যে বীজ বাঁচিয়েছিল গ্রামের শেষ প্রজাপতিদের।

বসন্তকালে একসময় মাধবপুর গ্রামের মাঠে নামলেই চোখে পড়ত অসংখ্য প্রজাপতি। হলুদ সর্ষেফুলের ওপর সাদা প্রজাপতি, বুনো ফুলের পাশে নীলচে ডানা, আবার পুকুরপাড়ের ঘাসের ওপর রঙিন ছোট ছোট প্রাণ। গ্রামের শিশুরা তাদের পেছনে ছুটত, আর বয়স্করা বলতেন, প্রজাপতি দেখলে বুঝতে হবে প্রকৃতি এখনও প্রাণবন্ত আছে।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেই দৃশ্য বদলে যাচ্ছিল।

মাঠের ধারে আগের মতো বুনো ফুল ফুটত না। অনেক জায়গায় ঘাস কেটে পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছিল। কোথাও আগাছা ভেবে সব ধরনের ছোট গাছ তুলে দেওয়া হতো, কোথাও আবার পোকামাকড় তাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছিল। ফলে গ্রামের শিশুদের চোখে পড়ত হাতে গোনা কয়েকটি প্রজাপতি।

চোদ্দো বছরের তিতলি এই পরিবর্তনটা প্রথম লক্ষ করেছিল নিজের বাড়ির উঠোনে।

তিতলির ঠাকুমা ছিলেন গাছপালা ভালোবাসার মানুষ। বাড়ির পেছনে তাঁর ছোট্ট বাগানে তুলসী, জবা, গাঁদা, অপরাজিতা আর নানা রকম দেশি গাছ ছিল। ঠাকুমা প্রতিদিন সকালে গাছে জল দিতেন। তিতলি স্কুলে যাওয়ার আগে প্রায়ই তাঁর সঙ্গে বাগানে দাঁড়াত।

একদিন তিতলি দেখল, জবা গাছের পাশে একটি ছোট প্রজাপতি বসে আছে। সে আনন্দে ঠাকুমাকে ডাকল।

“ঠাকুমা, দেখো! কত সুন্দর!”

ঠাকুমা কাছে এসে বললেন, “আগে এই বাগানে কত প্রজাপতি আসত জানিস? এখন খুব কম আসে।”

“কেন আসে না?”

ঠাকুমা একটু ভেবে বললেন, “হয়তো চারপাশে তাদের খাবার আর থাকার উপযুক্ত গাছ কমে গেছে। তবে ঠিক কারণ জানতে হলে আরও ভালো করে দেখতে হবে।”

তিতলি সেদিন থেকেই প্রজাপতি নিয়ে ভাবতে শুরু করল।

স্কুলের জীববিজ্ঞানের শিক্ষিকা শ্রেয়সীদি একদিন ক্লাসে পরাগবাহীদের ভূমিকা নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। তিনি বোঝালেন, প্রজাপতি ফুলের মধু খেতে গিয়ে এক ফুল থেকে অন্য ফুলে পরাগ নিয়ে যেতে পারে। যদিও সব প্রজাপতি সব গাছের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবু তারা বৃহত্তর বাস্তুতন্ত্রের একটি অংশ। তাদের জীবনচক্র সম্পূর্ণ করতে উপযুক্ত উদ্ভিদ ও নিরাপদ পরিবেশের প্রয়োজন হয়।

তিতলি হাত তুলে জিজ্ঞেস করল, “দিদিমণি, আমাদের গ্রামে প্রজাপতি কমে গেলে কি আমরা আবার তাদের ফিরিয়ে আনতে পারি?”

শ্রেয়সীদি বললেন, “সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আগে জানতে হবে কোন প্রজাপতি ছিল, কোন গাছ তাদের দরকার, আর পরিবেশে কী পরিবর্তন ঘটেছে। শুধু ফুল লাগালেই সব সমস্যার সমাধান হয় না।”

তিতলি সিদ্ধান্ত নিল, সে বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে।

পরদিন থেকে সে একটি খাতা ব্যবহার করতে শুরু করল। খাতার প্রথম পাতায় লিখল—‘আমাদের গ্রামের প্রজাপতি’।

প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে এবং বিকেলে বাড়ি ফেরার পরে সে বাগানের আশপাশে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করত। কোন সময় প্রজাপতি দেখা যাচ্ছে, কোন ফুলে বসছে, আবহাওয়া কেমন—এসব লিখে রাখত। প্রজাপতি ধরার চেষ্টা করত না, ডানায় হাত দিত না। দূর থেকেই পর্যবেক্ষণ করত।

কয়েক সপ্তাহ পরে সে বুঝতে পারল, শুধু প্রজাপতির সংখ্যা গুনলে চলবে না। কোন গাছের পাশে তারা বেশি দেখা যাচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।

একদিন সে শ্রেয়সীদির সঙ্গে কথা বলল। শিক্ষিকা তাকে প্রজাপতির ছবি দেখে পরিচয় শেখার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বই দিলেন। তিনি সতর্ক করলেন, ছবি দেখে সব প্রজাতি নির্ভুলভাবে চেনা সহজ নয়। সন্দেহ হলে স্থানীয় প্রকৃতিবিদ বা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে।

তিতলি বইটি পড়তে লাগল। সে জানতে পারল, কিছু প্রজাপতির শূককীট নির্দিষ্ট গাছের পাতার ওপর নির্ভরশীল। সেই গাছগুলো না থাকলে প্রজাপতিরা ডিম পাড়ার উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়তে পারে।

এই তথ্য তাকে নতুন করে ভাবাল। তার মনে হলো, গ্রামের মানুষ অনেক সময় বাগানকে সুন্দর করতে শুধু রঙিন ফুলের গাছ লাগান, কিন্তু প্রজাপতির জীবনচক্রের অন্য প্রয়োজনগুলো ভুলে যান।

তিতলি তার বন্ধু অয়ন, পায়েল আর সৌরভকে বিষয়টি জানাল। তারা প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দিল না।

অয়ন বলল, “প্রজাপতি কমেছে তো কী হয়েছে? আমাদের তো পড়াশোনা, পরীক্ষা—কত কাজ!”

তিতলি উত্তর দিল, “সব সময় বড় কাজ করতে হবে না। আমরা যদি একটু পর্যবেক্ষণ করি, কোন গাছ দরকার তা জানতে পারি, তাহলে ছোট করে শুরু করা যাবে।”

পায়েল আগ্রহী হলো। সে বলল, “তাহলে আমরা স্কুলে একটা প্রজাপতি-বাগান বানাতে পারি?”

প্রস্তাবটা সবার ভালো লাগল। কিন্তু স্কুলের মাঠের একাংশে বাগান করার জন্য প্রধান শিক্ষকের অনুমতি দরকার ছিল। তিতলিরা তাঁদের পরিকল্পনা লিখে জমা দিল।

পরিকল্পনায় তারা জানাল, স্কুলের পরিত্যক্ত এক কোণে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী কিছু ফুলের গাছ লাগাতে চায়। আগে মাটি ও জায়গাটা পরীক্ষা করা হবে। গাছের নাম লেখা থাকবে, আর কোনো কীটনাশক ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায়ে গাছের যত্ন নেওয়া হবে। বাগানটি যেন খেলাধুলা বা স্কুলের অন্য কাজে বাধা না দেয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।

প্রধান শিক্ষক প্রস্তাবটি অনুমোদন করলেন। তবে তিনি বললেন, “গাছ লাগিয়ে ছবি তুলে কাজ শেষ করা যাবে না। তোমাদের নিয়মিত যত্ন নিতে হবে। আর কোন গাছ কোথা থেকে আনা হচ্ছে, সেটাও খেয়াল রাখবে। পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকর বা বাইরের আক্রমণকারী প্রজাতি যেন লাগানো না হয়।”

পরের শনিবার তিতলিরা কাজ শুরু করল। প্রথমে জমির আবর্জনা পরিষ্কার করা হলো। এরপর স্থানীয় উদ্ভিদ সম্পর্কে অভিজ্ঞ এক নার্সারির কর্মীর সাহায্যে কয়েকটি উপযুক্ত দেশি গাছ নির্বাচন করা হলো। কিছু গাছ ছিল ফুলের জন্য উপকারী, আবার কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রজাপতির শূককীটের খাদ্য হতে পারে বলে জানা গেল।

তিতলির ঠাকুমা বাড়ির বাগান থেকে কয়েকটি উপযুক্ত গাছের বীজ দিলেন। তিনি বললেন, “বীজ ছোট হলেও তার মধ্যে একটা সম্ভাবনা থাকে। তবে মাটি, জল আর যত্ন না পেলে সেই সম্ভাবনা বড় হতে পারে না।”

তিতলি বীজগুলো হাতে নিয়ে হাসল।

“তাহলে আমরা শুধু গাছ লাগাচ্ছি না, প্রজাপতিদের ফিরে আসার জন্য একটা সুযোগও তৈরি করছি।”

প্রথম কয়েক সপ্তাহ কাজ বেশ ভালো চলল। শিশুরা পালা করে জল দিত, শুকনো পাতা সরাত, গাছের বৃদ্ধি লিখে রাখত। স্কুলের দেয়ালে একটি ছোট তালিকা টাঙানো হলো—কোন গাছের নতুন পাতা এসেছে, কোনটিতে কুঁড়ি ধরেছে, আর কোথায় কোনো প্রজাপতি দেখা গেছে।

কিন্তু একদিন প্রবল গরমে কয়েকটি চারা শুকিয়ে গেল। তিতলির খুব মন খারাপ হলো।

“এত যত্ন করেও গাছগুলো বাঁচাতে পারলাম না,” সে বলল।

শ্রেয়সীদি বোঝালেন, “প্রকৃতির কাজ সব সময় আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী হয় না। কোন গাছের কত জল দরকার, মাটির আর্দ্রতা কেমন, রোদ কতটা পড়ছে—এসব বুঝতে হবে। ভুল থেকে শেখাও কাজের অংশ।”

তিতলিরা আবার পরিকল্পনা করল। কিছু গাছ এমন জায়গায় সরানো হলো যেখানে দুপুরের তীব্র রোদ কম পড়ে। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে গাছের গোড়ায় শুকনো পাতা বিছিয়ে দেওয়া হলো। জল দেওয়ার সময়ও ঠিক করা হলো।

ধীরে ধীরে নতুন চারাগুলো বড় হতে লাগল।

তবে তিতলি বুঝতে পারছিল, শুধু স্কুলের ছোট্ট বাগান দিয়ে পুরো গ্রামের পরিবেশ বদলানো সম্ভব নয়। সে গ্রামের বাড়িগুলোতে গিয়ে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করল, বাগানে সব ধরনের ছোট গাছকে অকারণে উপড়ে ফেলা উচিত নয়। প্রজাপতির ডিম বা শূককীট দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে আগে পরিচয় জানা দরকার। সব শূককীটকে একই রকম ক্ষতিকর ধরে নেওয়া ভুল।

কেউ তার কথা শুনলেন, কেউ বললেন, “এত ছোট পোকামাকড়ের জন্য আবার এত আয়োজন!”

তিতলি রাগ করল না। সে জানত, সবাইকে একদিনে বোঝানো সম্ভব নয়।

একদিন গ্রামের কৃষক বিমলকাকু স্কুলে এসে বাগানটি দেখলেন। তিনি বললেন, “আমাদের জমিতে তো পোকামাকড়ের সমস্যা হয়। তোমরা যদি সব পোকা বাঁচাতে চাও, তাহলে ফসল নষ্ট হবে না?”

তিতলি উত্তর দেওয়ার আগে শ্রেয়সীদিকে তাকাল। শিক্ষিকা বললেন, “সব পোকা একই রকম নয়। কিছু পোকা ফসলের ক্ষতি করে, কিছু উপকারী, আবার অনেকের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জানা কম। কৃষিকাজে কীটনাশক ব্যবহার বা না করার সিদ্ধান্ত ফসল, পোকা এবং স্থানীয় পরিস্থিতি বুঝে নিতে হয়।”

বিমলকাকু মাথা নাড়লেন। তিনি বললেন, “তা ঠিক। আমাদেরও তো জমিতে কী হচ্ছে, সেটা বুঝে কাজ করতে হয়।”

এরপর তিনি স্কুলের শিশুদের সঙ্গে তাঁর জমির ধারে দেখা কিছু প্রজাপতির কথা ভাগ করে নিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন, মাঠের যে অংশে প্রজাপতি বেশি দেখা যায়, সেখানে কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে আরও সতর্ক থাকবেন এবং কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন।

বসন্ত আসতে আরও কিছুটা সময় লাগল। তারপর এক সকালে তিতলি স্কুলে এসে দেখল, ফুলের গাছের ওপর দুটি প্রজাপতি উড়ছে। একটি গাঁদা ফুলের ওপর বসে আছে, অন্যটি পাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে আবার উড়ে গেল।

তিতলি বন্ধুদের ডাকল। সবাই আনন্দে বাগানের চারপাশে দাঁড়াল। কিন্তু কেউ প্রজাপতিদের ধরতে গেল না। তারা দূর থেকে দেখল, খাতায় নোট করল এবং ছবি তুলল।

সেই দিনই প্রথম নয়, পরের কয়েক সপ্তাহেও তারা বিভিন্ন সময়ে প্রজাপতি দেখতে পেল। সব প্রজাতি ফিরে এসেছে, এমন দাবি করার মতো তথ্য তাদের কাছে ছিল না। কিন্তু উপযুক্ত গাছের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাগানে প্রজাপতি ও অন্যান্য ছোট পরাগবাহীর উপস্থিতি নথিভুক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল।

বছরের শেষে স্কুলে একটি পরিবেশ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো। তিতলিরা তাদের পর্যবেক্ষণের খাতা, গাছের তালিকা, ছবি এবং শেখা বিষয়গুলো তুলে ধরল। তারা দেখাল, কীভাবে একটি ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে প্রকৃতিকে আরও ভালোভাবে বোঝা যায়।

প্রদর্শনী দেখতে এসে অয়নের বাবা বললেন, “আগে ভাবতাম, বাগান মানে শুধু সুন্দর ফুল। এখন বুঝছি, একটা বাগান অনেক প্রাণীর আশ্রয়ও হতে পারে।”

তিতলির ঠাকুমা নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রদর্শনী শেষ হলে তিনি নাতনির হাতে একটি ছোট কাপড়ের থলি তুলে দিলেন। তার ভেতরে ছিল কিছু দেশি ফুলের বীজ, যেগুলো বাড়ির বাগানে যত্ন করে রাখা হয়েছিল।

ঠাকুমা বললেন, “এগুলো অন্য বাড়ির বাগানেও লাগানোর চেষ্টা করিস। তবে আগে জেনে নিবি, কোন বীজ কোথায় লাগানো উপযুক্ত।”

তিতলি বীজের থলিটা হাতে নিয়ে বুঝল, কাজটা এখনও শেষ হয়নি। একটি বাগান তৈরি করা যায়, কিন্তু প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে সেই যত্নকে ছড়িয়ে দিতে হয়—জ্ঞান দিয়ে, ধৈর্য দিয়ে, আর ভুল থেকে শেখার ইচ্ছা দিয়ে।

সেদিন বিকেলে স্কুলের ঘণ্টা বেজে গেল। ছাত্রছাত্রীরা বাড়ি ফিরতে শুরু করল। তিতলি একটু থেমে বাগানটার দিকে তাকাল। বাতাসে ফুলের ডাল নড়ছিল। একটি ছোট প্রজাপতি পাতার ওপর বসে ডানা মেলল।

তিতলি হাসল।

তার কাছে সেই দৃশ্য কোনো জয়ের ঘোষণা ছিল না। বরং মনে করিয়ে দিচ্ছিল—প্রকৃতির জন্য কাজ করার অর্থ সবকিছু নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে অন্য প্রাণীরাও বেঁচে থাকার সুযোগ পায়।

নৈতিক শিক্ষা: প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে শুধু সৌন্দর্যের দিকে তাকালেই চলবে না; জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের জীবনচক্র সম্পর্কে জানতে হবে। ছোট উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ, যদি তা সঠিক তথ্য, নিয়মিত যত্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ববোধের সঙ্গে করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *