
একটা সময় ছিল, যখন গ্রামবাংলার শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার জন্য বিশেষ কোনো সরঞ্জাম কিনতে হতো না। আশপাশে পড়ে থাকা কাঠি, বাঁশের কঞ্চি কিংবা মাটিতে আঁকা কয়েকটি দাগ দিয়েই তৈরি হয়ে যেত খেলার আসর। সেই সব খেলায় ছিল শরীরচর্চা, উপস্থিত বুদ্ধি, বন্ধুত্ব এবং প্রতিযোগিতার আনন্দ।
বাংলার কিছু অঞ্চলে প্রচলিত ছিল লালবাতি-কালোসোনা নামে একটি লোকখেলা। এই খেলায় বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করা হতো এবং একজন খেলোয়াড়কে নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করতে হতো। অন্য খেলোয়াড়রা তার কঞ্চিকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। তাকে আবার নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কঞ্চিটি ফিরিয়ে আনতে হতো।
রাঢ় বাংলার লোকখেলা নিয়ে প্রকাশিত একটি বিবরণে এই খেলার নিয়মের উল্লেখ রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, লোকখেলার নিয়ম অঞ্চলভেদে বদলাতে পারে। তাই এই বিবরণকে একটি আঞ্চলিক রূপ হিসেবেই দেখা উচিত।
কী কী লাগত এই খেলায়?
লালবাতি-কালোসোনা খেলতে সাধারণত খুব বেশি উপকরণের প্রয়োজন হতো না। প্রধান উপকরণ ছিল বাঁশের সরু কঞ্চি। একটি বিবরণ অনুযায়ী, খেলোয়াড়দের হাতে প্রায় আড়াই থেকে তিন ফুট লম্বা কঞ্চি থাকত।
এ ছাড়া খেলার জন্য দরকার হতো একটি নির্দিষ্ট জায়গা বা ঘর এবং কঞ্চি রাখার জন্য একটি চিহ্নিত স্থান। পুরনো দিনের গ্রামীণ পরিবেশে এসব ব্যবস্থা সহজেই করা যেত।
তবে আজকের দিনে শিশুদের দিয়ে এই খেলা করাতে হলে ধারালো বা ফাটলধরা কঞ্চি ব্যবহার করা উচিত নয়। কঞ্চির বদলে নরম, হালকা ও নিরাপদ উপকরণ ব্যবহার করে খেলাটির আধুনিক রূপ তৈরি করা যেতে পারে।
কীভাবে খেলা হতো?
একটি আঞ্চলিক বিবরণ অনুযায়ী, খেলায় আট থেকে দশজন খেলোয়াড় অংশ নিতে পারত। তাদের মধ্যে একজনকে নির্দিষ্ট দায়িত্বে থাকতে হতো। এই খেলোয়াড়কে ‘ফড়ি’ বলা হতো।
খেলার শুরুতে একটি গণনার পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রথম ফড়ি নির্ধারণ করা হতো। এরপর অন্য খেলোয়াড়রা পালা করে খেলায় অংশ নিত। গণনার নির্দিষ্ট ধাপ পার হলে একজন খেলোয়াড় ফড়ির দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেত। এভাবে একে একে খেলোয়াড়দের পালা নির্ধারিত হতো।
ফড়ির কঞ্চিটি মাটিতে রাখা থাকত। অন্য খেলোয়াড়দের লক্ষ্য ছিল সেই কঞ্চিটিকে ঠেলে যতটা সম্ভব দূরে সরিয়ে দেওয়া। অন্যদিকে ফড়ির কাজ ছিল নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কঞ্চিটি ফিরিয়ে আনা।
এখানেই শুরু হতো খেলাটির মূল উত্তেজনা। অন্য খেলোয়াড়রা চাইত কঞ্চিটি দূরে থাকুক, আর ফড়িকে চেষ্টা করতে হতো সেটিকে নির্ধারিত স্থানে ফিরিয়ে আনার।
কঞ্চি ফিরিয়ে আনার কঠিন পরীক্ষা
লালবাতি-কালোসোনা খেলায় কঞ্চি দূরে সরিয়ে দেওয়াই সব ছিল না। সেটিকে ফিরিয়ে আনার সময়ও কিছু শর্ত মানতে হতো।
প্রকাশিত আঞ্চলিক বিবরণে বলা হয়েছে, ফড়ি অন্য খেলোয়াড়কে স্পর্শ করার সময় তার কঞ্চি যদি নির্দিষ্ট ইটের ওপর না থাকত, তাহলে সে ‘মোড়’ হয়ে যেত। এরপর কঞ্চিটি যেখানে গিয়ে পড়েছে, সেখান থেকে মাথায় নিয়ে হাত-পা স্পর্শ করে মূল ঘরে ফিরিয়ে আনার মতো একটি শারীরিক চ্যালেঞ্জ পালন করতে হতো।
এই নিয়মের ফলে খেলোয়াড়কে শুধু দৌড়ালেই চলত না; কঞ্চির অবস্থান, নিজের চলাফেরা এবং নির্দিষ্ট শর্তের প্রতিও নজর রাখতে হতো।
তবে পুরনো বিবরণে ব্যবহৃত কিছু শব্দ ও নিয়ম আজকের পাঠকের কাছে অস্পষ্ট হতে পারে। তাই স্থানীয় প্রবীণ খেলোয়াড়দের স্মৃতি সংগ্রহ করে নিয়মগুলি আরও স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ করা জরুরি।
প্রতিপক্ষের কাজ ছিল মনোযোগ নষ্ট করা
এই খেলায় অন্য খেলোয়াড়দেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তারা ফড়ির মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত, যাতে কঞ্চি ফিরিয়ে আনার কাজ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
এই অংশটি খেলাটিকে শুধু শারীরিক পরিশ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। মনোযোগ ধরে রাখা, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজের পালার নিয়ম মনে রাখাও ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ দিক।
অবশ্য মনোযোগ নষ্ট করার অর্থ কাউকে ধাক্কা দেওয়া বা বিপদে ফেলা নয়। বর্তমান সময়ে খেলাটি ফিরিয়ে আনলে কৌশল ও বুদ্ধির প্রতিযোগিতা বজায় রেখে শারীরিক ঝুঁকি সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।
কেন নামটি আজও মনে রাখার মতো?
লালবাতি-কালোসোনা নামটি শুনলে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যালের কথা মনে পড়তে পারে। কিন্তু এই খেলার নামের সঙ্গে বর্তমান ট্রাফিক সিগন্যালের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
লোকখেলার নাম অনেক সময় স্থানীয় উচ্চারণ, ছড়া, পুরনো শব্দ কিংবা দীর্ঘদিনের প্রচলন থেকে তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে নামের অর্থ অস্পষ্ট হয়ে গেলেও নামটি টিকে থাকতে পারে।
লালবাতি-কালোসোনার ক্ষেত্রেও নামটির ইতিহাস নিয়ে আরও অনুসন্ধান করা যেতে পারে। যে অঞ্চলে খেলাটি প্রচলিত ছিল, সেখানকার প্রবীণদের সাক্ষাৎকার, পুরনো পত্রপত্রিকা এবং লোকসংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণা এই কাজকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।
গ্রামবাংলার জীবনে লোকখেলার ভূমিকা
পুরনো দিনের গ্রামীণ সমাজে খেলাধুলা ছিল শিশুদের অবসর কাটানোর অন্যতম মাধ্যম। বাড়ির কাজ ও পড়াশোনার ফাঁকে তারা বন্ধুদের সঙ্গে খেলত। খেলার নিয়ম শেখার জন্য আলাদা প্রশিক্ষক দরকার হতো না; একজন জানলে সে অন্যদের শিখিয়ে দিত।
এইভাবে একটি খেলা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত। এক গ্রামে যে নিয়মে খেলা হতো, পাশের গ্রামে তার কিছুটা পরিবর্তিত রূপ দেখা যেত। কোথাও নতুন নাম যোগ হতো, কোথাও নিয়মের কিছু অংশ বাদ পড়ত।
ফলে লোকখেলা কোনো স্থির নিয়মের বইয়ে সীমাবদ্ধ থাকত না। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্থানীয় ভাষা এবং সামাজিক অভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গে তারও পরিবর্তন ঘটত।
লালবাতি-কালোসোনার মতো কম-পরিচিত খেলার বিবরণ সংরক্ষণ করা তাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা, স্মৃতি ও বিনোদনের ইতিহাস।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে এমন খেলা?
আজকের শিশুদের অবসর কাটানোর সুযোগ আগের তুলনায় অনেকটাই বদলে গেছে। স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ভিডিও গেম এবং অনলাইন বিনোদনের পাশাপাশি পড়াশোনার চাপও বেড়েছে। বহু এলাকায় খোলা মাঠ ও নিরাপদ খেলার জায়গার অভাব রয়েছে।
এ ছাড়া পুরনো লোকখেলার নিয়ম শেখানোর মতো মানুষও অনেক জায়গায় কমে গেছেন। বাড়ির প্রবীণ সদস্যরা একসময় যে খেলাগুলি খেলতেন, সেগুলি সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আলোচনা না হলে সেই স্মৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে লোকখেলা সংরক্ষণের জন্য শুধু স্মৃতিচারণ যথেষ্ট নয়। খেলাটির নাম, নিয়ম, স্থানীয় ভিন্নতা এবং নিরাপদে খেলার পদ্ধতি লিখে রাখা দরকার। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা পাড়ার লোকসংস্কৃতি উৎসবও এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
আজকের শিশুদের জন্য কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়?
লালবাতি-কালোসোনার পুরনো রূপে কঞ্চি ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট শারীরিক শর্ত ছিল। সেই নিয়ম হুবহু ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে এর মূল বৈশিষ্ট্য—কৌশল, মনোযোগ ও পালা করে খেলা—বজায় রেখে নিরাপদ সংস্করণ তৈরি করা যেতে পারে।
যেমন, একটি নরম কাঠি বা হালকা ফোমের দণ্ড নির্দিষ্ট চিহ্নের মধ্যে রাখা যেতে পারে। অন্য খেলোয়াড়রা সেটিকে হাত দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরাবে। ফড়ির কাজ হবে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে সেটিকে আবার চিহ্নিত স্থানে ফিরিয়ে আনা।
এটি ঐতিহাসিক নিয়মের হুবহু পুনর্নির্মাণ নয়; বরং পুরনো খেলাটির ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত একটি আধুনিক, নিরাপদ সংস্করণ। স্কুলে এমন সংস্করণ চালু করার আগে শিক্ষক ও আয়োজকদের নিয়ম নির্ধারণ করা উচিত।
নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই জরুরি
কঞ্চি দিয়ে খেলার ক্ষেত্রে আঘাতের ঝুঁকি থাকে। তাই বর্তমান সময়ে খেলাটি আয়োজন করার সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা দরকার।
- ধারালো, ফাটলধরা বা শক্ত বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করা যাবে না।
- শিশুদের মুখ, চোখ বা শরীরের দিকে কাঠি ছুড়ে দেওয়া নিষিদ্ধ রাখতে হবে।
- ধাক্কাধাক্কি, টানাটানি কিংবা জোর করে কাউকে স্পর্শ করা চলবে না।
- সমতল, পরিষ্কার ও পর্যাপ্ত খোলা জায়গা বেছে নিতে হবে।
- ছোট শিশুদের খেলায় বড়দের তত্ত্বাবধান থাকা উচিত।
- কাউকে অপমান করা বা শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে খেলার নিয়ম ব্যবহার করা যাবে না।
পুরনো দিনের খেলায় কোনো অস্বস্তিকর বা অপমানজনক প্রথা থাকলে তা বর্তমান সময়ে অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি শিশুদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
লালবাতি-কালোসোনা বাংলার এমন একটি আঞ্চলিক লোকখেলা, যার কথা আজ অনেকেরই অজানা। বাঁশের কঞ্চি, নির্দিষ্ট ঘর এবং ফড়ির পালাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই খেলায় ছিল কৌশল, মনোযোগ ও প্রতিযোগিতার সমন্বয়।
এই ধরনের খেলার মূল্য শুধু অতীতের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলি আমাদের জানায়, একসময় সাধারণ উপকরণ এবং বন্ধুদের উপস্থিতিতেই শিশুদের জন্য আনন্দময় খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি হতো।
সময়ের পরিবর্তনে বহু লোকখেলা হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই প্রবীণদের কাছ থেকে তাদের স্মৃতি সংগ্রহ করা, নিয়ম লিখে রাখা এবং নিরাপদ উপায়ে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া জরুরি।
লালবাতি-কালোসোনার মতো লোকখেলাকে নতুন করে জানার মধ্য দিয়ে আমরা বাংলার গ্রামীণ জীবনের একটি বিস্মৃত অধ্যায়কে ফিরে দেখতে পারি। হয়তো সেই পথেই আগামী প্রজন্ম বুঝতে পারবে, খেলাধুলার আনন্দ সবসময় দামি সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে না—কখনও কখনও একটি সাধারণ কঞ্চি আর কয়েকজন বন্ধুই যথেষ্ট।












Leave a Reply