গল্প : যে সেতারটি শিখিয়েছিল হারিয়ে যাওয়ার পরেও ফিরে আসা যায়।

মেদিনীপুর শহরের এক পুরোনো পাড়ায় বাস করতেন অবসরপ্রাপ্ত সংগীতশিক্ষক অমিয়কান্ত মুখোপাধ্যায়। তাঁর বাড়ির সামনের উঠোনে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। গ্রীষ্মকালে গাছটি লাল ফুলে ভরে উঠত, আর শীতের বিকেলে তার ছায়া এসে পড়ত বাড়ির বারান্দায়। সেই বারান্দার পাশেই ছিল একটি ছোট সংগীতের ঘর।

ঘরটির দেওয়ালে টাঙানো ছিল কয়েকটি পুরোনো ছবি। কোথাও তরুণ বয়সে অমিয়কান্তের সংগীত পরিবেশনের মুহূর্ত, কোথাও তাঁর ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তোলা ছবি। ঘরের মাঝখানে কাঠের একটি আলমারি, পাশে তানপুরা, তবলা আর একটি পুরোনো সেতার।

একসময় এই ঘরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় সুরের আসর বসত। ছাত্রছাত্রীরা আসত, রেওয়াজ করত, ভুল হলে আবার চেষ্টা করত। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে ঘরটি প্রায় বন্ধই থাকত।

কারণ, অমিয়কান্তের একমাত্র ছেলে অনিরুদ্ধ বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

অনিরুদ্ধ ছোটবেলা থেকেই সেতার শিখত। তার আঙুলের স্পর্শে তারগুলো থেকে এমন সুর বেরোত যে পাড়ার মানুষ কাজ থামিয়ে শুনতে দাঁড়িয়ে যেত। অমিয়কান্তের বিশ্বাস ছিল, একদিন তাঁর ছেলে বড় শিল্পী হবে।

কিন্তু ছেলের নিজের স্বপ্ন ছিল অন্য রকম। সে সংগীত ভালোবাসত ঠিকই, কিন্তু পেশা হিসেবে সংগীতকে বেছে নিতে চাইত না। তার ইচ্ছা ছিল প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করে নিজের মতো জীবন গড়ার।

এই নিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে প্রায়ই তর্ক হতো।

অমিয়কান্ত বলতেন, “তোর মধ্যে এমন প্রতিভা আছে, যা সবাই পায় না। তুই সেটা নষ্ট করতে পারিস না।”

অনিরুদ্ধ উত্তর দিত, “প্রতিভা থাকা মানেই কি সেই পথেই জীবন কাটাতে হবে, বাবা? আমি সংগীত ভালোবাসি। কিন্তু আমার ভবিষ্যৎটা আমাকেও ঠিক করতে দাও।”

অমিয়কান্ত ছেলের কথাকে অবাধ্যতা বলে মনে করতেন। তাঁর ধারণা ছিল, অনিরুদ্ধ একদিন বুঝতে পারবে যে বাবার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল।

কিন্তু সেই দিন আর আসেনি।

এক রাতে তীব্র তর্কের পর অনিরুদ্ধ কলকাতায় চলে যায়। যাওয়ার সময় সে শুধু বলেছিল, “যেদিন তুমি আমার ইচ্ছেটাকেও আমার প্রতিভার মতো সম্মান করতে পারবে, সেদিন হয়তো ফিরে আসব।”

তারপর পাঁচ বছর কেটে গেছে।

মাঝে কয়েকবার ফোনে কথা হলেও বাবা-ছেলের দূরত্ব কমেনি। অমিয়কান্ত কখনও ছেলেকে নিজের ভুল স্বীকার করে কিছু বলতে পারেননি। আর অনিরুদ্ধও অভিমান ভুলে বাড়ি ফিরে আসেনি।

তবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় অমিয়কান্ত সংগীতের ঘরের দরজা খুলে সেতারটির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। যন্ত্রটির তারে ধুলো জমেছিল, কাঠের গায়ে সময়ের দাগ পড়েছিল। তবু তিনি সেটি বিক্রি করতে পারেননি।

সেতারটি ছিল তাঁর কাছে ছেলের শৈশবের শেষ জীবন্ত স্মৃতি।

১. অচেনা অতিথি

এক বর্ষার সকালে অমিয়কান্তের বাড়িতে এল এক তরুণী। তার নাম মেঘলা। বয়স চব্বিশ-পঁচিশের কাছাকাছি। কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ, হাতে একটি খাতা।

সে দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি অমিয়কান্ত মুখোপাধ্যায়?”

