চৌকা-ভারা: উঠোনের মাটিতে দাগ কেটে বুদ্ধির লড়াইয়ের হারিয়ে যাওয়া খেলা।

একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের বাড়ির উঠোন কিংবা বারান্দায় বসে যেত নানা ধরনের খেলার আসর। বাইরে মাঠে ছুটে বেড়ানোর পাশাপাশি এমন কিছু খেলা ছিল, যেগুলো খেলতে বড় জায়গার প্রয়োজন হতো না। মাটিতে কয়েকটি দাগ, কিছু গুটি আর কয়েকজন খেলোয়াড়—এই সামান্য উপকরণেই শুরু হয়ে যেত ঘণ্টার পর ঘণ্টার আনন্দ।

বাংলার লোকজ খেলাধুলার জগতে চৌকা-ভারা নামটিও বিভিন্ন অঞ্চলের পুরনো বোর্ডভিত্তিক খেলার সঙ্গে যুক্ত। তবে এই ধরনের লোকজ খেলার নিয়ম সর্বত্র এক নয়। কোনও অঞ্চলে ছকের নকশা আলাদা, কোথাও গুটির সংখ্যা বা চালের নিয়মে পার্থক্য দেখা যায়।

তবু খেলাটির মূল আকর্ষণ ছিল একই—গুটি সাজানো, সুযোগ বুঝে চাল দেওয়া এবং প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা বুঝে নিজের কৌশল তৈরি করা।

আজকের মোবাইল ও অনলাইন গেমের যুগে এই ধরনের মুখোমুখি বসে খেলার সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

মাটির উঠোনই ছিল বোর্ড

চৌকা-ভারা ধরনের পুরনো খেলায় আলাদা বোর্ড থাকা বাধ্যতামূলক ছিল না।

বাড়ির উঠোনের সমতল মাটি পরিষ্কার করে কাঠি দিয়ে ছক আঁকা যেত। কোথাও চৌকো ঘর, কোথাও সংযোগকারী রেখা—স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী ছকের ধরন বদলাতে পারত।

যাদের কাছে কাঠের বোর্ড ছিল, তারা সেটিও ব্যবহার করতেন।

এই সরল ব্যবস্থার কারণে খেলাটি খুব সহজেই শুরু করা যেত।

গুটি কোথা থেকে আসত?

পুরনো দিনের খেলায় গুটি কেনার জন্য দোকানে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না।

ছোট পাথর, বীজ, কড়ি, কাঠের টুকরো কিংবা মাটির তৈরি ছোট বস্তু গুটি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

দুই পক্ষের গুটি আলাদা করে বোঝানোর জন্য ভিন্ন রঙের বা ভিন্ন ধরনের বস্তু নেওয়া যেত।

একজনের গুটি শেষ হয়ে গেলে অন্যজনের কাছ থেকে কয়েকটি গুটি ধার করে খেলাও শুরু করা সম্ভব ছিল।

কীভাবে চলত খেলা?

চৌকা-ভারা নামে পরিচিত বিভিন্ন আঞ্চলিক খেলায় নিয়মে পার্থক্য থাকায় একটি মাত্র নিয়মকে সর্বজনীন বলা ঠিক নয়।

সাধারণত খেলোয়াড়রা নির্দিষ্ট ছকের ঘর বা সংযোগস্থল ধরে গুটি চালাতেন। নির্দিষ্ট ফল বা সুযোগ অনুযায়ী গুটি এগোনোর ব্যবস্থা থাকতে পারত।

কোনও রূপে প্রতিপক্ষের গুটিকে আটকে দেওয়া বা সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকত, আবার কোথাও নির্দিষ্ট ঘরে পৌঁছানো ছিল লক্ষ্য।

এই কারণেই একই নামের খেলাটি এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের খেলায় কিছুটা আলাদা হতে পারত।

খেলাটির আসল মজা ছিল কৌশলে

এ ধরনের খেলায় শুধু নিজের গুটি এগিয়ে দিলেই চলত না।

প্রতিপক্ষের গুটি কোথায় রয়েছে, পরের চাল কী হতে পারে এবং নিজের কোন গুটি আগে এগোনো উচিত—এসব নিয়ে ভাবতে হতো।

একটি ভুল চালের ফলে নিজের ভালো অবস্থান নষ্ট হয়ে যেতে পারত।

আবার কখনও এমন চাল দেওয়া যেত, যার ফল সঙ্গে সঙ্গে দেখা না গেলেও পরবর্তী কয়েকটি চালে সুবিধা তৈরি হতো।

এই কারণেই খেলাটিতে ধৈর্য ও পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব ছিল।

বড়দের সঙ্গে ছোটদের খেলা

পুরনো দিনের ঘরোয়া খেলাগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ।

বাড়ির বড়রা ছোটদের সামনে বসে খেলতেন। শিশুরা প্রথমে খেলা দেখত, পরে ধীরে ধীরে নিয়ম শিখত।

কখনও বড়রা ইচ্ছা করে সহজ চাল দিয়ে ছোটদের জেতার সুযোগ দিতেন। আবার কখনও শিশুরা বড়দের সঙ্গে সমান তালে প্রতিযোগিতা করার চেষ্টা করত।

এভাবেই খেলা হয়ে উঠত শেখার একটি স্বাভাবিক মাধ্যম।

সন্ধ্যার উঠোনে খেলার আসর

একটি গ্রামের পুরনো সন্ধ্যার দৃশ্য কল্পনা করলে চৌকা-ভারার মতো খেলার ছবি সহজেই মনে আসে।

দিনের কাজ শেষ হয়েছে। উঠোনে বসেছেন কয়েকজন। মাঝখানে আঁকা হয়েছে ছক।

দুই খেলোয়াড় মুখোমুখি। পাশে বসে অন্যরা খেলা দেখছে।

কেউ চাল নিয়ে ভাবছেন, কেউ বলছেন—“এই গুটিটা আগে চালাও।”

আবার কোনও চাল সফল হলে চারপাশে হাসি বা আনন্দের শব্দ।

খেলাটি যতটা প্রতিযোগিতার, তার চেয়ে কম নয় সামাজিক আড্ডারও।

খেলার সঙ্গে গল্পও চলত

পুরনো দিনের খেলা ও আড্ডাকে আলাদা করা কঠিন ছিল।

একটি চাল দেওয়ার পর খেলোয়াড়রা গল্প করতেন। গ্রামের খবর নিয়ে আলোচনা হতো। শিশুদের পড়াশোনা, ফসল, বাজার কিংবা পারিবারিক নানা বিষয় নিয়েও কথা চলত।

ফলে খেলা ছিল মানুষের একসঙ্গে থাকার একটি উপলক্ষ।

আজকের একাকী মোবাইল স্ক্রিনের তুলনায় এই সামাজিক অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

হার-জিত নিয়ে মজার তর্ক

যে কোনও পুরনো খেলায় যেমন হয়, চৌকা-ভারাতেও চালের নিয়ম নিয়ে তর্ক হওয়া অসম্ভব ছিল না।

কোন ঘরে গুটি রাখা যাবে, কোন চাল বৈধ, কখন প্রতিপক্ষের গুটি ধরা যাবে—এসব নিয়ে খেলোয়াড়দের মধ্যে আলোচনা হতো।

আবার অনেক সময় প্রবীণ কেউ এসে বলতেন, “আমাদের সময় এই নিয়ম ছিল।”

এভাবেই একটি খেলার নিয়মও মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যেত।

লিখিত নিয়মের অভাব

লোকজ খেলাগুলোর একটি বড় সমস্যা হলো—এগুলোর অনেকগুলোর নিয়ম লিখিতভাবে সংরক্ষিত হয়নি।

একজন খেলোয়াড় যেভাবে শিখেছেন, তিনি অন্যকে সেভাবেই শিখিয়েছেন।

ফলে সময়ের সঙ্গে নিয়ম বদলেছে। কোথাও নতুন নিয়ম যুক্ত হয়েছে, কোথাও পুরনো নিয়ম হারিয়ে গেছে।

চৌকা-ভারার মতো আঞ্চলিক খেলাগুলোর ক্ষেত্রে তাই প্রবীণদের স্মৃতি অত্যন্ত মূল্যবান।

আধুনিক বিনোদনে হারিয়ে যাওয়া

আজকের শিশুরা এক ক্লিকেই অসংখ্য গেম পেয়ে যায়।

অনলাইন গেমে প্রতিপক্ষ অন্য শহর বা অন্য দেশেও থাকতে পারে। কিন্তু পুরনো দিনের চৌকা-ভারার মতো খেলায় প্রতিপক্ষ বসত একেবারে সামনে।

চোখের সামনে বন্ধুর চাল দেখা, নিজের চাল নিয়ে ভাবা এবং সরাসরি কথা বলা—এই অভিজ্ঞতা এখন অনেকটাই কমে গেছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহু স্থানীয় খেলারও জনপ্রিয়তা কমেছে।

শিশুদের জন্য খেলার শিক্ষামূলক দিক

কৌশলনির্ভর বোর্ড গেমে শিশুরা নিয়ম মেনে চলা, নিজের পালার অপেক্ষা করা এবং প্রতিপক্ষের চাল পর্যবেক্ষণ করার অভ্যাস তৈরি করতে পারে।

একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে ভাবতেও শেখে।

হারলে হতাশ না হয়ে আবার চেষ্টা করার মানসিকতাও তৈরি হতে পারে।

অবশ্য এই উপকারগুলো খেলার নির্দিষ্ট নিয়ম ও শিশুর বয়স অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।

কীভাবে নতুন করে ফিরিয়ে আনা যায়?

চৌকা-ভারার মতো পুরনো খেলা ফিরিয়ে আনার জন্য বড় কোনও প্রকল্পের প্রয়োজন নেই।

স্কুলে লোকজ খেলা দিবস করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই কাগজ, কাঠ বা কাপড়ের ওপর ছক তৈরি করতে পারে।

স্থানীয় প্রবীণদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের কাছ থেকে পুরনো নিয়ম শোনা যেতে পারে।

তারপর সেই নিয়ম লিখে রেখে স্কুলের লোকজ সংস্কৃতি সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

এতে একই সঙ্গে ইতিহাস, শিল্প ও খেলাধুলার সঙ্গে শিশুদের পরিচয় ঘটবে।

নিজের হাতে বোর্ড বানানোর আনন্দ

পুরনো দিনের খেলাকে ফিরিয়ে আনার আরেকটি সুন্দর উপায় হলো খেলোয়াড়দের নিজেরাই বোর্ড তৈরি করতে দেওয়া।

কার্ডবোর্ড, মোটা কাগজ বা কাঠের ওপর ছক আঁকা যায়।

গুটি হিসেবে বোতামের বড় টুকরো, কাঠের গোল টুকরো বা নিরাপদ বড় আকারের গুটি ব্যবহার করা যায়।

বোর্ড তৈরি করতে গিয়েই শিশুরা পুরনো খেলাটির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবে।

নিরাপত্তার বিষয়

এই ধরনের খেলা সাধারণত শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবু ছোট গুটি ব্যবহার করলে খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।

গুটি যেন মুখে দেওয়ার মতো ছোট না হয়, তা নিশ্চিত করা ভালো।

মাটিতে খেলা হলে জায়গাটি পরিষ্কার ও সমতল হওয়া উচিত।

কাঠের বোর্ড ব্যবহার করলে তার ধারালো অংশ বা ভাঙা অংশ যেন না থাকে।

হারিয়ে যাওয়া খেলাকে লিখে রাখা

লোকজ খেলা বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো তার ইতিহাস লিখে রাখা।

কোন অঞ্চলে খেলা হতো, কারা খেলতেন, কী উপকরণ লাগত, কীভাবে ছক আঁকা হতো এবং কী নিয়ম ছিল—এসব তথ্য সংগ্রহ করা দরকার।

একই খেলার যদি একাধিক আঞ্চলিক রূপ থাকে, তাহলে প্রত্যেকটির তথ্য আলাদাভাবে লেখা উচিত।

এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বুঝতে পারবে, একটি খেলাও কীভাবে সময় ও অঞ্চলের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে।

আজও ফিরে আসতে পারে পুরনো বিকেল

একটি বোর্ড, কয়েকটি গুটি আর দু-চারজন বন্ধু—এতটুকুই যথেষ্ট একটি পুরনো খেলা নতুন করে শুরু করার জন্য।

হয়তো আজকের শিশুরা প্রথমে নিয়ম বুঝতে একটু সময় নেবে। কিন্তু একবার খেলায় আগ্রহ তৈরি হলে তারাও হয়তো নিজেদের মতো করে প্রতিযোগিতা শুরু করবে।

আর তখনই পুরনো খেলার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের একটি সেতু তৈরি হবে।

উপসংহার

চৌকা-ভারা নামের সঙ্গে যুক্ত লোকজ খেলাগুলোর বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ আমাদের গ্রামীণ সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের কথা মনে করিয়ে দেয়।

মাটিতে আঁকা ছক, ছোট ছোট গুটি, মুখোমুখি বসা খেলোয়াড় এবং চাল নিয়ে চিন্তা—এই সরল উপকরণের মধ্যেই ছিল বুদ্ধি, ধৈর্য ও সামাজিকতার আনন্দ।

সময়ের সঙ্গে অনেক জায়গায় এই খেলাগুলো হারিয়ে গেলেও তাদের স্মৃতি এখনও প্রবীণ প্রজন্মের কথায় বেঁচে আছে।

আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি যদি এমন কিছু পুরনো খেলাকেও নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া যায়, তাহলে শুধু একটি খেলা নয়—একটি সময়ের জীবনযাত্রা, সামাজিকতা এবং লোকজ সংস্কৃতির স্মৃতিও সংরক্ষিত থাকবে।

মাটিতে আঁকা কয়েকটি রেখা হয়তো আজ আর আগের মতো দেখা যায় না। কিন্তু সেই রেখার ভেতরেই একসময় বহু মানুষের বিকেল, হাসি, প্রতিযোগিতা আর বন্ধুত্বের গল্প লেখা থাকত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *