
যে নীরব ঘরটি একদিন সত্যের সাক্ষী হয়ে উঠেছিল
শালিখা গ্রামের পুরোনো পঞ্চায়েত ভবনের পেছনে একটি ছোট ঘর ছিল। ঘরটির দরজায় মরচে ধরা তালা ঝুলত। জানালার কাঠে ঘুণ ধরেছিল, দেওয়ালের চুন উঠে গিয়ে ইট বেরিয়ে পড়েছিল। বহু বছর ধরে সেখানে কেউ ঢুকত না। গ্রামের মানুষ ঘরটিকে বলত ‘পুরোনো হিসাবের ঘর’।
একসময় সেখানে গ্রামের জমি, পুকুর, রাস্তা, খাজনা এবং নানা সামাজিক সিদ্ধান্তের নথি রাখা হতো। কিন্তু নতুন ভবন তৈরি হওয়ার পর পুরোনো ঘরটি অবহেলায় পড়ে ছিল। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ জানতই না, সেই ঘরের ভেতরে কী রয়েছে।
সেই গ্রামেই থাকত কুড়ি বছরের অয়ন। কলেজে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করত সে। তার বাবা ছোট একটি মুদি দোকান চালাতেন, মা সংসার সামলাতেন। অয়নের স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়া। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি গ্রামের পুরোনো স্থাপনা ও মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানারও তার গভীর আগ্রহ ছিল।
একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে সে দেখল, কয়েকজন গ্রামবাসী পঞ্চায়েত ভবনের সামনে উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন।
গ্রামের দক্ষিণপাড়ার একটি খেলার মাঠ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে। কেউ বলছেন, মাঠটি বহু বছর ধরে গ্রামের শিশুদের খেলার জায়গা। অন্যদিকে কয়েকজন দাবি করছেন, জমিটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন এবং সেখানে নতুন নির্মাণকাজ শুরু হবে।
বিষয়টি নিয়ে গ্রামে বিভেদ দেখা দিয়েছে। একদল অন্য দলকে দোষারোপ করছে। কেউ বলছে, পুরোনো কাগজপত্র গোপন করা হয়েছে। আবার কেউ অভিযোগ করছে, জমির ইতিহাস না জেনেই মানুষ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
অয়ন অনেকক্ষণ চুপ করে সব শুনল।
তারপর সে গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক নির্মলবাবুর কাছে গেল।
“স্যার, জমিটার পুরোনো ইতিহাস কি জানা সম্ভব নয়?”
নির্মলবাবু চশমা খুলে বললেন, “সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আমাদের গ্রামের পুরোনো নথিগুলো কোথায় আছে, তা কেউ ঠিক জানে না।”
অয়নের মনে পড়ল পঞ্চায়েত ভবনের পেছনের সেই পরিত্যক্ত ঘরটির কথা।
সে বলল, “হয়তো নথিগুলো ওখানেই রয়েছে।”
নির্মলবাবু কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “থাকতেও পারে। তবে অনুমতি ছাড়া সেখানে ঢোকা ঠিক হবে না। নথি যদি থাকে, সেগুলো সংরক্ষণ করাও জরুরি।”
অয়ন সিদ্ধান্ত নিল, বিষয়টি নিয়ে সে নিয়মমাফিক এগোবে।
১. বন্ধ দরজার ওপারে
পরের দিন অয়ন পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে গেল। সে ঘরটির অবস্থা জানাল এবং পুরোনো নথিগুলো পরীক্ষা করার অনুমতি চাইল।
প্রথমে প্রধান খুব একটা আগ্রহ দেখালেন না।
“এত পুরোনো কাগজ নিয়ে এখন কী হবে? সবকিছু তো বর্তমান রেকর্ডেই থাকার কথা।”
অয়ন শান্তভাবে বলল, “বর্তমান রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো জমি বা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস জানতে পুরোনো নথিও কাজে লাগতে পারে। সেগুলো নষ্ট হয়ে গেলে ভবিষ্যতে আর কিছুই জানা যাবে না।”
অয়নের কথায় যুক্তি ছিল। কয়েকজন প্রবীণ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করে অবশেষে ঘরটি পরিষ্কার করার অনুমতি দেওয়া হলো। তবে স্পষ্ট করে বলা হলো, কোনো নথি বাইরে নেওয়া যাবে না এবং সব কাজের হিসাব রাখতে হবে।
শনিবার সকালে অয়ন, নির্মলবাবু এবং গ্রামের আরও দুজন স্বেচ্ছাসেবক ঘরটির সামনে হাজির হলো। তালা খোলার পর দরজাটি ঠেলে খুলতেই ধুলোর গন্ধে চারপাশ ভরে গেল।
ঘরের ভেতরে কাঠের তিনটি আলমারি। এক কোণে ভাঙা টেবিল, অন্য কোণে কয়েকটি লোহার বাক্স। ছাদের একটি অংশ দিয়ে বৃষ্টির জল পড়েছে। অনেক কাগজ ভিজে একসঙ্গে লেগে গেছে।
অয়নের মন খারাপ হয়ে গেল।
“এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস এভাবে পড়ে রয়েছে!”
নির্মলবাবু বললেন, “আমরা অনেক সময় নতুন কিছু তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পুরোনো সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখার কথা ভুলে যাই।”
তাঁরা প্রথমে ঘরটি পরিষ্কার করলেন। তারপর নথিগুলো আলাদা আলাদা করে সাজাতে শুরু করলেন। কোনোটিতে জমির বিবরণ, কোনোটিতে গ্রামের পুরোনো পুকুরের হিসাব, আবার কোনোটিতে স্কুল প্রতিষ্ঠার সময়কার সিদ্ধান্ত লেখা।
অয়ন একটি খাতা খুলে দেখল, তাতে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের হাতে লেখা বিবরণ রয়েছে। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে, তবু অনেক লেখা পড়া যাচ্ছে।
একটি নথিতে দক্ষিণপাড়ার মাঠটির উল্লেখ ছিল।
অয়নের বুকের ভেতর উত্তেজনা জাগল। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিল না। নথির তারিখ, জমির পরিচিতি, দাগ নম্বর এবং অন্যান্য তথ্য মন দিয়ে নোট করতে লাগল।
সে বুঝেছিল, কয়েকটি পুরোনো লাইন দেখে পুরো সত্য জানা যায় না। নথির অর্থ বুঝতে হলে প্রেক্ষাপটও জানতে হবে।
২. কাগজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ধরে অয়ন নিয়মিত পুরোনো ঘরে কাজ করতে লাগল। পঞ্চায়েতের অনুমতি নিয়ে নথিগুলোর তালিকা তৈরি করা হলো। যেসব কাগজ খুব নাজুক ছিল, সেগুলো বিশেষভাবে আলাদা করে রাখা হলো। প্রয়োজনে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে জেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরামর্শ নেওয়ার প্রস্তাবও উঠল।
অয়ন শুধু মাঠের নথিই খুঁজছিল না। সে দেখতে চেয়েছিল, গ্রামের সামাজিক ইতিহাস কীভাবে এই কাগজগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে আছে।
একদিন সে এমন একটি বিবরণ পেল, যেখানে লেখা ছিল—গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বহু বছর আগে একটি জমি শিশুদের খেলাধুলা ও গ্রামের সাধারণ ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
নথিতে জমিটির সীমানার কথাও ছিল।
অয়ন নির্মলবাবুকে ডেকে বলল, “স্যার, এখানে তো মাঠের মতো একটি জমির উল্লেখ রয়েছে!”
নির্মলবাবু মন দিয়ে পড়লেন। তাঁর মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
“এটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। কিন্তু এই জমি আর বর্তমান মাঠটি একই কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে। জমির নথি, মানচিত্র এবং সরকারি রেকর্ড মিলিয়ে দেখা দরকার।”
অয়ন মাথা নাড়ল।
তারা নথির অনুলিপি তৈরি করার জন্য যথাযথ অনুমতি চাইল এবং জমি সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে তুলনা করার উদ্যোগ নিল। পাশাপাশি গ্রামের প্রবীণ মানুষদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করতে লাগল।
এক বৃদ্ধ কৃষক জানালেন, ছোটবেলায় তিনি ওই মাঠে গ্রামবাসীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান হতে দেখেছেন। আরেকজন বললেন, বহু বছর আগে সেখানে কিশোরদের খেলাধুলার প্রতিযোগিতা হতো।
কিন্তু মৌখিক স্মৃতি আর লিখিত নথি এক জিনিস নয়। অয়ন প্রতিটি বক্তব্য আলাদা করে লিখে রাখল। কে কী বলেছেন, কোন সময়ের কথা বলেছেন এবং সেই তথ্য যাচাই করার অন্য কোনো উপায় আছে কি না—সবকিছু নোট করল।
একদিন কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপকও তাকে পরামর্শ দিলেন।
“ইতিহাসের কাজ শুধু পুরোনো কাগজ খুঁজে পাওয়া নয়, অয়ন। তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, একাধিক প্রমাণের মধ্যে সম্পর্ক বোঝা এবং যেখানে নিশ্চিত হওয়া যায় না, সেখানে অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করাও ইতিহাসচর্চার অংশ।”
এই কথাগুলো অয়নের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
সে বুঝল, সত্যের প্রতি ভালোবাসা থাকলেই যথেষ্ট নয়; সত্য খোঁজার পদ্ধতিটিও সৎ হতে হবে।
৩. যখন সন্দেহের তীর ঘুরে এল
অয়নের কাজের খবর দ্রুত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ তাকে উৎসাহ দিল, কেউ আবার সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করল।
একদিন বাজারে কয়েকজন তাকে থামিয়ে বলল, “তুমি কি বিশেষ কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করছ? মাঠের ব্যাপারটা নিয়ে এত মাথা ঘামানোর কারণ কী?”
অয়ন অবাক হলেও রাগ করল না।
সে বলল, “আমি কারও পক্ষ নিচ্ছি না। নথিতে কী আছে, তা জানার চেষ্টা করছি। প্রমাণ যা বলবে, সেটাই সামনে আসা উচিত।”
কিন্তু সন্দেহ একবার ছড়িয়ে পড়লে তা সহজে থামে না। কেউ কেউ বলতে শুরু করল, অয়ন পুরোনো কাগজ নিজের মতো করে ব্যবহার করছে। কেউ আবার দাবি করল, তার কাজের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অয়ন খুব হতাশ হয়ে পড়ল।
মা তার মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে?”
অয়ন বলল, “আমি তো শুধু সত্যিটা জানতে চাইছি। তবু সবাই সন্দেহ করছে। মনে হচ্ছে, কাজটা বন্ধ করে দিই।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “সবাই তোমার উদ্দেশ্য বুঝবে, এমন আশা করা ঠিক নয়। কিন্তু তুমি যদি নিজের কাজের হিসাব পরিষ্কার রাখো, কাউকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত না করো এবং নিয়ম মেনে এগোও, তা হলে অন্তত নিজের কাছে সৎ থাকতে পারবে।”
বাবাও দোকান থেকে ফিরে কথাটা শুনলেন।
তিনি বললেন, “মানুষের কথা শুনে পথ বদলানো সহজ। নিজের কাজের জবাবদিহি বজায় রেখে এগোনো কঠিন। তবে কঠিন বলেই সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
সেদিন রাতে অয়ন নিজের নোটগুলো আবার পরীক্ষা করল। কোথাও কোনো তথ্য অসম্পূর্ণ রয়েছে কি না, কোনো বক্তব্য ভুলভাবে লেখা হয়েছে কি না, সব খুঁটিয়ে দেখল।
তারপর সে একটি সিদ্ধান্ত নিল—যতক্ষণ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় নথি যাচাই না হচ্ছে, ততক্ষণ মাঠটির মালিকানা নিয়ে সে কোনো চূড়ান্ত দাবি করবে না।
তার লক্ষ্য ছিল না কাউকে জয়ী করা। তার লক্ষ্য ছিল গ্রামবাসীদের সামনে যাচাইযোগ্য তথ্য তুলে ধরা।
৪. সত্যের সামনে সবাই
প্রায় দুই মাসের চেষ্টার পর পুরোনো নথি, বর্তমান সরকারি রেকর্ড এবং জমির সীমানা সংক্রান্ত তথ্য একত্র করা গেল। সব তথ্য একেবারে একই কথা বলছিল না। কিছু পুরোনো বিবরণ অস্পষ্ট ছিল, কিছু তথ্যের ব্যাখ্যার জন্য আরও যাচাই প্রয়োজন ছিল।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে উঠল—মাঠটির ইতিহাস নিয়ে গ্রামের মানুষের যে ধারণা ছিল, তা একেবারে ভিত্তিহীন নয়। পুরোনো নথিতে জমিটির সাধারণ ব্যবহারের উল্লেখ ছিল, কিন্তু বর্তমান মালিকানা ও আইনগত অবস্থান নির্ধারণ করতে আরও সরকারি যাচাই দরকার।
অয়ন এই ফলাফল গোপন করল না। সে শুধু নিজের পক্ষে যাওয়া তথ্যগুলো সামনে আনেনি; যে তথ্যগুলো তার ধারণাকে সমর্থন করছিল না, সেগুলোও প্রতিবেদনে রাখল।
পঞ্চায়েত ভবনে একটি খোলা আলোচনা সভার আয়োজন করা হলো। উপস্থিত ছিলেন গ্রামের প্রবীণ মানুষ, দুই পক্ষের প্রতিনিধি, শিক্ষক, পঞ্চায়েত সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ কয়েকজন ব্যক্তি।
অয়ন নিজের তৈরি নথির তালিকা, পুরোনো বিবরণের অনুলিপি এবং যাচাইয়ের জন্য সংগৃহীত তথ্য সবার সামনে তুলে ধরল।
সে বলল, “এই নথিগুলো থেকে আমরা গ্রামের অতীত সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পেরেছি। কিন্তু শুধু পুরোনো নথির ভিত্তিতে বর্তমান আইনি মালিকানা নির্ধারণ করা যায় না। তাই জমির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড যাচাই করা দরকার।”
সভায় প্রথমে নীরবতা নেমে এল।
তারপর মাঠের এক পক্ষের প্রতিনিধি বললেন, “তুমি চাইলে শুধু আমাদের পক্ষে থাকা তথ্যগুলো দেখাতে পারতে। কিন্তু তুমি দুদিকের কথাই বলেছ।”
অয়ন উত্তর দিল, “তথ্য যদি নিজের পছন্দমতো বেছে নিই, তা হলে সত্য আর সত্য থাকে না। তখন সেটা শুধু নিজের মতামতকে সমর্থন করার উপায় হয়ে যায়।”
নির্মলবাবু মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
সভায় সিদ্ধান্ত হলো, জমিটির বর্তমান আইনগত অবস্থান নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিতভাবে আবেদন করা হবে। তত দিন পর্যন্ত বিরোধ এড়াতে সব পক্ষকে সংযত থাকার অনুরোধ জানানো হলো। একই সঙ্গে পুরোনো নথিগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হলো।
মাঠের বিরোধ সেদিনই মিটে গেল না। কিন্তু একে অপরকে দোষারোপ করার বদলে মানুষ প্রথমবারের মতো প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা করতে শিখল।
আর সেটাই ছিল বড় পরিবর্তন।
৫. নীরব ঘরের নতুন পরিচয়
কয়েক মাসের মধ্যে পঞ্চায়েত ভবনের পুরোনো ঘরটির চেহারা বদলে গেল। ভাঙা জানালা মেরামত করা হলো, ছাদের ফুটো বন্ধ করা হলো এবং নথি রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা করা হলো। গুরুত্বপূর্ণ কাগজগুলোর তালিকা তৈরি করে নির্দিষ্ট দপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলো।
ঘরটি আর পরিত্যক্ত রইল না। গ্রামের ইতিহাস ও পুরোনো নথি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী মানুষ নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সেখানে আসতে পারতেন।
দেওয়ালে একটি ছোট ফলক লাগানো হলো—
‘এই ঘরে সংরক্ষিত রয়েছে শালিখা গ্রামের অতীতের নানা দলিল। প্রতিটি নথি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্মৃতি মূল্যবান, কিন্তু সত্য জানতে হলে স্মৃতির সঙ্গে প্রমাণেরও প্রয়োজন।’
উদ্বোধনের দিন অয়নকে কয়েকটি কথা বলতে বলা হলো।