“হ্যাঁ। তুমি কে?”

“আমি মেঘলা দত্ত। কাছের একটি স্কুলে পড়াই। আপনার কাছে একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি।”

অমিয়কান্ত তাকে বসতে বললেন।

মেঘলা জানাল, তাদের স্কুলে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী সংগীত শিখতে চায়। কিন্তু স্কুলে কোনো সংগীতশিক্ষক নেই। স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানতে পেরেছেন, অমিয়কান্ত একসময় অনেক ছাত্রছাত্রীকে সংগীত শিখিয়েছেন। তাই তাঁরা চান, তিনি সপ্তাহে অন্তত এক দিন এসে শিশুদের সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা দিন।

অমিয়কান্ত মাথা নাড়লেন।

“এখন আর সে বয়স নেই মা। হাত কাঁপে, চোখেও আগের মতো দেখি না। তাছাড়া অনেক দিন সংগীত শেখানো হয় না।”

মেঘলা শান্ত গলায় বলল, “আমরা আপনাকে বড় কোনো অনুষ্ঠান করতে বলছি না। বাচ্চাদের শুধু সুরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।”

অমিয়কান্ত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন, “ভেবে দেখব।”

মেঘলা চলে যাওয়ার আগে ঘরের দরজার কাছে রাখা সেতারটি দেখতে পেল।

“আপনি কি এখনও বাজান?”

অমিয়কান্তের মুখে ম্লান হাসি ফুটল।

“না। বহু বছর বাজানো হয় না।”

“কেন?”

প্রশ্নটি শুনে বৃদ্ধ একটু থমকে গেলেন।

“সব সুরেরই বোধ হয় একটা সময় থাকে।”

মেঘলা আর কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখে এমন এক কৌতূহল ছিল, যা অমিয়কান্তের নজর এড়াল না।

২. প্রথম সুরের প্রত্যাবর্তন

পরের সপ্তাহে অমিয়কান্ত স্কুলে গেলেন। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো দশ-বারোজন শিশু থাকবে। কিন্তু ছোট্ট ঘরটিতে প্রায় তিরিশজন ছাত্রছাত্রী জড়ো হয়েছে।

কেউ বেঞ্চে বসেছে, কেউ মেঝেতে। কারও হাতে ছোট খঞ্জনি, কেউ খালি হাতে তাল দিচ্ছে।

অমিয়কান্ত প্রথমে তাদের স্বর চেনালেন। কীভাবে মন দিয়ে শুনতে হয়, কীভাবে ধীরে ধীরে সুর ধরতে হয়, তা বোঝালেন। শিশুরা কেউ ঠিকঠাক গাইতে পারল, কেউ ভুল করল। কিন্তু তাদের উৎসাহ দেখে তাঁর বহুদিনের ক্লান্ত মন একটু হালকা হয়ে গেল।

একটি ছোট ছেলে বারবার একই সুর ভুল করছিল। অন্যরা হেসে উঠলে ছেলেটি মাথা নিচু করে বসে পড়ল।

অমিয়কান্ত তার কাছে গিয়ে বললেন, “তোমার নাম কী?”

“সৌরভ।”

“কতবার চেষ্টা করেছ?”

“অনেকবার।”

“আর কতবার চেষ্টা করতে পারবে?”

ছেলেটি একটু ভেবে বলল, “যতবার দরকার।”

বৃদ্ধ হেসে উঠলেন।

“তাহলে তো তুমি ইতিমধ্যেই সংগীতের প্রথম পাঠ শিখে গেছ।”

সেদিন বাড়ি ফিরে অমিয়কান্ত বহুদিন পর নিজের সংগীতের ঘরের জানালা খুললেন। বিকেলের আলো ঘরে ঢুকে পড়ল। তিনি সেতারটি আলমারি থেকে নামিয়ে কাপড় দিয়ে মুছলেন।

তারপর ধীরে ধীরে তারগুলো পরীক্ষা করতে লাগলেন।

প্রথমে সুর ঠিক হলো না। কয়েকটি তারের শব্দ কর্কশ শোনাল। আঙুলে ব্যথা হচ্ছিল। তবু তিনি থামলেন না।

একসময় একটি পরিচিত সুর ঘরের নীরবতা ভেঙে বেরিয়ে এল।

সেই সুরের সঙ্গে ফিরে এল বহু পুরোনো একটি দৃশ্য—ছোট্ট অনিরুদ্ধ মেঝেতে বসে সেতার বাজানোর চেষ্টা করছে। বাবা তার পাশে বসে আঙুলের অবস্থান ঠিক করে দিচ্ছেন। ছেলে ভুল করলে তিনি আবার শেখাচ্ছেন।

হঠাৎ অমিয়কান্তের হাত থেমে গেল।

তিনি বুঝলেন, এত দিন তিনি ছেলের প্রতিভাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রতিভার আড়ালে ছেলেটির নিজের ইচ্ছেটাকে দেখতে ভুলে গিয়েছিলেন।

এই উপলব্ধি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিল।

৩. পুরোনো ভুলের মুখোমুখি

এর কয়েক দিন পর মেঘলা আবার তাঁর বাড়িতে এল। সে জানাল, স্কুলের শিশুরা সেতারের শব্দ শুনতে চায়। অমিয়কান্তকে যদি আপত্তি না থাকে, তবে একদিন স্কুলে সেতার নিয়ে গেলে ভালো হয়।

বৃদ্ধ প্রথমে দ্বিধা করলেন। তারপর রাজি হলেন।

সেদিন তিনি সেতার নিয়ে স্কুলে গেলেন। শিশুরা যন্ত্রটি দেখে অবাক হয়ে গেল। কেউ আগে কাছ থেকে সেতার দেখেনি।

অমিয়কান্ত তাদের সামনে বসে একটি সহজ রাগের আলাপ শুরু করলেন। ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে সুর ছড়িয়ে পড়ল। বাচ্চারা চুপ করে শুনছিল।

শেষ হলে সৌরভ হাত তুলে বলল, “স্যার, এই সুর শুনলে মনে হয় কেউ যেন অনেক দূর থেকে বাড়ি ফিরছে।”

কথাটা শুনে অমিয়কান্তের বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।

অনিরুদ্ধও কি কখনও এমন সুর শুনে বাড়ি ফেরার কথা ভেবেছে?

সেদিন রাতে তিনি ছেলের পুরোনো নম্বরে ফোন করলেন। বহুক্ষণ রিং হওয়ার পর অনিরুদ্ধ ফোন ধরল।

“হ্যালো, বাবা?”

অমিয়কান্তের গলা শুকিয়ে গেল। এত দিন পর ছেলের কণ্ঠস্বর শুনে তিনি কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না।

“কেমন আছিস?”

“ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?”

“বয়স হচ্ছে। শরীর আগের মতো নেই।”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর অমিয়কান্ত বললেন, “আমি আবার সেতার বাজানো শুরু করেছি।”

ওপাশ থেকে অনিরুদ্ধের গলায় বিস্ময় শোনা গেল।

“সত্যি?”

“হ্যাঁ। কাছের একটা স্কুলে বাচ্চাদেরও শেখাই।”

“খুব ভালো করেছ, বাবা।”

এই সামান্য কথাটুকু শুনেই অমিয়কান্তের চোখ ভিজে উঠল। তিনি বুঝলেন, ছেলের সঙ্গে কথা বলার দরজা এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

তবু তিনি সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসতে বললেন না। বরং বললেন, “একটা কথা তোকে বলতে চাই। অনেক দিন ধরে বলা হয়নি।”

অনিরুদ্ধ চুপ করে রইল।

অমিয়কান্ত ধীরে ধীরে বললেন, “তোর প্রতিভা নিয়ে আমি এত গর্বিত ছিলাম যে তোর নিজের ইচ্ছেটা শুনতে ভুলে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, তোর জন্য কোন পথ ভালো, সেটা শুধু আমিই জানি। তুই নিজের জীবন বেছে নিতে চেয়েছিলি, আর আমি সেটাকে অবাধ্যতা ভেবেছিলাম।”

ওপাশে কোনো উত্তর এল না।

বৃদ্ধ আবার বললেন, “আমি তোকে জোর করে আমার স্বপ্নের মধ্যে আটকে রাখতে চেয়েছিলাম। সেটা আমার ভুল ছিল। তুই যদি আমাকে ক্ষমা করতে পারিস, তবে ভালো লাগবে। আর যদি সময় লাগে, তাও বুঝব।”

ফোনের ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর অনিরুদ্ধ বলল, “বাবা, আমি তোমার ওপর রাগ করেছিলাম। কিন্তু তোমাকে কখনও ঘৃণা করিনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম, তুমি একবার আমার কথাটাও বোঝো।”

অমিয়কান্ত চোখ বন্ধ করলেন।

“এখন বুঝতে পারছি রে।”

সেদিন তাঁদের কথা খুব দীর্ঘ হয়নি। কিন্তু পাঁচ বছরের নীরবতার মধ্যে প্রথমবার সত্যিকারের একটি সেতু তৈরি হলো।

৪. ফিরে আসার অর্থ

পরের মাসে অনিরুদ্ধ কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে মেদিনীপুরে এল।

বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে সে দেখল, কৃষ্ণচূড়া গাছটি আগের মতোই আছে। উঠোনের এক কোণে পুরোনো সাইকেল, বারান্দায় বাবার চেয়ার। শুধু বাড়ির ভেতরটা যেন একটু বেশি নীরব।

অমিয়কান্ত দরজা খুললেন।

দুজনেই কয়েক মুহূর্ত একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বৃদ্ধ ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।

“ভেতরে আয়।”

অনিরুদ্ধ সংগীতের ঘরে ঢুকে সেতারটি দেখতে পেল। তার গায়ে নতুন করে তেল দেওয়া হয়েছে, তারগুলোও বদলানো হয়েছে।

সে আলতো করে যন্ত্রটির গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, “এটা এখনও রেখেছ?”

অমিয়কান্ত উত্তর দিলেন, “ফেলে দিতে পারিনি। তবে এখন বুঝি, যন্ত্রটাকে রেখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তোর ওপর আমার পুরোনো প্রত্যাশাগুলোও আঁকড়ে ধরে রেখেছিলাম।”

অনিরুদ্ধ বাবার দিকে তাকাল।

“তুমি কি এখনও চাও আমি সংগীতকেই পেশা করি?”

অমিয়কান্ত মাথা নাড়লেন।

“না। তুই যে কাজ ভালোবাসিস, সেটাই মন দিয়ে কর। সংগীত যদি তোর জীবনে আনন্দ নিয়ে আসে, তবে সেটুকুই যথেষ্ট।”

অনিরুদ্ধের চোখে জল এসে গেল। সে মুখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।

“আমি প্রকৌশল নিয়ে পড়েছি, বাবা। এখন একটি সংস্থায় কাজ করি। কিন্তু মাঝে মাঝে সেতারের কথা মনে পড়ে। এত দিন ভেবেছি, বাড়ি ফিরলে তুমি আবার আগের মতোই আমাকে তোমার স্বপ্নের কথা বলবে।”

অমিয়কান্ত মৃদু হেসে বললেন, “মানুষ ভুল করে। তবে ভুল বুঝতে পারলে বদলানোর চেষ্টা করাও জরুরি।”

সেই সন্ধ্যায় বাবা-ছেলে পাশাপাশি বসে সেতারটি হাতে নিলেন। অনিরুদ্ধ প্রথমে একটু অস্বস্তি বোধ করছিল। বহু বছর বাজানো হয়নি। আঙুল আগের মতো চলছিল না।

অমিয়কান্ত তাকে সংশোধন করতে গেলেন না। শুধু বললেন, “সময় নিয়ে বাজা। আজ কোনো পরীক্ষা নেই।”

এই কথাটুকু শুনে অনিরুদ্ধ যেন অনেকটা হালকা হয়ে গেল।

সে ধীরে ধীরে একটি পুরোনো সুর তুলল। অমিয়কান্ত চোখ বন্ধ করে শুনতে লাগলেন। সুরের মধ্যে ছিল অনভ্যাসের খসখসে ভাব, কোথাও কোথাও ভুল। কিন্তু তার ভেতরে ছিল ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

সেদিন তাঁরা বুঝলেন, একসঙ্গে সুর তোলার জন্য সব সময় নিখুঁত হওয়ার দরকার নেই। দরকার শুধু একে অপরের পাশে বসার ইচ্ছা।

৫. নতুন শিক্ষার ঘর

অনিরুদ্ধ কয়েক দিন পর কলকাতায় ফিরে গেল। কিন্তু এবার বিদায়ের সময় বাড়িতে কোনো অভিমান রইল না।

যাওয়ার আগে সে বলল, “বাবা, আমি মাসে অন্তত একবার আসব। আর সময় পেলে স্কুলের বাচ্চাদের জন্য কিছু সংগীতের সরঞ্জামও কিনে দেব।”

অমিয়কান্ত বললেন, “নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করিস। সাহায্য করতে গিয়ে নিজের ওপর চাপ নিস না।”

ছেলে হেসে বলল, “দেখছি, তুমি সত্যিই বদলে গেছ।”

বৃদ্ধও হাসলেন।

এরপর থেকে অমিয়কান্তের সংগীতের ঘর আবার খুলে গেল। তবে এবার সেখানে কোনো ছাত্রকে নির্দিষ্ট ভবিষ্যতের পথে ঠেলে দেওয়া হতো না। কেউ গান শিখত আনন্দের জন্য, কেউ তাল শেখার জন্য, কেউ আবার শুধু সংগীত শুনতে আসত।

অমিয়কান্ত প্রত্যেককে একটি কথাই বলতেন, “সংগীত শেখার আগে নিজের মনকে শুনতে শেখো। অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের আনন্দ হারিয়ে ফেলো না।”

সৌরভ, যে একসময় বারবার সুর ভুল করত, ধীরে ধীরে ভালো গাইতে শিখল। মেঘলা স্কুলের সংগীতচর্চার ব্যবস্থা আরও সুন্দর করে তুলল। অনিরুদ্ধও মাঝে মাঝে এসে শিশুদের সঙ্গে বসত। সে তাদের বুঝিয়ে দিত, বিজ্ঞান আর সংগীত পরস্পরের শত্রু নয়। প্রকৌশলের হিসাবের মধ্যেও ছন্দ আছে, আর সংগীতের মধ্যে রয়েছে নিয়ম, অনুশীলন ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ।

একদিন স্কুলে ছোট্ট একটি অনুষ্ঠান হলো। শিশুরা গান গাইল, কেউ তাল দিল, কেউ সেতারের সঙ্গে সহজ সুর তুলল। শেষ পরিবেশনে অমিয়কান্ত ও অনিরুদ্ধ পাশাপাশি বসে বাজালেন।

অনুষ্ঠান শেষে এক অভিভাবক এসে বললেন, “আপনার ছেলে তো খুব ভালো বাজায়। আপনি নিশ্চয়ই খুব গর্বিত?”

অমিয়কান্ত ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

“হ্যাঁ, গর্বিত। তবে শুধু ওর বাজানোর জন্য নয়। ও নিজের জীবন নিজের মতো করে গড়েছে, আবার নিজের ইচ্ছায় সংগীতের কাছেও ফিরে এসেছে। এটাই আমার কাছে বড় কথা।”

অনিরুদ্ধ বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পর কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দুজনে কিছুক্ষণ বসে রইল। আকাশে তখন প্রথম তারা উঠেছে। ঘরের ভেতর সেতারটি রাখা। তারগুলো আর নীরবতার প্রতীক নয়; সেগুলো এখন নতুন করে শুরু করার সম্ভাবনা বহন করছে।

অমিয়কান্ত জানতেন, অতীতের সব কষ্ট একদিনে মুছে যায় না। ক্ষমা চাইলেই সব ক্ষত সঙ্গে সঙ্গে সেরে ওঠে না। কিন্তু সত্যিকারের অনুতাপ, অন্যের ইচ্ছের প্রতি সম্মান এবং সম্পর্ককে নতুন করে গড়ার চেষ্টা—এই তিনটি জিনিস মানুষের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া পথ আবার খুলে দিতে পারে।

অনিরুদ্ধও বুঝেছিল, বাড়ি ফিরে আসা মানে নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দেওয়া নয়। কখনও কখনও ফিরে আসা মানে পুরোনো সম্পর্ককে নতুন চোখে দেখা, নিজের অভিমানকে ভাষা দেওয়া এবং অন্যের পরিবর্তনের সুযোগ রাখা।

রাতের শেষে অমিয়কান্ত সংগীতের ঘরে ঢুকে সেতারটির পাশে দাঁড়ালেন। জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে যন্ত্রটির গায়ে।

তিনি মনে মনে বললেন, জীবনের সব সুর একই রকম হয় না। কিছু সুর আনন্দের, কিছু অভিমানের, কিছু বিচ্ছেদের। কিন্তু কোনো সুরই চিরদিন শেষ হয়ে যায় না, যদি মানুষ আবার শোনার, বোঝার এবং নতুন করে শুরু করার সাহস রাখে।

আর সেই সাহসের নামই হয়তো ফিরে আসা।

শিক্ষা: সন্তানকে ভালোবাসা মানে তার হয়ে জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; তার স্বপ্ন, পছন্দ ও স্বাধীনতাকেও সম্মান করা। সম্পর্কের ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে ক্ষমা চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং সাহসের পরিচয়। অতীত বদলানো যায় না, কিন্তু বর্তমানের আচরণ বদলে ভবিষ্যৎকে নতুন করে গড়ে তোলা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *