
সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ করার সময় রাহুলের চোখ পড়ল তাকের নিচে রাখা একটি কাঠের বাক্সে।
বাক্সটি তার বাবার পুরোনো জিনিসের মধ্যে ছিল। বাবা মারা যাওয়ার পর বাড়ির অনেক জিনিসই সে দোকানে এনে রেখেছিল। কিন্তু বাক্সটি কোনোদিন খোলা হয়নি।
সেদিন হঠাৎ কৌতূহল হল।
তালা খুলতেই ভেতরে পাওয়া গেল কয়েকটি পুরোনো ছবি, একটি শুকনো গোলাপ আর নীল রঙের একটি ফিতা।
সবশেষে একটি ছোট কাগজ।
তাতে লেখা—
“কিছু মানুষকে হারিয়ে ফেললেও, তাদের জন্য রেখে যাওয়া জায়গাটা কখনও খালি হয় না।”
রাহুল অবাক হয়ে গেল।
বাবা কখনও ব্যক্তিগত জীবনের কথা বলতেন না।
ছবিগুলো দেখতে দেখতে একটি ছবিতে তার চোখ আটকে গেল।
ছবিতে তার বাবা যুবক। পাশে এক তরুণী।
পেছনে একটি স্কুলের মাঠ।
ছবির পেছনে লেখা—
“মেঘলা, ১৯৯৮।”
রাহুল মাকে ছবিটি দেখাল।
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“তোর বাবার জীবনে একজন ছিল।”
“কে?”
“মেঘলা।”
“তারপর?”
“তাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।”
রাহুল অবাক হয়ে গেল।
“তাহলে?”
মা জানালেন, বিয়ের ঠিক কয়েকদিন আগে মেঘলা হঠাৎ চলে যায়।
কেউ জানত না কেন।
রাহুলের বাবা এরপর আর কোনোদিন বিয়ের কথা বলেননি।
“তুমি জানো না মেঘলা কোথায়?”
মা মাথা নাড়লেন।
“শুধু জানি, তোর বাবা অনেক বছর অপেক্ষা করেছিল।”
রাহুলের মনে প্রশ্ন জাগল—কেন মেঘলা চলে গিয়েছিল?
বাক্সের ভেতর আরেকটি জিনিস ছিল।
একটি পুরোনো বাসের টিকিট।
স্থান—শিলিগুড়ি।
তারিখ—১৯৯৮ সালের ১২ ডিসেম্বর।
রাহুল বুঝল, মেঘলা সম্ভবত সেই দিনই চলে গিয়েছিল।
সে পুরোনো পরিচিতদের কাছে খোঁজ করতে শুরু করল।
অনেক চেষ্টা করে এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকার কাছ থেকে জানতে পারল, মেঘলা বিয়ে করেনি। সে উত্তরবঙ্গের একটি ছোট শহরে স্কুলে পড়াত।
রাহুলের মনে হল, বাবার অসমাপ্ত গল্পটি হয়তো শেষ করা উচিত।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর সে মেঘলার ঠিকানা পেল।
চিঠি নয়।
ফোনও নয়।
একদিন সরাসরি চলে গেল।
বাড়ির দরজা খুললেন সাদা চুলের এক মহিলা।
“আপনি মেঘলা?”
মহিলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
“তুমি কি অরুণের ছেলে?”
রাহুলের বুক কেঁপে উঠল।
“হ্যাঁ।”
মেঘলা ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।
“তোমার বাবা কেমন ছিলেন শেষ দিকে?”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,
“আপনাকে খুব মনে করতেন।”
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
“আমি জানতাম।”
“তাহলে আপনি চলে গিয়েছিলেন কেন?”
মেঘলা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
“তোমার বাবার বাবা আমাকে কখনও পছন্দ করতেন না। আমি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে ছিলাম। বিয়ের আগে তিনি আমাকে বলেছিলেন, বিয়ে হলে অরুণের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে।”
“আপনি বিশ্বাস করেছিলেন?”
“বিশ্বাস করিনি।”
“তাহলে?”
মেঘলা জানালার বাইরে তাকালেন।
“সেই সময় তোমার বাবার চাকরি পাওয়ার সুযোগ ছিল। তার পরিবার বলেছিল, আমি যদি সরে যাই, তাহলে অরুণকে বাইরে চাকরিতে পাঠাবে। আমি ভেবেছিলাম, আমার জন্য যেন তার ভবিষ্যৎ নষ্ট না হয়।”
রাহুলের গলা ভারী হয়ে এল।
“আপনি কি বাবাকে সত্যিটা বলেননি?”
“না।”
“কেন?”
মেঘলা মৃদু হেসে বললেন,
“তখন মনে হয়েছিল, ভালোবাসা মানে কখনও কখনও নিজের কথা না বলা।”
রাহুল কাঠের বাক্স থেকে আনা নীল ফিতাটি বের করল।
মেঘলা ফিতাটি দেখেই কেঁপে উঠলেন।
“এটা এখনও আছে?”
“বাবার কাছে ছিল।”
মেঘলা ফিতাটি হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করলেন।
“এটা আমি ওকে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, যতদিন এটা থাকবে, ততদিন আমাদের গল্পও থাকবে।”
রাহুল কিছু বলল না।
মেঘলা হঠাৎ উঠে ঘরের ভেতরে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর একটি পুরোনো খাম নিয়ে ফিরে এলেন।
“এটা তোমার বাবার জন্য লিখেছিলাম।”
রাহুল অবাক।
“পাঠাননি?”
“না।”
“কেন?”
“সাহস হয়নি।”
খাম খুলে রাহুল দেখল, চিঠির শেষ লাইনে লেখা—
“আমি চলে যাচ্ছি, কিন্তু তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি না। তোমার জীবনের ভালো থাকাটাই আমার ভালোবাসার শেষ ইচ্ছা।”
রাহুলের চোখে জল এসে গেল।
বাড়ি ফিরে সে বাবার ছবির সামনে নীল ফিতাটি রেখে দিল।
কয়েকদিন পর সে আবার মেঘলার কাছে গেল।
“চলুন।”
“কোথায়?”
“বাবার বাড়িতে।”
মেঘলা প্রথমে রাজি হলেন না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত গেলেন।
বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর অরুণের ছবির সামনে বসে ধীরে বললেন,
“আমি দেরি করে ফেলেছি।”
রাহুল পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“হয়তো। কিন্তু গল্পটা শেষ হয়নি।”
মেঘলা ছবির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ির পুরোনো আমগাছের নিচে দুজন মানুষ বসেছিলেন—একজনের হাতে পুরোনো নীল ফিতা, আর অন্যজনের হাতে বহু বছরের না-পাঠানো চিঠি।
তাদের জীবনে হারিয়ে যাওয়া সময় ফিরে আসেনি।
কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির যে দরজা এত বছর বন্ধ ছিল, সেটি অবশেষে খুলেছিল।
রাহুল বুঝেছিল—
সব ভালোবাসার শেষ একসঙ্গে থাকা নয়।
কিছু ভালোবাসার শেষ হয় সত্যিটা একদিন প্রকাশ পাওয়ার মধ্য দিয়ে।
আর কখনও কখনও একটি ছোট নীল ফিতা বহু বছরের নীরবতার চেয়েও বেশি কথা বলে।












Leave a Reply