সে বলল, “এই ঘরটি আমাকে শিখিয়েছে, অবহেলায় পড়ে থাকা জিনিসেরও মূল্য থাকতে পারে। কিন্তু সেই মূল্য বুঝতে হলে ধৈর্য দরকার। পুরোনো কাগজ সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না, তবু সঠিক প্রশ্ন করতে সাহায্য করে। আর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের পছন্দের বাইরেও সত্যকে দেখতে হয়।”
কথাগুলো শুনে উপস্থিত মানুষ হাততালি দিলেন।
সেদিন সভার শেষে এক প্রবীণ গ্রামবাসী অয়নের কাছে এসে বললেন, “বাবা, এত দিন আমরা ভাবতাম, সত্য মানে নিজের চোখে যা দেখেছি সেটাই। তুমি শিখিয়েছ, নিজের দেখা জিনিসকেও প্রশ্ন করতে হয়।”
অয়ন মৃদু হেসে বলল, “প্রশ্ন করলেই তো সত্যের কাছে পৌঁছনোর পথ তৈরি হয়।”
বছরখানেক পর অয়ন ইতিহাসে উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য শহরে চলে গেল। যাওয়ার আগে সে পুরোনো নথিগুলোর তালিকা, সংরক্ষণের নিয়ম এবং ভবিষ্যতে কীভাবে আরও তথ্য সংগ্রহ করা যায়, তার একটি বিস্তারিত বিবরণ পঞ্চায়েতের হাতে তুলে দিল।
তার অনুপস্থিতিতেও কাজটি যাতে চলতে পারে, সে জন্য গ্রামের কয়েকজন তরুণকে নথির যত্ন নেওয়ার প্রাথমিক পদ্ধতি শেখানো হলো।
একদিন সন্ধ্যায় অয়ন আবার সেই ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে ভেতরে আলো পড়ছিল। কাঠের আলমারিতে সাজানো নথিগুলো আর ধুলোর নিচে চাপা পড়ে ছিল না।
সে দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
এই ঘর তাকে কোনো অলৌকিক উত্তর দেয়নি। দেয়নি এমন কোনো প্রমাণ, যা দিয়ে এক মুহূর্তে সব বিরোধ মিটে যায়। বরং ঘরটি তাকে শিখিয়েছিল—সত্যের পথে হাঁটা মানে নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস রাখা, অসম্পূর্ণ তথ্যকে অসম্পূর্ণ বলার সততা বজায় রাখা এবং বিরোধের মধ্যেও ন্যায়সঙ্গত পদ্ধতির ওপর আস্থা রাখা।
অয়ন যখন ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, তখন গ্রামের কয়েকটি শিশু পুরোনো নথির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ফলকটি পড়ছিল।
একটি শিশু আরেকটিকে জিজ্ঞেস করল, “এখানে এত পুরোনো কাগজ রেখে কী হবে?”
অন্য শিশুটি উত্তর দিল, “আমরা যেন ভুলে না যাই, আগে কী হয়েছিল। আর কেউ কিছু বললেই যেন যাচাই না করে বিশ্বাস না করি।”
দূর থেকে কথাটি শুনে অয়ন থমকে দাঁড়াল।
তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
সে বুঝল, ঘরটির সবচেয়ে বড় সাফল্য নথি বাঁচানো নয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, একটি গ্রামের মানুষকে প্রশ্ন করতে, প্রমাণ খুঁজতে এবং মতের পার্থক্য থাকলেও সত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে শেখানো।
সেদিন সন্ধ্যায় শালিখা গ্রামের আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। পুরোনো ঘরের জানালায় শেষ আলো এসে পড়েছিল। সেই আলোয় ধুলোহীন তাকগুলো ঝলমল করছিল না, কিন্তু তাদের ভেতরে জমে থাকা ইতিহাস যেন নতুন করে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল।
নীরব ঘরটি অবশেষে কথা বলতে শিখেছিল—কোনো মানুষের কণ্ঠে নয়, সত্যের প্রতি মানুষের নতুন দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়ে।
শিক্ষা: সত্যকে ভালোবাসা মানে শুধু নিজের মতের পক্ষে প্রমাণ খোঁজা নয়; নিজের ধারণার বিপরীত তথ্যকেও সম্মান করা। ধৈর্য, স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে অনুসন্ধান করলে পুরোনো ভুল বোঝাবুঝি দূর করার পথ তৈরি হয়। আর কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নতি তখনই সম্ভব, যখন মানুষ অভিযোগের বদলে প্রমাণ এবং বিরোধের বদলে ন্যায়সংগত আলোচনাকে গুরুত্ব দেয়।












Leave a Reply