতা কতটা সাধারণ জিনিসকে আনন্দের উপকরণে পরিণত করতে পারে।
আজকের শিশুরা যদি এই খেলাগুলোর গল্প শোনে, নিজের হাতে সরঞ্জাম তৈরি করে এবং কিছু সময়ের জন্য হলেও মাঠে বা উঠোনে খেলতে পারে, তাহলে পুরনো ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের একটি নতুন সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
উপসংহার
কাঠি-গুটি কোনও একক নিয়মে বাঁধা সর্বত্র প্রচলিত খেলা নয়। বিভিন্ন অঞ্চলে কাঠি ও গুটি ব্যবহার করে নানা ধরনের লোকজ খেলা এই নামে বা কাছাকাছি নামে পরিচিত হয়েছে।
তবু এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই এর আসল সৌন্দর্য।
কয়েকটি সাধারণ কাঠি, কিছু ছোট গুটি আর একটু খোলা জায়গা—এই সামান্য উপকরণেই একসময় তৈরি হতো শিশুদের আনন্দের জগৎ।
সময়ের স্রোতে সেই খেলা অনেক জায়গায় হারিয়ে গেলেও তার স্মৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আনন্দের জন্য সবসময় বড় আয়োজন দরকার হয় না।
কখনও কখনও মাটিতে পড়ে থাকা একটি ছোট কাঠি আর কয়েকটি গুটিই যথেষ্ট—একটি পুরো বিকেলকে স্মরণীয় করে তোলার জন্য।












Leave a Reply