ছড়া-কথার খেলা: মুখে মুখে চলা হারিয়ে যাওয়া এক লোকজ বিনোদন।

সব পুরনো খেলার জন্য মাঠের প্রয়োজন হয় না। দৌড়ঝাঁপ, বল, দড়ি বা কাঠের উপকরণ ছাড়াও একসময় শিশুদের মধ্যে এমন কিছু খেলার প্রচলন ছিল, যেগুলোর প্রধান উপকরণ ছিল কথা, ছড়া, স্মৃতি ও উপস্থিত বুদ্ধি।

গ্রামবাংলার উঠোন, বারান্দা কিংবা সন্ধ্যার আড্ডায় কয়েকজন শিশু একসঙ্গে বসে একজনের বলা কথা বা ছড়ার সূত্র ধরে পরের জনকে উত্তর দিতে হতো। কোথাও এটি ছড়া-কথার খেলা, কোথাও শব্দ ধরার খেলা, আবার কোথাও অন্য স্থানীয় নামে পরিচিত ছিল।

এই ধরনের খেলাগুলোর নির্দিষ্ট একক নিয়ম ছিল না। পরিবার, পাড়া ও অঞ্চল অনুযায়ী নিয়ম বদলাত। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ছিল একই—কথার মাধ্যমে আনন্দ, স্মৃতি ও বুদ্ধির পরীক্ষা।

খেলার জন্য কী লাগত?

প্রায় কিছুই না।

কয়েকজন খেলোয়াড় একসঙ্গে বসে গেলেই খেলা শুরু করা যেত।

একজন প্রথমে একটি শব্দ, ছড়া, প্রশ্ন বা ছোট বাক্য বলত। পরের খেলোয়াড়কে সেই কথার সঙ্গে মিল রেখে নতুন শব্দ বা বাক্য বলতে হতো।

কখনও একটি নির্দিষ্ট অক্ষর দিয়ে শব্দ বলতে হতো। কখনও আগের খেলোয়াড়ের বলা শব্দ মনে রেখে তার সঙ্গে নতুন শব্দ যোগ করতে হতো।

এভাবেই খেলা এগিয়ে চলত।

স্মৃতির পরীক্ষা

খেলার একটি ধরনে প্রথম খেলোয়াড় একটি শব্দ বলল। দ্বিতীয় খেলোয়াড় সেই শব্দের সঙ্গে আরেকটি শব্দ যোগ করল।

তৃতীয় খেলোয়াড়কে আগের দুটি শব্দ মনে রেখে তার সঙ্গে তৃতীয় শব্দ যোগ করতে হতো।

এভাবে শব্দের তালিকা বড় হতে থাকত।

কেউ একটি শব্দ ভুলে গেলে বা ভুল ক্রমে বললে তার পালা শেষ হয়ে যেত।

খেলা যত এগোত, মনে রাখার চাপও তত বাড়ত।

ছড়া দিয়ে শুরু

বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে ছড়ার গুরুত্ব বহু পুরনো।

শিশুরা ছড়া শুনতে এবং মুখস্থ করতে ভালোবাসত। সেই ছড়াকেই কখনও খেলায় ব্যবহার করা হতো।

একজন ছড়ার একটি অংশ বলত, অন্যজন পরের অংশ বলার চেষ্টা করত।

আবার কোথাও নিজের মতো করে ছড়া বানানোর প্রতিযোগিতাও হতো।

ফলে একই সঙ্গে স্মৃতি ও সৃজনশীলতার ব্যবহার ঘটত।

হাসির পরিবেশ

এই খেলায় ভুল হলেই যে শাস্তি পেতে হতো, তা নয়। বরং ভুল উত্তর থেকেই অনেক সময় হাসির পরিবেশ তৈরি হতো।

কেউ অদ্ভুত শব্দ বলল, কেউ ছন্দ মিলাতে গিয়ে মজার বাক্য তৈরি করল—বন্ধুরা হেসে উঠত।

এই হাসি-ঠাট্টাই ছিল খেলাটির প্রাণ।

উপস্থিত বুদ্ধির গুরুত্ব

শুধু মুখস্থ করলেই এই খেলায় সবসময় জেতা যেত না।

হঠাৎ প্রশ্ন করা হলে দ্রুত উত্তর দিতে হতো। কখনও এমন শব্দ খুঁজতে হতো যা আগের শব্দের সঙ্গে মিলবে।

তাই খেলোয়াড়কে একই সঙ্গে শুনতে, মনে রাখতে এবং দ্রুত চিন্তা করতে হতো।

এটি কোনো আনুষ্ঠানিক বুদ্ধির পরীক্ষা ছিল না, কিন্তু খেলতে খেলতেই শিশুরা ভাষার সঙ্গে বেশি পরিচিত হয়ে উঠত।

দাদা-দিদা ও ঠাকুমাদের ভূমিকা

পুরনো দিনের অনেক ছড়া, ধাঁধা ও কথার খেলা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত।

বাড়ির প্রবীণরা শিশুদের নতুন ছড়া শেখাতেন। শিশুরা আবার সেটি বন্ধুদের শেখাত।

এইভাবেই লোকজ সাহিত্য শুধু বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের মুখেও বেঁচে থাকত।

আজ সেই মৌখিক ধারাটি অনেকটাই দুর্বল হয়েছে।

গ্রামের সন্ধ্যার আড্ডায় খেলা

সন্ধ্যার পর উঠোনে বা বারান্দায় বসে গল্প করার সময় এই ধরনের খেলা সহজেই শুরু হয়ে যেত।

কোনো খেলনা বের করতে হতো না। মাঠে যাওয়ার দরকার ছিল না।

একজন বলল, “চলো একটা খেলা খেলি”—তারপরই শুরু।

এই সহজলভ্যতাই ছিল এর সবচেয়ে বড় সুবিধা।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে?

বর্তমানে শিশুদের বিনোদনের বড় অংশ প্রযুক্তিনির্ভর।

ভিডিও, মোবাইল গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে মুখোমুখি বসে শব্দের খেলা খেলার সময় কমে গেছে।

আরেকটি কারণ হলো—অনেক পুরনো ছড়া ও নিয়ম লিখে রাখা হয়নি।

যাঁরা জানতেন, তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে সেই জ্ঞানও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

লোকসংস্কৃতির মূল্যবান অংশ

ছড়া-কথার খেলা শুধু শিশুদের বিনোদন ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি।

একেক অঞ্চলে একেক ধরনের শব্দ, উচ্চারণ, ছড়া ও রসিকতা ব্যবহার করা হতো।

তাই এই খেলাগুলো সংরক্ষণ করলে একটি অঞ্চলের ভাষাগত বৈচিত্র্য সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

স্কুলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব

এই ধরনের খেলাকে স্কুলে সহজেই ফিরিয়ে আনা যায়।

শিক্ষার্থীদের গোল করে বসিয়ে শব্দের খেলা, ছড়া বলা, গল্পের বাক্য বাড়ানো বা স্মৃতিনির্ভর খেলা আয়োজন করা যেতে পারে।

এতে কোনো দামি সরঞ্জাম লাগে না।

শিক্ষকেরা চাইলে স্থানীয় প্রবীণ মানুষদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের জানা পুরনো ছড়া ও খেলার নিয়মও সংগ্রহ করতে পারেন।

ডিজিটাল যুগেও নতুন রূপ

পুরনো খেলা মানেই যে আধুনিক প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখতে হবে, তা নয়।

লোকজ ছড়া ও শব্দের খেলাগুলো অডিও, ভিডিও বা ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

কোনো এলাকার প্রবীণ মানুষ একটি পুরনো খেলার নিয়ম বলছেন—এমন ভিডিও রেকর্ড করে রাখা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেটি মূল্যবান নথি হয়ে উঠতে পারে।

নিরাপদ খেলা

এই ধরনের খেলায় শারীরিক ঝুঁকি খুবই কম। তবু শিশুদের মধ্যে যেন ভুল উত্তর দেওয়ার কারণে কাউকে অপমান করা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।

খেলার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আনন্দ ও অংশগ্রহণ, কাউকে ছোট করা নয়।

শিশুদের বয়স অনুযায়ী সহজ শব্দ ও ছড়া দিয়ে খেলা শুরু করাই ভালো।

হারিয়ে যাওয়া শব্দের ভাণ্ডার

একটি পুরনো খেলা হারিয়ে গেলে শুধু একটি বিনোদন হারায় না। হারিয়ে যেতে পারে অনেক পুরনো শব্দ, ছড়া, উচ্চারণ এবং গল্পও।

তাই প্রবীণ প্রজন্মের কাছ থেকে এই ধরনের লোকজ খেলাগুলো সংগ্রহ করা জরুরি।

কোনো খেলার নিয়ম যদি অঞ্চলভেদে আলাদা হয়, তাহলে একাধিক সংস্করণও নথিবদ্ধ করা উচিত। এতে বোঝা যাবে একই খেলা কীভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন রূপ নিয়েছিল।

উপসংহার

ছড়া-কথার খেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিনোদনের জন্য সবসময় মাঠ, বল বা দামি খেলনার প্রয়োজন হয় না।

কয়েকজন মানুষ, কিছু শব্দ এবং একটু কল্পনাশক্তিই যথেষ্ট ছিল একটি আনন্দময় সন্ধ্যা তৈরি করার জন্য।

আজকের দিনে এই ধরনের খেলা হয়তো আগের মতো পাড়ায় পাড়ায় দেখা যায় না। কিন্তু ছড়া, শব্দ ও স্মৃতির সেই খেলাগুলোকে সংরক্ষণ করা গেলে আমাদের লোকসংস্কৃতির একটি সুন্দর অংশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

খেলার উপকরণ হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেই খেলার গল্পগুলো হারিয়ে যেতে না দেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *