
ভারতের সামাজিক ইতিহাসে এমন অনেক নারী রয়েছেন, যাঁরা বড় কোনো রাজনৈতিক পদে ছিলেন না, জনপ্রিয়তার আলোয়ও থাকেননি, কিন্তু তাঁদের কাজ সাধারণ মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছে। অনসূয়া সারাভাই তাঁদেরই একজন।
বিশ শতকের গোড়ার দিকের ভারত। শিল্পাঞ্চলগুলিতে দ্রুত বাড়ছে কলকারখানা ও মিল। কিন্তু শ্রমিকদের জীবন ছিল কঠিন—দীর্ঘ সময় কাজ, কম মজুরি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের অনিশ্চয়তা। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের সংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছিল।
আর সেই সময়েই গুজরাটের আহমেদাবাদে শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অনসূয়া সারাভাই।
তিনি শুধু শ্রমিকদের সমস্যার কথা বলতেন না; তাঁদের সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জীবনের সমস্যা তাঁর কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
শিক্ষিত পরিবার থেকে শ্রমজীবী মানুষের কাছে
অনসূয়া সারাভাই একটি সমৃদ্ধ পরিবারে জন্মেছিলেন। তাঁর ভাই ছিলেন শিল্পপতি আম্বালাল সারাভাই। কিন্তু পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা তাঁকে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবন থেকে দূরে সরিয়ে রাখেনি।
বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শ্রমিকদের দুরবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে জানতে শুরু করেন।
বিশেষ করে আহমেদাবাদের বস্তি ও মিল এলাকার শ্রমিকদের জীবন তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
সেই সময়ে শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে কথা বলার মানুষ থাকলেও নারী শ্রমিকদের নির্দিষ্ট সমস্যাগুলি অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা গুরুত্ব পেত না। মজুরি, কাজের সময়, মাতৃত্ব, স্বাস্থ্য, পারিবারিক দায়িত্ব—সব মিলিয়ে কর্মজীবী নারীদের জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন।
অনসূয়া বুঝেছিলেন, শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, নারী হিসেবেও তাঁদের সমস্যাকে দেখতে হবে।
ইংল্যান্ডে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা
অনসূয়া সারাভাই উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান। সেখানে তিনি শ্রমিক আন্দোলন, সামাজিক সংগঠন এবং নারী অধিকার নিয়ে নতুন চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হন।
ইউরোপের শ্রমিক আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কারের নানা অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে।
ভারতে ফিরে এসে তিনি বুঝতে পারেন, বিদেশের মডেল হুবহু প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। ভারতের শ্রমজীবী মানুষের বাস্তবতা আলাদা। তাই স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী শ্রমিকদের সংগঠিত করার পথ তৈরি করতে হবে।
এই উপলব্ধিই পরবর্তী কাজের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
আহমেদাবাদের মিল শ্রমিকদের পাশে
আহমেদাবাদ তখন ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্রশিল্প কেন্দ্রগুলির একটি।
শহরের অসংখ্য মানুষ টেক্সটাইল মিলে কাজ করতেন। শ্রমিকদের মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক নারীও ছিলেন।
অনসূয়া তাঁদের জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলি কাছ থেকে দেখতে শুরু করেন।
মজুরি নিয়ে অসন্তোষ, কাজের পরিবেশ, শ্রমিক পরিবারের আর্থিক সংকট—সবকিছুই তাঁর নজরে আসে।
তখন শ্রমিকদের অধিকারের জন্য সংগঠিত আন্দোলন খুব সহজ ছিল না। মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা, শ্রমিকদের মধ্যে ঐক্য তৈরি এবং সংঘাত এড়িয়ে দাবি আদায়—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দরকার ছিল ধৈর্য ও সংগঠনের ক্ষমতা।
অনসূয়া সেই কাজেই নিজেকে নিয়োজিত করেন।
গান্ধীর সঙ্গে সহযোগিতা
আহমেদাবাদের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে অনসূয়া সারাভাই এবং মহাত্মা গান্ধীর নাম একসঙ্গে আসে।
১৯২০ সালে আহমেদাবাদে Textile Labour Association (TLA) প্রতিষ্ঠিত হয়। SEWA-র নিজস্ব ইতিহাসে সংগঠনটিকে ভারতের প্রাচীনতম বৃহৎ টেক্সটাইল শ্রমিক সংগঠনগুলির একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং অনসূয়া সারাভাই ও মহাত্মা গান্ধীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিল শ্রমিকদের সংগঠিত করা এবং শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি করা।
গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের দর্শনের সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনের কাজকে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
অনসূয়ার ভূমিকা এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি শ্রমিকদের শুধু প্রতিবাদ করতে শেখাতে চাননি; তাঁদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে চেয়েছিলেন।
নারী শ্রমিকদের জন্য আলাদা উদ্যোগ
অনসূয়া সারাভাইয়ের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নারী শ্রমিকদের সংগঠিত করা।
TLA-র Women’s Wing-এর মাধ্যমে শ্রমিক পরিবারের নারী ও মেয়েদের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম চালানো হয়। SEWA-র ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, এই উদ্যোগে সেলাই, সুতো কাটা, বুনন, সূচিশিল্পসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
এই ধরনের উদ্যোগের গুরুত্ব ছিল অনেক।
কারণ শ্রমিক পরিবারের নারীরা শুধু পরিবারের সদস্য ছিলেন না; তাঁরাও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের কাজের মূল্য সবসময় স্বীকৃতি পেত না।
দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তাঁদের আয়ের সুযোগ তৈরি করা এবং আত্মনির্ভরতার পথ খুলে দেওয়া ছিল এই কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
শ্রমিক আন্দোলনে নারীর কণ্ঠ
অনসূয়া বুঝেছিলেন, নারীদের সংগঠিত না করলে শ্রমিক আন্দোলন পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
একজন নারী শ্রমিকের সমস্যার মধ্যে শুধু কর্মক্ষেত্রের সমস্যা থাকে না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সন্তান, সংসার, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এই কারণে শ্রমিক আন্দোলনকে শুধুমাত্র মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন ছিল।
অনসূয়ার কাজের মধ্যে সেই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অহিংস পথে অধিকার আদায়
শ্রমিক আন্দোলনে ধর্মঘট বা সংঘাতের বদলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল।
গান্ধীয় শ্রমিক আন্দোলনের এই পদ্ধতিতে অনসূয়ার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
তাঁদের ধারণা ছিল, শ্রমিক ও মালিক পরস্পরের সম্পূর্ণ শত্রু নয়। উৎপাদন ব্যবস্থায় দু’পক্ষেরই ভূমিকা রয়েছে। তাই বিরোধের সমাধান আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব।
এই পদ্ধতি নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা ধরনের মতামত তৈরি হলেও অনসূয়ার কাজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। তিনি শ্রমিকদের দাবি সংগঠিতভাবে তুলে ধরার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিলেন।
শ্রমিকের ঘর থেকে সমাজের বৃহত্তর প্রশ্ন
অনসূয়ার কাজ শুধু কারখানার গেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একজন শ্রমিকের জীবন বুঝতে হলে তাঁর পরিবারকেও বুঝতে হবে।
একজন নারী শ্রমিক যদি কাজ করেন, তাহলে তাঁর সন্তান কে দেখবে?
পরিবারের স্বাস্থ্য কেমন?
নারীর নিজের উপার্জনের ওপর তাঁর কতটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে?
তাঁর কাজের নিরাপত্তা কতটা?
এই প্রশ্নগুলি শ্রমিক আন্দোলনকে সামাজিক সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব পরবর্তী নারী শ্রমিক সংগঠনগুলির মধ্যেও দেখা যায়।
তাঁর উত্তরাধিকার ও SEWA-র সঙ্গে সম্পর্ক
অনসূয়া সারাভাইয়ের কাজের কয়েক দশক পরে আহমেদাবাদেই গড়ে ওঠে Self-Employed Women’s Association বা SEWA।
১৯৭২ সালে এলাবেন ভাটের নেতৃত্বে SEWA একটি ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে নিবন্ধিত হয়। SEWA-র নিজস্ব ইতিহাসে বলা হয়েছে, সংগঠনটি TLA-র Women’s Wing এবং নারী শ্রমিকদের সংগঠিত করার পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য পেয়েছিল।
অর্থাৎ অনসূয়ার সময়ের শ্রমিক সংগঠনের ধারণা বহু বছর পরে অন্য রূপে আরও বিস্তৃত হয়।
অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কাজ করা নারী—যেমন হকার, বাড়িতে কাজ করা শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারুশিল্পী—তাঁদেরও শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আন্দোলন শক্তিশালী হয়।
আজ SEWA ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিককে সংগঠিত করে।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের শিকড়ে অনসূয়া সারাভাইয়ের মতো প্রাথমিক সংগঠকদের অবদান স্মরণযোগ্য।
‘Anasuya’ নামের মধ্যেও স্মৃতি
অনসূয়া সারাভাইয়ের নাম পরবর্তী শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে যায় যে SEWA-র একটি প্রকাশনার নামও রাখা হয় “Anasuya”।
SEWA-র নথিতে বলা হয়েছে, এই নামটি অনসূয়া সারাভাইয়ের স্মরণে রাখা হয়েছিল এবং তাঁকে প্রাথমিক ভারতীয় নারীবাদী ও গান্ধীয় শ্রমিক আন্দোলনের একজন নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি কেবল একটি নাম নয়।
একটি সংগঠনের প্রকাশনার নামের মধ্যে একজন পূর্বসূরির স্মৃতি ধরে রাখা—এটিও ইতিহাসের এক ধরনের ধারাবাহিকতা।
কেন তাঁর জীবন আজও গুরুত্বপূর্ণ?
আজকের কর্মজগৎ একশো বছর আগের তুলনায় অনেক বদলে গেছে। শ্রম আইন, সংগঠন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগও অনেক বিস্তৃত হয়েছে।
কিন্তু শ্রমজীবী নারীদের কিছু প্রশ্ন এখনও আলোচনায় থাকে।
কাজের স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কাজের সঙ্গে পরিবারের ভারসাম্য—এই বিষয়গুলি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই অনসূয়া সারাভাইয়ের জীবন কেবল অতীতের ইতিহাস নয়।
তাঁর কাজ আমাদের দেখায়, শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কাজ করতে গেলে শুধু আইন বা অর্থনীতির দিকে তাকালেই হয় না; মানুষের দৈনন্দিন জীবনকেও বুঝতে হয়।
উপসংহার
অনসূয়া সারাভাই ছিলেন এমন এক নারী, যাঁর সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ।
তিনি নিজে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবার থেকে এলেও শ্রমিকদের জীবনযন্ত্রণা থেকে নিজেকে আলাদা রাখেননি। আহমেদাবাদের টেক্সটাইল শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। নারী শ্রমিকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সংগঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য।
তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের সমস্যাকে কাছ থেকে দেখা।
তিনি বুঝেছিলেন—অধিকার কাগজে লেখা থাকলেই যথেষ্ট নয়; মানুষকে সেই অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে, সংগঠিত হতে হবে এবং সম্মিলিতভাবে নিজের কথা বলতে হবে।
অনসূয়া সারাভাইয়ের নাম তাই ভারতীয় শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তিনি দেখিয়েছিলেন, সমাজ বদলের কাজ সবসময় বড় মঞ্চ থেকে শুরু হয় না। কখনও তা শুরু হয় একটি শ্রমিক পরিবারের দরজায়, একটি মিলের গেটে, অথবা কয়েকজন সাধারণ মানুষের একসঙ্গে বসে নিজেদের সমস্যার কথা বলার মধ্য দিয়ে।
সেই ছোট ছোট উদ্যোগই একদিন বৃহত্তর আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
অনসূয়া সারাভাই সেই ভিত্তি নির্মাণের অন্যতম অগ্রদূত।












Leave a Reply